“ন ডরাই” চলচিত্রটি নিয়ে আমার কিছু কথা-

তৌহিদ ৬ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার, ১২:১৪:০১পূর্বাহ্ন সমসাময়িক ৩৮ মন্তব্য

নব্বই এর দশকের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বাংলা চলচ্চিত্রে নষ্টামি, নোংরামি, রগরগে অশ্লীল দৃশ্যের সুড়সুড়ি আর কাটপিসের জয়জয়কার চলছিল। সেই সময় দেশের বিনোদনপ্রিয় সিনেমা হলমুখী মানুষ সেই যে হল বিমুখীতার সম্মুখীন হতে শুরু করল যা কিছুক্ষেত্রে এখনও বিদ্যমান। এরই মাঝে কিছু পরিচালক হাতেগোনা দু’একটি সামাজিক বাংলা চলচ্চিত্র দর্শকদের উপহার দিয়েছেন। কিন্তু মানুষকে হলমুখী করতে খুব একটা কাজে দেয়নি সেসব জনপ্রিয় চলচ্চিত্রও। শুরু হয় সিনেমা হল ধ্বংসের খেলা অর্থাৎ সিনেমা হলে দর্শক যাচ্ছেনা তাই প্রেক্ষাগৃহগুলি প্রচুর পরিমান অর্থের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিল। ইউটিউবের সুবাদে এবং ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি সিনেমা নিজেদের মোবাইলে, কম্পিউটারে ডাউনলোড করার সুযোগ যখন হাতের মুঠোয় সহজেই চলে আসলো মানুষের প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র দেখার প্রতি আকর্ষণ আরও হারিয়ে যেতে শুরু করে।

বাংলা চলচ্চিত্রের এমন দুর্দিনে কিছু মানুষের আপ্রাণ প্রচেষ্টা এবং উদ্যোগের ফলে পরিচালক-প্রযোজক, শিল্পী, কলাকৌশলীদের অনেকেই আবার বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের হলমুখী করার সংকল্প গ্রহণ করেন। বাংলা চলচ্চিত্রের সুদিন ফেরাতে সরকার নিজেও অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। মানসম্মত সিনেমা হল বানানো, অর্থলগ্নি, ভালো গল্প, ভালো ক্যামেরা, ফিল্ম সবই এসবের অন্তর্ভুক্ত ছিল। যার ফলে আমরা গত ক’বছরে পেয়েছি অনেক ভালো মানের কিছু চলচ্চিত্র।

এই ধারাবাহিকতার নতুন সংযোজন ছিল স্টার সিনেপ্লেক্স প্রতিষ্ঠানটির প্রযোজনায় “ন ডরাই” চলচ্চিত্রটি। যা গত ২৯ নভেম্বর মুক্তি পায় স্টার সিনেপ্লেক্স সহ দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির এক সপ্তাহের মধ্যেই চলচ্চিত্রটির সেন্সর বাতিল ও প্রদর্শনী বন্ধে আইনি নোটিশ পাঠানো হলো। নোটিশে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন মন্ত্রণালয় সচিব, ছবিটির প্রযোজক মাহবুব রহমান, পরিচালক তানিম রহমান অংশু ও চিত্রনাট্যকার শ্যামল সেনগুপ্ত বরাবর চলচ্চিত্রটি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।

“ন ডরাই” চলচ্চিত্রটি আমার দেখা হয়নি বা সুযোগ হয়ে ওঠেনি দেখার। তবে ইন্টারনেট ঘেটে যা পেলাম তা হচ্ছে- বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার নাসিমা আক্তারের সত্যিকারের জীবনকাহিনী হতে অনুপ্রাণিত হয়ে “ন ডরাই” চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে। এই চলচ্চিত্রটি আয়শা নামের একটি মেয়ের উদ্যমের গল্প, নিজের সংকল্পের গল্প। আয়শা চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেত্রী সুনেরাহ বিনতে কামাল। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সমুদ্রে সার্ফিং নিয়ে নির্মিত এমন একটি চলচ্চিত্র বাংলাদেশে এই প্রথম। ছবিটির মূল চরিত্র আয়শা যে সমস্ত সামাজিক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সার্ফিং করে। এই আয়শা নামটি নিয়েই মূলত আপত্তি তোলেন একজন আইনজীবী- মো. হুজ্জাতুল ইসলাম।

আইনি নোটিশে বলা হয়, এই চলচ্চিত্রে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর স্ত্রী হযরত আয়শা (রা.) সম্পর্কে বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও চলচ্চিত্রে কিছু অংশ অশ্লীল ও অনৈতিক। এসব বিষয় মুসলিম ধর্মালম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত সৃষ্টি করতে পারে। চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার সস্তা প্রচারণার উদ্দেশ্যে ধর্মীয় উস্কানিমূলক পথ বেছে নিয়েছেন। তাই নোটিশে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী বন্ধ এবং মুসলিম সমাজের কাছে ক্ষমা চাইতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

“ন ডরাই” চলচ্চিত্রটি যখন প্রথম সেন্সরবোর্ডে যায় তখন কিছু আপত্তিকর সংলাপের কারণে তার ছাড়পত্র স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে আপত্তিকর সেসব সংলাপ এবং ভিডিও চিত্র বাদ দিয়ে এই চলচ্চিত্রটিকে সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র দেয়। তাহলে সেন্সর বোর্ড কি তখন দেখেননি বা জানতেননা যে সেখানে কোনো সংলাপ ও দৃশ্য আপত্তিকর আছে কিনা? নিশ্চয়ই দেখেছেন এবং তারপরেই ছাড়পত্র দিয়েছেন। তাহলে এই নোটিশ কেন?

বাংলাদেশে ইদানীংকালে ধর্ম নিয়ে বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম নিয়ে যত বাড়াবাড়ি হচ্ছে, নানা মুনির নানান মতের ভীড়ে ইসলাম ধর্মের আসল উদ্দেশ্য ও গাম্ভীর্যতাই হারিয়ে যেতে বসেছে। আর বারবার একটি কথাই সামনে আসছে তা হলো “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” এই লাইনটি। আমার ধর্ম আমার নিজের কাছে। নিজেই শতভাগ ইসলাম মানতে পারিনা আমি অন্যকে কি করে উপদেশ দেবো? দেশের সংস্কৃতির সাথে ধর্মকে গুলিয়ে ফেলা মোটেই কাম্য নয়। এমন বাড়াবাড়ি যারা করে এরা কিন্তু তারাই যাদের বাসায় ডিশের সংযোগ নিয়ে ভারতীয় নাচ গান হরহামেশাই দেখছে তাদের ছেলেমেয়েরা। তাদের বাসাতেও চলে স্টার জলসা, স্টার প্লাস, জি টিভির সব টিভি সিরিয়াল। আজ তারাই ধর্মের কথা বলে বাংলা সিনেমা সংস্কৃতির বিরুদ্ধাচারণ করছে কিন্তু!

সার্ফিং নিয়ে বানানো এই চলচ্চিত্রটিতে নাকি বিকিনি পরার দৃশ্য আছে, চুমু খাবার দৃশ্য আছে। তো সমস্যা কিরে ভাই? শাড়ি পড়ে কেউ সার্ফিং করে নাকি? এখনকার কোন চলচ্চিত্র রোমান্টিক দৃশ্য নেই? হালের হিন্দি চলচ্চিত্রগুলোতো পরিবারের সবার সাথে দেখার মত নয়। ভারতীয় কিছু বাংলা চলচ্চিত্র যে পরিমাণ অশ্লীল দৃশ্য দেখানো হয় তা কোন অংশেই নীল ছবির চেয়ে কম নয়। আর যেখানে ভারতীয় টিভি সিরিয়ালগুলোতে বেডরুমের দৃশ্য এখন ডালভাতের মত কমন একটি বিষয় হয়েছে সেখানে এসব কথা বলাই অবান্তর। আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়িনা কিন্তু এমন ধর্মীয় গোঁড়ামী কর্মকাণ্ডে সর্বদাই আগ্রাসী ভূমিকা পালন করতে সচেষ্ট থাকি।

“ন ডরাই” চলচ্চিত্রের আয়শা নামটিও নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে, কেন? আয়শা নামধারী পৃথিবীতে আরো হাজারো মানুষ আছে তাদের সবাই কি মুসলিম? আমি নিজেই দেখেছি আয়শা নামীয় খৃষ্টীয় ধর্ম পালনকারী নারী। আমাদের মনে রাখতে হবে হযরত মোহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সহধর্মিনীগন, তাঁর সন্তান-সন্ততি, বংশধরগণ এনারা সকলেই সকল বিতর্কের উর্ধ্বে। এই ভাবগাম্ভীর্যতার মধ্যে থেকেই আমাদের ইসলাম ধর্মের সকল বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। আমার নামের প্রথমেওতো মো. আছে, তাহলে মহানবী (স.) এর নামের সাথে মিল আছে বলে কি তা আমার জন্য প্রযোজ্য নয়? যে হুজুর আমার নাম রাখছে সেতো তাহলে মহা অন্যায় করেছে, পাপ করেছে। যিনি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সেই মো. হুজ্জাদুল ইসলাম তাঁর নামেও মো. শব্দটি আছে। মহানবীর (সা.) এর নামের সাথে মিল থাকায় পৃথিবীর মোহাম্মদ নামের সবাইকে এখন কি নাম পরিবর্তন করতে হবে?

গত বছর ডঃ মুহাম্মদ জাফর ইকবালের “ভূতের বাচ্চা সোলায়মান” নামক বইটির কথা মনে আছে কি? নবী সোলায়মান (আ.) এর নাম ব্যবহার করে বইটির মূল চরিত্রটি লেখা হয়েছে বলে এটিকেও ঠিক একই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের তকমা দেওয়া হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে ড. জাফর ইকবালকে বর্বর হামলার শিকার হতে হয়েছে। ভূতের বাচ্চা সোলায়মান আর নবী সোলায়মান (আ.) কি একই জিনিস হল? আসলে কিছু ভ্রান্ত ধারনাকে প্রতিষ্ঠিত করতেই ধর্মের নামে দোহাই দিয়ে আমরা দেশের সংস্কৃতিকে বিলুপ্ত করার অপপ্রয়াস হিসেবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এই লাইনের অপব্যহার করি অনেকক্ষেত্রেই।

দেশের বাংলা চলচ্চিত্রগুলিতে শর্ট স্কার্ট, লো কাট ব্লাউজ পরিধান করে নায়িকারা যখন বিকৃত অঙ্গভঙ্গি করে আমাদের আনন্দ দেয় সেটি খুব মজা লাগে তাইনা? ইসলাম ধর্মেতো এমন পোষাক পড়া হারাম তাহলে সেগুলোর জন্য ধর্মীয় অনুভূতিতে তাদের আঘাত লাগেনা কেন বলতে পারেন? তাই যদি হয় তাহলে এদেশে ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম সব বন্ধ করে দেয়া হোক কারন এসবের মাধ্যমেও কুরুচিকর অনেক কিছুই চাক্ষুষ হয় যেগুলো ইসলাম ধর্মে কোন বিধানই নেই। দেশ থেকে ইন্টারনেট বিলুপ্ত করা হোক কারন এত বিধিনিষেধের পরেও মানুষ পর্নগ্রাফী দেখতে সেই গুগোলেই সার্চ করে প্রতিনিয়ত। আবার অনেকেই দেখতে না চাইলেও কিছু ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সেসব চোখে পড়ে যায়ই অনেকসময়। তখন ধর্মীয় অনুভূতি কোথায় হারায় তাদের জানতে চাই।

“ন ডরাই” চলচ্চিত্রটি নিয়ে এত যে হৈ চৈ আদতে কিন্তু সিনেমাটিই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। নারী-পুরুষ সবার জন্যই অনুপ্রেরণামূলক একটি সিনেমা এটি। আইনি নোটিশটি যেহেতু আদালতের মাধ্যমে এসেছে তাই তার প্রতি আমাদের পূর্ণ সম্মান এবং শ্রদ্ধা আছে। আদালত নিশ্চয়ই বিচার বিবেচনা করেই এই নোটিশ পাঠিয়েছেন। চলচ্চিত্রটিতে আপত্তিকর কিছু থাকলে তা আবারো সেন্সরবোর্ডে রিভিউ হতে পারে। কিন্তু “ন ডরাই”-কে যাতে ধর্মীয় অন্ধ রোষানলের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে না হয় এটাই কাম্য।

 

তথ্যসূত্রঃ ধর্মীয়-অনুভূতিতে-আঘাতের-অভিযোগে-ন-ডরাই-সিনেমা-বন্ধে-আইনি-নোটিশ

৮২৮জন ৪১৫জন
105 Shares

৩৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য