স্বাধীনতা সংগ্রামী মণীষা-৯ : বিনোদ বিহারী চৌধুরী  

১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি-২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল

[মণিষীরা বলেছেন “যে জাতি তার বীর সন্তানদের মূল্য দিতে পারে না সে জাতির কোনোদিন বীর সন্তান জন্ম নিতে পারে না।” আমরা আমাদের বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাধীনতা সংগ্রামী আত্মদানকারী মণিষাদের সম্মন্ধে কত টুকুই বা জানি। যারা প্রবীণ তারা হয়তো কিছু কিছু জানে, কিন্তু আমাদের নবীন প্রজন্ম সেসব মণিষাদের সম্মন্ধে তেমন কিছুই জানে না।তাই সব শ্রেণির পাঠকদের জন্য উল্লেখযোগ্য কয়েকজন মণিষার জীবনী নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস।]

-মাহবুবুল আলম 

যে সব বিপ্লবী নেতা আমাদের স্বাধীনতা ও স্বাধীকারের আন্দোলনকে তড়ান্বিত করেছিলেন তাদের মধ্যে চট্টগ্রামের শৈল-কিরীটিনী, নদী-মেখলা বনানী-কুন্তলা, বীর প্রসবিনী চট্টলার কিংবদন্তি বিপ্লবী বীর। তাই অনেকেই চট্টগ্রামকে বিপ্লবীদের তীর্থস্থান হিসেবে মনে করেন। আর চট্টলার বীর সন্তান বিনোদ বিহারী ছিলেন বিপ্লবীদের মধ্যে অগ্রসেনানী। বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী শুধু একটি নাম নয় এই নামটি জড়িত বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বাঙালির চেতনার সঙ্গে। তিনি ছিলেন সূর্যসেনের সহযাত্রী, কৈশোর উত্তীর্ণ বিনোদ বিহারী চৌধুরী সে বয়সেই ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে নাম লিখিয়েছিলেন এবং  দেশমাতৃকার জন্যে সঁপে দিয়েছিলেন নিজের জীবন।ত্যাগ করেছিলেন সুখ আরাম-আয়েশ । অন্যায়, অশুভ, সাম্প্রদায়িকতা, কূপমন্ডুকতা ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে তিনি ছিলেন সকলের প্রেরণার উৎস। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী সৈনিক বিনোদ বিহারী আর আমাদের মধ্যে বেঁচে নেই। তিনি ছিলে ব্রিটিশবিরোধী সৈনিকদের সর্বশেষ। তার মৃত্যুতে দেশ হারালো তার এক বীর সেনানীকে। বিনোদ বিহারী চৌধুরী কোনো ব্যক্তি নন। বহু আগেই তিনি ব্যক্তি জীবনের গন্ডি পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন। যে প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের সম্পত্তি।

৩০ এর দশকে বিপ্লবের বংশীবাদক মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে যে সশস্ত্র যুববিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল; তাতে বিপ্লবীরা ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলো সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের। আর দুনিয়া কাঁপানো এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন যে বিপ্লবীরা তাদের অন্যতম বিনোদ বিহারী চৌধুরী।

বিনোদ বিহারী চৌধুরী ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার উত্তর ভূর্ষি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বিনোদ বিহারি উকিল কামিনি কুমার চৌধুরী ও রমা রানী চৌধুরীর ৫ম সন্তান ।১৯২৭ সালে তিনি তৎকালীন বিপ্লবী দল যুগান্তরে যোগ দেন।  ১৯২৯ সালে সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করেন। তিনি এসময় রায় বাহাদুর বৃত্তি পান। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার লুট করে ব্রিটিশদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন মাষ্টার দা সূর্য সেনের নেতৃত্বে বিনোদ বিহারীসহ বিপ্লবী দলের বীর সৈনিকেরা। ঐতিহাসিক অস্ত্রাগার লুন্ঠনে বিনোদবিহারী চৌধুরী তাই হতে পেরেছিলেন সূর্যসেনের অন্যতম তরুণ সহযোগী। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামকে তিন দিনের জন্য স্বাধীন করেছিলেন তিনি। টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস করা, অক্সিলারি ফোর্সের সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র লুট করেছেন। দামপাড়া পুলিশ লাইন, এখানে অস্ত্রের গুদাম ছিল, সেটাও তিনি ও দলের সদস্যরা মিলে লুট করি। এ দলে ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেনসহ ছিলেন হিমাংশু সেন, অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষ ও আনন্দ গুপ্ত। এ ঘটনার পর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন জঙ্গি রূপ ধারণ করে। সে দিনের এসব বিপ্লবীর দুঃসাহসিক কর্মকান্ড ব্যর্থ হয়নি। চট্টগ্রাম সম্পূর্ণরূপে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত ছিল চার দিন। এই কয়েক দিনে ব্রিটিশ সৈন্যরা শক্তি সঞ্চয় করে বিপ্লবী দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বিপ্লবীমন্ত্রে দীক্ষিত বিনোদবিহারীরাও বীর বিক্রমে পরে জালালাবাদ পাহাড়ে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলেন।চোখের সামনে দেখেছিলেন ১২ জন সহকর্মীর মৃত্যু ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। আর তখন তাঁকে মৃত কিংবা জীবিত ধরিয়ে দিতে ব্রিটিশ সরকার ৫০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। বোয়ালখালীর পিসি সেন সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সংস্পর্শে এসে যোগ দেন গোপন বিপ্লবী দল যুগান্তরে। পরিচয় হয় মাস্টারদা সূর্য সেনের সঙ্গে। বিপ্লবীদের দলে নাম লেখানোর অল্প দিনের মধ্যেই বিনোদবিহারী চৌধুরী মাস্টারদা সূর্যসেনের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিলেন।১৯৩৪ সালে ভারতের রাজপুতনা দেউলি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী অবস্থাতেই পরীক্ষা দিয়ে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বিভাগে পাশ করেন। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি সূর্যসেনকে চট্টগ্রাম কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী। ১৯৩৬ সালে ওই ক্যাম্পে বন্দী থাকাকালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাশ করেন। ১৯৩৯ সালে ইংরেজিতে এমএ ও বিএল (আইনে স্নাতক) পাশ করেন ইংরেজ সরকার কতৃক গৃহবন্দী অবস্থায়।জালালাবাদ যুদ্ধ ছিল বিনোদবিহারী চৌধুরীর প্রথম সম্মুখযুদ্ধ। গলায় গুলিবিদ্ধ হয়েও লড়াই থামাননি তাঁর। এ সময় সূর্যসেনের ঘনিষ্ঠসহচর বিনোদ বিহারী সূর্যসেনের মৃত্যুতে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েন। ১৯৩৯ সালে বিনোদ বিহারী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন এবং চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সহ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৪৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এম এল এ ) নির্বাচিত হন বিনোদ বিহারী চৌধুরী। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি এমএলএ ছিলেন। ব্রিটিশ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ আমলের প্রতিটি সময়েই তিনি সবধরনের অন্যায়, অবিচার, অপশাসন, সা¤প্রদায়িকতা ও মানবতাবিরোধী সংগ্রামে লড়াকু ভূমিকা পালন করেছেন।

১৯৪০ সালে বিনোদ বিহারী চট্টগ্রাম কোর্টে আইনজীবী কিরণ দাশের মেয়ে বিভা দাশকে বিয়ে করেন। বিভা দাশ চট্টগ্রামের মানুষের কাছে বেলা চৌধুরী নামেই সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সালে ২৯ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। বিয়ের পর ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে প্রায় ৭ বছর বিভিন্ন সময়ে জেল খেটেছেন বিনোদ বিহারী চৌধুরী। ২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে ১০৩ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। প্রবীণ এই বিপ্লবী বিভিন্ন সময়ে লাভ করেছেন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননাসহ বিভিন্ন সংগঠনের সংবর্ধনা। ২০০০ সালে স্বাধীনতা পদক, শহীদ নতুন চন্দ্র স্মৃতি পদক, বিপ্লবী তীর্থ চট্টগ্রাম স্মৃতি সংস্থার সম্মাননাসহ লাভ করেন বহু সম্মাননা। সম্মাননার সঙ্গে যে আর্থিক সম্মানী দেয়া হয়েছিল তাঁর কিছুই নিজের জন্য রাখেননি তিনি। কর্মজীবনের শুরুতে সাংবাদিকতা ও আইনপেশায় যোগ দিলেও তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। আলোকিত মানুষ গড়ার কাজে যুক্ত হয়ে শতবর্ষ ছুঁই ছুঁই বয়সেও তিনি বাসায় ছাত্র পড়িয়েছেন। তিনি অসাধারণ ইংরেজী, বাংলা ও সংস্কৃত জানতেন। তাঁর স্ত্রী বিভা চৌধুরীও ছিলেন শিক্ষায়িত্রী। তাঁর দুই পুত্রই অকাল প্রয়াত। পুত্রবধূ ও নাতি রয়েছেন কলকাতায়।

তথ্যসূত্র:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র-হাসান হাফিজুর রহমান ও অন্যান্য সম্পাদিত

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ-মাহবুবুল আলম

একাত্তুরের রনাঙ্গণ- শামসুল হুদা চৌধুরী

উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া

১৪৮জন ৫৯জন
0 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য