সোনেলায় আমি // প্রথম পর্ব

বন্যা লিপি ৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, বুধবার, ১০:২৩:০০অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩৫ মন্তব্য

আব্বার ছাত্রজীবনের একটা স্যুটকেস ছিলো। অদ্ভূত লাগত আমার কাছে। সম্পূর্ণ বেতের তৈরী। কাঠের পাটাতন দেয়া মাচায় রাখা ছিলো ওই বেতে স্যুটকেসটা পরিত্যাক্ত অবস্থায়। আব্বার অনেক পুরোনো ডায়রী,  কিছু কাগজপত্র, ইত্তেফাকের পুরোনো সংবাদসহ(আব্বা ইত্তেফাকের জেলা সংবাদদাতা ছিলেন) কিছু খবরের কাগজ, ছিলো কিছু পুরোনো বিজ্ঞানকোষ,  ছিলো আমার প্রথম হাতে খড়ি দেয়া কালো রংএর একেবারে আসল শ্লেট, প্রথম খাতায় লেখা আমার কাঁচা হাতের লেখার খাতা। খুব ডানপিটে ছিলাম বলা না গেলেও,  বাওয়া বাওয়ি করতাম খুব, দেয়াল বেয়ে বেয়ে মেজো চাচার সিঁড়ি ছাড়া একতলা ছাদে উঠে যেতাম যখন তখন। তেমনি ঘরের মাচায়ও উঠে যেতাম মাঝে মাঝে। ওই বাক্সটা টেনে খুলতাম। ক্লাস ফাইভের পরে ওই বাক্সে স্থান নিলো পানিতে ডুবে পৃথিবী ছেড়ে, আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়া বোন সুইটের ব্যাবহার্য কাপড় চোপড়। চুপি চুপি প্রায়ই ওগুলো খুলে দেখি, নাকে লাগিয়ে গন্ধ নেই, মুখে চেপে ধরে চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ি একা একা। আম্মা যেন টের না পায়।  তাহলে আম্মাও সারাদিনের জন্য কাঁদতে বসে পড়বে।

কেমন করে কখন যেন আম্মা টের পেয়ে গেলেন। আমার অগোচরেই জামাকাপড়গুলো গরীবদের দিয়ে দিলেন। রেগে গিয়েছিলাম খুব। কিছু বলেনি আম্মা।  শুধু চুপ ছিলেন। একদিন বিজ্ঞানকোষ হাতে নিলাম। কত কত লেখা!  পড়তে লাগলাম ওখানেই। পড়তে ভালো লাগছিলো। একটা রুপকথার গল্পও পেয়ে গেলাম। আমার পড়ার আগ্রহ শুরু এভাবেই।

কবে কখন কিভাবে লিখতে শুরু করেছি আগেই লিখেছি।  ছোটবেলাটা ঝাত্ করে কখন চোখের সামনে থেকে পল্টি খেয়ে গড়িয়ে গেলো টের পাবার আগেই যেন টেনেটুনে একটু বড় হয়ে গেলাম। মানিক রায় নামে একজন পাড়ায় থাকতেন। পারিবারিক ভাবেই খুব যাতায়াত যেমন তেমন বিবিসির সংবাদদাতা হিসেবে প্রেসক্লাবের সদস্যা। আর প্রেসক্লাবের সম্পাদক তখন আব্বা। ক্লাশ নাইনে পড়ার এক পর্যায়ে এক দুপুরে মানিক কাকু একটা একটা লাল রঙের লম্বা রেজিস্টার খাতা নিয়ে বাসায় এলেন। প্রায়ই আসেন,আব্বার সিগনেচার নিতে। কোনো মিটিং এর নোটিশ জানিয়ে দস্তখত নিতে আসতেন এরকম প্রায়ই।

এ আর এমন কি? অবাক তখন হলাম, যখন খাতাটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন- ‘লিপি এখানে একটা সাইন করে দাও’ ততধিক বিস্মিত হয়ে একবার আব্বার দিকে একবার মানিক কাকুর দিকে প্রশ্নবোধক চিহ্ন কপালের চামড়ার  ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে রেখে তাকালাম। কোনো কথার জবাব দেবার তাগিদ অনুভব করলেন বলে মনে হলোনা একটুও। এবার ভালো করে খাতাটার দিকে তাকালাম। দেখলাম ‘কবিতা চক্র’ লেখা উপরে। সাইন করে দিলাম। আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপার কি? আব্বা সংক্ষেপে বললেন, একটা সংঘটন চালু করতে যাচ্ছে কবি সাহিত্যিকরা। তার মিটিং আছে।  এর বেশি কিছুই আর জানার প্রয়োজন নেই। আব্বা নিজে আছেন এখানে, তাঁর সম্মতি না থাকলে আমার যোগদানের প্রশ্নই উঠত না।

আমার যাত্রা শুরু এখান থেকেই। লিখি, আবৃত্তি করি। শহরের যে কোনো সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম মানেই আবৃত্তিতে আমি থাকছি। থাকছেন আব্বাও।  খুব বেশি সময় পাওয়া হয়নি আমার।  ৯০’ সালের মাঝবরাবর আমি মিস থেকে মিসেস হয়ে গেলাম। ৯১’ সালে জাতীয় কবিতা উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি এস সিতে শেষ স্বরচিত লেখা আবৃত্তির পরে সবকিছু থেকে ইতি টানলাম। পুরোদমে সংসারী। লেখালিখি বা আবৃত্তি সব চুলার আগুনে জ্বালাই রোজ তিনবেলা………

 

চলবে–

২৩৪জন ১০জন
0 Shares

৩৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য