কেমন আছেন সবাই?

আশাকরি অনেক ভালো৷

নিজের একটা বাড়ি, একটা স্বপ্নের নীড় করার ইচ্ছা প্রায় সবারই আছে৷
বাড়ির প্লান বিষয়ক একটা লেখা সোনেলাতে ২০১৪ সালে দিয়েছিলাম,
হাতে সময় থাকলে, এবং আগ্রহী হলে পড়ে এক্ষুনি পড়ে ফেলুন৷

নিজেই করুন নিজের বাড়ির প্লান

শুধুমাত্র প্লান করলেই তো আর বাড়ি হবে না৷ ভবনের সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভবনের কাঠামোকে যথাসম্ভব শক্তিশালী করে নির্মান করতে হবে৷ নয়তো আপনার তৈরী স্বপ্নপুরী, চোখের পলকে মৃত্যুকূপে পরিনত হতে পারে৷

সমগ্র বাংলাদেশ কম বেশী ভূমিকম্পের ঝুঁকি তে আছে৷
বাংলাদেশের কিছু অঞ্চল অতিরিক্ত ভূমিকম্প প্রবণসীমার মধ্যে আছে৷
তাই ভবন নির্মাণের সময় আমাদের অবশ্যই বাংলাদেশ নির্মাণ বিধিমালা (BNBC) কোড মেনে চলতে হবে৷

বিশেষজ্ঞ রা বলছেন ভবন ভূমিকম্প-সহনশীল করতে প্রতি বর্গফুটে খরচ হবে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ টাকা। আর ভবন নির্মাণের পর সেটি করলে প্রতি বর্গফুটে খরচ হবে কমপক্ষে ৬০০ টাকা। তাই ঝুঁকি এড়াতে ও খরচ কমাতে ভবন তৈরির সময়ই সহনশীল করেই নির্মাণ করা উচিত।

ভবন নির্মাণের সময় যে সমস্ত বিষয় গুলো অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে

১। বিল্ডিং ডিজাইনের আগেই অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা নির্ভুল সয়েল টেষ্ট রিপোর্ট বা সাব-সয়েল ইনভেস্টিগেশন করিয়ে নিতে হবে ৷

এখানে অবশ্যই অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন ইঞ্জিনিয়ার সয়েল টেস্টের ফিল্ড বোরিং এর সময় উপস্থিত থাকবেন৷ কারন সঠিক ভাবে বোরিং এবং সয়েল স্যাম্পল কালেকশন না করলে, রিপোর্ট সঠিক পাওয়া যাবে না৷

এতে যেখানে পাইল করা দরকার নেই সেখানে ডিজাইনে পাইল চলে আসতে পারে, আবার যেখানে পাইল করা দরকার সেখানে পাইল না আসতে পারে৷
তাই এই ব্যাপারটা খুবই গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে৷

২। যে কোন বিল্ডিং-এর নকশা তৈরি করার পূর্বেই স্ট্রাকচারাল নকশার বিধিগুলোর অনুসরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে সঠিক স্ট্রাকচারাল নকশা না হলে ভূমিকম্পরোধক বিল্ডিং হবে না।

৩। বিল্ডিং নির্মাণের সময় অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের (সিভিল ইঞ্জিনিয়ার) তদারকি রাখতে হবে যাতে গুণগত মান ঠিক থাকে।

৪। সঠিক অনুপাতে গুনগতমানের সিমেন্ট, রড, বালির ব্যবহার হচ্ছে কিনা দেখতে হবে। কংক্রিটের চাপ বহন ক্ষমতা কোনো অবস্থাতেই ৩০০০ পিএসআই-এর নিচে নামানো যাবেনা । তার জন্য সার্বক্ষণিকভাবে নির্মানাধীন সাইটে দায়িত্বে নিয়োজিত সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদেরকে কিউব অথবা সিলিন্ডার টেস্ট করতে হবে। কংক্রিটের মিক্সাচারে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। ঢালাই’র পরে পানির ব্যবহার করে কংক্রিটের কিউরিং করতে হবে।

#) ওয়াটার সিমেন্ট রেশিও মেনে চলুন, সহজ ভাষায় যতটুকু সিমেন্ট তার অর্ধেক পানি দিয়ে ঢালাই মশলা তৈরি করুন৷

#) রড এবং কংক্রিট কাঙ্ক্ষিত শক্তি অর্জন করছে কিনা সেটা জানার জন্য, রড এবং সিলিন্ডার টেস্ট করান৷
বুয়েট, ডুয়েট, মিরপুরে এমআইএসটি তে মোটামুটি কম খরচে এই টেষ্টগুলো করাতে পারবেন৷

৫। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন রড পরীক্ষাপুর্বক ব্যবহার করতে হবে। রডের বহন ক্ষমতা ৬০ হাজার পিএসআই-এর কাছাকাছি থাকতে হবে। স্ক্র্যাপ বা গার্বেজ থেকে প্রস্তুতকৃত রড ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে ।

৬। বিল্ডিং-এর প্ল্যান ও এলিভেশান দুই দিকই সামাঞ্জ্য থাকতে হবে।

৭। নির্ধারিত ডিজাইনের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ফ্লোর নির্মাণ করবেন না। বিল্ডিং কোড অনুসারে এক্সপানশান ফাঁক রাখতে হবে।

৮। বেশি পরিমান সরু ও উঁচু বিল্ডিং-এর পাশ হঠাৎ করে কমাবেন না। যদি কমাতে হয় তাহলে ত্রিমাত্রিক ডাইনামিক বিশ্লেষণ করে ডিজাইন করতে হবে।

৯। বিল্ডিং-এর উচ্চতা যদি ভবনের প্রস্থের ৪ (চার) গুণের অধিক হয় তাহলে ত্রিমাত্রিক ডাইমানশন বিশ্লেষণ করে ডিজাইন করতে হবে।

১০। ‘সেটব্যাক’ বা হঠাৎ করে বিল্ডিং-এর পাশের মাপঝোপ কমানো যাবেনা। যদি কমাতেই হয় তাহলে ত্রিমাত্রিক বিশ্লেষণ করে সাইট অ্যাফেক্ট জেনে ডিজাইন করতে হবে।

১১। জটিল কাঠামোগত প্লানের জন্য অবশ্যই ত্রিমাত্রিক ভূমিকম্প বিশ্লেষণ করে ডিজাইন করতে হবে।

১২। ‘শেয়ার ওয়াল’ বা কংক্রিটের দেয়াল সঠিক স্থানে বসিয়ে ভূমিকম্পরোধ শক্তির পরিমাণ বাড়াতে হবে।

১৩। ফ্লাট প্লেট স্লাবের চেয়ে বিম কলাম স্লাব বেশী শক্তিশালী । সুতরাং বিম, কলাম ও স্ল্যাব বিশিষ্ট বিল্ডিং তৈরি করতে হবে।

১৪। দায়িত্বরত ইঞ্জিনিয়ারকে “বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড” অনুসরণ করে বিল্ডিং-এর প্ল্যান/ ডিজাইন করে ভূমিকম্প রোধক বিল্ডিং নির্মাণ করতে হবে।

১৫। নিচের তলা পার্কিং-এর জন্য খালি রাখতে হলে, ঐ তলার পিলারগুলো বিশেষভাবে ডিজাইন করতে হবে। প্রয়োজনমতো কংক্রিটের দেওয়াল দিয়ে পিলারগুলোতে বেষ্টনীবদ্ধ করতে হবে।

১৬। বিল্ডিং-এর ‘বিমের’ থেকে ‘পিলারের’ শক্তি বেশি করে ডিজাইন করতে হবে। কমপক্ষে ২০% বেশি করতে হবে।

১৭। মাটির গুণাগুণের ওপর ভিত্তি করে যথাযথ ফাউন্ডেশন প্রকৌশলগতভাবে যাচাই বাছাই করে ডিজাইন করতে হবে।

১৮। ৫ ইঞ্চি ইটের দেয়ালগুলো ভূমিকম্পের জন্য আদৌ নিরাপদ নয়। তাই এই দেয়ালগুলো ছিদ্রযুক্ত ইটের ভিতরে চিকন রড দিয়ে আড়াআড়ি ও লম্বালম্বিভাবে তৈরি করে ‘লিন্টেলের’ সাথে যুক্ত করে দিতে হবে। সবদিকে ‘লিন্টেল’ দিতে হবে। বিশেষ করে দরজা বা জানালার খোলা জায়গায় চিকন রড দিয়ে ৫ ইঞ্চি ইটের দেয়াল যুক্ত করতে হবে।

১৯। কলামের টাই রডকে বাঁকিয়ে ১৩৫ ডিগ্রি করে দিতে হবে৷

২০) আমি এমনও দেখেছি মাত্র ৫০-৬০ হাজার টাকার জন্য বিল্ডিং মালিক কলামে কম রড দিতে চান, ডিজাইন অনুযায়ী দিতে চান না৷
অথচ এই মালিকই লাখ টাকার টাইলস দিয়ে বিল্ডিং সাজাবেন৷
ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনে লাখ লাখ টাকা খরচ করবেন!!!

পরে অবশ্য তাকে হাতে কলমে হিসাব করে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মাত্র এই কয়েকটা টাকার জন্য ঝুঁকি নেয়া যৌক্তিক হবে কিনা?

উনি বললেন আসলে কন্টাকটর সাহেব বললেল এতো রড দিয়ে কি হবে? তাছাড়া সব এক সাইজের রড দেয়াই ভালো৷

বিল্ডিং আপনার সারাজীবন সেখানে থাকবেন আপনি, ইঞ্জিনিয়ার সবসময়ই চাইবেন আপনি নিরাপদ থাকুন৷
কনটাকটর হয়তো অজ্ঞনতাবসত বা নিজের কাজের সুবিধার জন্য আপনাকে পরামর্শ দিতেই পারে, সবটা বুঝে নিজের নিরাপত্তার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে৷

২১) ওমুকের বাড়ি ছয়তলা কলামের সাইজ চিকন, মাত্র এই কয়েকটা রড দেয়া আমাদের বিল্ডিং এ এতো রড লাগছে কেন?
মাঝেমধ্যে এমন প্রশ্ন প্রায়ই শুনতে হয়৷

এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হলো

আপনার মনে এমন প্রশ্ন আসলে আপনি আপনার ইঞ্জিনিয়ারের করা ডিজাইন টা অন্যকোন সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার কে দেখান, উনি স্ট্রাকচার ডিজাইন, মডেল, সয়েলটেষ্ট রিপোর্ট টা আরেকবার রি চেক করুন৷ তবে বর্তমানে সফটওয়্যারে ডিজাইন করা হয় তাই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে৷ তবুও চাইলে ক্রস চেক করিয়ে নিতে পারেন৷

২২) বাংলাদেশ নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী, দেশের উত্তর অঞ্চল সবচেয়ে বেশী ভূমিকম্প ঝুঁকিতে আছে৷ এসব এলাকার ভবন নির্মাণের সময় অবশ্যই ভূমিকম্প সহনশীল স্ট্রাকচার ডিজাইন করা উচিত৷

তাহলে সহজ কথায় ভূমিকম্প সহনশীল ভবন কেমন হবে?
এটা মচকাবে তবুও ভাঙ্গবে না এমন টাইপের হবে৷

সম্পূর্ণ লেখাটি পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ৷

৩৭৯জন ২০৬জন
0 Shares

২৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ