স্বাধীনতা সংগ্রামী মণীষা-৭ : তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া

[মণিষীরা বলেছেন “যে জাতি তার বীর সন্তানদের মূল্য দিতে পারে না সে জাতির কোনোদিন বীর সন্তান জন্ম নিতে পারে না।” আমরা আমাদের বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাধীনতা সংগ্রামী আত্মদানকারী মণিষাদের সম্মন্ধে কত টুকুই বা জানি। যারা প্রবীণ তারা হয়তো কিছু কিছু জানে, কিন্তু আমাদের নবীন প্রজন্ম সেসব মণিষাদের সম্মন্ধে তেমন কিছুই জানে না।তাই সব শ্রেণির পাঠকদের জন্য উল্লেখযোগ্য কয়েকজন মণিষার জীবনী নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস।]

-মাহবুবুল আলম 

গণতন্ত্রের মানষপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দুই শিষ্য ছিলেন। এঁদের একজন ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁকে বলা হতো অসি, অর্থ্যাৎ সোহরাওয়ার্দীর অসি। আর অন্যজন ছিলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তাঁকে বলা হতো সোহরাওয়ার্দীর মসি কলম, যিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে রাজনীতিক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কলমযোদ্ধা ছিলেন। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তাঁর পেশাদারী জীবন ও কর্ম দিয়ে রাজনীতি ও সাংবাদিকতার একটি সেতুবন্ধন তৈরি করেন। আর এভাবেই তিনি একদিন এদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একজন অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হন জাতীয় সংগ্রামসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রেরণাস্থল হয়ে ওঠেন। যে আদর্শের জন্য তিনি বাংলার মুক্তির আন্দোলন সংগ্রাম করেছিলেন কিন্তু মৃত্যুর কাছে হার মেনে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ দেখে যেতে পারেননি। দেখে যেতে পারেননি কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শের স্বাধীন বাংলাদেশ মুখ। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়ে লিখতে গেলে অবশ্য অবশ্যই তফাজ্জাল হোসেন মানিক মিয়ার নাম তালিকার অন্যতমদের নামের পাশে বসাতেই হবে। সঙ্গত কারণেই এখন আমি স্বাধীনতা সংগ্রামের এ কলমসৈনিক তফাজ্জল হোসন মানিক মিয়ার জীবন ও কর্মেও ওপর কিছুটা আলোকপাত করতে চাই।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জন্ম ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলা জেলার ভান্ডারিয়া গ্রামে। তাঁর বাবার নোম মুসলেম উদ্দিন মিয়া। শৈশবেই মানিক মিয়ার মা মারা যান। গ্রামের পূর্ব ভান্ডারিয়া মডেল প্রাইমারি স্কুলে মানিক মিয়ার শিক্ষা জীবনের শুরু। সেখানে কিছুদিন পড়ার পর তিনি ভর্তি হন ভেন্ডারিয়া হাই স্কুলে। স্কুল জীবন থেকেই তাঁর মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। তখন থেকেই তিনি ছিলেন সহচর-সহপাঠীদের কাছে ক্ষুদে নেতা। ভান্ডারিয়া স্কুলে মানিক মিয়া অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তারপর চলে যান পিরোজপুর জেলা সরকারী হাই স্কুলে। সেখান থেকেই তিনি কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৩৫ সালে মানিক মিয়া ডিস্টিংশন সহ বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন।

পড়াশোনা শেষ করে তিনি পিরোজপুর জেলাসিভিল কোর্টে চাকরি শুরু করেন। চাকরি করার সময় তিনি একবার বরিশাল জেলা তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দীর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। কোর্টের চাকুরীকালীন সময়ে জনৈক মুন্সেফ একদিন তাঁর সাথে খারাপ আচরণ করেন। এই অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করে চাকুরি ছেড়ে দেন। এ চাকুরী ছেড়ে দিয়ে তিনি যোগ দেন করেন তদানীন্তন বাংলা সরকারের জনসংযোগ বিভাগে বরিশাল জেলার সংযোগ অফিসার হিসেবে। সে চাকুরী ছেড়ে দেয়ার পর তিনি কলকাতার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অফিস সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। রাজনৈতিক প্রচারকে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে একটি প্রচারপত্রের প্রয়োজন ছিলো এবং সেই চিন্তা থেকেই মানিক মিয়ার উদ্যোগে ১৯৪৬ সালে আবুল মনসুর আহমেদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’-এর পরিচালনা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। এ পত্রিকার সাথে মানিক মিয়া মাত্র দেড় বছরের মতো যুক্ত ছিলেন। এই পত্রিকার মাধ্যমেই তাঁর গণমাধ্যম জগতের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে। দেশ বিভাগের পর থেকে পত্রিকাটি ঢাকায় নিয়ে আসার অনেক চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু তিনবার পত্রিকাটিকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশে বাধা দেয়া হয় এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বার বার এভাবে পাকিস্তানি সরকার কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ। মানিক মিয়াও তখন ঢাকায় চলে আসেন।

১৯৪৮ সালেই পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নামে। এই ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই বাঙালির পাকিস্তান মোহ কিছুটা কাটতে থাকে। ১৯৪৯ সালে মুসলীম লীগেরবিরোধী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়। একই বছরে এই রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হিসেবে আবির্ভাব ঘটে সাপ্তাহিক দৈনিক ইত্তেফাক-এর। আবদুল হামিদ খান ভাসানী পত্রিকাটির আনুষ্ঠানিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৫১ সালের ১৪ আগস্ট থেকে মানিক মিয়া এই পত্রিকার পূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক দৈনিক ইত্তেফাকে রূপান্তরিত হয়। এ সময়েই দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯৫৯ সালে তিনি এক বছর জেল খাটেন।আমরা সবাই জানি যে, ১৯৪৯ ঢাকায় মুসলিম লীগের বিরোধী শক্তি হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। একই সালে পাকিস্তানি শাসকদের মুখপত্রের বিরোধী মুখপত্র হিসেবে ইত্তেফাকের জন্ম। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের রূপকার বাংলার ছাত্র-জনতা, আর ভাষা আন্দোলন হতে উৎসারিত জাতীয়তাবাদের মুখপত্র হিসেবে লড়াই করতে থাকে ইত্তেফাক। ৫৪-এর সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার প্রচার করে এবং যুক্তফ্রন্টের মৌলিক দাবিগুলোকে গণমুখী করে ইত্তেফাক। মূলত যুক্তফ্রন্টের ইশতেহারকে নিয়ে পশ্চিমা শাসনের একটি বিরোধী শক্তির আবির্ভাবের জন্য ব্যাপক জনমত তেরি করে ইত্তেফাক, যা পশ্চিমাদের পরাজয়কে অনিবার্য করে তোলে। ৫৮-এর আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনে মানিক মিয়ার ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক আন্দোলন তৈরি করে। ৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ছয় দফার সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন মানিক মিয়া এবং মানিক মিয়ার ইত্তেফাক বাঙালির জাতীয় মুক্তির সনদ এই ছয় দফার সবচেয়ে বড় প্রচারপত্র হিসেবে মূখ্য ভূমিকা পালন করে  ছিল। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে পশ্চিমা শাসকদের রাজনৈতিক পরাজয়ের সাথে সাথে নৈতিকতারও চরম বিপর্য ঘটে, এখানেও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় আবর্তনের মধ্যে মানিক মিয়া ছিলেন। ১৯৬৩ সালে তিনি আবার গ্রেফতার হন। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা নিষিদ্ধ এবং নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়। এর ফলে তার প্রতিষ্ঠিত অন্য দুটি পত্রিকা ঢাকা টাইমস ও পূর্বাণী বন্ধ হয় যায়। ১৯৬৩ সালে তিনি আন্তর্জাতিক প্রেস ইন্সটিটিউটের পাকিস্তান শাখার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরে সৃষ্ট দাঙ্গা ঢাকায় ছড়িয়ে পড়লে তা প্রতিরোধে স্থাপিত দাঙ্গাপ্রতিরোধ কমিটির প্রথম সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।ফলে ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি আবার প্রকাশিত হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি ইত্তেফাকের রাজনৈতিক হালচাল ও পরবর্তী সময়ে মঞ্চে নেপথ্যে কলামে মোসাফির ছদ্মনামে নিয়মিত উপসম্পাদকীয় লিখতেন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর একটা সময় এসে মানিক মিয়া কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাঁর শরীর ভেঙ্গে পড়ে। এ অবস্থায় ১৯৬৯ সালে ২৬ মে এই ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়েই তিনি প্রাতিষ্ঠানিক কাজে রাওয়ালপিন্ডি যান। সেখানেই ১৯৬৯ সালের ১ জুন রাতে তিনি মারা যান। তাঁ মৃত্যুও মাধ্যমে এক অকুতোভয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান হয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বেঁচে ছিলেন না, কিন্তু তাঁর বেঁচে থাকা আদর্শ স্বাধীনতাকামী মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা প্রথমেই আঘাত করে মানিক মিয়ার আদর্শের ও প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান ইত্তেফাক অফিসে। কারণ ইত্তেফাকই বাংলার মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছে আন্দোলন করতে, অধিকার আদায় করতে, স্বাধীনতাকামী হতে। রাজনীতির মাঠে তারা গরম বক্তব্য দেননি কিংবা আন্দোলনের হাত উঁচু করা নেতাও তার ছিলেন না, কিন্তু তাদের আদর্শিক সত্তা ও লেখনী ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবের জন্ম দেয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর মানিক মিয়াকে দলের হাল ধরতে অনুরোধ করা হলে তিনি তা নিতে অস্বীকৃতি জানান জানিয়ে বলেছিলেন, আমি ‘এভাবেই’ মানুষের সেবা করতে চাই। রাজনীতির সম্মুখ না এসে বরং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম পরিচালনা করেছে, একটি পত্রিকাকে সাথে নিয়ে সেই সংগ্রামের এক যুগপৎ ধারা সৃষ্টি করেছেন বঙ্গবন্ধুর ‘মানিক ভাই’। রাজনীতির মাঠে এসে আন্দোলনের আঙুল উঁচু করেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আর অধিকার আদায়ের মাঠে কলম কলামযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করে গেছেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া।

[সিরিজের শেষে তথ্যসূত্র দেয়া আছে]

 

১১০জন ১জন
0 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য