গত কয়েকদিন আগে সোনেলা ব্লগের সম্মানিত ব্লগার মনির হোসেন মমি দাদার একটা ফোনকল পেলাম। মনির দাদা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দাদা, আপনার অফিস থেকে কদম রসূল দরগাহ কতদূর?’ আমি বললাম, ‘বেশি দূর তো নয় দাদা। কিন্তু কেন?’  মনির দাদা বললেন, ‘আপনাকে নিয়ে শুক্রবার নবীগঞ্জ কদম রসূল দরগাহ দেখতে যাবো। আপনি ঠিক দুপুরের পরপর রেডি হয়ে থাকবেন।আমি ঠিক সময়মতো আপনাদের চৌধুরীবাড়িতে চলে আসবো।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে দাদা, তা-ই হোক।’ অবশেষে তা-ই হয়েছে। ব্লগার মনির দাদা এসেও ছিলেন। গিয়েছিলাম শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড় নবীগঞ্জ কদম রসূল দরগাহ পরিদর্শনে।

দিনটি ছিল ৪ অক্টোবর, ২০১৯’ শুক্রবার। আমি দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে আর ঘুমালাম না। মোবাইলটা চার্জে রেখে অপেক্ষায় থাকলাম, মনির দাদার কলের জন্য। কিন্তু মনির দাদার ফোনকল আর আসছে না। আমি নিজেই দুপুর ২টায় মনির দাদাকে কল দিলাম। মনির দাদা কল রিসিভড করে বললেন, ‘আমি আসছি, আপনি রেডি থাকুন!’ নিশ্চিত হলাম, তিনি কথা কাজে মিল রেখেছেন। তাই আমি তাড়াতাড়ি করে চৌধুরীবাড়ি গিয়ে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে থাকলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই মনির দাদা আমার সামনে এসে হাজির!

তারপর দুইজনে মিলে গোদনাইল চৌধুরীবাড়ি থেকে একটা ব্যাটারিচালিত রিকশায় হাজীগঞ্জ ঘুদারা ঘাটের উদ্দেশে রওনা হলাম। যাওয়ার পথে হাজীগঞ্জ কেল্লা। হাজীগঞ্জ কেল্লায় কিছুক্ষণ ঘুরাফেরা করে হাজীগঞ্জ গুদারা ঘাট গেলাম। খেয়ানৌকা চড়ে শীতলক্ষ্যা নদী পাড় হয়ে গেলাম কদম রসূল দরগাহ শরিফে। যেখানে যুগ যুগ ধরে রক্ষিত আছে ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পায়ের ছাপযুক্ত একটি কালো পাথর।

কদম রসূল দরগাহ শরিফের মূল প্রবেশ পথ ও উপরে ওঠার সিঁড়ি।

তবে আমি কদম রসূল দারগাহ শরিফে এবারই প্রথম যাইনি, এর আগেও অনেকবার গিয়েছি। একসময় আমাদের বাসস্থানই ছিল নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানাধীন লক্ষ্মণখোলা আদর্শ কটন মিলস্ অভ্যন্তরে। তাই কোনোএক সময় কদম রসূল দরগাহ শরিফের বাৎসরিক উরস উপলক্ষে যেই মেলা বসতো, সেই মেলায় যেতাম।পাথরটি ছুঁইয়ে প্রণাম করতাম। পাথর ঘেমে যেই জল বের হয়, সেই জলও মুখে নিতাম। আর এবারের যাওয়াটা মনে হয় আমার শেষ যাওয়া। কারণ, জীবনের অবশিষ্ট সময়ে এই পবিত্র দরগাহ শরিফে আর কখনো যেতে পারবো কিনা সন্দেহ! তাই আজকে কদম রসূল দরগাহ নিয়ে নিজের জানামত কিছু লিখে সবার মাঝে শেয়ার করতে চাই। আশা করি সবাই সাথে থাকবেন।

কদম রসূল দরগাহ নিয়ে কিছু শোনা কথা:
কারো কারো মতে এই পবিত্র দরগাহ’টি গায়েবি উঠেছিল। একদিন রাতভোর হতে-না-হতেই মজমপুর (বর্তমান কদম রসূল) গ্রামের মানুষ এই দরগাহ শরিফটি দেখতে পায়। তাই অনেকের ধারণা এটি আল্লাহতাওলা’র অশেষ মেহেরবানিতে মাটির নিচ থেকে উঠেছিল বলেই, এই পবিত্র কদম রসূল দরগাহ শরিফটি আশপাশের কিছু জায়গা নিয়ে টিলাকৃতি হয়ে আছে। যেহেতু এটি মাটি ফুঁড়ে উপরে উঠেছিলো। আর এই কারণেই পদচিহ্ন ছাপযুক্ত পবিত্র পাথরটি ঘিরেই এলাকাটার নাম হয় নবীগঞ্জ। যেহেতু এটি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পায়ের ছাপযুক্ত একটি পাথর, তাই। আর স্থানে এই পবিত্র পাথরটি পাওয়া গিয়েছিল, সেই স্থানটির নাম কদম রসূল (পূর্বের নাম মজমপুর)। যেই স্থানে এই পবিত্র পদচিহ্ন ছাপযুক্ত পাথরটি বর্তমানেও রক্ষিত আছে, এটিই কদম রসূল দরগাহ বা কদম রসূল দরগাহ শরিফ নামে সবার কাছে পরিচিত।

আবার অনেকের মুখে শুনেছি অন্যরকম এক গল্প। গল্পটি হলো এইরকম:
মজমপুর (বর্তমান কদম রসূল) গ্রামে একজন দরিদ্র লোক ছিলেন। একরাতে লোকটিকে স্বপ্নে আদেশ করলেন, ‘টিলার উপরে যাও! সেখানে একটি প্রস্তর খণ্ড দেখতে পাবে! এটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তোমাকে দেওয়া হলো। তুমি প্রস্তর খণ্ডটি যেখানে পাবে, সেখানে সেই জায়গায়ই রক্ষণাবেক্ষণ করা সহ প্রস্তর খণ্ডটি সেবাযত্ন করতে থাকো। এতে তোমার মঙ্গল হবে।’
এরপর লোকটি খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে টিলার উপরে গেল। টিলার উপরে উঠে ঠিকই একটি প্রস্তর খণ্ড দেখতে পায়। পূর্বের সূর্যের আলোতে তখন প্রস্তর খণ্ডটি ঝিলমিল করছিল। লোকটি সামনে গিয়ে প্রস্তর খণ্ডটিতে পদচিহ্নের ছাপ দেখতে পেয়ে, প্রস্তর খণ্ডটি সালাম করে বুকে নিয়ে সেখানেই বসে পড়লো। এই খবর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো গ্রাম ছেড়ে শহরে।

একসময় সেখানকার স্থানীয় মানুষ সেই জায়গায় একটি টিনের চালযুক্ত ঘর তৈরি করে, সবাই সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটি সময়ে সেখানে জিকিরের সাথে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করতেন এবং বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে এই পবিত্র দরগাহ শরিফে বাৎসরিক উরস করতে শুরু করেন। এরপর কদম রসূল দরগাহ শরিফের উরশ-এর কথা পৌঁছে যায় নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র কানে। তখন তিনি একটা জটিল রোগে ভুগতে ছিলেন। তিনি তাঁর রোগমুক্তির জন্য এই পবিত্র কদম রসূল দরগাহ শরিফে মানত করলেন। এর কিছুদিন পরই নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র সেই কঠিন রোগ নিরাময় হয়ে যায়।

এরিমধ্যে দরগাহ থেকে পদচিহ্নের ছাপযুক্ত পাথরটি চুরি হয়ে যায়। চোরে চুরি করে আর সারতে না পেরে একদিন এই পবিত্র পদচিহ্ন ছাপযুক্ত পাথরটি নিকটস্থ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দিয়ে কোনরকম দায়মুক্ত হয়। পাথরটি থেকে যায় শীতলক্ষ্যা নদীগর্ভেই।

এদিকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র রোগ নিরাময় হওয়াতে তিনি মনস্থির করলেন, একসময় তিনি এই পবিত্র কদম রসূল দরগাহ জিয়ারত করবেন। একসময় তিনি লোকজন নিয়ে এই পবিত্র দরগাহ শরিফের উদ্দেশে রওনা হলেন। সাথে ছিল নবাবকে বহন করার বিশালাকৃতির এক হাতি। যেই হাতি চড়ে তিনি এখানে সেখানে পরিদর্শনে যেতেন। সেই হাতি চড়েই আসলেন বর্তমান হাজীগঞ্জ গুদারা ঘাটের সামনে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে।

এরপর তিনি শীতলক্ষ্যা নদী পাড় হলেন নৌকা চড়ে। আর তাকে বহন করা হাতিটি নদী পাড় হলো সাঁতরে। হাতিটি শীতলক্ষ্যা নদী সাঁতরে পাড় হয়ে যখন কদম রসূল দরগাহ বরাবর নদীর পাড়ে উঠেছিল, তখন সবাই দেখে হাতির গলার লোহার চেইন’র শেষাংশ সোনালি রং হয়ে ঝিলমিল করছে। নবাব সিরাজউদ্দৌলা তখন পবিত্র দরগাহ শরিফে গিয়ে জানতে পারে পদচিহ্ন ছাপযুক্ত পাথরটি কিছুদিন আগে কে-বা-কারা চুরি করে নিয়ে গেছে। পবিত্র পাথরটি চুরি হয়েছে শুনে নবাব সিরাজউদ্দৌলা তখন আশাহত হয়ে পরেন। সেই মুহূর্তেই হাতির গলার চেইন’র শেষাংশ সোনালি রং হয়ে যাওয়ার খবরটা নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র কানে আসে।

তখন নবাব সিরাজউদ্দৌলা কয়েকজন ডুবুরিকে খবর পাঠায়। ডুবুরিরা এসে হাতি যেই জায়গা দিয়ে নদীর পাড়ে উঠেছিল, সেই জায়গায় তল্লাশি করে পাথরটি খুঁজে পেয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র হাতে দেয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলা পবিত্র পাথরটাকে সালাম করে দরগাহ’র খাদেমের কাছে বুঝিয়ে দেয়। এরপর নবাব সিরাজউদ্দৌলা ঢাকায় অবস্থিত আহসান মঞ্জিলের অনুরূপ কদম রসূল দরগাহ শরিফটি নির্মাণ করে দেন। তাই ঢাকার ইসলাম পুরের বর্তমান আহসান মঞ্জিলের সামনের আকৃতি যেরকম, নবীগঞ্জ কদম রসূল দরগাহ শরিফের সানের আকৃতিও একইরকম দেখা যায়।

কদম রসূল দরগাহ শরিফের ভেতর থাকা খাদেমদের কবর।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় এরকম:
আগেই বলে রাখা ভালো, কদম রসুল বলতে বোঝায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পায়ের ছাপযুক্ত একটি পাথর। ইসলাম ধর্মাবলম্বী অনেকের বিশ্বাস মহানবী হযরত মোহাম্মদ(সাঃ) হেঁটে যাওয়ার সময় প্রস্তর খন্ডের উপর পায়ের ছাপ থেকে যেতো। এই পদচিহ্ন ছাপযুক্ত প্রস্তর খণ্ড মক্কা থেকে অনেকেই নিয়ে যেতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। এধরনের প্রস্তর খন্ড ঘিরে পশ্চিমে জেরুজালেম হতে পূর্বে চট্টগ্রাম পর্যন্ত গড়ে উঠেছে সৌধ, দরগাহ। এরকম একটি সৌধ বা দরগাহ হলো নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানাধীন বর্তমান নবীগঞ্জ ‘কদম রসুল’ দরগাহ। যা এখন পবিত্র কদম রসূল দরগাহ শরিফ নামে সারাদেশে পরিচিত। এই দরগাহ শরিফটি ভূমি থেকে ৩০ ফুট উঁচুতে একটি টিলার উপর স্থাপিত।

সবাইকে দেখার জন্য নিজের মোবাইল থেকে রেকর্ড করা কদম রসূল দরগাহ শরিফের একটি ভিডিও ইউটিউব থেকে এখানে দেখানো হলো। 

বেশকিছু ইতিহাসবিদদের মতে:
এই কদম রসুল দরগাহ পাঁচ’শ বছরের পুরানো আধ্যত্মিক এবং অলৌকিক ঘটনাবলির প্রাণকেন্দ্র। প্রচলিত আছে যে, মুহাম্মদ (সাঃ) মিরাজের রাত্রে বোরাকে উঠার পূর্বে পাথরে তার পায়ের কিছু ছাপ অঙ্কিত হয়। পরবর্তীতে সাহাবিগণ পদ চিহ্নিত পাথরগুলো সংরক্ষণ করেন বলে অনেকে দাবি করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত পাথরটি বর্তমানে জেরুজালেমে সংরক্ষিত আছে। এছাড়া ইস্তাম্বুল, কায়রো এবং দামেস্কে অনুরূপ পাথর সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও সমগ্র ভারতবর্ষে কদম রসুলের সংখ্যা ১৪টি। এরমধ্যে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে দুইটি, নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে পূর্বের মজমপুর বর্তমান কদম রসূল গ্রামে একটি। যা এখন ইতিহাস খ্যাত এ দরগাহ শরীফ কদম রসূল দরগাহ।

আরেক মতে, ৯৮৬ হিজরি ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী আফগান নেতা মাসুম খান কাবুলি পদচিহ্ন সংবলিত এ পাথরটি একজন আরব বণিকের কাছ থেকে কিনেছিলেন। ঈসা খাঁর সাথে এই রাজার সখ্যতা ছিল। পরে মাসুম খান বন্দরের নবীগঞ্জ এলাকাতে বিশাল জায়গা নিয়ে ৩০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু মাটির টিলা তৈরি করে একটি পদচিহ্ন স্থাপন করেন। এর পর থেকেই প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) কদম মোবারক (পদচিহ্ন) সংবলিত এই কালো পাথরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ইতিহাস খ্যাত এ দরগাহ শরীফ কদম রসূল দরগাহ।

কীভাবে এই পবিত্র দরগাহে আসবেন?: 
প্রথমে ঢাকা থেকে গুলিস্তানের বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেট অথবা একটু দক্ষিণে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে উঠার পথে বন্ধন, আনন্দ, উৎসব বাসের টিকেট কাউন্টার রয়েছে। টিকেট সংগ্রহ করার পর বাসে চড়ে ৪০ মিনিটেই সরাসরি চলে আসতে পারবেন নারায়ণগঞ্জ (টার্মিনাল) বন্দর গুদারা ঘাট অথবা চিটাগং রোড থেকে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা পরিবহনে চড়ে সরাসরি চলে আসুন হাজীগঞ্জ গুদারা ঘাট। তারপর খেয়ানৌকা চড়ে শীতলক্ষ্যা নদী পাড় হয়ে হাতের একটু ডানে গেলেই কদম রসূল দরগাহ শরিফ চোখের সামনে দেখতে পাবেন। আর যদি নারায়ণগঞ্জ টার্মিনাল বন্দর গুদারা ঘাট হয়ে যেতে চান, তবে শীতলক্ষ্যা নদী পাড় হয়ে অটোয় চড়ে চলে যাবেন নবীগঞ্জের কদম রসূল দরগায়।

লেখক নিতাই বাবু।

আংশিক তথ্য সংগ্রহ বিভিন্ন অনলাইন সাইট।

৩৩০জন ১৫জন
36 Shares

৪২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ