স্বাধীনতা সংগ্রামী মণীষা-৪ :  হোসেন শহীদ সোহরোওয়ার্দী

(জন্ম: সেপ্টেম্বর ৮, ১৮৯২-মৃত্যু: ডিসেম্বর ৫ ১৯৬৩)

[মণিষীরা বলেছেন “যে জাতি তার বীর সন্তানদের মূল্য দিতে পারে না সে জাতির কোনোদিন বীর সন্তান জন্ম নিতে পারে না।” আমরা আমাদের বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাধীনতা সংগ্রামী আত্মদানকারী মণিষাদের সম্মন্ধে কত টুকুই বা জানি। যারা প্রবীণ তারা হয়তো কিছু কিছু জানে, কিন্তু আমাদের নবীন প্রজন্ম সেসব মণিষাদের সম্মন্ধে তেমন কিছুই জানে না।তাই সব শ্রেণির পাঠকদের জন্য উল্লেখযোগ্য কয়েকজন মণিষার জীবনী নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস।]

-মাহবুবুল আলম //

হোসেন শহীদ সোহরোওয়ার্দী  বিখ্যাত বাঙ্গালী রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী ছিলেন। যুক্তফ্রন্ট গঠনের মূলনেতাদের মধ্যে অন্যতম। গণতান্ত্রিক রীতি ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তাই দেশের মানুষ সুধী সমাজ তাঁকে ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ উপাধিতে  ভূষিত করেছিলেন।তিন বলেছেন- ‘আমার একমাত্র ভরসা হল গণতন্ত্র আর গণতান্ত্রিক দল। অর্থাৎ আমার দেশের দরিদ্র জনগণ, তাঁরাই আমার একমাত্র ভরসা। কারণ তাঁদের কল্যাণই আমার লক্ষ্য। এই শাসন ব্যাবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে আমি সচেতন। গণতন্ত্র মানুষেরই সৃষ্টি, এরও অনেক দ্যূতি আছে। কিন্তু মোটের উপর গণতন্ত্রই হচ্ছে প্রগতি ও বিবর্তনের একমাত্র নিশ্চিত পথ।…কোনো ব্যক্তির খেয়ালের উপর নয় বরং জনগণের ইচ্ছাই সরকারী নীতির ভিত্তি হবে।…গণতন্ত্রকে স্বতঃসিদ্ধরূপে গ্রহণ করতে হবে। নির্ভুল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র কখনো ব্যর্থ হতে পারে না’। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আজীবন গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নির্মাণে আন্দোলন-সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, গণতন্ত্র নির্মাণ করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিকবোধ ও সংস্কৃতি নির্মাণ করা। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই যে, রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে বসে তিনি তাঁর আদর্শ অর্থাৎ গণতন্ত্র বিনির্মাণে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। তিনি যে আদর্শ ও দর্শন বিশ্বাস করতেন, ধারণ করতেন তা-ই বাস্তবায়ন করার জন্য ব্যাকুল থাকতেন।হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ব্যক্তিগত জীবনাচরণ বিশ্লেষণ করলে আমরা  দেখতে পাই ত্যাগ ও দেশপ্রেম মহিমায় মানুষের মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার এক মহান ব্যক্তিত্ব হলেন তিনি। এই উপমহাদেশের গণতন্ত্রকে বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বুঝতে গেলে আমাদেরকে বার বার ফিরে যেতে হয় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে। গণতন্ত্রের স্বরূপ উম্মোচনে আমরা তাঁরই দ্বারস্থ হই। যে কারণে তাঁকে গণতন্ত্রের মানসপুত্র বলা হয়।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর জন্ম ১৮৯২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মেদেনীপুর জেলার এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে। এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হযরত শেখ শাহাবদ্দীন ওমর বিন মোহাম্মদ-উম-সোহরাওয়ার্দী। তিনি বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানীর প্রধান শিষ্য ছিলেন। মোঘল আমলে এই পরিবার বাগদাদ থেকে ভারতের মেদেনিপুর জেলায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সোহরাওয়ার্দীর বাবা জাহিদুর রহিম সোহরাওয়ার্দী, মা খুজিস্তা আখতার বানু। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার পরিবারের সদস্যবর্গ তৎকালীন ভারতবর্ষের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের নিয়ম অনুসারে উর্দু ভাষা ব্যবহার করতেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দি নিজ উদ্যোগে বাংলা ভাষা শিখেন এবং বাংলার চর্চা করেন। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরু করার পর যোগ দেন সেইন্ট জ্যাভিয়ার্স কলেজে। সেখান থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি তার মায়ের অনুরোধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে আরবি ভাষা এবং সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯১৩ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। এছাড়া এখানে তিনি আইন বিষয়েও পড়াশোনা করেন এবং বিসিএল ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯১৮ সালে গ্রে’স ইন হতে বার-এট-ল ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯২০ সালে তিনি বেগম নেয়াজ ফাতেমাকে বিয়ে করেন। বেগম নেয়াজ ফাতেমা ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আবদুর রহিমের কন্যা। ১৯২১ সালে কলকাতায় ফিরে এসে আইন পেশায় নিয়োজিত হন।কিন্তু বিয়ের ৩ বছর পর তাঁর সহধর্মিনী মারা যায়।১৯২৩ এর বেঙ্গল প্যাক্ট স্বাক্ষরে তার যথেষ্ঠ ভূমিকা ছিল। ১৯২৪ সালে তিনি কলকাতা পৌরসভার ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন। মেয়র ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস। ১৯২৭ সালে সোহরাওয়ার্দী পদত্যাগ করেন। ১৯২৮ সালে সর্বভারতীয় খিলাফত সম্মেলন এবং সর্বভারতীয় মুসলিম সম্মেলন অনুষ্ঠানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুসলমানদের মধ্যে তার ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত মুসলিম লীগের সাথে তিনি জড়িত হননি। ১৯৩৬ সালের শুরুর দিকে তিনি ইন্ডিপেন্ড্যান্ট মুসলিম পার্টি নামক দল গঠন করেন। ১৯৩৬ এর শেষের দিকে এই দলটি বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাথে একীভূত হয়ে যায়। এই সুবাদে তিনি বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগ তথা বিপিএমএল এর সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। ১৯৪০ সালে তিনি এক রাশিয়ান মেয়েকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে দুটি সন্তান জন্মে ছিল। মেয়ে আখতার সোহরাওয়ার্দী, ছেলে রাশেদ সোহরাওয়ার্দী। শেষ পর্যন্ত তাঁর দ্বিতীয় সহধর্মিনীর সাথেও তাঁর সম্পর্ক থাকেনি।

চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ পার্টিতে যোগ দানের মাধ্যমে হোসন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। স্বরাজ পার্টি তখন মূলত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরে একটি গ্রুপ ছিল। ১৯৪৩ সালের শেষ দিক পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। ১৯৪৩ সালে শ্যামা-হক মন্ত্রীসভার পদত্যাগের পরে গঠিত খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রীসভায় তিনি একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রীসভায় তিনি শ্রমমন্ত্রী, পৌর সরবরাহ মন্ত্রী ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৬ এর নির্বাচনে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের বিপুল বিজয়ে তিনি এবং আবুল হাশিম মূল কৃতিত্বের দাবীদার ছিলেন। ১৯৪৬ সালে বাংলার মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি ব্যাপক সমর্থন পান। পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে ১৯৪৬ সালে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি তার সমর্থন এবং সহযোগিতা প্রদান করেন। স্বাধীন ভারতবর্ষের ব্যাপারে কেবিনেট মিশন প্ল্যানের বিরুদ্ধে জিন্নাহ ১৯৪৬ সালের আগস্ট ১৬ তারিখে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের ডাক দেন। বাংলায় সোহরাওয়ার্দীর প্ররোচনায় এই দিন সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়। মুসলমানদের জন্য আলাদা বাসভূমি পাকিস্তানের দাবীতে এই দিন মুসলমানরা বিক্ষোভ করলে কলকাতায় ব্যাপক হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বেঁধে যায়। পূর্ব বাংলার নোয়াখালিতে এইদিন বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ চলে। সোওহরাওয়ার্দী এসময় তার নীরব ভূমিকার জন্য হিন্দুদের নিকট ব্যাপক সমালোচিত হন। তার উদ্যোগে ১৯৪৬ সালে দিল্লী সম্মেলনে মুসলিম লীগের আইন প্রণেতাদের নিকট লাহোর প্রস্তাবের একটি বিতর্কিত সংশোধনী পেশ করা হয়। এই সংশোধনীতে অখন্ড স্বাধীন বাংলার প্রস্তাবনা ছিল। কিন্তু কলকাতায় হিন্দু মুসলমান দাঙ্গায় তার বিতর্কিত ভূমিকার কারণে হিন্দুদের নিকট তার গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। ফলে শরৎচন্দ্র বসু ছাড়া কংগ্রেসের আর কোন নেতা তার অর্থাত- বাংলার ধারণার সাথে একমত ছিলেন না।

১৯৪৭ সালে তিনি বাংলার মূখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যান। তবে পদত্যাগের পর তিনি সাথে সাথে পাকিস্তান না গিয়ে কলকাতায় থেকে যান। এসময় কলকাতার মুসলমানদের সাথে হিন্দুদের পুণরায় বিরোধের সম্ভাবনায় তিনি মহাত্মা গান্ধীর সাহায্য চান। মহাত্মা গান্ধী এসময় যৌথ ভূমিকার শর্তে সোহরাওয়ার্দীর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা প্রশমনের ডাকে সাড়া দেন। উল্লেখ্য যে সোহরাওয়ার্র্দী ৪৭ এর দেশভাগের সাথে সাথে পাকিস্তানে চলে যাননি।

১৯৪৭ এর আগস্টে পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরে মুসলিম লীগের রক্ষনশীল নেতারা খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে শক্তিশালী হয়ে উঠেন। এর আগে ১৯৪৭ সালের আগস্ট ৫ এ খাজা নাজিমুদ্দিন জিন্নাহর পরোক্ষ সমর্থনে মুসলিম লীগের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। এরপর থেকে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতারা কোনঠাসা হয়ে পড়েন। খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ববাংলার মূখ্যমন্ত্রী হবার পর বেশ কয়েকবার সোহরাওয়ার্দীকে “ভারতীয় এজেন্ট” এবং “পাকিস্তানের শত্রু” হিসেবে অভিহিত করেন। সোহরাওয়ার্দীকে পাকিস্তানের আইনসভার সদস্য পদ থেকে অপসারিত করা হয়। ১৯৪৯ সালে তৎকালীন ভারত সরকার তার উপর ক্রমবর্ধমান করের বোঝা চাপালে তিনি ভারত ত্যাগ করে পাকিস্তান চলে যেতে বাধ্য হন। তার অনুসারীরা অনেকে ১৯৪৮ এর শুরুর দিকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯ এর জুনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের সাথে জড়িত ছিলেন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির নাম থেকে পরে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হন আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সহ-সভাপতি হন আতাউর রহমান খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আলী আহমদ। টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব¡ দেওয়া হয়। কোষাধ্যক্ষ হন ইয়ার মোহাম্মদ খান। কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থাতেই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব¡ পান মুজিব। অন্যদিকে, পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনটির নাম রাখা হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। এর সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ২৪ বছরের পাকিস্তান শাসনামলে আওয়ামী লীগ আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে দু’বছর প্রদেশে ক্ষমতাসীন ছিল এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে ১৩ মাস কোয়ালিশন সরকারের অংশীদার ছিল। ১৯৫৩ সালে তিনি একে ফজলুল হক এবং মাওলানা ভাসানীর সাথে একত্রে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিতব্য পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন উপলক্ষে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাভূত করার জন্য আওয়ামী মুসলিম লীগের উদ্যোগে এই যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। এই যুক্তফ্রন্টের নেতা ছিলেন – ১) মওলানা ভাসানী, ২) একে ফজলুল হক ও ৩) হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। যুক্তফ্রন্ট ২১ দফার একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। ওই ইশতেহারের মধ্যে প্রধান দাবি ছিল – ১) লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা, ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা, ভাষা শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনার নির্মাণ করা ইত্যাদি। ১৯৫৪ সালের মার্চের আট থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন পায়। এরমধ্যে ১৪৩টি পেয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মওলানা ভাসানী, আবুল কাশেম ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক গঠিত যুক্তফ্রন্ট অভূতপূর্ব জয়লাভ করে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সম্পূর্ণরূপে পরাভূত হয়। তারা শুধু ৯টি আসন লাভ করে। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ ‘মুসলিম’ শব্দটি বর্জন করে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বগুড়ার মোহাম্মদ আলী প্রধানমন্ত্রী এবং সোহরাওয়ার্দী আইনমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি ডিসেম্বর ২০, ১৯৫৪ হতে আগস্ট, ১৯৫৫ পর্যন্ত এ পদে ছিলেন। আগস্ট ১১, ১৯৫৫ হতে সেপ্টেম্বর ১, ১৯৫৬ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান আইনসভায় বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণয়নে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি সেপ্টেম্বর ১২, ১৯৫৬ থেকে অক্টোবর ১১, ১৯৫৭ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৫৬ সালে চৌধুরি মোহাম্মদ আলির পদত্যাগের পর তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। পররাষ্ট্র বিষয়ে পাকিস্তানের যুক্তরাষ্ট্রপন্থী মনোভাবের ব্যাপারে তাকে অগ্রদূত হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৯৫৬ সালে সংখ্যা-সাম্যের ভিত্তিতে একটি শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়। উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়। কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের ১৩ জন এমএনএ থাকা সত্ত্বেও রিপাকলিকান পার্টির সহযোগিতায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যেকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে তিনি পদক্ষেপ নেন। কিন্তু তার এই পদক্ষেপ ব্যাপক রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্ম দেয়। পূর্ব পাকিস্তানের মতো পশ্চিম পাকিস্তানেও এক ইউনিট ধারণা প্রচলনের তার চেষ্টা পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের কারণে নস্যাৎ হয়ে যায়। এরপর ১৯৫৮ সালে ইস্কান্দার মীর্জা পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারী করেন। আগস্ট, ১৯৫৯ হতে ইলেক্টিভ বডি ডিসকয়ালিফিকেশান অর্ডার অনুসারে তাকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রবিরোধী কাজের অপরাধ দেখিয়ে তাকে জানয়ারি ৩০, ১৯৬২ তে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং করাচি সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ করা হয়। আগস্ট ১৯, ১৯৬২ সালে তিনি মুক্তি পান। অক্টোবর, ১৯৬২ তে তিনি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের উদ্দেশ্যে ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট (এন ডি এফ ) গঠন করেন। স্বাস্থ্যগত কারণে ১৯৬৩ সালে দেশের বাইরে যান এবং লেবাননের রাজধানী বৈরুতে অবস্থানকালে ডিসেম্বর, ১৯৬৩ তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যু অনেকের কাছেই ছিল  রহস্যজনক।

এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যলয়ে আইন পড়ার সময়ই সিদ্বান্ত নিয়েছিলেন যে, সারা জীবন মানুষের জন্য রাজনীতি করবেন। তাঁর সিদ্বান্ত জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর এই বর্ণাট্য রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাসে কোন লোভ-ভোগ-সুবিধাবাদিতা ছিলো না। ছিল শুধু দেশপ্রেম ও ত্যাগের মহিমা। [সিরিজের শেষে তথ্যসূত্র দেয়া আছে]

 

৪৩১জন ৩০০জন
0 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য