সকাল ছয়টার দিকে দুজনে বের হয়ে আসলো চিটাগাং স্টেশনের বাইরে। সাম্য এর আগে মাত্র একবার চিটাগাং এসেছিল। কিছুই বলতে গেলে চেনে না। কক্সবাজার যেতে কোথায় গেলে গাড়ি পাওয়া যাবে তা জিজ্ঞেস করলো এক সিএনজি ড্রাইভারের কাছে। ড্রাইভারই বলে দিল কোথায় যেতে হবে। ঐ ড্রাইভারের সিএনজিতে উঠলো। কিছুক্ষনের মধ্যে বেশ বড় একটি মোড়ে এসে সিএনজি থামিয়ে বললো যে এখানেই ঢাকা থেকে কক্সবাজার অভিমুখে যাওয়া সব গাড়ি দাড়ায়, সে গাড়িতে উঠলে দ্রুত কক্সবাজার যাওয়া যাবে।

সিএনজি থেকে নামলো দুজনেই। দাড়িয়ে আছে গাড়ির অপেক্ষায়। ভীর বৃদ্ধি পাচ্ছে মোড়ে। ঢাকা থেকে কক্সবাজার অভিমুখের গাড়িগুলো একটু সামনে এগিয়ে যাত্রী নামিয়ে দিয়েই চলে যাচ্ছে। কোনো যাত্রী নিচ্ছে না এখান থেকে। একটা গাড়ীকে টার্গেট করে সাম্য আর তৃপ্তি দৌড় লাগালো। যাত্রী নামিয়ে ওদের না নিয়েই গাড়ী টান দিলো সামনের দিকে। তবে সুপারভাইজার দয়া করে বললো যে আজ কোনো গাড়ীতে যাত্রী উঠাবেনা এই মোড় থেকে।

আজ কি বার? কত তারিখ? আজ কি হয়েছে? সাম্যর হঠাৎ মনে পরলো আজ পহেলা মে, মে দিবস। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো সাম্যর। আজ তো কোনো গাড়ী বা যানবাহন চলবে না, যাবে কিভাবে এখান থেকে কক্সবাজার? একবার ভাবলো চিটাগাং কোনো হোটেলে আজ থেকে আগামীকাল সকালে কক্সবাজার যাবে কিনা। মনে মনেই বাতিল করে দিলো চিটাগাং থাকার পরিকল্পনা। তৃপ্তিকে নিয়ে স্বপ্নের দেশে যাচ্ছে, পথে কোথাও থামা যাবে না। যত বাধাই আসুক, স্বপ্নপুর যেতেই হবে।

ভাবতে হবে কিছুটা সময় নিয়ে। তৃপ্তিকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে গেলো সাম্য। খেতে হবে কিছু, আর খেতে খেতে ভাবতে হবে। পরোটা ডাল এর অর্ডার দেয়া হলেও টেনশনে সাম্যর ক্ষুধা চলে গিয়েছে। তৃপ্তিরও মনে হয় সাম্যর টেনশন সংক্রামিত হয়েছে, তারও ক্ষুধা নেই। দুজনে খেতে পারল একটি মাত্র পরোটা।

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে বাইরে এসে দেখলো কিছু মাইক্রোবাস যাত্রী উঠাচ্ছে কক্সবাজারের। মাইক্রোবাসের যে অবস্থা তাতে করে কক্সবাজার পর্যন্ত যেতে পারে কিনা সন্দেহ আছে। কিছুটা অপেক্ষা করে মোটামুটি একটু ভালো কন্ডিশনের মাইক্রোবাসে উঠে বসলো দুজন। ড্রাইভারের পিছনেই জানালার পাশে বসলো সাম্য, তৃপ্তি সাম্যর বাম পাশে। মোট যাত্রী দশ জন। সাম্যর মাথায় রাজ্যের দুশ্চিন্তা। ও জানে মে দিবসে শ্রমিকরা কত হিংস্র হতে পারে। একটু অবস্থাপন্ন যাত্রী পেলে চুড়ান্ত অপমান করার জন্য উন্মাদ হয়ে যেতে পারে শ্রমিকরা। মে দিবসের কোনো মিছিলের মুখোমুখি যদি মাইক্রোবাস পরে যায় তবে ভাংচুর করার সম্ভাবনা আছে। এতসব টেনশনের কিছুই সাম্য তৃপ্তিকে জানায়নি, জানালে তৃপ্তি ভয় পাবে তাই।

মাইক্রোবাস রওয়ানা দিলো কক্সবাজার অভিমুখে। পথে কয়েকটা ছোট খাটো মিছিলের সামনে পরলো মাইক্রোবাস। তেমন একটা সমস্যা হলো না। কয়েক কিলোমিটার যাবার পরে শ্রমিকদের একটা দল মাইক্রো থামালো। যেতে দেবে না আর সামনে মেইন রাস্তা দিয়ে। মাইক্রোর ড্রাইভার একটা গলি রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চললো সামনে। পাঁচ ছয় কিলোমিটার গলি রাস্তা দিয়ে মেইন রোডে উঠে স্পীডে চালাচ্ছে গাড়ি।

বিশাল এক মিছিল এলো সামনে দিয়ে। বেশ বড় একটি বাজার। অনেক বিল্ডিং, মার্কেট ওখানে। সাম্যর মনের মধ্যে ডাক এলো, আতংকগ্রস্থ হয়ে পরলো সে। এবার আর রক্ষা নেই। শ্রমিকরা মাইক্রোবাস দাড় করালো। মাইক্রোর ড্রাইভারের পাশের দরজা নিয়ে টানা হ্যাচরা করছে। সাম্যর পাশের জানালায় হাত দিয়ে ধুম ধাম পিটাচ্ছে শ্রমিকরা। সাম্য তৃপ্তিকে আড়াল দিয়ে রাখলো, যদি জানালা ভেংগে ফেলে, গ্লাসের টুকরা যেন তৃপ্তিকে আঘাত না করে, সব কিছু যেন সাম্যর গায়ের উপর দিয়ে যায়। একসময় শ্রমিকরা ড্রাইভারকে টেনে বেড় করে নিলো, মাইক্রোর চাবি নিয়ে গেলো শ্রমিকরা। সাম্য তৃপ্তি অন্য যাত্রীদের সাথে বসে আছে মাইক্রোর মধ্যে। কি আর করার আছে!

কিছুক্ষন পরে ড্রাইভার এসে সাম্যকে অনুরোধ করলো ‘ স্যার আপনি যদি একবার শ্রমিকদের নেতার সাথে কথা বলেন, তাহলে হয়ত ছেড়ে দিতে পারে গাড়ি।’ ড্রাইভারের এই বিশ্বাসের কোনো যুক্তি খুঁজে পেলো না সাম্য। তারপরেও সে ভাবলো দেখি কথা বলে। শ্রমিক নেতার কাছে গিয়ে একটু আলাদা কথা বলতে চাইল সাম্য, কি মনে করে যেন শ্রমিক নেতা একা কথা বলার জন্য রাজি হয়ে গেলো। সাম্য তার পরিচয় দিয়ে তাদের মে দিবসের সাথে একাত্বতা প্রকাশ করে আরো কিছু কথা বলল। অনুরোধ করলো মাইক্রোবাস ছেড়ে দেয়ার জন্য। সাম্যর বলার ভংগিতে এমন কিছু ছিলো যে শ্রমিক নেতা রাজি হয়ে গেলো। তবে শর্ত দিলো, এক ঘন্টা পরে ছেড়ে দেবে। প্রায় দশটা মাইক্রো আটকে দিয়েছে তারা। এই একটিই যেতে দেবে একঘন্টা পরে।

সাম্য তৃপ্তিকে নিয়ে মার্কেটের দোতলায় একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে কোল্ড ড্রিংক্স খেলো। তৃপ্তির মনে কোনো চিন্তা নেই। সব টেনশন সাম্যর উপর দিয়ে সে নির্ভার। কক্সবাজার যেতে এই বাঁধা বিপত্তিকে সে উপভোগই করছে মনে হচ্ছে।

ঠিক এক ঘন্টা পরে নেতা মাইক্রোবাসের চাবি সাম্যকে দিলো, বললো সামনে যদি কোনো ব্যারিকেডে পরে তার নাম যেন বলে। পথে আর কোনো সমস্যা হয়নি। তিনটার দিকে মাইক্রো কক্সবাজার পৌছালো। একটা অটোতে দুজনে হোটেলে পৌছালো। ভাগ্যক্রমে হোটেলের রুম টা এমন হলো যে বারান্দায় এলেই সমুদ্র দেখা যায়। বারান্দা লাগোয়া ওয়ালটি কাচের। ভারী  পর্দা সরালে বেডে বসে বা শুয়ে শুয়েই সমুদ্র দেখা যাবে।

রুমে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে তৃপ্তি, চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে সাম্যর দিকে। সাম্যই যেন তৃপ্তির আকাশ। সমুদ্র আর আকাশকে দেখে মুগ্ধ তৃপ্তি সাম্যকে বললো  ” স্বপ্নপুরে আমাকে নিয়ে আসার জন্য এত্তগুলো আদর।  লাভ ইউ জাদু জান। ”

* জাদু- সম্বোধন টি প্রিয় লেখক সাবিনা ইয়াসমিন এর  শব্দ ভান্ডার হতে ধার করা।

গন্তব্য স্বপ্নপুর : দ্বিতীয় পর্ব

১৮০জন ১৯জন
22 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য