পর্বতকন্যের ইতিকথা

প্রদীপ চক্রবর্তী ৩ আগস্ট ২০১৯, শনিবার, ০৯:১৪:৫৫অপরাহ্ন উপন্যাস ১৩ মন্তব্য

#পর্ব_১৬

এদিকে পার্বতীর বাবা বিলাস চৌধরী বেশ গুরুগম্ভীর ভাবে বসে বসে হুকা টানছেন।
বলরাম দাদা এক পা দু পা করে আগাতে লাগলেন বিলাস চৌধরীর দিকে। দুজন মিলে এই গভীর রাত্রিতে আপনমনে হুকা টানছেন। পার্বতী স্তব্ধ হয়ে পাশের কামরায় কাঁদছে।
বিনোদ কুম্ভকর্ণের ন্যায় ঘুমিয়ে আছে। আর আমি বড্ড একা হয়ে পার্বতীর কথা ভাবছি।
একদিকে বিদীর্ণ অমানিশা রাত্রি অভিসারের শেষ নির্যাসে প্রতিটি পত্রবৃন্ত মৃগতৃষ্ণা খুঁজে। সেই সময়ে অশ্রুজলে ভাসে পার্বতী। পাহাড়ের শীতলতা আর হরিণীর ক্রুদ্ধ শিংয়ে বৃষ্টি ছুঁয়ে শান্তির পরিহাস ঘটে। নদীর কত ক্ষত মোহনায় এসে নিয়ে যায় সাগর। পার্বতীর গায়ে মোচড় খেয়ে গাছের শেকড় ধরে অর্ধশূন্যে হয়ে। মরুভূমির তপ্ত বালুর গায়ে শীতলতা এনে দেয় শিশিরজল। অব্যক্ত কত যন্ত্রণা আর চিরাচরিত নিয়মের নিয়তিতে আজ পার্বতী প্রায় বাকরুদ্ধ। শেষের অশ্রুবিন্দু আর নিয়তির চিহ্নচাপে ভুগতে ভুগতে পার্বতী দিনদিন অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
গাছের পাতা বৃদ্ধ হলে যেমন ঝরে পড়ে তেমনি করি পার্বতীর জীবন ঝরে পড়ছে।
বিবাহের পীড়িত বসবে না এই কথা বলাতে পার্বতীর উপর বেশ কদিন ধরে অগ্নিশর্মা হয়ে আছেন পার্বতীর বাবা বিলাস চৌধরী।
যদিও প্রত্যেক পিতা চায় তার মেয়েকে সৎ পাত্রে কন্যা দান করতে। পার্বতী এসবকিছুতে মেনে নিলেও সে এই বিবাহের পীড়িতে বসতে নারাজ।
পার্বতীর আবেগ আপ্লুত চোখেরজলে নিজেকে ডুবিয়ে নিচ্ছি তার ললাটে টিপ কাজল কালো নয়নের মায়ায়।
তার প্রতি নিজেকে যে কোথায় থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি এ যেন আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন দেখা আর শরৎ সিন্ধুতে শিউলি ফুলের মোহনীয় গন্ধে আকুলতার এক রূপকথা।
যদিও পার্বতীর প্রেমে পড়া বারণ। তাকে পাবো না নিশ্চয়। কয়েকদিন পর তাহার বাগদান।
আর এই গভীর রাত্রিতে তাকে নিয়ে আনমনা হয়ে তাকে স্বপ্নঘোরে চিৎকার করে বলছি পার্বতী তোমায় ভালোবাসি ভালোবাসি।
হঠাৎ করে আতকে উঠে নিজে নিজেকে প্রশ্ন করে বলছি এসব আমি কি বলছি!
না না এসব স্বপ্ন দেখাটা যে বৃথা। না না এসব নিয়ে আমি ভাবনা না কখনো না।

#পর্ব_১৭

ধীরে ধীরে সকাল নামছে। আমিও স্বপ্নের ঘোর কেটে কিভাবে উঠি আর কিভাবে বা কেমন করে পার্বতীকে বলি পার্বতী তোমায় ভালোবাসি। আমার শূন্যতার বুকে দাবানল। আর হাতের রেখা বিলুপ্ত। দিনভর জীর্ণদেহে তৃষার্ত মৃগের মত আকুল কান্না। পার্বতীর একাকীত্ব যে নিশিযাপন আর্তনাদের সারস কান্না। তাহা দেখে আমি যে বড্ড নিরুপায়।
দুপুর ঠিক বারোটা ছুঁই ছুঁই হঠাৎ করে বলরাম দাদার বাড়িতে ভগিনী জয়িতা তার পিত্রালয় ছাড়িয়া স্বয়ংবরা হয়ে মাতুলালয়ে প্রবেশ করিয়াছে। মেয়েটির হবু বর বর্তমানকালের ডিজিটাল যুগের যুগোপযোগী শিক্ষিত।
বরের শিক্ষাগত যোগ্যতা আমার পুরোপুরিভাবে না জানা থাকলেও অনুমানের উপর নির্ভর করে বলতে পারি স্নাতক পাস। আমার মত করে জয়িতার হবুবর বেকারত্বের অভিশাপে জড়িত। আর জয়িতার শিক্ষাগত যোগ্যতা সঠিকভাবে যাচাই করতে পারিনি। কেননা ডিজিটাল যুগের মেয়ে তো প্রেমবিদ্যা ও শিক্ষাদীক্ষার দিকে এগিয়ে। এরা নিজেই স্বামী নির্বাচন করিয়া থাকেন।
কেননা স্বয়ং কন্যা যে জায়গাতে স্বামী নির্বাচন করিয়াছেন সেখানে অন্য কোন অপশক্তি হানা দিতে পারেনা।
কনে এবং বর দুজনই মাতুলালয়ের লক্ষীর
ভান্ডারের উপর নির্ভর করে সংসারী হইয়া জীবনযাপন করিতেছেন। কেননা হবু বর চাকরির হাল এখনো ঠিকমতো ধরেননি। কিন্তুু দুঃখের বিষয় মাতুলালয়ের লক্ষী ভান্ডার যে ইঁদুর প্রবেশ করিয়াছে সেদিকে মামার কোন চক্ষু দৃষ্টি পড়েনি। হঠাৎ একদিন দৃষ্টিপাত হইলে মামার অশ্রুজল ঝরে পড়ে।
মামা সংসারটাতে দিনদিন অলক্ষীর দৃষ্টিছায়া পড়ছে এই নিয়ে মামা মস্ত বড় চিন্তায় মগ্ন। আর অন্যদিকে ভগ্নীপতির কোন চাকরী নেই। অন্য কোন কাজ করার কথা বলতে পারেন না মামা।
অন্যদিকে মেয়েটি তার মামাকে আশ্বাস দেয় যে মামা তোমার জামাই চাকরী পেয়ে গেলে সমস্ত সংসার চালিয়ে নিবেন এখন একটু কষ্ট করে মামা তুমিই সংসারটা চালিয়ে নাও।
অন্যদিকে ভগ্নীপতিকে একটু ভালোমন্দ না খাওয়ালে তো ভবিষ্যৎবাণী মামার শুনতে হবে। লক্ষীর ভান্ডারে যে ইঁদুর প্রবেশ করিয়া সে পেট ভরিয়া মাতুলালয় ছাড়িয়াছে সেদিকে মামার মোটেও দৃষ্টি পড়েনি।
মাতুলালয় ছাড়িবার আগে কনে ও বর দুজনের বাগদান ও সম্প্রদান মামা সুসম্পন্ন করিয়াছেন।
তাই যে মেয়ে স্বয়ংবরা হয়ে তাকে সে যাহার ঘরে প্রবেশ করিবে ইঁদুরের মতো ধানের ভেতরের চাল খেয়ে ধানের ভূষি রেখে যাবে।
যাই হোক বলরাম দাদার ধৈর্যশক্তি বেশ ভালো।

আমার আর বিনোদের হাতে সময় নেই আর দিনকতক আছি। তারপর বাড়ি ফিরব।
যদিও আমাদের আদরযত্নের কমতি নেই।
বলরাম দাদা আমাদেরকে বললেন বিয়ে পরে বাড়িতে ফেরার জন্য।
পার্বতী দিনরাত নির্বাক হয়ে বসে আছে।
পাহাড়ের সকল দুঃখ কষ্ট ঝর্ণাধারা ধুয়ে নিলেও যে পার্বতীর দুঃখ কষ্ট আর একাকীত্ব দিনদিন বেড়ে চলছে।

#পর্ব_১৮

জন্ম,বিবাহ,মৃত্যু আর আকাশের কৌতূহলী নক্ষত্র আজও ঈশ্বরের কাছে সমর্পিত। না হলে মানুষ মহামৃত্যঞ্জয় মন্ত্রের কাব্য লিখত। আর ঈশ্বরকে মানুষ ভুলে যেত যেমন করে নদীতে পলি জমলে নদী ভুলে যায় তার চলার গতিপথ।
এই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে আমি বসে আছি। নিশ্চয় পার্বতীর বিয়ে হবে না।
শীতের দিনে যতটুকু রৌদ্র আসে বেলকুনি ঘিরে ততটুকু রৌদ্রের আলো আসেনা পার্বতীর কামরায়।
সে যে আছে এক বদ্ধ ঘরের রৌদ্রহীন ক্লান্ত ছায়াতলে।
হঠাৎ করে খবর আসলো পার্বতীর ঠাকুমা অদ্য দুপুর দুই ঘটিকার সময় সকলকে শোকসাগরে ভাসাইয়া ইহলোকে গমন করিয়াছেন। এই কথা শুনিয়া তাড়াতাড়ি বিলাস চৌধরী পরিবারের সকলকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরছেন। পার্বতী তার ঠাকুমার মৃত্যুতে অশ্রুজলে ভাসছে। কেননা পার্বতী মুখে তার ঠাকুমার অনেক গল্প শুনেছি আমি। ঠাকুমার সাথে পার্বতীর ছোটবেলার অনেক স্মৃতি জড়িত। যা আজ তা ভুলে যাওয়ার নয়। তার একবছর আগে পার্বতীর দাদু  পরলোকগমন করিয়াছেন। এই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে বিলাস চৌধরী আজ মাতৃ শোকে কাতর।
সকালবেলা আমার একটু অসুস্থবোধ করছিলো।
তাই বলরাম দাদার সাথে যাইনি হুগলিতে।
আজ বলরাম দাদা রায়বাহাদুর খেতাব পদে শপথ গ্রহণ করবেন। সাথে করে বলরাম দাদার সাথে বিনোদ গিয়েছে। বাড়িতে আজ একা থাকলেও আজ সাপ্তাহিক ছুটি ছিলো। তাই আমি আর আবির দুজন মিলে লুডু খেলছি। এদিকে বিলাস চৌধরী তাড়াহুড়া করে বাড়ি ফিরার জন্য ট্রেনের টিকেট করতে পাঠিয়েছেন বলরাম দাদার বার্তাবহনকারী হরনাথকে। সে বিকাল চারটে ট্রেনের টিকেট কেটে নিয়ে এসেছে। বিলাস চৌধরী সকলকে নিয়ে বিকাল চারটের দিকে রওয়ানা হলেন।

#পর্ব_১৯

পার্বতী তার প্রিয় ঠাকুমার জন্য অশ্রুজলে ভাসলেও ললাটের ভাগ্যরেখা উন্নতির দিকে এগুচ্ছে!
কেননা বিলাস চৌধরীর মাতৃবিয়োগের ফলে পার্বতীর এই বিবাহ আর একবছর পর সম্পাদন হবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন পার্বতীর পিতা বিলাস চৌধরী
বরপক্ষকে। এ কথা শুনে পার্বতী অনেক অনেক আনন্দিত। এই আনন্দের রেশ আমাকে এক মুগ্ধতার প্রলেপ দিয়ে যায়।
যাবার বেলা পার্বতী আমাকে একখানা পত্র দিয়েছে বলছে শীঘ্রই আবার দেখা হবে…।
এই কথা বলে পার্বতী তার পিতার সাথে বাড়িতে চলে যাচ্ছে।
পত্রখানাতে একরাশ মুগ্ধতার বার্তা লেখা ছিলো..

কোন এক রাতের আঁধারে,
দেখা হবে নিভৃত কাননে।
জলমল আবরণে,
স্নিগ্ধ রজনীতে।
ছোঁয়ে যাবে দুজনের মনপ্রাণ,
দুজন ভালোবেসে যাব প্রত্যক্ষণ।
একি প্রাণে,
একি বন্ধনে।
ইতি
তোমারি পার্বতী।

পত্রখানা পড়ে আমি আবেগ আপ্লুত হয়ে অশ্রুজলে ভাসছি। আর ভাবছি নিশ্চয় পার্বতী আমায় বেশ ভালোবাসে। সত্যিই ভালোবাসা এমন করে আসে। সাথে করে নিয়ে আসে একি বন্ধনে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। হয়তো পার্বতী আমায় এই অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে।

অপরাহ্ণবেলায় যাবার বেলা আমিও থাকে বললাম দেখা হবে পার্বতী।
কোন এক আলোকিত পূর্ণিমারাত্রিতে মধুময় মধুর লগনে,
পুলকিত প্রেমে।

আমার প্রতি পার্বতীর কিছুটা ভালোবাসা জাগলেও পার্বতীর বাবা মায়ের ভালোবাসা জাগবে কি না তা জানি না। হয়তো আমার প্রতি ভালোবাসা কিছুটা কমতি আছে। কেননা পার্বতীর সাথে বিবাহের পীড়িত বসার ভাগ্য আমার নেই।
কিন্তু পার্বতী আমায় মনেপ্রাণে বেশ ভালোবাসে। তার প্রতিও আমার যে ভালোবাসার কমতি নেই।

#পর্ব_২০

বেশ কদিন ধরে চোখে ঘুম নেই। নিদ্রাহীন রজনী আর পার্বতীর অশ্রুজলে নিজেরও অশ্রুজল ভাসছে।
কখনো কখনো পার্বতীর পুলকিত প্রেমের স্বপ্নে মাতাল হয়ে অভিসারে শেষে দুচোখ ভরে অর্ন্তবেক্ষণ করতাম।

সন্ধ্যার আলোকোজ্জ্বলে গোধূলির আরক্ত আভাকে বিমোহিত করে একঝাঁক সরালি উড়ে যাচ্ছে দিগন্তছোঁয়া আপন নীড়ে। যেখানে সারাদিনের ক্লান্তির বিশ্রাম হবে। আর আপনমনে গ্রথিত হবে নিজ নিজ কাব্যরসের ইতিকথা।
এদিকে খেলার মাঠ থেকে পাড়ার কিশোরকিশোরীরা ধূলি উড়িয়ে নিজ গায়ে ধূলি মাখিয়ে বলরাম দাদার পুকুরে স্নান করে নিজ নিজ গৃহে ফিরছে। এসব দেখে আমার বেশ আনন্দ লাগছে। এই স্মৃতিতে দেখে ফিরে গেলাম আমার শৈশবে।
আমার ছোটবেলার বন্ধু সুমন,রিফাত তপু,পুরন্জন আর সন্জিতা,তমা সবাই মিলে একসাথে স্কুলে যেতাম।
স্কুলের পাশে ইটেরভাঁটা,পদ্মদীঘি আর রেলপথ যেখানে রয়েছে আমাদের অনেক স্মৃতি। মাঝেমধ্যে আমরা স্কুল পালিয়ে পাশের বাড়ি নিরোদ দাদুর বাড়িতে গিয়ে পেয়ারা,নারিকেল আর কালোজাম খেতাম।
গাছ বেয়ে উঠত সুমন আর তপু। আর আমরা বাকি চারজন মিলে নিরোদ দাদুর পাশে বসে বলতাম দাদু একটা গল্প শোনাও। উনি বলতেন কিরে আজ তোমরা স্কুলে যাওনি? না দাদু আজ স্কুল বন্ধ তাই।
এসব মিথ্যা কথা বলে গল্প শুনে ধীরে ধীরে সবাই মিলে নারিকেল,পেয়ারা আর কালোজাম নিয়ে পদ্মদিঘীর পাড়ে বসে সবাই মিলে খেতাম আর কতনা আনন্দ।
পরেরদিন স্কুলে ফিরে বাংলা বিভাগের ম্যাডাম আমাদের সকলকে একত্রিত করে ব্রেঞ্চের নিচে মাথা রেখে পেছন থেকে ধপাস ধপাস করে বেত দিয়ে কয়েক ঘা বসিয়ে দিতেন। স্কুলে ফিরার পথে ইটেরভাঁটার কালো ধোঁয়া আর ইট কিভাবে তৈরি করে এসব দেখতে আমি আর সন্জিতা চলে যেতাম রোজ।
একদিন সন্জিতাকে রেখে আসলে পরের দিন সে আমার স্কুলের ইউনিফর্মের কয়লার কালো দাগ লাগিয়ে দেয়। বাড়িতে গিয়ে মায়ের বকুনি।
কবে আসবে কালবৈশাখ এই অপেক্ষায় আমরা সকলে মিলে প্রহর গুনতাম।
হারিয়েছি আজ প্রাণের শৈশব। আজকাল একত্রে বসা হয় না শৈশবের প্রিয় বন্ধুদের সাথে।
স্মৃতির স্রোতের শৈশবের স্মৃতি আজ ধূসর দর্পণে হেম।

.

ক্রমশ…

১৯৭জন ৯৪জন
42 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য