কবিতা লেকতে পারো?//৭

বন্যা লিপি ৬ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার, ০২:১২:১৭পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২৫ মন্তব্য

একটা দুটো নুড়ি পাথর কুড়াই…..
যত্ন করে টুকরি করে বোঝাই।
রঙিন সেসব পাথর দেখি
দু’চোখ ভরে ফাগুন আঁকি।
পথের ধারে বৈচি ফুলের ঝার
দূরন্ত সব কিশোর বেলা আমার।

স্বর্ন আভায় দিন যে কেবল শুরু!
একটা দু’টো প্রহর গোনা আরো।
হাঁটছি আমি,আমার সাথে ছায়া..
পরম স্নেহে আগলে রাখে মায়া।

নির্ভরতায় নতুন আরেক নেশা জুটে গেলো। প্রচন্ড বই পড়া, গান শোনা, এখন কিছু একটা লিখতে চাওয়া। পড়ার টেবিলটা দিনে দিনে, কারনে অ-কারনে প্রিয় থেকে আরো প্রিয় হয়ে উঠলো। আরো প্রিয় হয়ে উঠলো আমার কলম আর সাদা কাগজ। সাদা কাগজ আমার কেবল দেখতেই ভালো লাগে। ভীষণ ভালো লাগে। চোখের সামনে যখন মেলে ধরি দুধ সাদা রঙা নতুন সাদা কাগজ!কাগজের বুকে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে মসৃনতা স্পর্শ করি বারবার। অনেকটা সময় ধবল সাদায় কালো চোখের মনি মেলে ধরে রাখি।
এখানে গোপন ; খুব গোপন একটা কথা আজ আপনাদের বলেই দেই। হাসলে হাসতে পারেন! মনে করলে কিছু করতে পারেন; বলতে ইচ্ছে করছে যে! বলেই ফেলি;আম্মার মুখে শোনা এবং এই ক্লাস নাইনে ওঠা পর্যন্ত নিজেও ক্রমেই আবিষ্কার করলাম,….. আমি একা একা কথা বলি 😊 হ্যাঁ সত্যি! আমি কথা বলি একা একা আপনমনে। কখনো কলাবতী গাছগুলোতে হাত বোলাতে বোলাতে, আবার দুষ্ট ফড়িং সহজে হাতের নাগালে না এলে, আমি চোখ রাঙাই, ধমক দিয়ে বলি…. “কিরে! সমস্যা কি তোগো? আমি কি তোদের মেরে ফেলবো? উঁহু, মোটেও না! তোদের ধরে কিছুসময় ধরতে পারার আনন্দ নেবো মাত্র! তারপর আবার তোকে ছেড়ে দিয়ে দেখবো, কেমন স্বাধীনতা পেয়ে কতটা দূরে পালাস আমার থেকে?” মাঝে মাঝে আয়নায় নিজের সাথে কথা বলি নিজেকে নিয়ে, ” তুই এমন বোকা ক্যান? বুদ্ধি নাই ক্যান তোর একটুও? কেমন বকা খাস কেবল বন্ধুদের কাছে বোকা বোকা কথা বলে!”
এমন কত শত বকর বকর করি একা হলেই!

এবার কথা বলার মাত্রাটা একটু বেড়ে গেলো বলে মনে হচ্ছে। একা বিড়বিড় করে উপযুক্ত কবিতার পঙ্তি খুঁজে ফেরা। আমার কখনো আলাদা কোনো কবিতার খাতা বা ডায়রী নেই। স্কুলের খাতাতেই যখন যা মনে আসে লিখছি। লেখা শেষ হলেই আব্বার কাছে দেখাচ্ছি। আমার ছয় নাম্বার কাকুর আবার অনেকদিন হয়ে গেলো দেখা নেই। পাওয়াই যাচ্চেনা! দাদু’র বাসায় গেলে হয় তখন বাসায় থাকেন না, নয়তো আমাদের বা মেজো চাচার ঘরেও কিছুদিন ধরে আসছেন না।
কাকু’কে দেখাতেই পারছিনা লেখাটা! ম্যাগাজিনের ব্যাপারে জমাও তো নিতে হবে! বেশ কিছুদিন পার করে এলেন সন্ধ্যার পরে একদিন! যথারিতী খবরের কাগজ হাতে ধরে চোখের সামনে। সংকোচে কাকুরে জিজ্ঞেস করলাম ” কাকু কবিতা নিবানা? দেখবানা লিখছি?” একটু কাকু সম্পর্কে বলি। বড় হতে হতে দেখেছি এই কাকুটা একেবারে অন্য কাকুদের চেয়ে কেমন যেন আলাদা। কথা কম বলেন, এ স্বভাবটা আব্বার মতো। কিন্তু যখন বলেন প্রাণ খুলেই বলেন। হাসিঠাট্টা যখন করেন, তখন মন খুলেই করেন। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, দুনিয়ায় থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখেন একেবারে নিজের মতো করে। পরিবারের সবাই একসাথে হলে তখন কাকু আবার প্রাণবন্ত। প্রচন্ড রাগ দেখেছি, তবে তা দেখেছি আরো অনেক পরে।
সেদিন কাকু বেশ গাম্ভীর্য ধারন করে আছেন বুঝতে পারছি। সেভাবেই বললেন” লিখছিস্? কিন্তু সংকলন তো আর বের করা হবেনা রে! ” ব্যাস্, এটুকুই বলে গেট দিয়ে বের হয়ে চলে গেলেন। কিন্তু ওই যে বললাম! আমি লেখা নিয়ে ভাবি এখন দিনরাত। কি করে আরেকটা নতুন লেখা লিখবো? কয়েকটা জমেছে। আব্বা কারেকসন করে দিচ্ছেন। বছরের মাঝা মাঝি। নবম শ্রেনীর পড়াটা একটু বেশিই তখন। হলে কি হবে? আমি আমার মতো! ফখরুল আলম স্যার শ্রেনী শিক্ষক।স্যার নাম ধরে যতটা না ডাকতেন আমায়, তারচেয়ে বেশি সম্বোধন করতেন চাঁন (চাঁদ) স্যারের মা বলে। একদিন ক্লাশে বান্ধবি লুনা আমার খাতা টেনে নিলো। প্রায়ই লুনা আমার লেখা দেখলেই পড়ে। খুব সহজ সরল আর আমার চেয়েও বোকাসোকা টাইপ মেয়ে একটা। স্যার পড়াচ্ছেন। সবার দিকে খেয়াল রাখছেন। হঠাৎ লুনার ডাক পড়লো, এই সাবিনা (সাবিনা আক্তার লুনাকে দিদিমনি স্যাররা সাবিনা বলে ডাকতেন) তুমি কি পড়ো ওটা দেখাও তো! আমার মেজাজ খারাপ হলো। বারবার বলেছিলাম লুনাকে ক্লাস শেষে পড়িস।কে শোনে কার কথা? না জানি কি বলেন স্যার আল্লাহ্ ভালো জানেন! আমি চাইছিলাম না স্যারের হাতে পড়ুক আমার এলোমেলো শৈশব স্মৃতীকথা। বরই তলা শীত পোহানো সকাল,গার্লস স্কুলের পাশে ধানক্ষেতের ভেতর লুকোচুরি খেলা। ভাঁট ফুল ছিঁড়ে ছিঁড়ে রান্নাবাটি খেলা। পুতুলের বিয়ে দেয়া। ২১শে ফেব্রুয়ারিতে চাঁদা তুলে শহিদ মিনার বানানো, এইসব এলোমেলো শৈশব স্মৃতী নিয়ে লিখতে তখন কেবল শুরু করেছিলাম, আরো লেখা বাকি আছে বলেছিলাম লুনাকে। লুনা শোনেনি আমার কথা,বললো, লিখবি আরো, যেটুকু লিখছিস, এটুকু পড়ি আগে। ওর কেন ভালো লাগতো এরকম করে আমার লেখা পড়তে আমি কখনো জানতে পারিনি। মালাও পড়তো আমার লেখা। মালাও লিখতো গল্প। আমিও মালার লেখার অসম্ভব পাগল পাঠক ছিলাম। মালা লিখেই আমাকে পড়াতে নিয়ে আসতো। দুটো গল্প লিখেছিলো ওই বয়সে, ওই সময়ে চমৎকার রোমান্টিক প্রেমের গল্প। কখনো কোথাও কেউ জানতো না শুধু আমরা কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবি ছাড়া।

যাইহোক,স্যার খাতা দেখতে চাইতেই আমি লুনার দিকে কটমট করে তাকাই।লুনা ফাট বেলুনের মতো চুপসে গেছে। আমার দিকে করুন চোখে একবার তাকিয়ে খাতাটা নিয়ে স্যারের ডায়াসের দিকে এগিয়ে গেলো। আমি প্রমাদ গুনছি। স্যারের টিপ্পনী খাবার জন্য রেডি করে নিলাম। আর রাগে ফোঁস ফোঁস করছি লুনার ওপরে। কেই কিছুই বলছেনা, স্যার পড়ছেন, পড়ছেন,পড়ছেন………..
স্যারের কপাল লক্ষ করছি আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে গোপনে। বেশি তো না লেখা দেড় পৃষ্ঠার মতো হবে! স্যার প্রশ্ন করে বসলেন লুনাকে “এটা কার খাতা? কে লিখছে এসব? লুনা জবাব দেবার আগেই ক্লাস শেষের ঘন্টা বেজে উঠলো ঢং ঢং ঢং……… খাতাটা রেখে ঘড়ি দেখে স্যার চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক এ যাত্রা বাঁচা গেলো……………!

চলবে—

২৮৮জন ১২৭জন
20 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য