স্বার্থপর বোন

এস.জেড বাবু ৬ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার, ০৮:১৯:১১অপরাহ্ন গল্প ২৯ মন্তব্য

প্রবাসে তেমন একটা সময় মিলে না বলেই হয়ত মাস তিনেক পর আবারও ছুটির দিনেই মিলির নাম্বারে কল করে সাজিদ। মন ভরে কথা বলা যাবে।

তুই আজকাল বড় স্বার্থপর হয়েছিস বুবু-
আর সব কথা বলার প্রায় শেষ পর্যায়ে, ফস করে অভিযোগ করেই ফেলল বোনের কাছে-

কেন রে ? হটাৎ কেন তোর মনে হলো যে- আমি স্বার্থপর হয়েছি।

কেমন যেন বদলে গেছিস, আমি অভিমান করেই এতোদিন কল করিনি তোকে, তুইতো পারতি। পারবি কি করে, সুখের জোয়ারে ভুলেই গেছিস আমাকে। হয়ত আমাদেরকে।

কথাগুলি অনেকটা খামখেয়ালিতে বলার পরের ২০ মিনিট, সাজিদ শুধু শুনেই গেলো স্বার্থপর বোনের স্বার্থপরতা-

স্বভাবত ধীর লয়ে মিলি বলছে-
পূবের জানালাটা খুলে দিতো মা, ঘুম ভাঙ্গতো হাজারটা বকা শুনতে শুনতে- আলসে মেয়ে, সেই সকালে ঘুম ভেঙ্গে পাড়ার মেয়েরা মায়ের সাথে হাজার কাজ সেরে স্কুলের জন্য রেডি হলো, বাপ ভাইয়ের নাস্তা বানালো, আমার অকর্মা মেয়ে ঘুমায়। কপালে যে কি আছে- মা হলে বুঝতি-
মনে হলে মুচকি হেসে দেয়াল ঘড়িটা দেখতাম,
সাড়ে সাতটা।
মা ইচ্ছে করেই এই একই সময়ে ঘুম ভাঙ্গাতো আমার, কখনো আগেও না পরেও না- অনেক কাজের ভীরেও মা কখনো ১০ মিনিট আগে ডাকেনি আমায়।
মুখ ধুয়ে রান্না ঘরে গেলেই দেখতাম, দুইটা পরোটা আর ডিম ভাজা চুলার পাশে। গরম গরম রাখা।

আজকাল লোকটা জানালার পর্দা টানে।
বিড়বিড় করে ছোট ছোট নালিশ শোনায়, অর্ধেক শুনি আর অর্ধেক শুনিনা।
প্রশ্ন করি কখনো – কি বলছো ? ডাকনি কেনো ?

অনেকটা রাগে জবাব দেয়- হুমম, আমার দায় পড়েছে ডেকে দিতে। আমার কলিগদের বৌ-রা প্রতিদিন কত সুন্দর করে দুপুরের খাবার রেডি করে দেয়। ওরা মজা করে অফিসে বৌয়ের হাতের রান্না খায়। আমার পোড়া কপাল, বৌয়ের ঘুম ভাঙ্গে নটায়।

কিন্তু জানিস- লোকটা সেই পাঁচটায় উঠেছে, গোসল সেরেছে। আমার জন্য বাথরুমে ওর পছন্দের কাপড় রেখেছে। রাতের খাবারের সব প্লেট বাটি ধুয়ে ফেলেছে, নিজে পিয়াজ ছাড়া ডিম পছন্দ করলেও আমার জন্য ডিমে পিয়াজ দিয়েই ভাজি করেছে। পারোটা সেইম, মায়ের মতো- একটু পোড়া পোড়া- কড়া ভাজি আমার পছন্দ, সে জানে-
ফ্রেশ হয়ে আসার আগ পর্যন্ত আয়নার সামনে বারবার নিজের পরিচর্যা নিয়ে ব্যাস্ত থাকে।
একসাথে খায়- কখনো পিয়াজ ছাড়া নিজের রুটির একাংশ আমার মুখে তুলে দিয়ে বলে- খেয়ে দেখ, অনেক মজা পিয়াজ ছাড়া ডিম।

মা কে মনে করে কখনো ভিজে আসে চোখ-
আমি মা কে ফেলে এসেছি- মায়ের মমতা এখনো ঘিরে আছে আমাকে।

ছোট বেলায় বাবা কাঁধে করে মেলায় নিয়ে যেতেন- স্কুলের সামনে সাইকেল থেকে নামার পর যতক্ষন না ক্লাশে যেতাম- এক পা প্যাডেলে রেখে তাকিয়ে থাকতেন। আমি ফিরে তাকালে মিটি মিটি করে হাসতেন।
কলেজে বাবা দুই তিন বার কল করতেন। নিজের ছেড়া জুতা না বদলালেও আমার জন্য থ্রী পিসের কাপড় নিয়ে আসতেন। চশমাটা হাতে নিয়ে অফিস যাওয়ার পথে দরজায় দাড়িয়ে ডাকতেন-
মিলি – মামণি চশমাটা দিয়ে যাবি, খুঁজে পাচ্ছি না।

লোকটা দুশ টাকায় নিজের জন্য ফতোয়া কিনে, বেতনের অর্ধেকটায় শাড়ি কেনে আমার জন্য।
সময়ে অসময়ে ফোন করে, কখনো যদি বলি- কেনো ফোন করেছো-
জবাবে বলবে, ওহহ তুমি, আমি তো আমার এক ক্লায়েন্টকে ফোন করেছিলাম।
কখনো বলবে, ভুলে চাপ পড়ে কল লেগে গেছে।

বাবার মতো মিথ্যে বলে আমাকে একবার দেখার মতো বাহানা এই লোকটা করে, চাবি ফেলে সিড়ি দিয়ে অর্ধেকটা নেমে যায়, সেখান থেকে চিৎকার করে- মিলি – মি…লি….
চাবিটা ফেলে এলাম,
দিয়ে যাও না প্লিজ-

আমি কাঁদি- অনেক কাঁদি-
বিধাতা বাবার স্নেহের মধ্যে আমাকে আজও রেখেছেন- বাবাকে মনে পড়ে প্রতিবার-
যতবার ওর মুখটা আমি দেখি।

সাজিদ – মনে পড়ে তোকে – বিয়ের পর বাবা মায়ের জন্য যতটা কেঁদেছি, তারচে বেশি কেঁদেছি তোর জন্য। আমার দেখায় দুনিয়ার সবচেয়ে ভাল এবং সবচেয়ে মন্দ ভাই তুই।
মনে পড়ে ছোটবেলায় টিভির রিমোর্ট নিয়ে টানাটানি হতো তোর আমার?
তুই খেলা দেখতি- আর আমি দেখতাম সিরিয়াল।

বিয়ের দ্বিতীয় দিনে লোকটা আমার কাছে থেকে রিমোর্ট কেড়ে নেয়- অনেক রাগ হয়েছিল সেদিন।

আজকাল হয়না রাগ। সে সোফায় শুয়ে খেলা দেখতে শুরু করে, আমি ঘর গোছানো শেষে পাশে বসলেই দেখি লোকটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমি রিমোর্ট নেই, চেনেল বদলাই- সিরিয়াল শেষে উঠে যাওয়ার সময় ডাকি।
কখনো সিরিয়াল নিয়ে কথা উঠলে বুঝতে পারি- সিরিয়ালের সবার সব কথা মুখস্থ ওর, লোকটা সোফায় ঘুমায় না কখনো, ভান করে থাকে, আমি যেন আমার মতো করে সিরিয়াল দেখতে পারি।

কখনো বিকেলে চটপটি খেতে নিয়ে যায় নদীর তীরে, কখনো রাতের খাবার নিয়ে আসে বাইরে থেকে, মোম জ্বেলে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার হয়, মৃদু গানের তালে নাচ হয়, প্রথম দিকে নাচতে না পারলেও আজকাল পারি।
সব ছুটিতে ঘুরতে নিয়ে যায় কোথাও না কোথাও।

একদিনের ছুটি পেলে ঘরে থাকে- রান্নায় হেল্প করে, তিন চারবার আমার কাপড়ে ময়লা লাগাবে, চেঞ্জ করতে বলবে। নিজে থেকে বলে দিবে কোন শাড়িটা পড়বো।
চুলে তেল দিয়ে দিবে, বেনী করে দিবে যত্ন করে-

কখনো তোদের কথা মনে হয়ে চোখ ভিজে এলে জড়িয়ে রাখে বুকে। নরম করে হাত বুলিয়ে দেয় বাবার মতো করে, মায়ের মতো অভিযোগ করে, তোর মতো কৌতুকে হাসায়, খুনশুটিতে রাগায়-
কখনো তোদের জন্য খুব করে কান্না পেলে মাথা টেনে নেয় কোলে, সত্য মিথ্যে ভরা আজগুবি সব গল্প শোনায়- আমি বুঝি সব মিথ্যে গল্প- তবু শুনি- শুনতে ভাল লাগে।

আমি একটা মানুষের মধ্যে আমার সবটা পরিবার খুজে পেয়েছি।

হ্যা – আমি ভুলে না গেলেও ভুলে গেছি তোদের-
স্বার্থ পর হয়েছি এই লোকের কাছ থেকে প্রতি মূহুর্তে পাওয়া ভালবাসার স্বার্থে।

সাজিদ স্পস্ট্য শুনতে পাচ্ছে প্রতিটি শব্দ।
না দেখেও দেখতে পাচ্ছে বোনের দুই চোখের উজ্জলতা-

কলটা এখনো কাটেনি, ওপাশ থেকে হয়ত মিলি কিছু বলে যাচ্ছে, কিন্তু এখন আর কোন কিছু শুনতে ইচ্ছে করছে না, বলতে ইচ্ছে করছে না।
মিলি বলতো, বেটা ছেলেদের কাঁদতে নেই। কিন্তু এখন যে কিছুক্ষণ ভিষন ভাবে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

ফোনটা রেখে দিয়ে খেয়াল হলো-
টি শার্টের বুকটা ভিজেছে চোখের জলে-
বোনের নিত্য সুখের গল্প শুনতে শুনতে সেই কখন থেকেই যেন অশ্রু ঝড়ছে টের পায়নি একটুও।

আপনজনদের এমন স্বার্থপরতার আসল অনুভুতি, কান্নায় সাথেই বেশ মজার হবে হয়ত।

-০-

ছবিঃ নেট থেকে।

৫৯৫জন ৫৯৫জন
9 Shares

২৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য