পর্বতকন্যের ইতিকথা

প্রদীপ চক্রবর্তী ১১ আগস্ট ২০১৯, রবিবার, ০৫:০৮:২৩অপরাহ্ন উপন্যাস ৬ মন্তব্য

#পর্ব_২১

বেশ কয়েকদিন হলো আমার জ্বর কমছে না। তার সাথে বিষণ অসুস্থতায় ভুগছি।
চোখে ঘুম আসেনা রোজ রাত্রিবেলা অতন্দ্র প্রহরী হয়ে বিছানায় কখনো বা বারান্দায় গিয়ে একা বসে থাকতাম। পার্বতী অনেককাল আগে বাড়ি চলে গিয়েছে।
যদি সে থাকতো তাহলে আমার একটু খুঁজ খবর করত।
বেশ শূন্যতার আর্তনাদে ভুগছি আমি তার স্মৃতিতে।
কবে বা আর দেখা হবে। তার সাথে কি বিয়ের পীড়িত বসা হবে। এসব ভেবেচিন্তে রাত্রি কাটিয়ে দিলাম কখনো স্বপ্নেঘোরে কখনো বা একাকীত্বের নির্বাকে।
পরেরদিন সকালবেলা ডাক্তার দেখাতে চলে গেলাম বলরাম দাদার সাথে কলকাতায়। সারাদিন ট্রেনে কাটিয়ে সন্ধ্যা সাতটার দিকে ডাক্তার দেখিয়ে স্টেশনে এসে বসে আছি। বলরাম দাদা আমার জন্য দশ টাকা দিয়ে বাদাম কিনে দিলেন আর বললেন খাওয়ার জন্য।
শীতের রাতে কনকনে হিমেল পরশে গরম গরম বাদাম ভাজি খেতে বেশ ভালো লাগছে।
হঠাৎ করে স্টেশন চত্বরে পার্বতীর বাবা বিলাস চৌধরী আমাদের দেখে আনন্দে আত্মহারা। বলরাম দাদা ও আমার সাথে বিলাস চৌধরী করমর্দন করে নিলেন।
আগামীকাল বিলাস চৌধরীর মায়ের শ্রাদ্ধ। আমাদেরকে সাথে করে নিয়ে গেলেন ওনার বাড়িতে।
পার্বতীর মা বলরাম দাদা ও আমাদের দেখে আনন্দিত।
এদিকে বাড়িতে উঠেই দেখলাম পার্বতী ঠাকুরঘরে বসে তাদের আরাধ্য দেবতার পূজাঅর্চনা করছে।
শুনেছি পার্বতী ছোটবেলা থেকে ধর্মপরায়ণ ও ভক্তিপরায়ণ।
বিলাস চৌধরীর বাড়িতে আসার সময় আমার ঔষধপত্র কিনে দিয়েছেন বলরাম দাদা।
রাত্রি প্রায় এগারোটা পনেরো মিনিট আমি আর বলরাম দাদা শুয়ে পড়লাম। আজ একটু সুস্থতার আভাস পাচ্ছি। শীতল পরশে মন্ত্রমুগ্ধ হাওয়াতে ধেয়ে আসছে পার্বতীদের মন্দিরের পাশে শিউলি ফুলের সুশোভিত গন্ধ। এ যেন শীতের রাতের এক নির্যাস মোহনিয়তা।
প্রেমময়ীর রাতজাগা প্রেমিক যেখানে পায় এক আনন্দের বাহার আর অভিসারে ঝরে পড়া শিউলি ফুলের পরশ ছোঁয়া মনোলোভা। ফুলের মোহনীয়তায় আমি যে মাতাল।

ফুটে ছিলো শিউলি শীতের রাতের আঁধারে,
ঝরে আছে পড়ে প্রেমময়ীর অভিমানের ঘোরে।

#পর্ব_২২

বাড়ির বড়কর্তা বিলাস চৌধরী ভোরবেলা সকলকে ডেকে তুলে নিলেন। আমি আর বলরাম দাদা তাড়াহুড়া করে উঠে পড়লাম। বাইরে থেকে অনেক আত্মীয়স্বজন এসেছে বিলাস চৌধরীর মায়ের শ্রাদ্ধে।
তখন প্রায় সকাল সাতটা পার্বতী শিউলি ফুল তুলছে। আমি এক পা দু পা এগিয়ে পার্বতীর কাছে গিয়ে বলছি ফুল তুলতে পারি কি?
সে বলে উঠলো না থাক্। যাই হোক সে না বললেও আমি তার সাথে ফুল তুলতে লাগলাম।

অনেক কথা বলা হলেও বলা হয়নি পার্বতীকে যে আমি কত ভালোবাসি তাকে !
আর আমার বিশ্বাস ছিলো পার্বতী আমায় বেশ ভালোবাসতো। শিউলি গাছের নিচে বসেবসে দুজন আপনমনে লিখছি দুজনের নামের আদ্যক্ষর।
যদি ভারতবর্ষে কোন নিপুণ কারুকার্যে শিল্পীর দক্ষতা বিচার করা হয় তাহলে আমাদের দুজনের নাম খাতায় থাকবে তা নিশ্চিত।
নিজের প্রশংসার কথা বাঁধ দিলাম প্রশংসা করতে হয় বড্ড পার্বতীর। তাহার হাত যেন দেবী সরস্বতীর আর্শীবাদ প্রাপ্ত। শিউলি ফুল দিয়ে এতো সুন্দর করে এঁকেছে নিজের নামের চন্দ্রবন্ধনী। তা যেন গ্রথিত এক হিয়ার মাঝে। এদিক পুরোহিত মশাই চলে এসেছেন পূজার জন্য ফুলের প্রয়োজন। তাই পার্বতীকে ডাক দিয়ে পুরোহিত মশাই বলছেন তাড়াতাড়ি ফুল নিয়ে আসতে।
যদিও পার্বতীকে এই সুবাদে অনেক কথা বলার ছিলো তা আর বলা হয়নি। পার্বতী তাড়াহুড়া করে ফুল তুলে নিয়ে যাচ্ছে পুরোহিত মশাইয়ের কাছে। পরে কথা হবে এই কথা বলে পার্বতী চলে যাচ্ছে। বাড়ির সবাই ব্যস্ত।
সকালটা শুরু হয়েছিল শীতল পরশ আর শিউলি ফুলের মোহনীয় গন্ধে আর পা ভেজা তৃণ শিশিরজলে।
রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে আনমনা স্বপ্নঘোরে।
রাতভর অবশ করে দিয়েছিল আমায় প্রতিটি স্নায়ুকণিকা। শীতের দুপুর আর উষ্ণ চায়ের কাপে দিন কাটাতে কাটাতে চলে এসেছে বিকাল।
বিলাস চৌধরীর মায়ের শ্রাদ্ধক্রিয়া এদিকে সম্পূর্ণ হয়েছে। সবাই খেয়েদেয়ে বাড়ি ফিরছে। যদিও আমাদের আজ বাড়িতে ফেরার কথা ছিলো। কিন্তু আজ যাওয়া হয় নি।
যাই হোক আমি খেয়েদেয়ে এখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে একটু আরাম আয়েশ নিচ্ছি।

#পর্ব_২৩

পার্বতী পাশের কামরা থেকে এসেই নিজ বাহু বেষ্টনীতে স্বভাবসিদ্ধ মুচকি হাসি দিয়ে আমায় বলছে এইবার তোমার মুখটি দেখতে পেরেছি।

আর বলছে..
আমি যে চাই তোমারে,
শত যুগে চাহিবার তরে।

আমি যে নির্বাক। এ যেন পশ্চিমান্তের সূর্য মৃগরাজ রূপে আছে বলয় বৃত্তে। গলা ঝেড়ে পার্বতী আমায় বলছে অজস্র ধন্যবাদ দীপ।
আমরা দুজনকে যে মনেপ্রাণে ভালোবাসি তা আমরা দুজনি জানি। কিন্তু নিয়তির পরিহাস আমাদেরকে কী উপহার দিবে তা আজও কেউ জানি না। আকাশের মেঘ এবার পাহাড়ে ফিরে চলেছে। যা হয়েছে ভুলে যাও। নতুন করে দুজনের আবার শুরু হউক নতুনত্বের ঠিকানা। একে অপরের পাশাপাশি থাকব চিরকাল।
স্বর্গের পথটা হবে দুজনের কর্মের উপর। দুজনি দুইপ্রান্তে। কিন্তু অশরী আত্মা যে আমাদের এক।
মনের গভীর আর বাস্তবতায় অনুসরণ এক হলেও বাস্তবতা যে চির অম্লান। সময় স্রোতধারা আর কালান্তে যে সময় ধেয়ে আসছে নিকটে পার্বতী তা জানলেও এসব ভুলে গিয়েছে। তাই পার্বতীর বাগদান চার মাস পর। আমিও যে থাকে ভালোবাসি সেই সুবাদে তার সাথে বিবাহের পীড়িত যে আমার বসার ভাগ্য নেই।
তা জেনে শুনে কেন যে আমি থাকে ভালোবাসি সেও যে কেন আমায় ভালোবাসে তা আমি আজও বুঝে উঠতে পারছি না। তার সাথে অল্পদিনের অনেক স্মৃতি আর অনেক ভালোবাসা যা ভুলে যাওয়ার নয়। সে যে তার পিতার কথা অমান্য করেও এই বিবাহের পীড়িতে বসতে চায় না। তবুও যে তাকে নিয়তির কাছে থাকে মানতে হয় সকল কিছু।
দুজনের ভালোবাসা ইতিহাসের পাতায় রয়ে যাবে। কিন্তু হারিয়ে যাব যে দুজন বিস্তৃতির  অন্তরালে। নিজেকে কেমন করে বুঝিয়ে রাখি।
কেমন করে বা বুঝাই পার্বতীকে।

#পর্ব_২৪

দিন যাচ্ছে দুজনার অনেক স্মৃতির স্রোতে। সাথে নির্ভর করছে ললাটের ভাগ্যরেখা আর সিঁথির সিঁদুর।
দুটি দেহের একি প্রাণের গ্রন্থি বন্ধন। পুলকিত প্রেমের আবাস আর কাশফুলের গায়ের শীতের শেষ আমেজতা। শুনেছি ভালোবাসা যত গভীর হয় পূর্ণতা তত চিরস্থায়ী হয়!
আগামীকাল চলে যাব বলরাম দাদার সাথে বাড়িতে। বিনোদ দুদিন ধরে একা। না জানি কত গালিগালাজ করছে আমায়। ওকে একা রেখে এসেছি। রাত্রিবেলা খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঠিকমতো করে চোখে ঘুম আসছে না। এ যেন আমি নিদ্রারোগী ভুক্তভোগী। রাতের ঘুমটা ছিঁড়ে গেছে কারো বিভৎস আর্তনাদের চিৎকারে। জীবনে অনেক মর্মন্তুদ আর্তনাদ শুনেছি শুনার পর সহ্য করে নিয়েছি। গভীর রাত্রিতে এমন ক্লান্তিকর মর্মন্তুদ আর্তনাদ কখনো শুনি নাই।
কত স্বপ্নঘোরে চোখের পাতায় কত ঘুমপরী ছোঁয়ে যায়।
তাও যে টের পাই নি কখনো। আমি যে হারিয়ে আছি পার্বতীর স্বপ্নঘোরে।
তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখটা আজ কয়েদি সেজেছে মনের অজান্তে। ধীরে ধীরে কাক ডাকা ভোরের অভিপ্রায়ে ক্লান্তিকর মর্মন্তুদ আর্তনাদ আর শুনতে পারছি না।
আগন্তুকের কৃষ্ণাঙ্গ আর সুশোভিত শীতের শেষে পড়ে আছে কত শিউলি। যেখান থেকে ভেসে আসছে কত মৃদু সুগন্ধতা আর মোহনিয়তার নির্যাস ছোঁয়া।
দেবী রূপে পার্বতীর কালো কেশে মেঘ জমেছে গ্রাম্য অজিনে।
এদিকে আমাদের যাবার সময় এসেছে তার সাথে বেলা বাড়ছে। স্নান আহার শেষ করে সবার সাথে গল্প করছি।
আজও আমাদের থেকে যাওয়ার জন্য আহ্বান করা হচ্ছে। এ যেন আত্মীয়তার রেশ কাটছে না। তবুও যে যেতে হয়।

#পর্ব_২৫

শীতের পরশতা আর কাশফুলের গায়ে শিশিরভেজা শীতকাল আসার আগে পার্বতীর ছন্দনামে লিখেছিলাম কোন এক হেমন্তীনিকে।
ওগো হেমন্তীনি আজ হতে গায়ে চাদর ডেকে নাও। ধীরে ধীরে হেমন্তের কুয়াশা চারদিকে কালোছায়া দিয়ে ডেকে আছে। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ো দেখে নাও পূর্ব আকাশের ভানু ধীরে ধীরে উদয় হচ্ছে। প্রভাতের সদ্যফোটা সোনার বরণ ফুল গুলো কাক ডাকা ভোরে হেসে হেসে গন্ধের আবরণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
আর ফুলের প্রতিটি পাপড়িতে কুজ্বটিকার আবরণে আবরিত হচ্ছে ফুলের কুসুম কলি। সদ্যফোটা ফুলের কুসুম কলি থেকে মৌমাছি ফুলের রেণু নিচ্ছে যুগল বন্দন করে। তার সাথে ফুলের গায়ে যখন প্রজাপতির ডানা উড়ে তখনি আমার মন উতারিয়া করে দেয়।
ওগো হেমন্তীনি যেইদিন তোমার দুটি চঞ্চল আঁখি চাদর দিয়ে ডেকে রেখেছিলে সেইদিন হতে তোমার পিছু পিছু ছুটেছিলাম তোমার দুটি চঞ্চল আঁখি দেখার জন্য।
অনেক হয়েছে হেমন্তীনি পূর্ব আকাশের ভানু ধীরে ধীরে দক্ষিণায়নে গমন করছে। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে পড়ো।
ঐ দেখে নাও পল্লী গায়ের দীঘির পারের   খেজুর গাছের উপর বাঁধানো কলসিতে অনেক রস রয়েছে দুজন মিলে তৃষ্ণা মিঠিয়ে আসি। হেমন্তীনি জানি তোমার হৃদয়ে অনেক ভালোবাসা আছে। যে ভালোবাসিতে জানে-সে ভালোবাসিবেই। তাই আমি তোমায় অনেক ভালোবাসি। জানি তুমি আমার হৃদয়ের ভালোবাসাটুকুকে রিক্ত করে দিবে না। আমার এমন প্রার্থনাটুকু যেন তোমার হৃদয়ে একটু শক্ত করিয়া নির্মাণ করে।
হেমন্তীনি জানো তোমার জন্য একখানা চিঠি লিখতে বসেছি চাদর দিয়ে মুখ মুড়িয়ে। বিষণ ঠান্ডা,হাত থেকে কলম কষে পড়ছে তবুও তোমার জন্য আমার এই চিঠিখানা লিখতে বন্ধ করিনি। আমার এমন হাড় কাপানো শরীর দেখে পূর্ব আকাশের ভানু হাসছে।
কেন যে পূর্ব আকাশের ভানুর আলোকবর্তিকা আমার গায়ের উপর প্রলেপন হচ্ছে না। সবটুকু আলোকর্বতিকা কুয়াশার আবরণে ডাকা ঘাসের উপর।
ওগো হেমন্তীনি জানো ভানু মামার উপর রাগান্বিত হয়ে প্রদীপ শিখা প্রজ্জলন করে তোমার জন্য আমার চিঠিখানা যখন পুনরায় লিখতে বসি তখনি পূর্ব আকাশের প্রভাতের ধমকা হাওয়া আমার প্রদীপ শিখা নিভিয়ে দিয়ে আমার চিঠিখানা উড়িয়ে নিয়েছে।
হেমন্তীনি এ কেমন অভিশাপ তোমাকে চিঠিখানা প্রেরণ না করতেই পূর্ব আকাশের ধমকা হাওয়া এসেই উড়ে নিলে আমার চিঠিখানা।
হেমন্তীনি তোমার কাছে আমার ভালোবাসার চিঠি পুরোপুরিভাবে লিখে দিতে পারলাম না।
ঐ পূর্ব আকাশের ধমকা হাওয়া আমার চিঠিখানা যদি তোমার কাছে পৌছে দেয় তাহলে আমার ভালোবাসার অর্ধাংশ লেখনী পূর্ণাংশ করে নিও।
হেমন্তীনি যদি কোনদিন তোমার সাথে দেখা হয় তখনি দুজন একসাথে ধূলা মাখিয়া,হাওয়ায় উড়িয়া,শিশিরে ভিজিয়ে,রোদের আবরণে আবরিত হয়ে ঐ পল্লী গায়ের দীঘির পারের খেজুর গাছের তলায় দুজনি বসে ভালোবাসার ছন্দ লিখব। হেমন্তীনি তোমায় খুঁজে পাইনি বলেই আজ তুমি এতোই অভিমানী।
হেমন্তীনি জেনে নিও ফুলের পুষ্পমন্জুরিতে মৌমাছি ও প্রজাপতির যুগল বন্ধন ঘটে।
আমার দেহ যদি কোনদিন হয়ে যায় নিথর ওগো হেমন্তীনি সেইদিন আমার নিথর দেহ দূরে ফেলে দিওনা। আমার নিথর দেহ একস্থানে রেখে দুটি হাত মুঠো করে ধরে নিবো তবুও তোমায় অনেক ভালোবাসি হেমন্তীনি।
প্রকৃতির স্পর্শতা আর প্রেমময়ীর নির্যাস ভালোবাসায় হেমন্তীনি আজ পার্বতী।
..
ক্রমশ

২৭৬জন ১৮২জন
54 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ