মূল লেখায় যান

সেই তুমি এই আমি ( ম্যাগাজিন )

জিসান শা ইকরামগল্প৫৩টি মন্তব্য

দেবরাজ জিউস তার সৃষ্টি মানব জাতিকে ধ্বংস করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, কারণ মানব জাতি তাদের মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিয়েছিল। অন্যায় আর পাপাচারের সর্বোচচ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু দেবতাদের মধ্যেও নিয়ম নীতি ছিল বিধায় হঠাৎ করে মানব জাতি ধ্বংস করা যাচ্ছিল না। এর মুলে ছিলেন প্যান্ডোরা। দেবরাজ জিউস প্যান্ডোরার বিয়েতে একটি বাক্স উপহার দিয়েছিলেন, এবং বলে দিয়েছিলেন যে এই বাক্স যেন খোলা না হয়। কিন্তু প্যান্ডোরা কৌতূহল বসত বাক্সটি খুলে ফেললেন, আর এতেই বাক্সে থাকা রোগ-জরা-হিংসা-দ্বেষ-লোভ-মিথ্যা ইত্যাদি সব স্বর্গীয় নীচুতা ছড়িয়ে পরে মানুষের পৃথিবীতে।

সে জনমে তুমি প্যান্ডোরার মেয়ে পিরা ছিলে, আর আমি ডিউক্যালিয়ন। আর এ জনমে আমি জন্ম নিলাম পিরু হয়ে, তুমি জন্ম নিলে……………।  প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক কড়ির গায়ে লেগে থাকা বাংলা অক্ষর তখন ছিল কিনা সে প্রশ্ন অবান্তর। পিরা যে রূপান্তরিত হয়ে পিরু হয়ে গিয়েছে এটি নিশ্চিত হয়েই বলা যায়। কেনই বা আমার পিরু নামটি রাখা হবে? সম্পুর্ন অপ্রচলিত একটি নাম, তার ইতিহাস খুঁজতে হলে গ্রীক পুরাণে যেতেই হবে।

ককেশাস পর্বতে আমার পিতা প্রমেথিউস-এর সঙ্গে দেখা করতে গেলে পিতা এক ভয়ংকর সংবাদ দেন আমাকে, দেবতা জিউস মহাপ্লাবন সৃষ্টি করে মানবজাতি ধ্বংস করে দেবেন। আমি গ্রিসে ফিরে এসে তোমাকে এই সংবাদ দিলে তুমিও প্রথম ভয়ে আতংকে কেঁপে উঠলে। তবে মুহুর্তের মধ্যেই তুমি নিজেকে সামলে নিয়ে আমাকে অভয় বানী দিয়ে আমার হাত ধরে রাখলে। তোমার হাতের স্পর্শ পেয়েই কেমন এক নির্ভরতা পেলাম, আমাদের কিছুই হবে না। তুমি জিজ্ঞেস করলে তোমার পিতা এ থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নিশ্চয়ই বলেছেন, বলো আমাকে। আমি তোমাকে বললাম ‘আমার পিতা আমাকে মহাপ্লাবন থেকে বাঁচার জন্য একটি কিস্তি তৈরী করতে বললেন’।

নির্ভীক তুমি বললে এসো আমরা খুব দ্রুতই একটি বড় কিস্তি বানাই। দুজনেই আমরা একটি কিস্তি বানিয়ে ফেলি। কিস্তি তৈরী শেষ হলে কিস্তিতে গম, মধু আর খাবার পানি তুলে দুজনেই উঠে বসে থাকি কিস্তিতে।
কিস্তিতে ওঠার সাথে সাথেই প্লাবন শুরু হয়ে গেলো, ধীরে ধীরে পানি বাড়তে লাগল। তুমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললে, দেবতা জিউস এমন সিদ্ধান্ত নিলেন কেন? আমি উত্তরে বললাম পৃথিবীতে মানবজাতি পাপে নিমজ্জিত হয়েছে। তুমি আক্ষেপের সুরে বলল, ইস! মা যদি দেবতা জিউস-এর দেওয়া সেই বাক্সটি না খুলত!’ আমি উত্তরে বললাম ‘তোমার মা প্যান্ডোরা দেবতা জিউস-এর ইচ্ছাতেই বাক্সটি খুলেছে।‘ কারনের কারন দেবতারা নিজেরাই তৈরী করে রাখেন।

একটি সময়ে সন্ধ্যা নামে, চারিদিকে থই থই পানি। প্রান্তর নেই, পাহাড় নেই- কেবলই পানি আর পানি। এভাবে এক এক করে ৯ দিন কাটল। এরপর পানি কমতে লাগল। কিস্তি এসে ঠেকল একটি পাহাড়ের গায়ে। যে পাহাড়ের নাম পার্নেসাস পাহাড়। কিস্তিতে থাকতে আমাদের আর ভালো লাগছিল না। পানি কমে গিয়েছে। কিস্তি থেকে দুজনে নামলাম ৯ দিন পরে। চারিদিকে কাদা আর ধ্বংসের চিহ্ন। কাঁদামাখা পাথরের উপর শ্যাওলা জমেছে। সব কিছু কেমন শূন্য শূন্য। কোনো মানুষ, প্রাণী আর বেঁচে নেই।
তুমি একটি উপাসনালয় চিনিয়ে নিয়ে এলে যার নাম দেলফির উপাসনালয়। তোমার পরামর্শেই আমরা দুজনে দেবরাজ জিউসের উপাসনা শুরু করলাম দেলফির উপাসনালয়ে। দেবরাজ জিউস আমাদের এই উপাসনা দেখে সন্তষ্ট হলেন। তিনি স্বর্গীয় দেবদূত হার্মেস কে বললেন, শোনো, হার্মেস। তুমি এখুনি ডিউক্যালিয়ন এবং পিরার কাছে যাও। ওদের মনোবাসনা পূর্ণ কর। স্বর্গীয় দেবদূত হার্মেস বিদ্যুতের গতিতে দেলফির উপাসনালয়ের প্রাঙ্গনে এলেন। দেবদূত কে দেখে আমরা খুবই অবাক হয়েছিলাম।
স্বর্গীয় দেবদূত হার্মেস আমাদের বললেন ‘আমাকে দেখে তোমাদের অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমাকে দেবতা জিউস পাঠিয়েছেন। তোমরা জিউসের আরাধনা করেছে। জিউস এতে ভারি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আমি তোমাদের মনের বাসনা পূর্ণ করবো। বলো কি তোমাদের মনের বাসনা?’
তুমি আমার দিকে একবার তাকালে, এরপর বললে ‘আমরা মানুষ চাই। পৃথিবী ভর্তি মানুষ। পৃথিবী আবার মানুষে- মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে উঠুক। এই আমাদের মনের বাসনা।
স্বর্গীয় দেবদূত হার্মেস বলল ‘তোমাদের মনের বাসনা পূর্ণ হবে যদি তোমরা তোমাদের মায়ের হাড় পৃথিবীতে ছড়িয়ে দাও।‘ এই কথা বলেই স্বর্গীয় দেবদূত হার্মেস অদৃশ্য হয়ে গেলো।
এই কথার অর্থ আমরা প্রথমে বুঝছিলাম না। তবে তোমার উপর আমার আস্থা ছিল যে তুমি এর অর্থ অবশ্যই বের করতে পারবে। অবশেষে তুমিই বললে ‘আমরা টাইটান। ইউরেনাস আমাদের পিতা এবং পৃথিবী মাতা গেইয়া আমাদের মা। পাথর হলো পৃথিবী মাতা গেইয়ার হাড়।‘

তোমার কথা শুনেই হাসিতে উল্লাসিত আমি মাটি থেকে একটি পাথর হাতে নিয়ে দূরে ছুড়ে মারলাম। চোখের পলকে একটি মানবের জন্ম হলো। এরপর তুমি একটি পাথর ছুড়ে মারলে। চোখের পলকে একটি মানবীর জন্ম হলো। আমি যে পাথর  ছুড়লাম সেটি হলো পুরুষ। আর তুমি যে পাথর ছুড়লে সেটি হলো নারী।

এভাবেই আমাদের মনের বাসনা পূর্ণ হলো। পৃথিবী আবার মানুষে মানুষে পরিপূর্ন হয়ে গেলো।
ফিরে ফিরে আসি আমরা জন্ম জন্মান্তরে সাথী হয়ে।

• গ্রীক মিথোলোজী অবলম্বনে।
• পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ কুরআন এবং বাইবেলে বর্ণিত মহাপ্লাবন এবং নুহ নবীর নৌকার সাথে গ্রীক মিথোলোজীর সাদৃশ্য আছে।

মোট পড়েছেনঃ ২১৯১জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

৫৩টি মন্তব্য

      1. লেখক তার নিজের লিখনীতে আত্মতৃপ্ত হতে পারেনি বলেই একেরপর এক অসাধারণ গল্প পাচ্ছি আমরা। আপনি এভাবে অতৃপ্ত থেকেই লিখে লিখে তৃপ্ত হবার চেষ্টা করেন। আমরা প্রতি গল্পের পরেই প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিচ্ছি।

  1. ভাইয়া, আমি না আপনার মনু?
    পোষ্ট দেয়ার আগে অন্তত একবার কইতেন,’মনু মন্তব্য নিয়া শিগ্গির রেডি থাক, পোষ্টি দিতেছি।’
    দেখলেন তো প্রহেলিকা ফার্স্টু হইলো। খেলমু না।

  2. গ্রীক পুরাণের কাহিনি আমাকে বেশ টানে, আমি অবশ্য চরিত্রগুলোর নামগুলো ঠিক মনে রাখতে পারি না। লেখকের সাথে সাথে আমরা পাঠকরাও যে সে কিস্তিতে ৯দিন ধরে ভাসতে থাকবো। সুন্দর একটি দৃশ্য ভেসে উঠলো চোখের সামনে।

    হাতে অনেক কাজ, কিন্তু এখন আবার গ্রীক পুরাণের কাহিনি পড়ার জন্য মন ছুটেছে!

    বেশ ভালোই পরিশ্রম করেছেন গল্পটি লিখতে। ম্যাগাজিন সমৃদ্ধ হলো।

    1. গ্রীক পুরাণ আমাকে টানে খুব,
      কেন জানি মনে হয় আমি পুরানের কোন চরিত্র বারবার জন্ম নিচ্ছি বিভিন্ন ভাবে।
      পুরাণের চরিত্র গুলোকে অত্যন্ত আপন, চেনা মনে হয়।
      হিন্দু পুরাণ, গ্রীক পুরাণ, বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে প্রচুর সাদৃশ্য আছে, যা বলতে মানা।

      কাজ শেষ করুণ, এরপর আবার গ্রীক পুরাণে যান মনি মুক্তো খুঁজতে।
      গত ফেব্রুয়ারীতে শাহাবাগ থেকে গ্রীক পুরাণের বই কিনে ছিলাম কয়েকটি,
      নিজের মত করে গল্পের ছলে লিখতে পারবো আশাকরি।
      কষ্ট তো একটু হয়েছেই।
      এই লেখা মনোনীত হবে!

  3. অসাধারণ লিখলেন ভাই, মুগ্ধ হয়ে পড়ছিলাম, গ্রীক পুরাণ আমার প্রিয় একটি বিষয়, ইটালিতে থাকার সময় পড়তাম ব্রশ, আজ আবার আমাকে সেইদিনে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন, বাহ ভাইজান বাহ। 😍

  4. পূর্ব জনমে নারী হয়ে জন্ম নিয়ে এজন্মে পুরুষ। আপনার অনুভূতি বলুন। আমি পরের জন্মে কী হতে চাই, এই শংকায় ভুগি মাঝে মাঝেই। 🙁
    এই যে মানা করা সত্বেও প্যান্ডোরা বাক্স খুলে ফেললো, তাতে করেই সব ঘৃণা, জরা, লোভ ছড়িয়ে পড়লো, এটাই হচ্ছে আদম- হাওয়াকে মানা করা সত্ত্বেও আপেল খাওয়া, এরপরেই পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হওয়া। মোট কথা, অবাধ্য হওয়া। গ্রীক, পুরাণের এইগুলা মিথ, আর আমাদের গুলা ধর্ম 🙂 বলা মানা বলছিলেন কিন্তু বইলা ফেললাম।
    মিথ নিয়ে আপনি আগেও লিখেছেন, আমার কাছে মনে হয়েছে যেই জিনিসে মানুষের দূর্বার টান, তাতেই তার মনপ্রাণ মিশে যায়। আপনাকে এ লেখাতেই মানায় বেশী।
    ছোট, সুন্দর লেখাটিতে ভালোবাসা রইলো।

    1. নাম ওলট পালট হয়েছে মাত্র,
      ইদানিং পূর্বজন্ম, জন্মান্তর নিয়ে খুবই ভাবছি, কিছু কিছু ঘটনা ভাবাচ্ছে আমাকে খুব।
      ভাইরে অনেক কিছু বলা মানা, তাই বলতে পারিনা। ঐ সময়ে যদি ইন্টারনেট আর গুগল থাকতো, তাহলে আমি নিশ্চিত এমন মিল গ্রীক পুরাণ এবং ধর্মে থাকতো না। সবাই সার্চ করে বলতো- আরে এটা দেখি ওখানে আছে, আপনি নকল করে বা কপি পেস্ট করছেন কেন? 😀

      মিথে আসলেই আমার দুর্বার টান। চরিত্র গুলোর সাথে আমি একদম মিশে যাই,
      আপনাদের অনুপ্রেরণা পেলে অবশ্যই এমন লেখা আরো লিখবো।
      শুভ কামনা।

  5. মিথোলজী আমার ও খুব প্রিয় স্যার * পিরা থেকে পিরু আর ডিউক্যালিয়ান থেকে….. কোথা থেকে কোথায় যে যোগসুত্র টা গিয়ে মিলেছে!!! আপনার এই সব লেখা খুব টানে…..

  6. মিথলজি আমার প্রিয় বিষয়। বার বার টানে এসব লেখা। অবশ্যই লেখাটি প্রিয়তে নিলাম ভাইয়া। সমস্যা একটাই গ্রীক পুররানের নামগুলি আমার মনে থাকেনা।

    লেখাটি পড়ছি আর নিজেকে কল্পনা করছি। আসলে নিষিদ্ধ জিনিসই মানুষে বার বার টানে। আর এটা ঠিক গ্রীক পুরাণের সাথে বিভিন্ন ধর্মের অনেক ঘটনার মিল আছে। বিষয়টি আমিও লক্ষ করেছি।

    ধন্যবাদ এত সুন্দর একটি লেখা উপহার দেবার জন্য। আপনাকে ব্লগে মিস করি ভীষণ। ভালো থাকবেন ভাইয়া।

    1. হ্যা, হিন্দু পুরাণ, গ্রীক পুরাণ এবং ধর্মের মাঝে অনেক মিল আছে,
      এসব নিয়ে প্রশ্ন করা বা লেখাও রিস্কি খুব। তাই কেবল ঘটনা গুলো বলতে চেয়েছি।
      ভবিষ্যতের পোষ্ট গুলোতে নাম সমূহ বাঙালি দেব, তাহলেই মনে থাকবে নাম।

      শুভ কামনা।

  7. দাদা এক জন্মে পুরুষ তো পরের জন্মে নারী? কিংবা এক জন্মে নারী তো পরের জন্মে পুরুষ? এমন কোন নিশ্চয়তা আছে নাকি?
    অনেক দিন পর আপনার লেখা গল্প পড়লাম। 🙂

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।