বরযাত্রী নদীঘাটে এসে পৌঁছার খবর এসেছে। এই অঞ্চলটির রাস্তাঘাট তেমন উন্নত নয়। নদীপথে চলাচলই স্বাচ্ছন্দ্য,তাই লঞ্চে করে বর যাত্রী এসেছে। নাসিমার বাবা কাদিম আলী মোল্লাসহ অন্যান্য মুরব্বিরা বরযাত্রীদের এগিয়ে আনতে লঞ্চঘাটে গেছে। বরযাত্রী এসে যাওয়ার খবরে ভিতর বাড়িতেও মাহিলাদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। লঞ্চ ঘাট থেকে বরযাত্রীরা আসতে আসতে পনের মিনিটের মতো সময় লাগবে। সাজগোজ যারা সেরে ওঠতে পারেনি তারা হাত চালাচ্ছে দ্রুত। পিউ এরই মধ্যে নাসিমাকে সাজিয়ে নিজেও সেজে নিয়েছে।
উঠোনে বিরাট প্যান্ডেল করা হয়েছে। মৃদুল প্যান্ডেলের ভিতর টেবিলে টেবিলে ঘুরে ঘুরে সব কিছু ঠিকঠাক মত হয়েছে কি-না তদারকীতে ব্যস্ত। তখনই পিউ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে প্যান্ডেলের ভিতর। সারা প্যান্ডেলই ফাঁকা। বরযাত্রী আসার খবর শুনে সবাই দৌড়ে গেছে নদীঘাটের দিকে। এই সুযোগটা কাজে লাগাতেই ছুটে আসে পিউ। মৃদুলের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসে পিউ। হাসে মৃদুলও। পিউ ই বলে-
: কেমন লাগছে?
: কী কেমন লাগছে, বলবে তো!
: কি বোকা। আমাকে ছাড়া এখনে আর কে আছে। আর আমি আমার কথা ছাড়া, অন্য কার কথা এমন করে জিজ্ঞেস করবো !
:ও, তা ই বলো। মৃদুল দুষ্টমী করে আপাদ মস্তক দেখে বলে।
:ভাল।
: শুধুই ভাল।
: না। শুধুই ভাল না। একেবারে পরীর মতো লাগছে।
: পরী কী দেখেছেন কখনো? পরী দেখতে কেমন?
: পরী কখনো দেখিনি। তবে শুনেছি। পরীরা দেখতে অবিকল তোমারই মতো।
: না, আপনি একটু বেশী বাড়িয়ে বলছেন।
: না, মোটেই বাড়িয়ে বলছিনা। তুমি তো এমনিই সুন্দর। তার উপর মেরুন গর্জিয়াস কাথান। অপূর্ব ম্যাকাপ। সব মিলিয়ে হান্ডেড অন হান্ডেড।
সব মেয়েরাই বোধ হয় তার প্রিয় মানুষটির মুখ থেকে নিজের রূপ সৌন্দর্য্যে প্রশংসা শুনতে পছন্দ করে। সেখানে পিউর বেলায়ও ব্যতিক্রম কিছু নয়। মৃদুলের মুখ থেকে এতো প্রশংসা সূচক কথা শুনে লাজুক লতার মতো পিউ কেমন চুপসে যায়। তার চোখমুখ আরো লাল হয়ে ওঠে। মৃদুল তখন পলকহীন চেয়ে থাকে পিউ’র দিকে। কিন্তু পিউ চেয়ে থাকতে পারে না, মৃদুলে চোখের দিকে। তাই সে কৌশলে প্রসঙ্গ পাল্টায়-
: চিঠিটা কী পড়ে দেখেছেন?
: হ্যা, পড়েছি।
: কিছু তো বললে না। পিউ’র কন্ঠে অভিমানের সুর ঝরে।
: বলার তেমন সুযোগই বা পেলাম কোথায়। সকালে তোমরা সবাই যখন ঘুমে বড় মামা নির্দয় ভাবে আমার ঘুম ভেঙ্গে তোলে নিয়ে গেলেন বাজারে। বাজার থেকে ফিরে এসে দেখি তোমরা সবাই সাজুগুজু নিয়ে ব্যস্ত। আর সারা বাড়িতে মেহমানে গিজগিজ করছে। তাও আবার অধিকাংশই হলো আবার মহিলা মেহমান।
কথার মধ্যেই মৃদুলকে থামিয়ে দেয় পিউ-
: থাক। এতো কৈফিয়তের দরকার নেই। পথ খুঁজে পেতে চাইলে, পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয় না। কিন্তু আমিতো আপনাকে দেখার জন্য এতো ব্যস্ততার মধ্যেও বারবার উঁকিজুঁকি মেরেছি। কোথাও তো কারো টিকিটি ও নজরে পড়লো না।
: এত এত মহিলার মাঝে যেতে আমার কেমন কেমন জানি লাগে। মৃদুলের কথা শুনে ভেংচি কাটে পিউ-
: আহারে ! লা– জুক — পুলুস–লে– । যাক এখন কোনো ভণিতা না করে ঝটপট বলে ফেলুন, চিঠি পড়ে কেমন লেগেছে?
: খুব ভাল লেগেছে।
: এতো ভাল লাগার কারণ?
: জীবনে এই প্রথম কোনো রূপসী ললনার সুন্দর হাতের চিঠি পেলাম এ জন্য।
: আর বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলতে হবে না। এম.এ পড়–য়া ছেলে, তার ওপর এমন হ্যান্ডসাম। আর সে কোনো মেয়ের পত্র পাবে না তা কি করে হয়!
: সত্য। একেবারে নিরেট সত্য। এখনে বানিয়ে বলার কিছু নেই। আর আমি নিজেও কাউকে কখনো এভাবে চিন্তাই করিনি। তাই হয়তো ভাগ্যে সিকে ছিড়েনি। আর মেয়েদের প্রতি আমার সীমাহীন নির্লিপ্ততা দেখেই হয়তো কোনো মেয়ে সাহসই করেনি। শেষ পর্যন্ত তুমিই সাহস দেখেলে। মৃদুলের কথা ছোঁ মেরে নিয়ে পিউ বলেÑ
: কী মনে করেন আমাকে? আমি তো আর নাসিমা না যে, মনে মনে লবন মরিচ মেখে কাঁচা কলা খাব। বুঝলেন সাহেব! কখনো কখনো মেয়েদেরকে সাহস দেখোতে হয়। থাক এ সব ফুচুর ফাচুর বাদ দিয়ে এখন আসল কথা বলুন। আমার প্রত্যাশা আর আপনার ইচ্ছার মধ্যে ব্যবধান কতটুকু জানতে পারি কি?
: এখন এই ঝামেলার মধ্যে থাক না, পরে ভেবে চিন্তে বলি।
: আপনি কিন্তু আমাকে বেশ অপমান করছেন মশাই। আমি চিঠিও লিখলাম আগে, আবার আমাকেই আগ বাড়িয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মনের কথা বের করতে হবে কেন? আপনি কী আমাকে অপছন্দ করেন?
: ওভাবে বলছো কেন।
: তো কি ভাবে বলবো। প্রায় ১৮ ঘন্টা হয়ে গেল চিঠি দিলাম। এখনো ওনি ভেবে বলবেন। জানেন… থাক বলবনা।
: বলবেনা কেন বলো। অনেক রোমিও তোমার রূপের আগুনে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চায় তাই না?
: থাক পেটের কথা আর হাতিয়ে বের করতে হবে না।
: আমি তো জানি তুমি যেমন সুন্দরী যে কোনো ছেলে তোমাকে পেতে আকুল হয়ে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু…
কিন্তু কি? কিছুটা ক্ষুব্দ ভঙ্গিতে বলে পিউ।
: এই সবে আমার বিশ্বাস নেই। তা ছাড়া এই নিয়ে আগে থেকে কিছুই ভাবিনি। লেখা পড়া নিয়েই তো কেটে গেল এতটা সময়।
: সব জানি। আপনি অতি ব্রিলিয়ান্ট ষ্টুডেন্ট। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পেয়েছেন। এসএসসি, এইচএসসি ষ্টার মার্কস, অনার্সে ফাষ্ট ক্লাশ সেকেন্ড … আর এগুতে পারে না পিউ। মৃদুল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে-
: তুমি তো দেখছি আমার সব খবরই রাখ।
: এ ছাড়া আরো খবর রাখি। আপনার আর পাগলের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। বইয়ের কালো অক্ষরে ডুবে থেকে থেকে কোন আলোর দিকেই আপনার নজর নেই। মুখ চেপে ভীষন হাসে পিউ। হাসি যেন থামতেই চায়না।
পিউ’র কথা শুনে মৃদুল হো হো করে হেসে ওঠে।
: তুমি আমার এতো খবর রাখ অথচ আমার সামাজিক কোনো কাজ কর্মের খবর রাখনা।
: না, তাও রাখি। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়াতে আপনার জুড়ি নেই। আবার হাসে মৃদুল। হাসি শেষ হতে না গেইটের কাছে বর যাত্রী এসে হাজির। পিউ ছেলেমানুষের মতো দৌড় দেয় গেইটের কাছে। এতক্ষণ পিউর সাথে কথা বলে মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে ওঠেছিল মৃদুলের। সে চলে যাওয়াতে কেমন জানি এক ধরনের পিপাষা তার বুকটায় ডানা ঝাপটায়। পিউকে তো সে ছোট বেলা থেকেই ভালোবাসে। শুধু মুখ খুলে বলা হয়নি এ যা। আজ পিউ যখন নিজেই সংকোচের আবরণ ভেদ করে নিজের কথা খুলে বলেছে। তখন আর কোনো দ্বিধা নেই। ওর সাথেই সারা জীবনের গাটছাড়া বাঁধার কথা ভাবে মৃদুল।
গেটের কাছে ছেলে পেলেদের খুব হইহুল্লোর হচ্ছে। সেই দিকে নজর যায় মৃদুলের। নাসিমার বরকে দেখে মুহুর্তের মধ্যে তার মনে এতক্ষণ মনের ভেতরের বাতাস লাগা পালটা হঠাৎই কেমন এক গুমুট হাওয়ায় ঝুলে পড়ে। এতক্ষণের হাসি হাসি রোমাঞ্চিত চেহারাটা যেন কেমন এক কালে মেঘে ঢেকে যায়। এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কটকটে হলুদ রঙের সেরোয়ানী ও টোপর পড়ে সবার মাঝ খানে একটা খাম্বা দাড়িয়ে আছে। না আছে তার শরীরের শ্রী, না আছে চেহারার শ্রী। মৃদুল মনে মনে মামাদের বকাঝকা করে। নাসিমার মতো এমন একটা সুন্দরী মেয়ের জন্য মামারা কি ধরে এনেছেন। নাসিমার মত মেয়ে এ’কে নিয়ে এক বিছানায় শোবে কি করে।
এ সব ভাবতে ভাবতে নাসিমার জন্য মৃদুলের মনটা অজানা এক বিষাদেভরে ওঠে। ভাবনা ও বিষাদের ফাঁক গলে তার দৃষ্টি গিয়ে ঠেকে আবার গেটে। এতক্ষন তো তার অন্য একটা ভীমের প্রতি তার দৃষ্টিই পড়েনি। নজর পড়বেইবা কি করে। এতক্ষন তো ভীমটা এখানে ছিলই না। পিউ গেটের কাছে যেতেই সেই লোকটা ঠোলাঠেলি করে সামনে এসে দাড়িয়েছে। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে পিউকে দেখে তাদের ইয়ার্কীর মাত্রাটা বেশ বেড়েই গেছে। ঐ ভীমটা মাঝে মাঝে পিউর দিকে এমন ভাবে তাকাচ্ছে যেনো জীবনে সে কোনো সুন্দরী মেয়ে দেখেনি। পারলে সে পিউকে গিলে খায়। [চলবে…]

৩২৪জন ২০৮জন
7 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ