সম্বোধনে আপনি-তুমি-তুই//

বন্যা লিপি ৩ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার, ০৪:৪০:৫৮অপরাহ্ন বিবিধ ২৪ মন্তব্য

একটু বড় হবার পর থেকেই দেখেছি বা শুনেছি আব্বার চমৎকার বাচিক উচ্চারন। সেই ছোটোবেলা থেকেই দেখতাম আব্বা খুব সুন্দর করে কথা বলেন। আমাদের ভাইবোনদের সাথে তখন তুমি তুমি করে কথা বলতেন। আম্মা মাঝে মাঝে বলতেন তুমি করে। যখন খুব রেগে যেতেন, তখন তুই তোকারি করতেন। ভেবেই নিয়েছিলাম সেই ছোট্ট বয়সে যে “তুই” শব্দ সম্বোধনের জন্য রেগে যেতে হয়। তুই শুধু মাত্র রাগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়া উচিত। এই ধারনা আমার বহুদিন যাবৎ বলবৎ ছিলো। একটু একটু করে বড় হতে হতে সম্বোধনের রহস্য বুঝতে শিখেছি। কিন্তু তারপরও মেনে নিতাম না, অনেকের তুই বলে সম্বোধন করাটা। মেনে নিতাম না, তাহলে কি করতাম? ভীষণ বিরক্ত হতাম মনে মনে।

স্কুলে এক দিদিমনি ছিলেন, তার বর ছিলেন হাই স্কুলের শিক্ষক সুনীল স্যার। স্যারের স্ত্রী প্রাথমিকের মানে আমার দিদিমনি। শুকনা, একহারা গড়ন, খুব ফর্সাটাইপ লম্বাটে মুখ। তাঁর কপালে আর মাঝবরাবর সিঁথিতে, কপালের শুরু থেকে চান্দির মাঝখান পর্যন্ত টকটকে লাল সিঁদুর পড়তেন। ফ্রক পরা ছোট্ট শিশু বয়সে আমাকে তাঁর রুপ সৌন্দর্য মুগ্ধ করতো। ক্লাশের ফাঁকে তিনি কি পড়াতেন কানে যতটুকু না যেত!তারচেয়ে বেশি মুগ্ধতায় চেয়ে থাকতাম তাঁর দিকে। আর অবাক হয়ে ভাবতাম! দিদিমনি এত সুন্দর ! কিন্তু তাঁর গলার স্বর অমন কর্কশ কেন? প্রাথমিক পেরিয়ে তখন ক্লাশ সিক্সে উঠে গিয়ে প্রাইমারী সেকশনের গন্ডি পার হয়ে বিভাজনের ওপারে চলে গিয়েছি। প্রাইমারী আর বয়েজ্ সেকশন আলাদা করেছে প্রমাণ সমান উঁচু দেয়াল। সেদিন একা ফিরতে হচ্ছিলো বাসার পথে, দিদিমনি প্রাইমারী সেকশনের এক ক্লাশরুমের জানালায় কলিগের সঙ্গে দাঁড়িয়ে হয়তো কোনো আলাপ করছিলেন, আমাকে যেতে দেখেই ডাক দিলেন, প্রথমত হকচকিয়ে গেলাম……আমার ধারনা ছিলো সবসময় দিদিমনি বা স্যাররা ছাত্র/ছাত্রী ‘দের একমাত্র অন্যায় টন্যায় না করলে ডাকেন না। এক মুহুর্তে পেছনের সময় হাতরে এলাম। নাহ্ এমন তো কিছু মনে পড়ছেনা! সামনে গিয়ে দেয়াল ঘেঁসে দাঁড়াতেই তিনি উচ্চারন করলেন ” কিরে খিদা বেশি লাগছে? এমন দৌড়াইয়া যাচ্ছিস যে?” পাঠকগন বিশ্বাস করুন! ঠিক ওই মুহুর্তে আমার ইচ্ছা করছিলো ঝেড়ে দৌড় দিয়ে তাঁর সামনে থেকে চলে যাই: বেয়াদবি করা যাবে না। কড়ায় গন্ডায় শিখিয়েছেন আব্বা আম্মা। কোনোদিন বেয়াদবি করা যাবে না কারো সাথে। বেয়াদবির মিনিং চবনপ্রাশের মতো করে বাসায় সবসময় গেলানো হতো। মাথা নিচু করে সব সহ্য করে যেতাম। কিন্তু!! মনে মনে দিদির সৌন্দর্য আমার কাছে ম্লান হতে থাকে। যে দিদিমনি বাচ্চাদের সাথে তুই তোকারি করে সম্বোধন করতে পারেন! তার সৌন্দর্য আমাকে বেশিদিন আকৃষ্ট করতে পারলো না। যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতাম তাঁর সামনে থেকে। এমন ভাবেই বেড়ে উঠছিলাম তুই /তুমির হেফাজতে।

আমার পরিবারে আজো অনেক চাচা,চাচি, দাদি সবার সাথেই তুমি করে সম্বোধন করে চলেন। আমরা একে অন্যের প্রতি আত্মিক সম্পর্কের টান এবং টানাটানির প্রয়োগ করে থাকি সম্বোধনের আধিক্যে।

কোনো আত্মীয়স্বজন বেড়াতে এসেছে, সমবয়সী কেউ আছে আতিসয্যেই হোক আর অহংকারেই হোক তুমি তুমি করে সম্বোধন করছে। মাথায় নিতে পারছিনা, জানতে হবে সে কোন ক্লাশে পড়ে। জানার পরে যখন বুঝি, সে আমার থেকে নিদেন পক্ষে এক ক্লাশ নিচুতে পড়ে। ব্যাস্, হয়ে গেলো তাঁর সাথে আমার আত্মিকতার টানাপোড়েন। আমি তো তোমার বড়, তুমি আমাকে তুমি করে বলছো কেন? আত্মীয় মেয়েটা এমন ভাবে ঠোঁট ওল্টায়!যেন “কি আমার বড় রে!! এরে আবার আপনি করে কওয়া লাগবো!!! মেজাজ তখন থেকেই একটু একটু করে বিগড়াতে লাগতে লাগতে একসময় আমি রাগের ডিপো হয়ে গেলাম।

আমার বড় ফুপুর একটা ননদ আছে, সেও এলো বেড়াতে আমাদের শহরে, সেও মনে করে আমরা সমবয়সী , ওর নাম বিউটি। তুমি তুমি করে নাম ধরে ডাকাডাকি। পছন্দ হচ্ছিলো না। কিন্তু বিউটিকে আমার খুব পছন্দ হচ্ছে তখন। চমৎকার বুদ্ধিদীপ্ত এবং মেধাবী আচরনে আমি আকৃষ্ট বিউটির প্রতি। বইপড়ুয়া। বিভিন্ন বই সম্পর্কে আলোচনা চলে। ভালো লাগে। কিন্তু!….. ওই একজায়গায় গিয়ে বিতৃষ্ণা বাড়ছে। শেষমেষ বলেই ফেললাম ছোটোফুপু +বন্ধু মুক্তিকে, বিউটির তো আমি বড়! ও আমাকে নাম ধরে ডাকছে কেন? খালা ডাকতে কি লজ্জা লাগে? মুক্তি তৎক্ষনাত বিউটিকে বলে দিলো আমার সামনেই। চমৎকার ভাবে মেনে নিলো।বললো, ঠিক আছে, আজ থেকে তোমাকে আমি খালা তুমি বলেই ডাকবো। আশ্চর্যের বিষয় হলো। খালা বলাতে লজ্জাটা আমিই পাচ্ছিলাম তখন।

আপনি/তুমি/তুই এর সংঘর্ষ কাল চলে আসছে আজও।

চলবে–
******************************
বানান ভুলের বিষয়টা ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখবেন সকলে আশা করি।

১৭২জন ১জন
13 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য