মা’কে মনে পড়ে..

মনির হোসেন মমি ১৪ অক্টোবর ২০১৯, সোমবার, ০৮:৪৩:০২অপরাহ্ন চিঠি ৩২ মন্তব্য

পরম শ্রদ্ধান্নেষু
‘মা’

ঘুমের ঘরে কোন স্বপ্ন দেখি না বহু বছর হল।মানুষ ঘুমের ঘরে স্বপ্ন দেখা থেকে দূরে থাকে কি ভাবে আমার মস্তিষ্কে কাজ করে না।প্রত্যাকে ঘুমের ঘরে প্রতিনিয়ত ইচ্ছায় অনিচ্ছায় কিছু না কিছু স্বপ্ন দেখেন অথচ আমার হয়েছে এর উল্টো। জীবনের একটা সময়ে ঘুমের ঘরে খুব ঘটা করে স্বপ্ন দেখতাম।কখনো আকাশে উঁড়ছি,কখনো দৌড়ে পালাচ্ছি,কখনো প্রিয়তমাকে স্বপ্নে কথার খৈ ফুটাচ্ছি, কখনো বা দেশ মার্তৃকার তরে যুদ্ধে শত্রুর সাথে মোকাবেলা করছি।
এখন এ সব স্বপ্ন তো দূরে থাক যে কোন স্বপ্ন যেন আমার সাথে আড়িঁ কেটে বসে আছে।

ঘুমের ঘরে স্বপ্ন দেখার শেষ স্বপ্নটি ভেঙ্গে ছিলে তুমি- মনে আছে আমার খুব করে।সেদিন আমার ভীষন রাগ হয়েছিলো তোমার উপর।তুমি হঠাৎ যখন ধাক্কা দিয়ে আমাকে জাগিয়ে দিয়ে আমার রঙ্গীন স্বপ্ন দেখাগুলো ভেঙ্গে দিলে।বিশ্বাস করো সেদিন আমি তোমার উপর খুব রাগ হয়েছিল, খুন করতে ইচ্ছে করছিলো তোমাকে।
মাত্রতো স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলাম- সে এসেছিলো চুপি চুপি আমার চাদ ভাঙ্গা ঘরে।আমি তখন আনমনে ফ্রেমের ক্যানভাসে ছবিঁ আকঁছি।কখন যে সে পিছু দাড়িয়ে ছিলো বুঝতে পারিনি।আকাঁনো পেইটিং এ বগীর এক পা দেখে…তার হঠাৎ হাসির মুচ্ছোনায় আমি অবাক হই।তুলিঁর আচঁর থেমে যায় তার হাসি যেন চলছে কোন এক অস্পরীর মুক্তো ঝরা উজ্জ্বল জ্যোতি নিয়ে।কিছু বলার আগেই তুমি হঠাৎ ধাক্কায় চেতন জাগালে।রাগে আমার মন ফেটে যায়।বুঝতে পেরে আমার পাশে বসলে।মমতার আদরে আমার রাগ ভাঙ্গালে।জিজ্ঞেস করলে- কি স্বপ্ন দেখছিলেরে খোকা? আমি তখন খানিকটা লজ্জা পেলেও তোমার বুঝতে একটুও অসুবিদা হয়নি কি ছিলো সেই স্বপনে কারন তুমিতো আমার মা।সন্তানের সব খবর সবার আগে জানতে পারেন এ জগতে কেবলি যে “মা”।

এরপর পুত্রের ভালবাসাকে তোমার বুকে আগলে রাখলে অতি যতনে। একটা সময় ঘটনার অন্তরালে শত্রুর মুখে চুঁনকালি দিয়ে নিজ হাতে সাজাঁলে পুত্রবধুঁ। স্ব-ইচ্ছায়- অপরিপক্কতায় সাংসারিক টান পোড়নে একদিন উড়ালঁ দিতে হয় পরদেশে।চোখের জলে বিদায়ে মুখবয়ে ভেসে উঠছে স্পষ্টত তোমার মমতাবোধ,নাড়ীর টান।বাবা ভাই বোন পাশে দাড়িয়ে তাদেরও নয়ন জলে ছলছল।এই বুঝি শেষ বিদায়।হয়তো এ কথাটি বুঝতে পেরেছিলেন বাবা’ তাইতো ইমিগ্রেশনে প্রবেশের পরও পিতার নিষ্ফল চাহনী মনকে নাড়া দিয়ে যায়।প্রবাসে মাত্র তিনটি মাসের মাথায় বাবাকে হারাই। আর তুমি তখন খুব একলা হয়ে গেলে-আমিও নেই ভাইটিও ছোট, তখন তোমার চোখের জলের শান্তনা হবার আর কেউ ছিলো না।ভরসা ছিলো প্রবাসী পুত্রের এমন চিঠি।

সামান্য অক্ষরজ্ঞান ছিলো বলে তুমি তেমন একটা ভাল গুণতে পারতে না।টাকা পয়সা যা হাতে আসতো তা আচঁলে গিট্ট্রু মেরে গুজে রাখতে আমি বাসায় এলে গিট্ট্রু খুলে আমাকে দিতে গুনতে- যেন শিয়ালের মা’র কাছে মুরগী বরগী দিলে।গণার মাঝেই পাচ দশ পয়সা সড়িয়ে ফেলতাম। পাচঁ দশ পয়সার তখন অনেক দাম।তখন ছিলো আনা পেরুয়ে পয়সার যুগ।গণনার প্রতিবারই কি ভাবে যেন বুঝে যেতে-আমাকে বলতে দেখ,সৎ পথের কামাই আর অসৎ পথের কামাইয়ের মাঝে তৃপ্তির এক বিরাট ব্যাবধান আছে যা তুমি সহজেই বুঝতে পারবে যখন এমন কোন পরিস্থিতিতে তুমি কখনো পড়।চেয়ে সব খেয়ে ফেললও খাবার দাতার আপত্তির বদলে মন থেকে এই নিঃস্বাস বের হবে-‘আহারে ছেলেটা কত ভূখাই না ছিলো!।সে দিনের তোমার কথাগুলো আমার মনে আজও জাগ্রত।অন্ততঃ এইটুকু পেয়েছি জগতে-এই আমি মা হীন,বাবা হীন,বড় কোন গার্ডিয়ানহীন, জেনারেল শিক্ষিত,নুণ্যতম জমানো অর্থ-সম্পদহীন জীবনে চলার পথে কোথাও কখনো ঠেকিনি। কখনো কখনো কোন বিপদের সম্মুখীন হলে তোমার দোয়ায় তা পেরিয়ে উঠতে পেরেছি।এমনি করেই যেন ‘কোন মত পৃথিবীকে পাশ কেটে যেতে পারি স্বর্গে বসে সেই সহ-যোগীটিাই কর।

তুমিতো এখন স্বর্গে। স্বর্গে গিয়ে দুনিয়াবী ঝামেলা হতে এক প্রকার বেচেই আছ।আমারো ইচ্ছে হয় খুব দ্রুতই তোমার কাছে আসতে। তোমার স্বর্গীও কোলে মাথা দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুম পারতে। ‘জানো মা’ কত দিন হলো ঘুম যেন ঠিক মত হয় না। আজকাল নিজেকে খুব অসহায় লাগে। কেউ নেই পাশে। একদিন সব ছিলো, সবায় ছিলো-তুমি আমি বাবা ভাই বোন সব এক সাথে এক থালে আহারে, দুঃখ সূখ ভাগা ভাগি করে। আজ আর কেউ নেই। বাবা স্বর্গে যাবার পরও বেশ কিছু কাল ছিলো সবায় তোমার মায়ায় তোমার ভালবাসায়-মায়াময় রক্তের বন্ধনে।

তুমি পান খেতে নিয়মিত।নিজে খেতে বান্ধবীদেরকেও খাওয়াতে।এক বেলা ভাত না খেয়েও থাকতে পারতে কিন্তু এক মুহুর্ত পান না খেয়ে থাকতে পারতে না।এক দিন রাতে অফিস ফেরা বাসায় এসে মনে পড়ল- এই যা! পান আনতে ভুল গেছি।সেকি সেদিন তোমার মনের অনুভুতি! মনে হয় সারা জীবনে মা ভক্তের পূর্ণ্যের সেদিনই সমাপ্তি।উপায় অন্তর না পেয়ে রাতেই পাশের এক দোকান হতে রেডিমেট পান ক্রয় করে এনে সে রাতের মতন বেচে যাই।

তুমিও যখন স্বর্গে চলে গেলে তখন দেরী হয়নি এক মুহুর্তও সম্পর্কে এক সাথে থাকার বিচ্ছিন্ন হবার। চিরাচরিত পৃথিবীর নিয়মে হলাম একেলা আরেকটি জীবনাধ্যায়ের একক মালিকানার মালিকত্ব।সেদিন হতে আজও! কে রাখে কার খোজঁ!সময়ের আবর্তনে হারিয়ে যেতে থাকে ক্রমশতঃ তোমার স্মৃতি চিহ্নগুলো।এক দিন কালের পরিক্রমায় ভুলে যাবে তোমাদের নাম যেমন করে এখন আমি মনে করতে পারি না আমার কয়েক পূর্বো পূরুষদের কারো নাম।

ইয়া নফসি ইয়া নফসিতে চলছে জীবন।ঠিক এই মুহুর্তে তোমার আদর শাসন তোমার মমতার ছায়াঁ সব কিছুর খুব অভাব অনুভব করছি। বিপদে কিংবা অসুস্থতায় কেউ এসে এখন আর বলে না -সব ঠিক হয়ে যাবে,আল্লাহ ভরসা। ছাঁয়াহীন আলোহীন আশাহীন কেবল আত্মার প্রস্থানের ইচ্ছেটুকু এখন আমার শেষ চাওয়া।খুব জানতে ইচ্ছে করছে- স্বর্গের বারান্দায় এখনও কি সেই আগের মত বাড়ী ফেরার সময় হলে আমার অপেক্ষায় সময়কে দিচ্ছ বলি। এখনো কি আমাকে একটু আদরে সোহাগে বুকে টেনে নিতে ইচ্ছের প্রহর গুণছ! জানো মা, তোমার রেখে যাওয়া সেই চশমা এখনো মনে করে দেয়-কখনো’সারা বাড়ী খুজেঁ না পেলে ডাকতে আমায়-‘খোকা চশমাটা কই রাখলাম? আমি এদিক ঐদিক দেখে দেখতাম চঁশমাটা তোমার চোঁখেই আছে। মনে করিয়ে দিলে- মুচকি হাসিতে আমাকেই শাসাতে- আগে বলবিতো? সেই মুহুর্তটুকু মনে হলে মনে হয় স্বর্গের জন্য আর পাড়ি দিতে হতো না সাত আসমান- স্বর্গ আমার ঘরেই।আমার খুব ইচ্ছে করছে খুব দ্রুত সেই স্বর্গে তোমার আদরের ছায়ার তলে যেতে ।তুমি ডাকবে আমায়?

তোমার নাতনী ঠিক তোমার মতন হয়েছে-একটুও বদলায়নি।বাসায় কোন মেহমান এলেই হল,খুব যতন করে, ঠিক তোমারি মতন।পাশের বাড়ীর এক বোনকে তোমার নামে কিরণী’ ডেকে ডেকে তার চিবানো পানের রস মুখে  নিয়ে দাদীর আদর সোহাগ মেটায়। বাসায় কেউ এলে, কেউ না বসে, না খেয়ে যেতেই পারেন না। অনেকে বলেন আমি নাকি তোমাকে ফিরে পেয়েছি মা। সত্যিই কি তাই? মায়ের অভাব কি অন্য কিছুতে অন্য কারো মাঝে পূরণ করা যায় ? কখনোই না, মেয়ে বড় হবে পরের ঘরে একদিন সেও চলে যাবে অতপর একদিন পর আপণ হবে। আর আমিও হয়তো পৃথিবী বিয়োগে প্রহর গুণব ঠিক তোমারি মতন।

চলবে..

২০০জন ৩১জন
23 Shares

৩২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য