দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত দের থেকে সবচেয়ে বেশী কষ্টে আছে মধ্যবিত্তরা। তারা না পারছে রাস্তায় নেমে আসতে , না পারছে ঘরে বন্দী থাকতে। প্রায় চার মাস ধরে মহামারীর ছোবলে আটকে আছে। নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা সরকারী সাহায্য পেয়েছে, এখনো পাচ্ছে। সরকার এদেরকে বিভিন্ন ত্রাণ, প্রণোদনা দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে। ওদিকে সরকারী কর্মকর্তারাও বহাল তবিয়তে আছেন । চাকরি হারানো বা বেতনের জন্য তাদের কোন দুশ্চিন্তা নেই। বাকি মধ্যবিত্তদের মধ্যে অনেকেরই চাকরি নেই, আয়-রোজগার নেই বললেই চলে। জমানো সঞ্চয়গুলো শূণ্যের কোঠায় নেমে এসেছে। মধ্যবিত্তদের সমস্যা একটাই তাদের পক্ষে নিম্নবিত্তের জীবনে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়না। আবার উঁচু তলার স্ট্যাটাস মেইনটেইন করাও পুরোপুরি সম্ভব হয়না। ইতিমধ্যেই এরা খরচ বাঁচাতে  বাড়িবদল করছে বা গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছে। কারণ রাজধানীতে বেতনের অর্ধেকই যায় বাড়ি ভাড়াতে। অনেকেই এজন্য মধ্যবিত্তের জীবন-যাপন কে দায়ী করছে। তাদের প্রতিনিয়ত বাইরে ঘুরতে যাওয়া , প্রায় প্রতিদিনই বাইরের খাবারের পিছনে বাড়তি খরচ করা , আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করাকে দুষছেন। আচ্ছা মানুষ কি সারাজীবন একজায়গায় , এক অবস্থানে থাকতে পারে, না থাকতে চায়? আপনি-আমি পেরেছি? আপনার-আমার ঠাকুরদার জেনারেশন যেভাবে চলেছে , আমাদের বাবা-কাকাদের জীবন কি একই ধারায় থেকেছে? তাহলে আমাদের জীবনযাপন ও নিশ্চয়ই একই ধারায় চলবে না! সবাই নিজেদের উন্নতি চায় , উপরে উঠতে চায়, চাকচিক্য চায় জীবনধারায়।

 

আমাদের ঠাকুরদার জেনারেশন এ কোনো ফোন , ফ্যাক্স , টেলিভিশন, ইন্টারনেট, মোবাইল ছিলনা তাই বলে কি আমরা এসব ব্যবহার করবো না? তারা বেড়াতে যেতো আত্নীয়-স্বজনদের বাড়ি আর আমরা এখন দেশের বিভিন্ন জেলাতে ঘুরতে যাই যার কারনে পর্যটন শিল্প অনেকটাই জমজমাট হয়ে উঠেছে, বাড়ি ভাড়া বেড়ে গেছে, সুউচ্চ ভবনের চাহিদা বেড়ে গেছে। বাইরে খেতে যাই বলে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা অলিতে গলিতে গজিয়ে উঠেছে। তাহলে আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের কারণেই এসব ব্যবসা , বাড়ি ভাড়া চলছে জাঁকজমকভাবে। তাহলে আমরাই বাঁচিয়ে রেখেছি কয়েকটি সেক্টরকে। এরমধ্যে শপিং মল গুলো ও আছে। কারন এখন ঘরপ্রতি দু’তিনজন  আয় করছে আর যার দরুন তাদের কাজের জন্য প্রতিদিন বাইরে যেতে হয়। এখনকার কোম্পানিগুলো তাদের কর্মকর্তাদের ফিটফাট দেখতে চায় বিশেষ করে বেসরকারি খাত গুলো এটা তাদের আয়ের আরেকটি মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে । এখানেও একটা সূক্ষ্ম চাল চালে কোম্পানি গুলো। বিদেশীদের সাথে, দেশের অন্যান্য কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে গিয়ে  এসব আনুসঙ্গিক খরচগুলোও ইদানিং বেড়েছে বহুগুণে যার প্রভাব পড়ছে পোশাকশিল্পে। ইদানিং মেয়েরাও বাইরে যাচ্ছে আয়ের জন্য , সংসারের বাড়তি খরচ সামলানোর জন্য। মেয়েদের  খরচটা পুরুষের চেয়ে বেশি করতে হয় কারণ তাদের কসমেটিকস, আনুসঙ্গিক খরচ বেশী। মেয়েদের কাজের ক্ষেত্রে বাহ্যিক সৌন্দর্যটা বেশী দেখা হয়। ফলাফল খরচ বেড়ে যায় কয়েকগুণ বেশি। সারা সপ্তাহ অফিসের খাটুনির পর তাদের মানসিক সুস্থতা, প্রশান্তির জন্য বাইরে ঘুরতে যায়, খেতে যায়। এতে করে তাদের কাজের উদ্দীপনা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই মধ্যবিত্তরাই আজ সবচেয়ে করুণ অবস্থায় পড়েছে তাদের চাকরি চলে যাবার কারণে, বেতন-ভাতা না পাবার কারণে। যার কারণে এই মধ্যবিত্তদের উপর  যারা নির্ভরশীল ছিলো তাদের অবস্থা ও জরাজীর্ণ। তাদের ও আয়ের পথ বন্ধ, সংকুচিত। অনেকের আয়ের একমাত্র পথ ছিলো বাড়ি ভাড়া তাদের আয় ও বন্ধ। এই মধ্যবিত্তরাই সংসারের কাজে সময় দিতে পারতো না বলে গৃহকর্মী রাখতো। সেই গৃহকর্মীরাও কোনো না কোনো ভাবে বেঁচে আছে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে বা গ্রামে ফিরে গিয়ে । কিন্তু মধ্যবিত্তদের সম্বল বলতে মাস শেষে বেতনটাই ছিলো। 

 

যারা লেখাপড়া শিখে বিভিন্ন সেক্টরে চাকরি করেছে তারাতো  জমিজমার কাজ শিখেনি। মধ্যবিত্তরা শুধু নিজে বাঁচেনি- তারাই কিন্তু নিম্নবিত্ত, উচ্চবিত্তদের ও বাঁচিয়ে রেখেছিলো। আজ সেই মধ্যবিত্তদেরই আমরা দোষারোপ করছি কয়েকমাস চলতে না পারার জন্য। একটা গরীব দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ কিন্তু এমনি এমনি হয় না। লেখাপড়া শিখে চাকরি করে  নিজেদের উন্নতি করেছে, মধ্যবিত্তে পরিণত করেছে  সেইসাথে দেশের সর্বক্ষেত্রে উন্নয়নের ছোঁয়া দিয়েছে, অন্যদের আয়ের পথ প্রসারিত করেছে। যার ফলাফল বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। তাহলে মধ্যবিত্তদের কেন আমরা দোষারোপ করছি কয়েকমাস চলতে না পারার কারণে? তারাতো কারো কাছে হাত পাতে নি। যেখানে সবকিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী, পুরো মাসের বেতন দিয়েই টানাটানি করে সংসার চালাতে হয় সেখানে কয়েকমাস বেতন না পেলে, চাকরি না থাকলে কিভাবে চলবে তাদের পুরো ফ্যামিলি, তাদের উপর নির্ভরশীল অন্য পরিবার গুলো? রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ধস, দেশের পর্যটন শিল্পে ধস, পোশাকশিল্পে ধস, নিম্নবিত্তদের আয়ের পথ ও বন্ধ বাড়ি বাড়ি কাজ করতে না পারার কারণে, কোম্পানির উৎপাদন কমে গেছে, বাড়ি গুলো ফাঁকা হয়ে গেছে। মধ্যবিত্তরা সবখানেই অবহেলিত, অনাদৃত। মধ্যবিত্তরা হচ্ছে রাষ্ট্রের বন্ধন। উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে হলে মধ্যবিত্তের বিকল্প কিছু নেই।

২২৪জন ৬৭জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য