দেবরাজ জিউস তার সৃষ্টি মানব জাতিকে ধ্বংস করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, কারণ মানব জাতি তাদের মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিয়েছিল। অন্যায় আর পাপাচারের সর্বোচচ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু দেবতাদের মধ্যেও নিয়ম নীতি ছিল বিধায় হঠাৎ করে মানব জাতি ধ্বংস করা যাচ্ছিল না। এর মুলে ছিলেন প্যান্ডোরা। দেবরাজ জিউস প্যান্ডোরার বিয়েতে একটি বাক্স উপহার দিয়েছিলেন, এবং বলে দিয়েছিলেন যে এই বাক্স যেন খোলা না হয়। কিন্তু প্যান্ডোরা কৌতূহল বসত বাক্সটি খুলে ফেললেন, আর এতেই বাক্সে থাকা রোগ-জরা-হিংসা-দ্বেষ-লোভ-মিথ্যা ইত্যাদি সব স্বর্গীয় নীচুতা ছড়িয়ে পরে মানুষের পৃথিবীতে।

সে জনমে তুমি প্যান্ডোরার মেয়ে পিরা ছিলে, আর আমি ডিউক্যালিয়ন। আর এ জনমে আমি জন্ম নিলাম পিরু হয়ে, তুমি জন্ম নিলে……………।  প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক কড়ির গায়ে লেগে থাকা বাংলা অক্ষর তখন ছিল কিনা সে প্রশ্ন অবান্তর। পিরা যে রূপান্তরিত হয়ে পিরু হয়ে গিয়েছে এটি নিশ্চিত হয়েই বলা যায়। কেনই বা আমার পিরু নামটি রাখা হবে? সম্পুর্ন অপ্রচলিত একটি নাম, তার ইতিহাস খুঁজতে হলে গ্রীক পুরাণে যেতেই হবে।

ককেশাস পর্বতে আমার পিতা প্রমেথিউস-এর সঙ্গে দেখা করতে গেলে পিতা এক ভয়ংকর সংবাদ দেন আমাকে, দেবতা জিউস মহাপ্লাবন সৃষ্টি করে মানবজাতি ধ্বংস করে দেবেন। আমি গ্রিসে ফিরে এসে তোমাকে এই সংবাদ দিলে তুমিও প্রথম ভয়ে আতংকে কেঁপে উঠলে। তবে মুহুর্তের মধ্যেই তুমি নিজেকে সামলে নিয়ে আমাকে অভয় বানী দিয়ে আমার হাত ধরে রাখলে। তোমার হাতের স্পর্শ পেয়েই কেমন এক নির্ভরতা পেলাম, আমাদের কিছুই হবে না। তুমি জিজ্ঞেস করলে তোমার পিতা এ থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নিশ্চয়ই বলেছেন, বলো আমাকে। আমি তোমাকে বললাম ‘আমার পিতা আমাকে মহাপ্লাবন থেকে বাঁচার জন্য একটি কিস্তি তৈরী করতে বললেন’।

নির্ভীক তুমি বললে এসো আমরা খুব দ্রুতই একটি বড় কিস্তি বানাই। দুজনেই আমরা একটি কিস্তি বানিয়ে ফেলি। কিস্তি তৈরী শেষ হলে কিস্তিতে গম, মধু আর খাবার পানি তুলে দুজনেই উঠে বসে থাকি কিস্তিতে।
কিস্তিতে ওঠার সাথে সাথেই প্লাবন শুরু হয়ে গেলো, ধীরে ধীরে পানি বাড়তে লাগল। তুমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললে, দেবতা জিউস এমন সিদ্ধান্ত নিলেন কেন? আমি উত্তরে বললাম পৃথিবীতে মানবজাতি পাপে নিমজ্জিত হয়েছে। তুমি আক্ষেপের সুরে বলল, ইস! মা যদি দেবতা জিউস-এর দেওয়া সেই বাক্সটি না খুলত!’ আমি উত্তরে বললাম ‘তোমার মা প্যান্ডোরা দেবতা জিউস-এর ইচ্ছাতেই বাক্সটি খুলেছে।‘ কারনের কারন দেবতারা নিজেরাই তৈরী করে রাখেন।

একটি সময়ে সন্ধ্যা নামে, চারিদিকে থই থই পানি। প্রান্তর নেই, পাহাড় নেই- কেবলই পানি আর পানি। এভাবে এক এক করে ৯ দিন কাটল। এরপর পানি কমতে লাগল। কিস্তি এসে ঠেকল একটি পাহাড়ের গায়ে। যে পাহাড়ের নাম পার্নেসাস পাহাড়। কিস্তিতে থাকতে আমাদের আর ভালো লাগছিল না। পানি কমে গিয়েছে। কিস্তি থেকে দুজনে নামলাম ৯ দিন পরে। চারিদিকে কাদা আর ধ্বংসের চিহ্ন। কাঁদামাখা পাথরের উপর শ্যাওলা জমেছে। সব কিছু কেমন শূন্য শূন্য। কোনো মানুষ, প্রাণী আর বেঁচে নেই।
তুমি একটি উপাসনালয় চিনিয়ে নিয়ে এলে যার নাম দেলফির উপাসনালয়। তোমার পরামর্শেই আমরা দুজনে দেবরাজ জিউসের উপাসনা শুরু করলাম দেলফির উপাসনালয়ে। দেবরাজ জিউস আমাদের এই উপাসনা দেখে সন্তষ্ট হলেন। তিনি স্বর্গীয় দেবদূত হার্মেস কে বললেন, শোনো, হার্মেস। তুমি এখুনি ডিউক্যালিয়ন এবং পিরার কাছে যাও। ওদের মনোবাসনা পূর্ণ কর। স্বর্গীয় দেবদূত হার্মেস বিদ্যুতের গতিতে দেলফির উপাসনালয়ের প্রাঙ্গনে এলেন। দেবদূত কে দেখে আমরা খুবই অবাক হয়েছিলাম।
স্বর্গীয় দেবদূত হার্মেস আমাদের বললেন ‘আমাকে দেখে তোমাদের অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমাকে দেবতা জিউস পাঠিয়েছেন। তোমরা জিউসের আরাধনা করেছে। জিউস এতে ভারি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আমি তোমাদের মনের বাসনা পূর্ণ করবো। বলো কি তোমাদের মনের বাসনা?’
তুমি আমার দিকে একবার তাকালে, এরপর বললে ‘আমরা মানুষ চাই। পৃথিবী ভর্তি মানুষ। পৃথিবী আবার মানুষে- মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে উঠুক। এই আমাদের মনের বাসনা।
স্বর্গীয় দেবদূত হার্মেস বলল ‘তোমাদের মনের বাসনা পূর্ণ হবে যদি তোমরা তোমাদের মায়ের হাড় পৃথিবীতে ছড়িয়ে দাও।‘ এই কথা বলেই স্বর্গীয় দেবদূত হার্মেস অদৃশ্য হয়ে গেলো।
এই কথার অর্থ আমরা প্রথমে বুঝছিলাম না। তবে তোমার উপর আমার আস্থা ছিল যে তুমি এর অর্থ অবশ্যই বের করতে পারবে। অবশেষে তুমিই বললে ‘আমরা টাইটান। ইউরেনাস আমাদের পিতা এবং পৃথিবী মাতা গেইয়া আমাদের মা। পাথর হলো পৃথিবী মাতা গেইয়ার হাড়।‘

তোমার কথা শুনেই হাসিতে উল্লাসিত আমি মাটি থেকে একটি পাথর হাতে নিয়ে দূরে ছুড়ে মারলাম। চোখের পলকে একটি মানবের জন্ম হলো। এরপর তুমি একটি পাথর ছুড়ে মারলে। চোখের পলকে একটি মানবীর জন্ম হলো। আমি যে পাথর  ছুড়লাম সেটি হলো পুরুষ। আর তুমি যে পাথর ছুড়লে সেটি হলো নারী।

এভাবেই আমাদের মনের বাসনা পূর্ণ হলো। পৃথিবী আবার মানুষে মানুষে পরিপূর্ন হয়ে গেলো।
ফিরে ফিরে আসি আমরা জন্ম জন্মান্তরে সাথী হয়ে।

• গ্রীক মিথোলোজী অবলম্বনে।
• পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ কুরআন এবং বাইবেলে বর্ণিত মহাপ্লাবন এবং নুহ নবীর নৌকার সাথে গ্রীক মিথোলোজীর সাদৃশ্য আছে।

৪৭৩জন ১৪৭জন
16 Shares

৫৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য