করোনা কালের কাহিনী

নিতাই বাবু ২৮ জুন ২০২০, রবিবার, ০৫:৫১:৩৪অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২৩ মন্তব্য

প্রতিদিনের মতো দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়া সেরে ভাবছি কিছু লিখবো! কিন্তু কী লিখবো ভেবে পাচ্ছিলাম না! তবুও ভাবছি কিছু লিখবো! একাল-সেকাল বর্তমান নিয়ে লিখবো লিখবো ভেবে ওঠার আগে, নিজের অজান্তেই লেখা হয়ে গেলো ‘করোনাভাইরাস’। মোবাইল কীবোর্ডে কীভাবে যে এই ‘করোনাভাইরাস’ লিখে ফেললাম, তা আমি নিজেই জানিনা। ‘করোনাভাইরাস’ হলো বর্তমান সময়ে সারাবিশ্ব কাঁপানো এক নতুন রোগ সংক্রমণ। যার পুরো নাম, সংক্ষেপে কোভিড-১৯। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে স্রষ্টার সুন্দর এই পৃথিবী যখন থরথর করে কাঁপছিল, ঠিক তখন থেকেই নিজের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গও কাঁপতে শুরু করেছিল, এই রোগের ভয়ে। তাই হয়তো আজ মোবাইল কীবোর্ডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের হাতের পাঁচটা আঙুলও ভয়ে ভয়ে হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ করতে করতে ‘করোনাভাইরাস’ লিখে ফেলেছে।

যাইহোক, মোবাইল কীবোর্ডে যখন ‘করোনাভাইরাস’ লেখা হয়েই গেলো, তাহলে ভাবনা এখন ‘করোনাভাইরাস’ নিয়ে কিছু লেখা। করোনাভাইরাস নিয়ে কিছু লিখতে গেলে আগে চোখ পড়ে গণচীনের উপর। এই গণচীন থেকেই করোনাভাইরাসের উৎপত্তি। করোনাভাইরাস যখন গণচীন থেকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো, তখন বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞানীরা খুঁজে বের করলো এর উৎপত্তির কারণ। কারণ হলো, যেকোনো প্রাণী থেকেই করোনাভাইরাস মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে।

কিছু কিছু বিজ্ঞানীদের ধারণা থেকে বলা হয়েছে, গণচীনের উহান সহরের এক বাজার থেকে এই ভাইরাসের উৎপত্তি। সেখানে কিছু সামুদ্রিক প্রাণী থেকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে।

আবার কিছু বিজ্ঞানীরা বলছে, সামুদ্রিক প্রাণী নয়, এটির সৃষ্টি পাখি জাতীয় বাদুড় থেকে।

কেউ কেউ আবার সরাসরি মানবসৃষ্ট জীবানু অস্ত্র বলেও চিল্লাচিল্লি করছে।

কিন্তু কারোর মতের সাথে কারোর মত মিলছে না বলেই এ-বিষয়টি নিয়ে অমীমাংসিত থেকেই যাচ্ছে। তা থাকুক অমীমাংসিত। বর্তমানে আমি নিজেই করোনাভাইরাসের ভয়ে আতংকিত। গণচীনে এই ভাইরাসের আলামত শুরু হবার পর ভয় পেয়েছিলাম না। তখন মনে করেছিলাম যেখান থেকে এই ভাইরাসের আলামত শুরু, সেখানেই হয়তো  শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু না, আমার ধারণা সম্পূর্ণ ভল হয়েছে। শেষাবধি দেখা গেলো এই ভাইরাস গণচীন থেকে ছড়াতে ছড়াতে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে। আক্রান্ত করে ফেলছে বিশ্বের লক্ষলক্ষ মানুষকে। বর্তমানে  এমনও দেখা যাচ্ছে, যাঁরা এই রোগের চিকিৎসা করে মানুষকে সুস্থ রাখবে, বাঁচিয়ে রাখবে তাঁদেরকেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত করে ফেলছে এবং  অনেক দেশে অনেক নামীদামী চিকিৎসক এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণও করছে।

২০১৯ সালের শেষদিকে এই প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস দেখা দেওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসের কথা। তখন মনে হয় এই প্রাণঘাতী ভাইরাস আমাদের দেশে প্রায় আসার পথেই ছিল। আমাদের দেশের সরকারও এই ভাইরাস প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল। সে-সময়ই নিজের সহধর্মিণী হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখনকার সেই অবস্থা যদি বর্তমান সময়ে হতে, তাহলে আমাদের জন্য আরও দশটা ফ্যামিলি তালাবদ্ধ হয়ে থাকতে হতে। সহধর্মিণীর অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, তাঁর শরীরের জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশি কিছুতেই সারাতে পারছিলাম না। এই ডাক্তার, সেই ডাক্তারের কাছে দৌড়াতে দৌড়াতে নিজের চাকরিটাও লটরপটর হয়ে গিয়েছিল।

সহধর্মিণী অসুস্থ হবার প্রথম থেকে শুরু করে প্রায় ১৫ দিন পর্যন্ত সহধর্মিণী শরীরের জ্বর কাশি কিছুতেই দমাতে পারছিলাম না। শেষমেশ সহধর্মিণীর আশা ছেড়ে দিয়ে একমাত্র মেয়েকে ছাড়া সব আত্মীয়স্বজনের কাছে ফোন করে তাঁর আসন্ন মৃত্যু সংবাদ দিতে লাগলাম। আর সামনে থাকা পরিচিতদের কাছে এই বৃত্তান্ত খুলে বলে কাঁদতে লাগলাম। আর গণচীনের নব্য করোনাভাইরাসের কথা মনে মনে ভাবতে লাগলাম। ভাবলাম, মনে হয় গণচীনের ওই প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসই আমার সহধর্মিণীকে আক্রান্ত করে ফেলেছে। এই ভেবে সহধর্মিণীর অগোচরে চোখের জল ফেলতে লাগলাম। অনেকের কাছেই কেঁদে কেঁদে ফোন করেছিলাম, সহধর্মিণীকে এক নজর দেখে যাবার জন্য। কিন্তু তখন নিজের দুই শেলক ঢাকা থাকতেও একবার এসে চুপি দেয়নি। তবুও বারবার আত্মীয় স্বজনের কাছে কেঁদে কেঁদে ফোন করেছিলাম। কিন্তু করোনাভাইরাসের কথা ভেবেই মনে হয় কেউ আসেনি।

আমার সহধর্মিণীর এই অসুস্থতার কথা শুনে, আর চোখের জল দেখে পরিচিত অপু সরকার নামে এক ভদ্রলোক আমাকে নারায়ণগঞ্জ চাষাঢ়া বালুর মাঠ সংলগ্ন এক বিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে সহধর্মিণীকে নিয়ে যেতে বললেন। ওই ভদ্রলোকের কথা শুনে সহধর্মিণীকে ওইদিনই ওই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। ডাক্তার সাহেব রুগী দেখে প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন। সাথে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করতে বললেন। পরীক্ষা করালাম। ঔষধ খাওয়ালাম। ঔষধ সেবনের পর থেকে ধীরে ধীরে সহধর্মিণী সুস্থ হতে লাগলো। এভাবে ঔষধ সেবন করতে করতে ফেব্রুয়ারি মাস গত হতেই, আমার সহধর্মিণী পুরোপুরিভাবে সুস্থ হয়ে গেল। সেই সুস্থই সুস্থ। আজও সুস্থ, কালও সুস্থ। মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায় সে সময়ের সে অবস্থা যেকোনো উপায়ে সেরে উঠেছিলাম।৷

সেই সময়টা নিয়ে এখন ভাবি, সে অবস্থা যদি সে-সময়ে না হয়ে এখন হতো; তাহলে এই সময়ে কোথাও ডাক্তার পেতাম না–সুচিকিৎসাও হতো না–আর আমার সহধর্মিণীকেও বাঁচানো যেতো না। যদিও বর্তমানে ডাক্তার নামের আক্তার সাহেদের পেতাম, তাহলে প্রথমেই তাঁরা বিনা পরীক্ষায় আমার সহধর্মিণীকে করোনা রুগী বলে দেশের যেকোনো আইসোলেশনে ভর্তির পরামর্শ দিতো। সাথে আমাকে এবং আমার পাশের ভাড়াটিয়াদেরও অন্তত ১৪/১৫দিন করে নিজ নিজ বাসায় কোয়ারেন্টাইন-এ থাকার নির্দেশ দিতো। তাঁদের নির্দেশ পেয়ে এলাকায় থাকা জনপ্রতিনিধিরাও আমাদের উপর সজাগ দৃষ্টি রাখতো। যাক, সেই সময়টা হয়তো অতিক্রম করতে পেরেছি ঠিক, কিন্তু এখন ভাবছি বর্তমান সময়ের সামনের  দিনগুলো নিয়ে।

এই করোনাকালে বর্তমান সময়টাও একরকম ভয়ে ভয়েই কাটাতে হচ্ছে। প্রতিদিনই ভয়ে থাকি। বাসায় থাকতেও ভয়! বাসার বাইরে তো আরও ভয়! সবসময়ই আতঙ্কেরগ্রস্ত হয়ে থাকি। কোনও সময় যদি সহধর্মিণী বলে, ‘আমার যেন কেমন কেমন লাগছে!’ তখনই মনের ভেতর করোনা’র করুণ সুর নিজের মনে বাজতে থাকে। সহধর্মিণীর শরীরে হাত দিয়ে দেখতেও ভয় করে। যদি ওটা (করোনাভাইরাস) হয়! তাহলে তো আমি নিজেও আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছি! এই ভেবে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘আসলে তোমার কাছে কেমন লাগছে? শরীরে জ্বর আছে? ঠাণ্ডার ভাব আছে? কাশি হয় কিনা’ ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়ে শরীর স্পর্শ না করে জিজ্ঞেস করি।

আমিও যদি বাইর থেকে বাসায় এসে কোনও সময় বলি, শরীরটা বেশি ভালো লাগছে না। তাহলে সহধর্মিণীর পায়তারা শুরু হয়ে গেলো! কী হয়েছে? কেমন লাগছে? শরীরে জ্বর আছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে থাকে। আসলে কিন্তু কিছুই হয়নি, সময় সময় মনের ভয়ে নিজের শরীরও ভয়ে কেমন যেন হয়ে যায়।

আমি আবার অন্তত ধূমপায়ী ব্যক্তি। প্রতিদিন অন্তত চার প্যাকেট সিগারেট না হলে আমার আর চলে না। তাই মাঝেমধ্যে একটু আধটু কাশি হওয়াটা স্বাভাবিক। অফিসে থাকা অবস্থায় বসদের সামনে একটু হুক্কুও করি, তাহলে আমার সম্মানিত দুই বস আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে, তাঁরা দুইজনই চোখে চোখে কী কী যেন বলে। যদিও আমি তাঁদের চোখের ভাষা নিজ কানে শুনি না, তবুও আমি ঠিকই বুঝতে পারি; তাঁরা আমার কাশিতে করোনাভাইরাসের কথাই বলছে। আবার যদি সময়তে বলি, আমার শরীরটা ভালো লাগছে না, তাহলে তাঁরা প্রথমেই বলে, তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখান। হাসপাতালে যান। বেশি খারাপ লাগলে বাসাই থাকুন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি বুঝতে পারি, তাঁরা তো বলবেই।কারণ এখনকার সময়টাই তো করোনা’র সময়। আতঙ্কের সময়। ভয়ের সময়!

আবার রাস্তাঘাটে চলা-ফেরা করার সময় হঠাৎ যদি দূরসম্পর্কের কারোর সাথে দেখা হয়ে যায়, ভুলবশত হাতে হাত মেলাই; পরক্ষনেই মনের ভেতর দুরুদুরু করোনা’র করুণ সুর বাজতে থাকে। মনে হয় এই বুঝি আমি করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছি। আবার কেউ যদি হঠাৎ করে শরীরের সাথে টার্চ করে, তাহলেও একইরকম অবস্থার সৃষ্টি হয়। মানে করোনা’র ভয়। তাই বর্তমানে কেউ সমাদর করে ডেকে নিয়ে কিছু খাওয়াতে চাইলেও করোনা’র ভয়ে সমাদরকারির সামনেও যেতে মন চায় না, যদি সংক্রমিত হয়ে পড়ি! তাই এসব থেকেও দূরে দূরেই থাকি। অনেক ভয়ে ভয়ে থাকি।

তাই এই করোনা’র ভয়ে বাসায় সবসময় প্যারাসিটামল ট্যাবলেট, গ্যাস্টিকের ট্যাবলেট, সহধর্মিণীর কোমড়ব্যথার ট্যাবলেট হিস্টাসিন ট্যাবলেট মজুদ রাখছি এবং নিয়মিত প্রতিদিন দুই জনেই সেবন করে চলছি। মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায় এখনো ভালো আছি। দুইজনেই সুস্থ আছি। সামনের দিনগুলোতে মহান সৃষ্টিকর্তার উপরই ভরসা রাখি। হয়তো সামনের দিনগুলোও মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায় ভালোভাবেই কাটবে। কিন্তু করোনা কালে আমাদের এমন পরিস্থিতি এই পৃথিবীতে চিরদিন ইতিহাস হয়ে থাকবে।

১৯৪জন ৮৪জন
0 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য