“আমি তোমার জন্য এসেছি -(পর্ব-ত্রিশ)

যদি একবার আরাফ ভাইয়ার সাথে দেখা হতো পা ধরে ক্ষমা চেয়ে নিতাম। জীবনের অনাকাঙ্খিত সকল ভুলের জন্য,ক্ষমা চেয়ে নিতাম। তার ভালোবাসা বুঝতে না পাবার অক্ষমতার জন্য,ক্ষমা চেয়ে নিতাম।

তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় আমার জন্য অপেক্ষা করে নষ্ট করার জন্য…!

প্রিয়া অনার্স,মাস্টাস শেষ করে ভালো একটা সরকারী চাকরি করে নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সমাজে তার একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে চাকরির সুবাদে সবাই তাকে এক নামে চিনে “পাপিয়া জামান প্রিয়া ” সরকারী প্লেট পেয়েছে বাবা মাকে নিয়ে ঢাকায় থাকে।

ভালো ভালো বিয়ের প্রস্তাব আসে কিন্তু প্রিয়া সবাইকে ফিরিয়ে দিয় কেউ তাকে আরাফের মতো ভালোবাসতে পারবে না আজাদ,মিরা অনেক বুঝায় কিন্তু প্রিয়ার সিদ্ধান্তের কোন পরিবর্তন হয় না কয়েক বছর আগে প্রিয়া দাদুমনিকে হারিয়েছে।

প্রিয়া মোবাইলটা হাতে নেয় সেইভ করা প্রথম নাম্বারটা Araf নাম্বারটা ডায়াল করে আজও বন্ধ। একটা দ্বীর্ঘ শ্বাস ফেলে প্রিয়া না জানি এমন কতগুলো দ্বীর্ঘশ্বাসের সাক্ষী আরাফের হৃদয়। ৮ বছর ধরেই প্রতিদিন একবার করে প্রিয়া কল দেয় আরাফের দেওয়া নাম্বারে হয়ত কোন দিন কল রিসিভ হবে জীবনের সব লেনা দেনা মিটিয়ে আরাফের কাছে ক্ষমা চেয়ে মুক্তি পাবে প্রিয়া।

তোমাকে আসতেই হবে আরাফ আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে তুমি না আসলে হবে না। স্যার এই মুহূত্বে দেশে আসা সম্ভব না কয়েক মাস পরে সব ছেড়ে দেশে চলে যাব তাই সব গুছিয়ে নিচ্ছি। আমি তোমার কোন কথা শোনতে চাই না এই নাও তোমার আন্টির সাথে কথা বলো।

জ্বী, আন্টি আসসালামু আলাইকুম।

ওয়া আলাইকুম সালাম বাবা।

কেমন আছো.?

ভালো,আপনি.?

ভালো।

আরাফ তোমাকে আসতেই হবে না আসলে রোহান খুব কষ্ট পাবে।

আরাফ কিছুক্ষন চুপ করে রইল,রোহানের বাবা আব্বুর ছোটবেলার বন্ধু ওনার একমাত্র ছেলের বিয়ে যাওয়াটা দরকার। কিন্তু আন্টি আমার কিছু ব্যক্তিগত সমস্যা আছে সে গুলো শেষ না করে আসবো কি করে।

তারপরও আমি চেষ্টা করে দেখি কি করা যায়, আফিস ব্যবসা সবটা ম্যানেস করতে পারলে ইনশাল্লাহ্ এমাসেই বাংলাদেশে ফিরল।

আচ্চা বাবা অপেক্ষায় রইলাম।

ওকে আন্টি রাখলাম তাহলে।

রাতে বাসায় আরাফ তার বড় বোন আরিফাকে সবটা জানায়, মাস খানেক পরে না এ মাসেই দেশে ফিরবে রোহানের বিয়েতে যাবে।

আরিফা কিছুটা মন খারাপ করে গত ৬ বছর ধরে আরাফ বোনের সাথেই জাপান থাকে।

সুখে, দুুঃখে বিদেশের মাটিতে আপন বলতে এই ভাইটাই।

কষ্ট হলেও দেশে মা, ভাই সবাই আছে, আরাফ তাদের কাছেই ভালো থাকবে।

দেশে আসার জন্য টিকেটের ব্যাপারে রাহাতকে জানায়, রাহাত বলে সব রেডি হয়ে যাবে। তুই দেশে ফেরার আগের দিন আমাকে কল দিস,আমি তোর বাসায় পৌচ্ছে দিন।

মামার ফোন কি ব্যাপার নিশ্চয় কোন কারন আছে! হাতের ফাইলটা টেবিলে রেখে প্রিয়া মোবাইলটা রিসিভ করে হ্যালো মা -কেমন আছো.?

-আরে মামী ভালো আছি

-আপনারা সবাই কেমন আছেন.?

-খুব ভালো আছি রে মা।

-মিরা আপা,আজাদ ভাই ওনারা কেমন আছেন.?

-জ্বী মামী আব্বু,আম্মু ভালো আছেন।

 

-শোন হঠাৎ করেই মিতুর বিয়েটা ঠিক হয়ে গেল। ছেলেদের ঢাকায় নিজস্ব ব্যবসা আছে।

-ভালো তো।

-বিয়ে কবে.?

-২৪শে জুন ২০১৯ইং প্রিয়া ক্যালেন্ডারে চোখ বুলিয়ে দেয়, দেখে আরো ২০দিন বাকি।

-মিরা আপা,আজাদ ভাইকে অবশ্যই সাথে নিয়ে আসবে।

-কথা দিতে পারছি না মামী। আব্বুর শরীরটা ভালো না বয়স হয়েছে তো লং জার্নি করতে পারে না।

-ওহ্ তাহলে তো দুলাভাইকে রেখে আপাও আসবে না,তাহলে তুমি একাই এসো।

-জ্বী, মামী।

-নেও তোমার মামা সাথে কথা বলো।

-মামা আসসালামু আলাইকুম।

-ওয়া আলাইকুম সালাম।

তোমার মামীর কাছে তো সব শোনলে, তোমরা সরকারের চাকরি করো আগেই জানালাম যাতে ছুটি নিয়ে আসতে রাখতে পাব।

-খুব ভালো কাজ করছেন মামা, আমি অবশ্যই আসবো।

-মিতু একটু কথা বলতে চায়।

-অবশ্যই! মিতুকে দেন।

-বড় আপ্পি! বলেই কথা শুরু প্রিয়াকে কিছু বলার সুযোগ দিল না মিতু একাই বলে চললো। ছেলে দেখা থেকে শুরু করে বিয়ের তারিখ ঠিক হওয়ার পর্যন্ত সবকিছু।

-সব শুনে প্রিয়া হাসলো, পাগলি মেয়ে একটা প্রিয়া হঠাৎ করে তার অতীত স্মৃতিতে হারিয়ে গেল।

মনে পড়ে গেল আকরাম আঙ্কেল, মনোয়ারা আন্টি খুব চেয়েছিলেন প্রিয়াকে আরাফের সাথে বিয়ে দিতে।

কিন্তু প্রিয়া অবুঝ ছিলো বলে বিয়েটা হয়নি, আজ প্রিয়া বুঝতে শিখেছে কিন্তু আরাফের সাথে যোগাযোগ নেই।

-বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে মেয়ের দু-জনের পছন্দ হওয়াটা জরুরী।

-আচ্চা মিতু ছেলে তোর পছন্দ হয়েছে.?

– হ্যাঁ আপ্পি,খুব পছন্দ হয়েছে সেও আমাকে পছন্দ করেছে।

-ভেরি গুড, দোয়া রইল সুখি হও।

-প্রিয়া আপ্পি বিয়ের দু’দিন আগেই তুমি আসবে।

-আচ্ছা আসবো।

-ফুপি,ফুপাকে আমার সালাম দিও।

-আচ্চা দিব, আমি তাহলে এখন রাখি.?

-আচ্ছা রাখো।

আল্লাহ্ হাফেজ।

রোহানদের বাড়িতে চলছে বিয়ের উৎসব যদিও এখনো বিয়ের ১০ দিন বাকি। সিফাত সাহেবের একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা আত্মীয় স্বজনরা ১০ দিন আগে থেকেই আসতে

শুরু করছে।

সিফাত সাহেব বিয়ে উপলক্ষে আত্মীয় স্বজনদের সবাইকে বর যাত্রী যাবার জন্য একই ডিজাইনের পাঞ্জাবী,আর মহিলাদের শাড়ি দিয়েছেন।

রোহানের জন্য সেরওয়ানীর অর্ডার দেওয়া হয়েছে, বিয়ের দু-দিন আগে দিবে।

মিতুর জন্যও রোহানের বড় মামা ইন্ডিয়া থেকে বিয়ের শাড়ি,আর রোহানের জন্য পাঞ্জাবী আনিয়েছেন বউভাতের দিনে পড়ার জন্য।

প্রতিটা মা চায় তার সন্তানকে ভালো পরিবারে বিয়ে দিতে সুখি দেখতে।,মিরার এইটুকু চাওয়া অযুক্তিক কিছু না। প্রিয়া ভালো একটা চাকরি করে সেই সুবাদে ভালো ভালো বিয়ের ঘর আসে কিন্তু প্রিয়া মত দেয় না। আজাদ বার বার বলে মেয়ের যুক্তির কাছে হার মেনেছে হয়ত বিধাতা চাইলে বিয়েটা হবে।

মিতুদের বাড়িতে বিয়ে বাড়ি মনে হচ্ছে,শেখর সাহেবের একমাত্র মেয়ের বিয়ে কথা বলে কথা।

বেগম শেখর সারাদিন কানে ফোনটা লাগিয়ে রাখেন, পরিচিত আত্মীয়দের দাওয়াত দেন।

জিসান তার বন্ধুদের লিস্ট করেছে স্কুল,কলেজ, ইউনিভার্সিটি,কর্মজীবন সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ জনকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।

আম্মু এই নাও আমার বান্ধুদের লিস্ট শেখর সাহেব একটু রসিক মানুষ অবাক হয়ে বললেন। আল্লাহ্ বাঁচিয়েছেন যদি ৪ টা সন্তান থাকতো তাহলে আমি ফকির হয়ে যেতাম ছেলে মেয়েদের বিয়েতে দাওয়াতের মানুষের খরচ মেটাতে হা হা হা হা।

মিতু আদুরে সুরে বললো তাহলে আমি বিয়ে  করবো না।ওরে আমার রাজকন্যা যে রাগ করে ফেলছে।শেখর সাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন না রে মা, আমি তো মজা করছি। মিতুর মা নাও এখনি মিতুর ১২ জন বন্ধু,বান্ধবীর ফোন নাম্বার দেওয়া আছে দাওয়াত দেও।

ওদের বাবা মা সহ আসতে বলবে! বেগম শেখর লিস্ট নিয়ে একে একে দাওয়াত পর্ব শেষ করলেন।

জিসানের শ্বশুড়বাড়ী থেকে মা,বাবা,বোন আসছে।

বাড়িতে মেহমান এসে ভর্তি  হইছে হুই হুল্লু-রে বিয়ে বাড়ি মনে হচ্ছে, মিতু অপেক্ষায় আছে প্রিয়া কবে আসবে।

হঠাৎ মিতুর মোবাইলের রিং বেজে উঠল, রোহান মিতুকে কল দেয় রিসিভ করার সাহস পাচ্ছে না.. মিতুর ভাবি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে।

মিতুকে ডেকে নিয়ে যায়, মিতু সময় নষ্ট না করে হ্যালো বলে সালাম দিয়ে জিসানের রুমে চলে যায়।

দুজনেই জমিয়ে গল্প শুরু করে বিয়েতে কি কি কেনা হয়েছে,আর কি কি কেনা দরকার তাই নিয়ে গল্প করে।

নানা রঙের সুতোয় মনের মাধুরী মিশিয়ে মিরা হাতে নকশি কাঁথা সেলাই করছে। প্রিয়ার বিয়ের পরে দিবে বলে এরকম আরো কয়েকটা কাঁথা সেলাই করে জমিয়ে রেখেছে।

আজাদ বিছানার পাশেই সোফায় বসে টিভি দেখছে আজকাল টেলিভিশন দেখেও আনন্দ নেই। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে টিভি চ্যানেল বিনোদনের মাধ্যমে বিভিন্ন ভাবে সাজাচ্ছে।

বয়স হয়েছে তো তাই মন কি চায় আজাদ নিজেই বুঝতে পারে না।

৫০-৬০ উর্ধে মানুষেরা এই বয়সে নামাজ,তাসবীহ্, নাতি,নাতনি নিয়ে আনন্দ ফুর্তি করে,গল্প করে আমার সময় কাটে টিভি দেখে, ঘুমিয়ে। আমার সেই কপাল নেই বলেই মনে মনে আক্ষেপ করলো আজাদ চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে কয়েক বছর হলো।

মিরা অনেকক্ষন ধরে চুপচাপ সেলাই কর্ম করেই যাচ্ছে আপন মনে…!

…..চলবে।

১৭০জন ৩১জন
0 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য