আমি আমি না,

জিসান শা ইকরাম ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, শনিবার, ১২:৫৯:২৮পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩৮ মন্তব্য

খৃষ্টপূর্ব ৩১৫০ এ আমার আর মুগ্ধতার বিয়ে সম্পন্ন হয় বেশ ধুমধাম সহকারেই। স্বর্গের অধিকর্ত্রী নাট দেবীর বিশেষ স্নেহধন্যা মুগ্ধতার বিয়ের আয়োজন তিনিই করেছিলেন। পরমা সুন্দরী স্ত্রী নিয়ে আমার দিনগুলো স্বপ্নের মতই সুন্দর ছিল। ফুল, পাখি, জোছনা, ঝরনা শোভিত পারিপার্শ্বিকতায় স্বপ্ন ময় মুহূর্তগুলো কেটে যাচ্ছিল। ভালোবাসার বৃষ্টিতে সিক্ত হয়ে আনন্দ, সুখে পূর্ন ছিল সে জীবন। তখন আমার নাম ছিল অসিরিস, আর মুগ্ধতা্র নাম আইসিস।

হঠাৎ কোনো এক বেখেয়াল রাতে ভালোবাসাবাসিতে মত্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি আমি। ভোরের আলোয় পাশে শায়িত মুগ্ধতাকে কাছে টানতে গিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় যেন আমার মাঝে। এতো মুগ্ধতা নয়, এই শয়ন কক্ষ তো আমাদের নয়। যার সাথে রাত কাটিয়েছি সে তো মুগ্ধতার ছোট বোন স্নিগ্ধতা। দুবোনের চেহারা শরীর প্রায় একই রকম। আমি না হয় বেখেয়ালে ভুল করলাম, কিন্তু স্নিগ্ধতা? তার তো বুঝতে পারার কথা। স্বর্গের অধিকর্ত্রী নাট দেবীর শাসন। নারীরা ইচ্ছেকে ভালভাবেই প্রাধান্য দিত বলে এটি প্রায় স্বাভাবিক ছিল তখন। ঘুমন্ত স্নিগ্ধতাকে না জাগিয়ে উদভ্রান্তের মত ছুটে যাই আমাদের শয়ন কক্ষে। ঘুমিয়ে আছে আমার মুগ্ধতা, স্বর্গের অপ্সরা যেন। কান্নায় চোখ মুখ বুক ভাসিয়ে সবকিছু বলি তাঁকে।
= জানু আমি মহা অন্যায় করে ফেলেছি, আমি মহা পাপী। তুমি আমাকে শাস্তি দাও, ছুড়ে ফেলে দাও তোমার জীবন থেকে। ”
– জানি আমি জান, তুমি স্নিগ্ধতার সাথে রাত কাটিয়েছ। ইচ্ছে করেই ডাকিনি।
= কেনো জানু কেনো ডাকোনি? অনুতপ্তের অনলে পুড়ে কতটা কষ্ট পাচ্ছি আমি বুঝতে পারছ তুমি?
– হ্যাঁ পারছি জান। কিছু সিক্রেট ব্যাপার আছে যা তোমার না জানলেও ক্ষতি নেই।

দিন যায় রাত যায় আমার নিদ্রাহীনতায়। চোখের জল আমার বাধ  মানে না। এই অবিশ্রান্ত চোখের জলের কারনেই মুগ্ধতার কাছে আমার নাম হয়ে যায় জল। বোনকে সন্তান উপহার দেয়ার জন্য আমার মুগ্ধতার পরিকল্পনার একটি চরিত্র হয়ে গিয়েছিলাম আমি সেই রাতে। অবশেষে আমার আর স্নিগ্ধতার ছেলে সন্তান যার নাম মৃত্যুদূত ভূমিষ্ঠ  হয়। আর এই সন্তান জন্মের পরেই সবকিছু এলোমেলো হয় যায়। অক্ষম পুরুষ স্নিগ্ধতার পতি সে রাতকে ভুলতে পারেনি। সব কিছুই সেও জানতো। অবশেষে এক পরম সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমাকে জীবন্ত কফিনে আবদ্ধ করে কফিন ভাসিয়ে দেয় নীল নদে। আমার আর স্নিগ্ধতার সন্তান আসার পরে আমার মৃত্যু হওয়ায় সন্তানের নামই হয়ে যায় মৃত্যুদূত। আমার মৃতদেহ সমেত কফিনটি ভেসে ভেসে সিরিয়ার উপকুলে এক সৈকতে আঁটকে যায়। আর কফিন সহ আমি একটি গাছে পরিনত হই। যে গাছ থেকে অদ্ভুত সুন্দর সুগন্ধ বের হতে থাকে।

আমার নিখোঁজে পাগলপারা আমার প্রিয়তমা স্ত্রীর জান জান আহাজারিতে স্বর্গ এবং মর্ত বিষাদে পরিপূর্ন হয়। কোনভাবে জানতে পেরে মুগ্ধতা নীল নদের তীরে হাঁটতে থাকে আমার কফিনের খোঁজে। পতি সন্ধানী মুগ্ধতার চোখের জলে নীল নদ এর জল উপচে দুকুল প্লাবিত হয়। তখন হতেই নীল নদের উপচে ওঠা জলে ফসলের আবাদ হয় এবং মিশরের সভ্যতার পত্তন ঘটে। মুগ্ধতা আর আমি পরবর্তিতে জন্ম নিয়ে বেহুলা লক্ষিন্দর নামে বাংলাদেশের বগুড়া্র আধিবাসী হই। সে ইতিহাস না হয় আর একদিন বলা যাবে। এই সুগন্ধি গাছের সংবাদ জেনে সিরিয়ার রাজা গাছটি কেটে নিয়ে তার বাড়ির একটি খাম্বা বানিয়ে রাখেন যাতে সমস্ত রাজবাড়ি সুগন্ধে মৌ মৌ করতে। প্রিয়তম পতিকে খুঁজতে খুঁজতে মুগ্ধতা অবশেষে পৌছায় সিরিয়ায়। রাজবাড়ির কাছাকাছি হতেই সে সুগন্ধ পেয়েই বুঝে যায় এটি তার জল এর সুগন্ধ। যেভাবেই হোক তার জানকে তার চাইই চাই। রাজকন্যাকে দেখভাল করার চাকরী নেয় মুগ্ধতা। রাজকন্যার সেবায় সে এতই মগ্ন হলো যে রাজকন্যার জন্মদিনে রাজা মুগ্ধতার কাছে জানতে চান কি উপহার চাই তার। মুগ্ধতা একটুও অপেক্ষা না করে জানিয়ে দেয় যে এই সুগন্ধি যুক্ত খাম্বাটি তার চাই। রাজার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া গাছটিকে নিয়ে মুগ্ধতা ফিরে চলে আমাদের সুখের সেই বাড়িতে। পথে আমরা মিলিত হলে মুগ্ধতার গর্ভে আসে আমাদের প্রথম সন্তান মিশু। এই মিশু হোরাস নামে দেবতা হিসেবে পরিচিতি পায়। সবাই জানে মুগ্ধতার পতি আমি নিহত, আমি যে গাছের খাম্বা হয়ে আছি তা তো আর কেউ জানে না। স্বামী ব্যতীত সন্তান জন্ম দেয় মুগ্ধতা, মিশুর জন্মের পরে সে হয়ে যায় দেবতা। পরবর্তী এক জন্মান্তরে মুগ্ধতা জন্ম নেয় মরিয়ম/ মেরী হয়ে। তখন আমাদের সন্তান জন্ম হয় যীশু।

এভাবেই আছি আমরা জন্মান্তরের সাথী হয়ে। কখনো আমরা জন্ম নেই জল-মুগ্ধতা হয়ে, কখনো অসিরিস-আইসিস, কখনো বেহুলা- লক্ষীন্দর, কখনো ওসিন- মেরী/মরিয়ম হয়ে।
আর এখন?

— প্রাচীন মিশরীয় মিথ অবলম্বনে।

======================
আমি আমি না, আমি সে ও না-পর্ব ৫

৫২৭জন ৫২৭জন
0 Shares

৩৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ