মূল লেখায় যান

সোনেলায় আমি // প্রথম পর্ব

বন্যা লিপিএকান্ত অনুভূতি৩৫টি মন্তব্য

আব্বার ছাত্রজীবনের একটা স্যুটকেস ছিলো। অদ্ভূত লাগত আমার কাছে। সম্পূর্ণ বেতের তৈরী। কাঠের পাটাতন দেয়া মাচায় রাখা ছিলো ওই বেতে স্যুটকেসটা পরিত্যাক্ত অবস্থায়। আব্বার অনেক পুরোনো ডায়রী,  কিছু কাগজপত্র, ইত্তেফাকের পুরোনো সংবাদসহ(আব্বা ইত্তেফাকের জেলা সংবাদদাতা ছিলেন) কিছু খবরের কাগজ, ছিলো কিছু পুরোনো বিজ্ঞানকোষ,  ছিলো আমার প্রথম হাতে খড়ি দেয়া কালো রংএর একেবারে আসল শ্লেট, প্রথম খাতায় লেখা আমার কাঁচা হাতের লেখার খাতা। খুব ডানপিটে ছিলাম বলা না গেলেও,  বাওয়া বাওয়ি করতাম খুব, দেয়াল বেয়ে বেয়ে মেজো চাচার সিঁড়ি ছাড়া একতলা ছাদে উঠে যেতাম যখন তখন। তেমনি ঘরের মাচায়ও উঠে যেতাম মাঝে মাঝে। ওই বাক্সটা টেনে খুলতাম। ক্লাস ফাইভের পরে ওই বাক্সে স্থান নিলো পানিতে ডুবে পৃথিবী ছেড়ে, আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়া বোন সুইটের ব্যাবহার্য কাপড় চোপড়। চুপি চুপি প্রায়ই ওগুলো খুলে দেখি, নাকে লাগিয়ে গন্ধ নেই, মুখে চেপে ধরে চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ি একা একা। আম্মা যেন টের না পায়।  তাহলে আম্মাও সারাদিনের জন্য কাঁদতে বসে পড়বে।

কেমন করে কখন যেন আম্মা টের পেয়ে গেলেন। আমার অগোচরেই জামাকাপড়গুলো গরীবদের দিয়ে দিলেন। রেগে গিয়েছিলাম খুব। কিছু বলেনি আম্মা।  শুধু চুপ ছিলেন। একদিন বিজ্ঞানকোষ হাতে নিলাম। কত কত লেখা!  পড়তে লাগলাম ওখানেই। পড়তে ভালো লাগছিলো। একটা রুপকথার গল্পও পেয়ে গেলাম। আমার পড়ার আগ্রহ শুরু এভাবেই।

কবে কখন কিভাবে লিখতে শুরু করেছি আগেই লিখেছি।  ছোটবেলাটা ঝাত্ করে কখন চোখের সামনে থেকে পল্টি খেয়ে গড়িয়ে গেলো টের পাবার আগেই যেন টেনেটুনে একটু বড় হয়ে গেলাম। মানিক রায় নামে একজন পাড়ায় থাকতেন। পারিবারিক ভাবেই খুব যাতায়াত যেমন তেমন বিবিসির সংবাদদাতা হিসেবে প্রেসক্লাবের সদস্যা। আর প্রেসক্লাবের সম্পাদক তখন আব্বা। ক্লাশ নাইনে পড়ার এক পর্যায়ে এক দুপুরে মানিক কাকু একটা একটা লাল রঙের লম্বা রেজিস্টার খাতা নিয়ে বাসায় এলেন। প্রায়ই আসেন,আব্বার সিগনেচার নিতে। কোনো মিটিং এর নোটিশ জানিয়ে দস্তখত নিতে আসতেন এরকম প্রায়ই।

এ আর এমন কি? অবাক তখন হলাম, যখন খাতাটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন- ‘লিপি এখানে একটা সাইন করে দাও’ ততধিক বিস্মিত হয়ে একবার আব্বার দিকে একবার মানিক কাকুর দিকে প্রশ্নবোধক চিহ্ন কপালের চামড়ার  ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে রেখে তাকালাম। কোনো কথার জবাব দেবার তাগিদ অনুভব করলেন বলে মনে হলোনা একটুও। এবার ভালো করে খাতাটার দিকে তাকালাম। দেখলাম ‘কবিতা চক্র’ লেখা উপরে। সাইন করে দিলাম। আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপার কি? আব্বা সংক্ষেপে বললেন, একটা সংঘটন চালু করতে যাচ্ছে কবি সাহিত্যিকরা। তার মিটিং আছে।  এর বেশি কিছুই আর জানার প্রয়োজন নেই। আব্বা নিজে আছেন এখানে, তাঁর সম্মতি না থাকলে আমার যোগদানের প্রশ্নই উঠত না।

আমার যাত্রা শুরু এখান থেকেই। লিখি, আবৃত্তি করি। শহরের যে কোনো সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম মানেই আবৃত্তিতে আমি থাকছি। থাকছেন আব্বাও।  খুব বেশি সময় পাওয়া হয়নি আমার।  ৯০’ সালের মাঝবরাবর আমি মিস থেকে মিসেস হয়ে গেলাম। ৯১’ সালে জাতীয় কবিতা উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি এস সিতে শেষ স্বরচিত লেখা আবৃত্তির পরে সবকিছু থেকে ইতি টানলাম। পুরোদমে সংসারী। লেখালিখি বা আবৃত্তি সব চুলার আগুনে জ্বালাই রোজ তিনবেলা………

 

চলবে–

মোট পড়েছেনঃ ১২৭০জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

৩৫টি মন্তব্য

  1. আমাদের গুণী আপুর লেখালেখিতে আসা নিয়ে কিছুটা ধারণা পেলাম, আপনি আবৃত্তি ও করেন! এটা জানা ছিলো না আপু। মিস থেকে মিসেস হবার দরুন কত গুণীর গুণ যে চাপা পড়েছে, অপমৃত্যু ঘটেছে তার ইয়ত্তা নেই। এগিয়ে চলুন সাথেই আছি, থাকবো এটাই কাম্য। সোনেলার জয় হোক , আরো সমৃদ্ধ হোক আপনার এই পথচলা। শুভ কামনা রইলো

    1. ছোটদি ভাই, লেখালিখিতে আসা নিয়ে ৮টা পর্ব লিখে ফেলেছি অলরেডি। ওগুলো আপনি একটাও পড়েননি বোধহয়। ওখানে লিখেছি লেখার জগতে প্রবেশের প্রারম্ভিক গল্প। হ্যাঁ, আমি আবৃত্তি করতাম, এখনো করি তবে নিজের জন্য। একা একা। আমার ভালো লাগে ভীষণ আবৃত্তি করতে। যদিও ঠিকঠাক মতো হয়না, তবুও নিজের মত উচ্চারন করি আরকি!

      1. হুম পড়া হয়নি আপু। ঠিকঠাক হবার দরকার কি? কবিতাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে নিজের আনন্দেই, নিজের পরিতৃপ্তি লাভ এর জন্য আবৃত্তি করুন। এটাই‌ মনের আসল সুখ। শুভ কামনা রইলো

  2. আপু সত্যি আপনার সাথে আমার মিল আছে। আমিও প্রথম বই পড়েছি আব্বার পুরনো স্যুটকেস থেকে লুকিয়ে। আপনি আবৃত্তি করেন জেনে ভালো লাগলো।
    আবৃত্তি একটি কঠিন শিল্প। আমাদের মেয়েদের শখ এবং সাধ্যের সমন্বয় খুব কমই হয়। প্রায় সবাই আমরা কোনো না কোনভাবে পিছিয়ে যাই। পরিবারের ভালো মন্দ দেখভাল করতে করতে নিজেকে ভুলে যাই। তবু্ও আজ আমাদের গর্বের দিন আমরা সোনেলার ব্লগার।
    অনেক শুভেচ্ছা রইল আপু।

    1. পরের পর্ব পড়ার আমন্ত্রন রাখলাম। জানা যাবে, বন্ধ কেমন করে হয়েছিলো লেখালিখি।আবার শুরুটাই বা কেমন করে করলাম।
      আবৃত্তি ঠিক বলিনা আমি, আমি পাঠ করি বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
      শুভ কামনা।

  3. চলতে থাকুক পড়ে পড়ে ধন্য হই।
    নারী আর পুরুষের এই জায়গাতেই বিবেধ।বিয়ের পরে নারীদের সব কিছুই বিসর্জিত হয় আর পুরুষের শুরু হয়।।।
    শুভ কামনা বড় আপু। শুভ সকাল।

  4. বফ,
    আপনার আগমনের ব্যাখ্যাটা জানলাম।
    তবে তিন বেলা চুলার আগুন জ্বালান তাতে কোন সমস্যা নেই। ধারাবাহিকতায় চলবে জীবন। আগুন জ্বালানোর সঙ্গে যেন লেখালেখি না জ্বলে

    1. ঘোর অভ্যুত্থানের মধ্যে আমার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছিলো নভেম্বরে।ফেব্রুআরির ১,২ তারিখ ছিলো জাতীয় কবিতা উৎসব। অর্থাৎ তখন ৯১’ পরে গিয়েছিলো। আর ওই শেষ আবৃত্তি- লেখালেখি সব।
      ভালো থাকবেন দাদা।

  5. আরও অনেক অনেক জানার আছে, সেসব জানতে চাই। এতো অল্পেতো হবে না ( আগের আট পর্ব সহ )। দ্রুত লেখার অনুরোধ রইলো। আসবো বারেবার 🙂

    ভালোবাসা ❤❤

    1. ১৫ তারিখের মধ্যে এই পর্বগুলো শেষ করবো। ‘কবিতা লেকতে পারো’ ওটাও শেষ করেই ফেলবো ভাবছি। বাকি আছে ‘একদিন’ গল্পটাও। এগুলো এখন শেষ করবো বলে ভাবছি….যদি বেঁচে থাকি ইনশাল্লাহ্।
      ভালবাসা❤❤❤

  6. খুব ডানপিটে ছিলাম বলা না গেলেও, বাওয়া বাওয়ি করতাম খুব, দেয়াল বেয়ে বেয়ে মেজো চাচার সিঁড়ি ছাড়া একতলা ছাদে উঠে যেতাম যখন তখন

    (আপু আমাদের কিন্তু অদ্ভুত মিল)

    বাবার হাত ধরে সাহিত্যের জগতে প্রবেশ। দারুণ
    পরের পর্বের অপেক্ষায়…

    1. বলাই যায়, তুই আমার ছায়া, বলিও বার বার তাইনা? স্মৃতিকথা লিখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। যেদিনগুলো ছিলো সোনায় মেরা!
      আসছি পরের পর্ব নিয়ে।
      ভালবাসা তোর জন্য।

      1. হ্যাঁ আপু আপনি সবসময় বলেন আমি আপনার ছায়া। আমি সত্যি বলছি আমৃত্যু আপনার ছায়া হয়ে আপনার সাথে সাথে থাকতে চাই। ভালোবাসা অবিরাম আপু❤️❤️

    1. চলছে না শেষ, এবার তোমরা বিচার করো! তবে থেমেছিলো বেশ দীর্ঘ সময়, কি কারনে সে কিছুটা আঁচ করা যাবে পরের পর্বে। সাথে থেকো। জানতে পাবে।
      শুভ কামনা ছোটোভাই।

  7. সোনেলায় সহব্লগার হিসেবে আপনাকে পেয়ে আমি/আমরা সকলেই গর্বিত আপু। আপনি শুধুমাত্র লেখক হিসেবে নয় অনেক গুনে গুণান্বিতা একজন ব্লগার।

    লেখালিখি আপনি পারিবারিক আবহ থেকেই পেয়েছেন এবং আপনার কলমের ধারে পাঠক সবসমই অসম্ভব সুন্দর সব লেখা পড়তে পারছে। অবশ্যই আপনার ধন্যবাদ প্রাপ্য।

    সমাজ সংসারের পাশাপাশি লেখালিখি এবং আবৃতি পাঠ করার সৌভাগ্য সব নারীর হয়ে ওঠেনা। এক্ষেত্রে আপনি ভাগ্যবতী বটেই।

    চমৎকার অনুভূতি পড়লাম। পরের পর্বের অপেক্ষায়। শুভকামনা জানবেন।

    1. আপনার এমন মন্তব্যে আমি লজ্জা পাচ্ছি ভাই। এটা সত্য আবহটা ছিলো প্রতিকুলে লেখার জগতে আসার। “কবিতা লেকতে পারো?” সিরিজে আমি লিখেছি বেশ কিছু কাহিনি লেখালিখি কিভাবে শুরু হয়েছিলো আমার। এবং আবৃত্তি জগতেই বা কি করে এসেছিলাম। এটুকু সৌভাগ্য সত্যি আমি স্বিকার করি। এখনকার সময়ে লেখালিখি যেটুকু করছি তাও আপনাদের এরকম অনুপ্রেরনা আর উৎসাহের কারনেই পারছি করতে। আমি ভাগ্যবতী এরকম একটা প্লাটফর্ম পাওয়াতে। এসব কিছুই লেখার আগ্রহ নিয়ে শুরু করেছি “সোসেলায় -আমি”পর্ব। আপনাদের মত গুণী লরখকদের সান্নিধ্যে নিজেকে বরং দিনকে দিন ঝালাই করে নেবার সুযোগ পাচ্ছি, এটার চেয়ে বড় ভাগ্য কি হতে পারে?
      আশা করি সবসময়ের জন্যই আপনাদের এমন উৎসাহ, প্রেরনা পাবো। আসছি পরের পর্ব নিয়ে।
      শুভ কামনা।
      ভালো থাকবেন সবসময়।

  8. বেতের সুটকেস আমার বড়দার ছিল একটা। স্বাধীনতার আগে তিনি জগন্নাথ কলেজ থেকে বিএ পাশ করেছিলেন। অত্যন্ত স্টাইলিশ ছিলেন তিনি ছাত্রাবস্থায়। নায়কের মত সুন্দর ছিলেন। তিনিও সাহিত্যানুরাগী ছিলেন খুব। শহরের যে কোনো সাহিত্য বিষয়ক প্রগ্রামে তার অংশ গ্রহন ছিলোই। তাঁর ব্যাক্তিত্ব আমাকে সব সময়ই মুগ্ধ করতো। আমার জীবনে আমার বড়দার প্রভাব সবচেয়ে বেশী।

    সাহিত্য জগতে তোমার আগমনের প্রথমটুকু জানলাম।
    আগুন নিভে গেলেও ছাইয়ের মধ্যে আগুন চাপা পরে থাকে, তোমার অবস্থা তেমন।
    বিয়ের পরে কিছুদিনের জন্য হয়ত সাহিত্য চর্চা চাপা পরে গিয়েছিল,
    সময় এবং সুযোগে তা আবার প্রকাশিত হয়েছে ঠিকই।
    পরের পর্ব দ্রুত পড়তে চাই।
    লেখাটিতে তোমাকে পরিচিত লাগছে খুব 🙂 ঘটনা কি?
    শুভ কামনা, শুভ ব্লগিং।

    1. আপনার বড়দা স্টাইলিষ্ট ছিলেন বরাবর। ব্রাণ্ডেড পারফিউম ছাড়া ব্যাবহার করতেন না, ব্র্যাণ্ডেড সিগারেট ছাড়া ধুমপান করতেন না, আয়রন ছাড়া পোষাক পড়তেন না, মাথার চুল আঁচড়াতেন সবচে বেশি সময় নিয়ে। তাঁর যৌবনের কিছু ছবি আছে এখনো, উত্তম কুমার, নায়ক রাজ রাজ্জাকের মত লাগে দেখতে। তিনিই আপনার এবং আপনার ৭ ভাই ৩ বোনের বড়দা। তিনি স্থানীয় শিল্পকলা একাডেমী র সম্পাদক ছিলেন, ছিলেন বিভিন্নন সংঘটনের পৃষ্ঠপোষক, ছিলেন সরকারি সব প্রোগ্রামের স্ক্রিপ্ট রাইটার, পরিচালনাকারী,। আমাদের জেলার মেয়ে ছেলে ছেলেদের সংগীতেও তিনি তাঁদেরকে সুযোগ করে দিয়েছেন মঞ্চে। আমার অনেক বান্ধবি আজো বলে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে যে, চাঁন স্যারের কারনেই জাতীয় পর্যায় থেকেও তাঁরা সাফল্য বয়ে এনেছে। তিনি আবৃত্তিও শেখাতেন অনেককে। আমিও আবৃত্তি শিখেছি তাঁরই কাছে।

      লেখায় আমাকে পরিচিত লাগছে😊😊 দেখেন ভেবে চেনেন কিনা?
      আসছি পরের পর্ব নিয়ে।
      কৃতজ্ঞতা শ্রদ্ধা।

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।