মূল লেখায় যান

জীবনের দাম

রোকসানা খন্দকার রুকুসমসাময়িক৩০টি মন্তব্য

– চাচামিয়া যাবেন?

কোথায় যাবেন?

-গলাকাটা বাজার।

-চলেন।

-মা,এই বাজারের নাম  গলাকাটা কেন জানেন?

-আমি তো জানিনা তেমন,অল্প অল্প  শুনেছি।

শুনলাম ,রিকশাঅলা চাচার কাছে।বছর চল্লিশ আগে এক সকালে কে বা কারা একজন মানুষ এর গলা কেটে শুধু ধর ফেলে রেখে চলে গেছে।পুলিশ কোনভাবেই মাথা খুঁজে পায়নি তাই আর কেউ ধরাও পড়েনি কিংবা কোথাকার মানুষ কি তার পরিচয় কিছুই জানা যায়নি।আগে এই জায়গাটা ফাঁকা ছিল।কচুরীপানা ভর্তি বিশাল এক জলাশয় ।আশেপাশে বড় এলাকা জুড়ে বসতবাড়ি না থাকায় কেমন সুনশান নিরবতা।লোকজন তেমন একটা যাতায়াত করত না।দিনের বেলাতেই কেমন গা ছমছম করত।মধ্যরাতে গাঁজাখোররা বড় বড় গাছের তলায় বসে গাঁজা খেত।অপরিচিত কেউ পথ ভুলে চলে আসলেই বিপদ।তারসব কেড়ে নিয়ে মারধর করে ছেড়ে দিত।

চল্লিশ বছর আগের ঘটনা শুনতে শুনতেই এগোচ্ছি। আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলাম।

চাচা আরও জানালেন আমরা যে এলাকায় যাচ্ছি সেখানে ঈদের দিন বিকেলে দু’জনকে খুন করা হয়েছে আর কয়েকজন আহত।

এতক্ষন আগ্রহ তেমন একটা হয়নি।এবার সত্যিই শুনতে ইচ্ছে করল।

ঘটনার সুত্রপাত হয়,গতবছর রমজান মাসে। সাধারণত পুরুষেরা তারাবীর নামাজ মসজিদে গিয়ে আদায় করেন।পুরো মাস শেষ হওয়ার পর মুছল্লীদের কাছ থেকে কিছু কিছু করে টাকা নিয়ে মুয়াজ্জিন ও ইমামকে হাদিয়া স্বরুপ দেয়া হয়।এই হাদিয়ার কোন নির্দিষ্টতা নেই। মুছল্লীদের সামর্থ্য অনুযায়ী তারা দিয়ে থাকেন।

জনৈক আক্কাস আলীও তেমনি একজন মুছল্লী।পুরো রমজান মাস মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করছেন।সে গরীব কৃষকের ছেলে।জমিজমা থেকে কিছু আয় হয় আর অন্যের বাড়িতে কাজ করে তার সংসার চলে। তাঁর চাঁদা ধরা হয় তিনশত টাকা॥সেদিন তাঁর কাছে চাঁদা নিতে আসলে সে  দুইশ  পন্চাশ টাকা দেয়।তার কাছে আর টাকা নেই।বাকি টাকাটা যেন মাফ করে দেয় এই বলে হাত জোর করে।

মসজিদটি এলাকায় বেশ বড়সড়।লোকজনও অনেক হয়। মোটামুটি একটা চাঁদাও ওঠে।আর যিনি নামাজ পড়ান তিনি এলাকার জমিজিরাত অলা নামকরা হাজী সাহেবের ছেলে হাফেজে কোরআন। আক্কাসের পন্চাশ টাকা না পেলেও কোন সমস্যা হওয়ার কথা না।

তারপরও মসজিদ  চাঁদা আদায়কারী আক্কাসকে জোর দিয়ে বলে টাকাটা যেন রেডি রাখে কাল নেবে। গ্রামে রমজান পরবর্তী সময়ে লোকজনের বেশ অভাব থাকে তাই পরদিনও সে টাকাটা দিতে পারেনা।

তৃতীয় দিন ইমাম তাঁর সঙ্গীদের পাঠিয়ে দেন টাকা নিতে।মাফ চাওয়ার পরও টাকা চাইতে আসায় আক্কাসের খানিকটা জেদ হয়।সে দিবে না তারা যা করার করুক।

শুরু হয় তর্ক। একপর্যায়ে সবাই মিলে আক্কাসের উপর চড়াও হয়।নিজেকে বাঁচাতে সেও খানিকটা কিলঘুষি মারে।

এতে করে ইমাম সাহেবের ইজ্জত চলে যায়। তাই তিনি স্হানীয় চেয়ারম্যানের কাছে বিচার দাবি করেন।তিনি দুপক্ষের সমঝোতা করে দেন।

-চাচামিয়া ব্যাপার তো মিটে গেল।তাহলে খুন কেন?

অবাক হলাম।তাও এক বছর পরে।

এ বছর করোনার জন্য তো নামাজ বাসায় হয়েছে। তাই ইমাম সাহেব বকেয়া টাকা তুলতে থাকেন।এ বছরও আক্কাস টাকাটা দেয় না।কারন হিসেবে সে বলে চেয়ারম্যান তো মিটমাট করে দিয়েছে।

ইমাম আবারও অপমানিত হয়।লোকজনকে দিয়ে হুমকি দেয় এবং এর একটা বিহিত তিনি করবেন।

ইমাম সাহেবরা চার ভাই।বড়জন বি ডি আর এ চাকুরী করতেন।বিডিয়ার বিদ্রোহের  আসামি ছিলেন তার চাকুরী চলে গেছে।মেজজন সাব-ইন্সপেকটর॥ছোটজন তেমন কিছু করেনা।মজার ব্যাপার হলো তার ভাই পুলিশ এই শক্তি তিনি সবখানেই প্রয়োগ করেন।

কোরবানি ঈদে সবাই বাড়িতে এসেছে।তিনিসহ সবাই বুদ্ধি করে আক্কাসকে মারধোর করবে।টাকার শোধ তো নিতে হবে।ঈদের দিন বিকেলে আককাস যায় বোনের বাড়ি।হাফেজরা চারভাই তাদের বাপ চাচা মিলে ধারালো অস্ত্র সহ বোনের বাড়িতে গিয়ে অতর্কিতে আক্কাসকে আক্রমন করে।বোন এসে ভাইকে বাঁচাতে টাকা দেয়,পা জড়িয়ে ধরে। কিন্তু কোন লাভ হয়না। টেনেহিঁচড়ে আঙ্গিনায় ফেলে মারতে থাকে। হাতে কোপ দেয়।হাত পড়ে যায়।আক্কাসের বউ এসে স্বামীকে রক্ষার জন্য গায়ের উপর শুয়ে পড়ে।তাকেও কিল ঘুষি মারে।

ইমাম বলতে থাকেন -এই ছুড়ি দিয়ে চারটা কোরবানি দিয়েছি তোরে না দিলে শান্তি নাই।তোরা ইসলামের শত্রু,ভালো কাজের টাকা থাকেনা?

এই বলে মাথা বরাবর কোপ দেয়।মাথার এক পাশ কেটে মগজ বের হয়ে যায়॥আক্কাসের বড় ভাই এগিয়ে এলে তাকে পেটে কোপ দেয়।এরপর সামনে যেই আসে তাকেই আহত করে। আক্কাসের মৃত্যু সাথে সাথেই হয়।ভাই মারা যায় হাসপাতালে আর দুবছর বিয়ে করা বউটির পেটের বাচ্চা  নষ্ট হয়ে যায়।

ঘটনা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। মোটামুটি ভালো একটা পরিবার যার স্বচ্ছলতা,চাকুরী ,ধর্মীয় শিক্ষা সব আছে অথচ একবছরেরও বেশি সময় আগের ঘটনা ধরে এতগুলো মানুষ মেরে ফেলল?তাঁদের শিক্ষা কতটুকু পরিপূর্ণ হয়েছে।হবেই বা ক্যামনে যে গুরুজনরা শি ক্ষা দেবেন তারা হাজী এবং মেম্বার হয়েও ছেলেদের মারামারির ইন্ধন যুগিয়েছেন।

এর পরবর্তী ঘটনা আরও মজার॥ সুযোগ সন্ধানী কিছু মানুষ ওত পেতে থাকেন যে কোন দূর্যোগে তাদের স্বার্থ রক্ত  উদ্ধারের। যেহেতু অনেক বড় ঘটনা তাই তারা রাতেই পালিয়ে যায়।এই সুযোগে অন্য গ্রামের লোকজন এসে তাদের বাড়ির সব লুটপাট করে নিয়ে যায়।ধান,চাল,গরু,হাসমুরগী ,টিভি,ফ্রিজ ঈদের মাংস সবকিছু।এক অন্যায়ের সুত্র ধরে আর একটা অ্ন্যায়ের জন্ম হয়। আমি সামনে একাত্তরের যে সব গল্প শুনেছি তাঁর চিত্র খুঁজে পাই।

মনে মনে বলি এত রক্ত, এত সম্ভ্রম ,এতকিছুর বিনিময়ে আমরা আজও কি স্বাধীনতা পেয়েছি?

নাকি “স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন?”

 

মোট পড়েছেনঃ ১৮৯১জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

৩০টি মন্তব্য

  1. সরি বলে নিচ্ছি।লেখা শেষ করে পোস্ট করতে গিয়ে দেখি কেমন প্যারা প্যারা হয়েছে ।ঠিক করতেই পারলাম না।কারও পড়তে অসুবিধা হলে আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।

    1. প্যারা ঠিকই আছে শুধু মাঝামাঝি হয়েছে। আপনি সম্পাদনাতে গিয়ে পুরো লেখা সিলেক্ট করে উপর নীচে ড্যাশ চিহ্নিত তিনটির প্রথমটিতে ক্লিক করুন। ঠিক হয়ে যাবে।

    1. ধন্যবাদ ভাইয়া।অনেক সুন্দর ও বাস্তব বলেছেন।
      সহজ হিসাব কেউ খুন হয় আর খুনি কিছুদিন পালিয়ে থাকে। আমরাই তাকে লুকিয়ে রাখি।অতপর সে ফিরে আসে।সবাই ভুলে যায় ঘটনা॥সে দিব্বি সংসার করে এবং আবার অন্যকোন অনঅন্যায় করে।।।

  2. স্বাধীনতা রক্ষা করাটাই কঠিন বলে মনে হয়। স্বাধীনতা এতটুকুই, বিত্তশালীরা স্বাধীনতা পেয়ে ঘুরতে যায় মঙ্গলে।
    বাংলার কৃষক-কৃষাণী স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা তার লাঙ্গলে।
    আর যার নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যায়, তার স্বাধীনতা জঙ্গলে।
    এ হলো আমাদের বাংলার স্বাধীনতা।
    শুভকামনা থাকলো শ্রদ্ধেয়।

    1. মন আমারও খারাপ হয়।যখন খুন হতে দেখি। প্রতিনিয়ত কত স্বপ্ন এভাবে ঝরে পড়ছে॥বিচার হওয়াটাই কি বড় কথা!তা কিন্ত না। বেঁচে থাকার অধিকার জন্মগত আর কিছু মানুষ সেটাই কেরে নেয়।আমরা তখন বলি হায়াত ছিলনা কিংবা অন্যকিছু দিয়ে মা সন্তান হারানোর কসট লুকায়।আমার কথা এটা কেন হবে?

  3. সুযোগ সন্ধানী কিছু মানুষ ওত পেতে থাকেন যে কোন দূর্যোগে তাদের স্বার্থ রক্ত উদ্ধারের।
    ওরাই আজ সবকিছু গিলে গিলে খাচ্ছে
    আবার কদর বাড়াচ্ছে।
    শুভ কামনা।

  4. গলাকাটা নামের আড়ালে মানুষের পৈষাচিকতা জানলাম আপনার লেখায়। চমৎকারভাবে লিখেছেন আপু। আসলে স্বার্থপর মানুষ এভাবেই নিজের স্বার্থ হাসিল করে।

    ভালো থাকুন আপু।

  5. স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে ও রক্ষা করা কঠিন।
    পঞ্চাশ টাকার জন্য এতো প্রাণ নিয়ে নিলো।
    লোমহর্ষক ঘটনা।
    লাইভে এসে স্ত্রী খুন করে এ দেশে।
    স্বাধীনতা শুধু কাগজে কলমে আছে।

  6. লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ পড়লাম। কত মর্মান্তিক ব্যাপার! হাদিয়া হয়ে গেলো চাঁদা আর চাঁদা তোলাকে কেন্দ্র করে একটা পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো! মসজিদের ইমামের মনমানসিকতা যদি এমন হিংস্র হয় তাহলে বাকিদের অবস্থা কি সেটাই ভাবছি। শুনতে খারাপ শোনা গেলেও গ্রামদেশে এসবই হয়। বছরের পর বছর একই কোন্দল নিয়ে মারামারি করে। ভাইয়ের হাতে ভাই খুন হয়, জমি/সম্পদের লোভে মা বাবাকে মেরে ফেলে, এমনকি প্রতিবেশীকে মামলায় অভিযুক্ত করার জন্যে নিজের সন্তানকেও হত্যা করে। এসব ঘটনা শুনলে মনে হয়, গ্রাম গঞ্জের মানুষেরা লেখা পড়া শিখে শুধু আক্ষরিক জ্ঞান বাড়ানোর জন্য, মনুষ্যত্ব বিকাশের জন্যে নয়। শহরে এমন ঘটেনা তা নয়। কিন্তু গড় হিসাব করলে নৃশংসতার ঘটনায় গ্রাম এগিয়ে আছে।

    অনেক ভালো লেখেন আপনি। নিজস্বতা দিয়ে লেখেন, তাই এতো প্রানবন্ত লাগে। আরও অনেক অনেক লিখুন। শুভ কামনা নিরন্তর 🌹🌹

    1. দেরিতে হলেও অনেক খুশি হলাম।এত চমৎকার মন্তব্যের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা,ভালোবাসা সব।।।
      আপনি এতসুন্দর মন্তব্য করেন যে সবারই তা পড়ে লিখতে ইচ্ছে করে।
      দ্যাখেন আপনার মন্তব্য পড়ে এমনি আপ্লুত হয়েছি যে অন্যখানে লিখে ফেলেছি।।।

      1. হাহাহা, সমস্যা নেই। দুইবার জবাব পেয়ে আপনার আপ্লুতভাব ডাবল টের পেলাম।
        কমেন্ট করার পর যদি এমন জবাব আসে তাহলে কমেন্টদাতাও কমেন্ট দিতে দ্বিগুণ উৎসাহ পায়। সুন্দর জবাবের জন্যে আপনাকেও ধন্যবাদ 🙂

  7. দেরিতে হলেও অনেক খুশি হলাম।এত চমৎকার মন্তব্যের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা,ভালোবাসা সব।।।
    আপনি এতসুন্দর মন্তব্য করেন যে সবারই তা পড়ে লিখতে ইচ্ছে করে।

    1. আমি সবসময় তাই বলি আমরা যারা নতুন আপনারা তাদের একটু আধটু সমালোচনা করবেন।তা না হলে ভালো টা আসবেনা। ধন্যবাদ ভাইয়া।
      চেষ্টা করব হালছাডা ভাবে না লিখতে॥
      দোয়া রাখি।আমার জন্যও দোয়া করবেন।

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।