জামায়াতে ইসলামী নেতা মওদুদী পূর্ব পাকিস্তানিদের (বাংলাদেশী) দেশপ্রেমিক মুক্তিকামী জনগনের ধর্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কারন দেশের জনগন যেভাবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ নিপীড়ন অত্যাচারের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বাধীনতার জন্য ফুঁসে উঠছিলো তা দেখে মওদুদী সংগঠিত হতে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যকলাপকে বে-ধর্মী বলে আখ্যা দেন। ইসলাম ধর্মকে ভিন্ন ব্যাখ্যায় ধর্মভীরু মানুষের কাছে প্রচার করে ধর্মীয় চেতনার আঘাত হানার এই তকমাটি তখন থেকেই প্রতীয়মান যা অদ্যাবধি চলমান একটি কর্মকাণ্ড বলে বিবেচিত হচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামী নেতা মওদুদী পূর্বপাকিস্তানের দেশপ্রেম ও আচার-অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যকে লাগাতার কটাক্ষ করে আসছিলেন। তিনি পূর্বপাকিস্তানে নববর্ষ উদযাপন সম্পর্কে অনেক ঘৃণ্য মন্তব্য করেছেন। বাংলা নববর্ষকে হিন্দুদের নববর্ষ বলে অভিহিত করেন মওদূদী। তার এসব কর্মকান্ডের নিন্দা জানিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের ৯১ জন আইনজীবী তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতিও প্রকাশ করেছিলেন।

এরআগে, মাওলানা কাওসার নিয়াজী ২৫ আগস্ট (১৯৬৯) সামরিক আইনে মাওলানা মওদুদীর বিচারের দাবী করে বলেন- মওদুদী জামায়াতের সাপ্তাহিক মুখপত্র ‘এশিয়া’-তে এক নিবন্ধে কোরআনের অপব্যাখ্যা করে লিখেছেন- অমুসলমানদের সুশ্রী ছেলেরা ও তরুণী কন্যারাই হবে বেহেশতের গোলেমান ও হুর। জামায়াতে ইসলামের এইসব কথাবার্তা আজও আমরা অনেকের মুখেই শুনতে পাই যা মূলতঃ মওদুদীর রেখে যাওয়া সেই বীজের ফসল।

১৯ অক্টোবর ১৯৬৯ পীর মোহসেনউদ্দিন দুদুমিয়া ঢাকায় এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি বেশ কিছুদিন ধরে মাওলানা মওদুদীর কার্যকলাপে আশঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। কারণ মওদুদী এখন সকল জায়গাতেই কমিউনিজমের গন্ধ পাচ্ছেন। এমনকি মসজিদ-মাদ্রাসাতেও মওদুদী কমিউনিস্ট খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

পীরসাহেব আরো বলেন, মওদুদী সনদ প্রাপ্ত কোন মাওলানা নন। হায়দ্রাবাদের নিজামের দরবারে তদানীন্তন সম্রাজ্যবাদী প্রভুদের তুষ্ট করার জন্য তিনি কাজ করতেন। সেই প্রভুদের কাছ থেকেই মওদুদী মাওলানা খেতাব পান।

মওদুদী মূলতঃ শেখ মুজিব সহ অন্যন্য মুক্তিকামী জনপ্রিয় নেতাদের কমিউনিস্ট বলে আখ্যায়িত করতেন। পরবর্তীতে ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন অপব্যাখ্যা দিয়ে এদেশের স্বাধীনতাকামী সকল মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যক্তিকেই তিনি কমিউনিস্ট,দেশ বিরোধী ও ইসলাম বিরোধী হিসেবে আখ্যা দেন।

১৯৬৯ সালে ন্যাপ (ভাসানী) কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় রাজনৈতিক মতলব হাসিলের জন্য জামাত ইসলাম কর্তৃক মসজিদ ব্যবহারের নিন্দা করা হয়। এতে আরও বলা হয়, পিতা-মাতা তাদের কন্যাকে কোথায় বিয়ে দেবেন তার নির্দেশও জামায়াত দিতে চাচ্ছে। অথচ এই জামাতের আমীর মওদুদীই একদিন পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘হারাম আন্দোলন’ এবং পাকিস্তানের জন্য যারা জীবন বিসর্জন দিয়েছেন তাদের ‘হারাম মউত’ হয়েছে বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন।

সরকারি মুখপত্র দৈনিক পাকিস্তান ‘মাওলানা মওদুদীর ধর্মরাজ্য বনাম কায়েদে আজমের পাকিস্তান’ শীর্ষক এক উপসম্পাদকীয়তে লেখা হয়- মওদুদীর প্রস্তাবিত ধর্মতন্ত্র নিয়ে আমাদের ধারণা খুবই সীমিত। কিন্তু তাদের (জামায়াতে ইসলামী) কথাবার্তায় এবং আচার-আচরনে মনে হয় মধ্যযুগীয় থিয়োক্রাসীই জামাতে ইসলামীর সকল স্লোগানের সারকথা। মাওলানা মওদুদীর ধর্মচিন্তা অথবা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে একমত না হলেই তা ইসলামের খেলাপ হয়ে যাবে এই জবরদস্তিমূলক নীতি এ দেশের জনসাধারণের কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এবং তাদের এই নীতি যে আসলেই গ্রহযোগ্য ছিলোনা তা মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে আজ পর্যন্ত মওদুদীবাদী জামায়াতে ইসলামী আদর্শে পরিচালিত রাজাকারদের কর্মকান্ডের প্রতি আমাদের ঘৃণাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

১৯৭০ সালেও পশ্চিম পাকিস্তানে এক সংবর্ধনায় জামায়াত নেতা গোলাম আযম বলেছিলেন- উর্দুই পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের সাধারণ ভাষা। তিনি বলেন, ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের সময় তিনিও এতে অংশ নিয়েছিলেন যা তার জীবনে চরম একটি ভুল ছিলো। ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল রাজশাহীতে গোলাম আযম বলেন – “জয় বাংলা” স্লোগান ইসলাম ও পাকিস্তান বিরোধী। তিনি বলেন বাঙালিরা কখনো জাতি ছিল না। মূলতঃ এইসব প্রেক্ষাপটেই জামায়াতে ইসলাম পাকিস্তানি রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্বিচার বাঙালি নিধনযজ্ঞ ও ব্যাপক ধ্বংসলীলার মাত্র ৬ দিন পর পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক গোলাম আযম ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে এক ভাষণ দেন। যার সারবক্তব্য হচ্ছে- জামায়াতে ইসলামী এখন পূর্ব পাকিস্তানের হর্তাকর্তা হতে যাচ্ছে। তাঁর ভাষণ শুনে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল যুগপৎ বিস্মিত ও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। কারণ গোলাম আযম বা জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতাসীন দলের কেউ ছিলনা। পূর্ব পাকিস্তানে তখন পাকিস্তান সমর্থক আরো রাজনৈতিক দল ছিল। যেমন- মুসলিম লীগের বিভিন্ন গ্রুপ, পিডি.পি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সহ আরও বিভিন্ন দল। কিন্তু একমাত্র গোলাম আযমই ঢাকা বেতার থেকে এমন উষ্কানিমূলক বেতার-বক্তৃতা দেন। ভাবটা এমন ছিল যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর বুঝি জামায়াতে ইসলামী পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতায় চলে এসেছে।

২৫ মার্চের সে ভয়াল রাত্রে পাকিস্তান কর্তৃক সংগঠিত গণহত্যায় যে জামায়াতে ইসলামী সরাসরিভাবে ইন্ধনদাতা এবং প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী একট দল তা সহজেই অনুমেয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে জামায়াতে ইসলামীর অপতৎপরতায় কিভাবে রাজাকার, শান্তিকমিটি, আলবদর, আলশামস এগুলো গঠিত হয় এসবকিছু নিয়ে পাঠকদের জন্য পরের পর্বে থাকছে চমকপ্রদ কিছু তথ্য। মহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘঠিত দীর্ঘ নয়মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জামায়াতে ইসলামীর সেই অপতৎপরতাগুলো জানলে গা শিউরে উঠবে আপনাদের।

(চলবে…….)

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী’র অপতৎপরতা- প্রথম পর্ব

তথ্যসূত্রঃ

★ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
★ ১৯৭১ সালে প্রকাশিত পত্রিকা সংকলন।
★ স্বাধীনতার দলিল (২য় খন্ড)

লেখার কিছু কিছু অংশ তথ্যসূত্রে উল্লেখিত বইগুলি থেকে হুবহু তুলে ধরা হয়েছে। কারন ইতিহাস মনগড়া নিজের মত করে কিংবা বানিয়ে লেখা অনূচিত বলে মনে করি।

৩০৮জন ১০৫জন
51 Shares

৩০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য