সাদা চশমার শ্বেতাক্ষী

শামীম চৌধুরী ১০ আগস্ট ২০১৯, শনিবার, ১২:৫৯:৪৬পূর্বাহ্ন পরিবেশ ১৮ মন্তব্য

পাখির ছবি তোলা অনেকটা নেশায় পরিণত হয়েছে। সুযোগ পেলেই ছুটে যাই নতুন নতুন প্রজাতির পাখির সন্ধানে। এ উদ্দেশ্যে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে মহাখালী থেকে বাস ধরে সকালে রওনা দিলাম হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশ্যে। দুপুরের আগেই সাতছড়ি পৌঁছে যাই। স্থানীয় ত্রিপুরা বস্তির বাসিন্দা সুনীল ত্রিপুরাকে সঙ্গে নিয়ে সরাসরি চলে যাই বনের ট্রেইলের পথে। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বনের ভিতর ঘুরে সন্ধ্যায় ফিরে আসি বন বিভাগের ডরমেরটরিতে।

আগে থেকেই সেখানে একটি রুম বুকড করা ছিলো। ক্লান্ত শরীর বিছানায় ঢলে পড়ে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর ৫ টায় ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে বের হই ওয়াচ টাওয়ারের উদ্দেশ্যে। টাওয়ারে যখন উঠি তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। অথচ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলরবে নিজেকে হারিয়ে ফেলি প্রকৃতির মাঝে। ধীরে ধীরে বনের ভেতর ভোরের আলো ঢুকছে। কুয়াশার চাদরে মোড়া পুরো বন। এরই মধ্যে পাখিগুলো এসেছে টাওয়ার সংলগ্ন কাঁটাযুক্ত মান্দার গাছের ফুলের মধু খেতে। ক্যামেরায় শাটার স্পীড না পাওয়ায় ক্লিক না করে পাখিদের চেঁচামেচি ও এক ডাল থেকে অন্য ডালে ওড়ার ভঙ্গি দেখছি। কিছুক্ষণ মান্দার গাছে থেকে সবগুলো টিয়া পাখি চলে গেল। কাঁটাযুক্ত মান্দার গাছ দখল নিলো শত শত কাঠশালিক। ইতোমধ্যে সূর্যের আলো পড়েছে বনের সবুজ গাছের উপর। সবুজের চাকচিক্যে মনটা পুলকিত হয়ে ওঠে। তখন সময় সকাল সাড়ে ৭টা। হঠাৎ নজরে এলো হলুদ-সবুজ রঙ্গের ছোট্ট একটি পাখি। শরীর হলুদ রঙে  সয়লাব। চোখের চারপাশে সাদা রিংয়ের মত। দেখে মনে হবে চোখে সাদা চশমা পরে আছে। দুই নয়নজুড়ে পাখিটিকে প্রথম দেখলাম। খুবই চঞ্চল স্বভাবের পাখি। ক্যামেরায় অনেকগুলো ছবি ধারণ করলাম। পরবর্তীতে জানতে পারলাম এই পাখিটির নাম ‘শ্বেতাক্ষী’ বা ‘বাবুনাই’।

শ্বেতাক্ষী Zosteropidae পরিবারের ক্ষুদ্রাকৃতি বৃক্ষচারী পাখি। যার দেহের দৈর্ঘ্য ১০ সে.মি.। এরা গাছের মগডালে ‘পোকা শিকারী’ পাখি নামেও পরিচিত। এদের পিঠ উজ্জ্বল হলদে-সবুজ রঙ্গের। ডানা ও লেজ কালচে হয়। গলা ও বুকের উপরি ভাগ উজ্জ্বল হলুদ।  বুকের নিচের অংশ ও পেট সাদা। লেজের নিচের দিক হলুদ। চোখ হলদে-বাদামী। চোখের চারপাশে সাদা রিং বা বলয় দেখা যায়। দূর থেকে মনে হয় চোখে চশমা পড়ে আছে। চোখের নিচে কালো পট্টি থাকে। ঠোঁট সরু ও ছোট। ঠোঁটের দৈর্ঘ্য প্রায় মাথার অর্ধেক। নাকের ছিদ্র বড় পর্দায় ঢাকা। পা দীর্ঘ ও শক্ত। শিকার ধরার সময় এরা জিহ্বা বাইরে আনতে পারে। এদের ডানা লম্বা ও লেজ ছোট। পুরুষ ও মেয়েপাখির চেহারায় ভিন্নতা আছে। এই পরিবারের ৯৫ প্রজাতির পাখি আছে। বাংলাদেশে এক গোত্রে এক প্রজাতির শ্বেতাক্ষী পাখি দেখা যায়।

 

শ্বেতাক্ষী পাখি ঘন বন, ফুল বাগান, ফলের বাগান ও সুন্দরবনে বিচরণ করে। এরা দলবদ্ধ পাখি। সচারচর ২৫-৪০টির মতো ছোট দলে বা ঝাঁকে থাকে। এরা Babbler ও Warbler প্রজাতি শিকারী পাখির সঙ্গেও দল বেঁধে ঘুরাঘুরি করে। পাতায় ও গাছের ফুলের মুকুলে বা কুঁড়িতে উড়ে ও লাফিয়ে লাফিয়ে খাবার খায়। খাদ্যতালিকায় রয়েছে পোকা, মাকড়সা, শুঁয়োপোকা, রসালো ছোট ফল, বীজ ও ফুলের মধু বা রস। দলবেঁধে খাবার খাওয়ার সময় এরা ডাকতে থাকে।

এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস এদের প্রজননের সময়। প্রজননকালে গাছের সরু ডালে খুব শক্ত করে ঘাস, ছোট লতা জাতীয় গাছের শিকড়, শেওলা, মাকড়সার জাল দিয়ে ছোট্ট করে বাসা বানায়। নিজেদের বানানো বাসায় মেয়েপাখিটি ২-৪টি নীল রঙ্গের ডিম পাড়ে। পুরুষ ও মেয়েপাখি উভয়েই ডিমে তা দিয়ে ১০-১২দিনের মধ্যে বাচ্চা ফুটায়। বাচ্চাদের লালন ও যত্নাদি বাবা-মা দুজন মিলেই করে।

শ্বেতাক্ষী পাখি বাংলাদেশে সুলভ আবাসিক পাখি। বাংলাদেশের সব বনে ও গ্রামে পাওয়া যায়। প্রায় সব জেলাতেই এরা মুক্তভাবে বিচরণ করে। এছাড়াও ভারত, চীন, নেপাল, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। এরা বিশ্বে ও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত পাখি।

বাংলা নাম: শ্বেতাক্ষী/বাবুনাই/চশমা পাখি

ইংরেজি নাম: Oriental White-eye.

বৈজ্ঞানিক নাম: Zosterops palpebrosus

ছবিগুলো সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে তোলা।

 

১৬৩জন ৫৭জন
30 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য