নাজিফাকে নিয়ে যখন তার পরিবার মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে ডাক্তারের কাছে এসেছিলো তার মুখে লাবণ্যময়ী সে চাহনি ছিলোনা। বিমর্ষ, জীবন থেকে পরাজিত এক মেয়েকে আমি সোফার এককোণে গুটিসুটি হয়ে বসে থাকতে দেখেছিলাম। ডাক্তার তাকে আলাদাভাবে চেম্বারে ডেকে নিয়ে কথা বলছিলেন। নাজিফা একধরনের মানসিক রোগ “বিষণ্ণতায়” আক্রান্ত হয়েছিলো। ডাক্তার নাজিফার সবকিছু বিস্তারিত শোনার পর কিছু ঔষধসহ পূর্ণবিশ্রাম দিয়ে তাকে মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্রে রেফার করেছিলেন।

আমাদের সমাজে, পরিবারের চারপাশে নাজিফার মত এমন অনেকেই আছেন। কত অবহেলা বঞ্চনার শিকার হয়ে তারা বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষপর্যন্ত আত্মহত্যার মত নির্মম পথ বেছে নিচ্ছে তার হিসেব নেই। সবার নাজিফার মত চিকিৎসার আওতায় আসার সৌভাগ্য হয়না।

আমরা নিজেরা কমবেশি সবাই বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হই এবং কারো সাহায্য ছাড়াই এর থেকে বেরও হয়ে আসি। কিন্তু সবার মনোবল একরকম নয় এবং সবাই তা পারেনা যার পরিণতি মারাত্মক। তাই বিষণ্ণতাকে আমাদের জানতে হবে, চিহ্নিত করা শিখতে হবে।

চলুন আজ বিষণ্ণতা নিয়ে কিছুটা আলোচনা করি-

বিষণ্ণতা এক ধরনের মানসিক সমস্যা বা সমস্যাজনিত লক্ষণ। এর বিভিন্ন মাত্রাভেদ আছে। এইসব মাত্রাভেদে বিষণ্নতা বিভিন্ন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। যেমন-

🔵 সাধারণ বিষণ্ণতা (Normal Depression),
🔵 স্নায়বিক বিষণ্ণতা (Neurotic Depression),
🔵 মনোবিকারজনিত বিষণ্ণতা (Psychotic Depression) ইত্যাদি।

বিষণ্ণতামূলক স্নায়ুরোগটি সাধারণ বিষণ্ণতা এবং মনোবিকারজনিত বিষণ্ণতার মধ্যবর্তী পর্যায়ে অবস্থান করে। এটি অপেক্ষাকৃত স্থায়ী এবং মাঝারি রকমের তীব্রতা সম্পন্ন হয়। ফলে একজন ব্যক্তি বাস্তবতার সাথে সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষম হয় ঠিকই কিন্তু তার ব্যক্তিগত সুস্থতা অক্ষুন্ন থাকে না।

বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তির বিভিন্ন রকমের প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়। যেমন-

🔵 তীব্র মানসিক দুশ্চিন্তা,
🔵 হতাশামূলক অনুভূতি এবং
🔵 আত্মবেদনা অনুভূত হওয়া।

আপনি বা আপনার পরিবারের অথবা আপনজনদের কেউ বিষণ্ণতায় ভুগছেন তা কি করে বুঝবেন?

🔴 বিষণ্ণ ব্যক্তি কোন কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন না অর্থাৎ এক্ষেত্রে মনোযোগ কেন্দ্রীভূতকরণে সমস্যা দেখা যায়।

🔴 সে এক ধরনের আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকে। সে ধীরে ধীরে আহাজারি করতে থাকে। একস্থানে দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকতে পছন্দ করে।

🔴 যে কোন বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করে। বিশেষ করে সামাজিক অংশগ্রহণে অনীহা এমনকি যেকোনো কাজের প্রতি অনীহা পরিলক্ষিত হয়।

🔴 ক্ষুধামান্দ্য ও অনিদ্রা বিশেষ প্রকট থাকে। রোগী দিবাস্বপ্ন (fantasy) দেখতে থাকে। হতাশামূলক বিলাপ করতে থাকে।

🔴 অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে নেমে গেলে প্রায়শই আত্মহত্যার কথা বলে। আত্মহত্যা করার প্রবণতাও দেখা যেতে পারে। অনেক সময় এরকম হতাশামূলক অবস্থা আত্ম বিরোধিতা হিসেবে প্রকাশ পায়।

🔴 অন্যকে দোষারোপ করার মধ্য দিয়ে নিজের আত্মব্যর্থতা প্রকাশ করে। ভাগ্য বিড়ম্বনার কথা বলে।

🔴 অধিক মাত্রায় বশ্যতার প্রবণতা, নির্ভরশীলতা এবং তীব্র সংবেদনশীলতা দেখা দিতে পারে।

বিষণ্ণতায় আক্রান্তের কারনসমূহ-

একজন ব্যক্তি বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হবার নানাবিধ কারন থাকতে পারে। সাধারণত হতাশা ও মানসিক চাপ, মানসিক আঘাত থেকে যে স্নায়বিক বিষণ্ণতা দেখা যায় তা যখন অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে উপনীত হয় তখন তাকে বিষণ্ণতামূলক স্নায়ুরোগ বলে। যাদের ইগো বা অহম দূর্বল যাকে সাধারণত আমরা বলি মনের দিক থেকে দুর্বল ব্যক্তি তারাই মানসিক বিষণ্ণতার শিকার হতে পারেন। মানসিক আঘাতের তীব্রতা এবং আঘাতের পৌনঃপুনিকতাও এর জন্য দায়ী। প্রেমঘটিত ব্যাথা, ব্যর্থতা এবং এমনসব কামনা-বাসনা যা অসামাজিক ও নীতি বিরুদ্ধ তা থেকেই বিষণ্ণতামূলক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে।

বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলে করণীয়-

বিষণ্ণতা রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন। তার প্রতি মানবিক ও সদয় আচরণ করুন। তাকে বোঝার চেষ্টা করুন। একমাত্র বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ এবং আপনার সঠিক পরিচর্যাই কাউকে বিষণ্ণতা থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে।

মনে রাখবেন, এই পৃথিবী, সমাজ, পরিবারে কেউ শতভাগ সুখী নয়। সুখ, দুঃখ, জড়া, বেদনা, হতাশা, ক্লান্তি, ব্যর্থতা, প্রেম, বিরহ এসবই জীবনের অংশ। এসবকে মেনে নিয়েই জীবন পরিচালিত করতে হয়। তাই নিজের জীবনে এসবের অস্তিত্বকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে শিখুন। তাহলেই কেবলমাত্র বিষণ্ণতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা সম্ভব। আমরা আমাদের পরিবারের কাউকেই নাজিফার মত বিষণ্ণ দেখতে চাইনা।

সকলে ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

প্রথম পর্বটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

[তথ্য- অস্বভাবী মনোবিজ্ঞান- কাজী সাইফুদ্দীন]

২৩০জন ২২জন
0 Shares

৩৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ