সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

অনুগল্প

আরজু মুক্তা ৮ আগস্ট ২০২১, রবিবার, ০৩:৩৯:১০পূর্বাহ্ন সাহিত্য ১৯ মন্তব্য

অনুগল্প বা ফ্লাশফিকশন সম্প্রতি সাহিত্যের জনপ্রিয় শাখা হয়ে উঠেছে। তাহলে অনুগল্প কেমন হবে, এমন একটা প্রশ্ন প্রায়ই সামনে এসে দাঁড়ায়।

অনুগল্পকে জোনাকির আলো বলা যেতে পারে। একটা বৃষ্টির ফোটা অনুগল্প কারণ এটাকে টেনে নদী বা সাগর বানানো সম্ভব নয়। কিন্তু বৃষ্টির ফোটা অনিন্দ্য সুন্দর একটি শিল্প যা স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর শব্দ সীমাকে চীনা সাহিত্যে বেঁধে দেয়া হয়েছে। স্মোকলং ফিকশন বলে। অর্থাৎ একটি সিগারেট শেষ করতে যে সময় লাগবে তার ভেতর এ গল্প শেষ হয়ে যাবে। একে মাইক্রো ফিকশন, পোস্টকার্ড ফিকশন, সাডেন ফিকশন, সুপার শর্ট ফিকশন, ন্যানো ফিকশন কিংবা শর্ট শর্ট স্টোরি নামেও ডাকা হয় বিভিন্ন দেশে।

অনুগল্পে একটি কাব্যিক দ্যোতনা বা ভাব মুদ্রা থাকে। ভাষা হয় ঘন রূপকাশ্রিত। মার্কিন কবি গ্রেস পালে বলেছেন, ” অনুগল্প কবিতার মতো ধীরে পড়া উচিত। ” অনুগল্প বিদ্যুৎ চমকের মতো ঝলক দিয়ে শেষ হবে। আর্জেন্টিনার কথা সাহিত্যিক লুইসা ভেলেনজুয়েলা বলেছেন, ” I usually compare the novel to a mammal, be it wild as tiger or tame as a cow; the short story to a bird or a fish ; the micro story to an insect. ”

অনুগল্প পোকা সদৃশ্য হওয়ার কারণে শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে অতি মিতব্যয়ী হওয়া প্রয়োজন। শেষে একটা চমক বা whip crack end থাকলে ভালো হয়।

অনুগল্পকার কে হতে হয় হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালা — যে তার বাঁশীর বোলে যা খুশি তাই করে ফেলতে পারে। অনুগল্প হলো ছোট গল্পের নবজাতক শিশু। আধো আধো কিছু কথা বলবে আর পাঠক তা বুঝে নেবে।

বৈশিষ্ট্য :

১) অল্প পরিসরে অল্প কথায় অনন্য উন্মোচন।

২) কোন গল্প থাকতেও পারে কিংবা নাও থাকতে পারে।

৩) বর্ণনার বাহুল্য নেই।

৪) কিছু বা বলা কথা উহ্য রেখে এক দারুণ রহস্য তৈরি করা।

৫) পাঠ করার পর নিজের মতো করে অর্থ খুঁজে নেবে পাঠক।

৭) অনুগল্পে হাস্যরসের জায়গা নেই। তবে, এটি সবচেয়ে বেশি মনন বা বোধের জায়গা।

অনুগল্প সবটুকু বলে না। বেশির ভাগই থেকে যায় পাঠকের জন্য। জগদীশ চন্দ্র বলেছেন, ” সংকেতময় সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বাক্যবিন্যাস পরিবেশ প্রস্তুত করে। উপসংহারে বাক্যে অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত অথচ অনিবার্যভাবে ভাব সত্যের বিদ্যুৎ বিকাশই এর বৈশিষ্ট্য।”

অনুগল্পে , অস্পষ্ট আলো আঁধারির মায়াভুবন অখণ্ড দেহ কান্তি দৃপ্তভাবে বিরাজমান। এক টুকরো আগুন বলা যায়। প্রতিটি শব্দ, বাক্য, বিরামচিহ্ন আগুনের স্ফুলিঙ্গ।

অনুগল্পে টুইস্ট থাকবে। পড়তে পড়তে মনে হবে লেখক অসচেতন। কিন্তু পাঠ শেষে পাঠক কিংকর্তব্য বিমুঢ় হবেন। এটাই অনুগল্পের নিঃশ্বাস। অনুগল্প পড়ে যেনো পাঠক স্তব্ধ হয়ে যায়।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অনুগল্পের প্রধানতম লেখক বনফুল। অনুগল্প লিখে বুকার পেয়েছেন মার্কিন লেখক লিভিয়া ডেভিস( ১৯৪৭)।  আবার পুলিৎজার পেয়েছেন রবার্ট ওলেন বার্টলার ( ১৯৪৫) ।  অনুগল্প লিখেছেন কাফকা, হেমিংওয়ে, আর্থার সি ক্লার্ক,  নগিব মাহফুজ, ডোনাল্ড বার্থলেম, আমব্রুস বিয়ার্স, কেট শপা, শেখবের মতো কথা সাহিত্যিক।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে প্রায় নয়শ শব্দে ” Cat in the rain ” অনুগল্প লিখেছেন। আবার, মাত্র ছয় শব্দে লিখেছেন, ” For sale, baby shoes never worn”

Augusto Monterrose সাত শব্দের একটি অনুগল্প এপিক বলেই বিখ্যাত। ডাইনোসর অনুগল্পে লিখেছেন “Upon waking,  the dianosaur was still there.”  আবার মেক্সিকান লেখক Guillermo Samperio “Fantasma ” নামে অনুগল্পে লিখলেন শিরোনাম। যেখানে শিরোনামের পর একটি খালি পৃষ্ঠা।

বনফুলের নিমগাছও একটি অনুগল্প।

সবশেষে বলবো, ছোটগল্পের সীমা ভেঙ্গে ক্ষিপ্র গতিতে রচিত হচ্ছে আজকের সব অনুগল্প। তাই এটা গল্পের জগতে টি টোয়েন্টি।

অনুগল্প লিখুন। অনুগল্প পড়ুন।

 

৪১১জন ৬৭জন
57 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য