রঙ্ধনু আকাশ (১৩তম পর্ব)

ইঞ্জা ১৬ আগস্ট ২০২০, রবিবার, ০১:১৩:০৪অপরাহ্ন গল্প ৩৫ মন্তব্য

রুদ্র হোটেলে ফিরে প্রথমে শাওয়ার নিয়ে বেরুলো, আজকের দিনটা এমন হবে ও চিন্তায় করতে পারেনি, আজব্ব্র পরিবারের ঘুরে দাঁড়ানোর পিছনে যে ব্যক্তি, তিনিই কিনা আজ জীবনমৃত্যুর মাঝে আছেন।

রুদ্র সিগারেট ধরিয়ে টান দিলো, ঘড়িতে দেখলো রাত বারোটা বাজছে, সিগারেট শেষ হয়ে এলে এস্ট্রেতে গুজে দিয়ে স্লিপিং ড্রেস পড়ে নিয়ে শুয়ে পড়লো।

হটাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলো দুঃস্বপ্ন দেখে, এ কেমন দুঃস্বপ্ন, অনেক মানুষ ঘিরে ধরে আছে ওকে, যেন ওকে চেপে ধরবে, ও নিশ্বাস নিতে পারছেনা, দম বন্ধ হয়ে আসছে, হটাৎ কে যেন হাত বাড়িয়ে ধরলো ওকে, এক টানে ভীড়  থেকে টেনে নিয়ে এলো, এরপর ঘুম ভেঙ্গে গেলো।

স্বপ্নের কথা ভাবতে ভাবতে হাত ঘড়িটা টেনে নিয়ে সময় দেখলো ভোর ছয়টা। 

রুদ্র উঠে গেলো, ইন্টারকম তুলে দুইটা কন্টিনেন্টাল ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিলো, যার মধ্যে একটা টেকওয়ে হবে, ফোন রেখে বাথরুমে গেলো। 

বাথরুম থেকে বেরিয়ে দ্রুত ড্রেসআপ করে চুল আঁচড়াতে লাগলে দরজায় নক হলো। 

রুদ্রভদরজা খুলে দিলে রুম সার্ভিস ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেলো, রুদ্র ব্রেডে বাটার লাগিয়ে অমলেট দিয়ে শুরু করলো খাওয়া, মাঝে মাঝে চামচ ভর্তি করে ওয়াইট বিন নিয়ে মুখে পুড়লো, শেষে কফিতে চুমুক দিলো, কফি শেষ করে নিজের বিজনেস ব্যাগটা আর টেকওয়ে ব্রেকফাস্ট নিয়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। 

 

হাসপাতালে যখন পোঁছালো তখন সাতটা বাজে, রুদ্র লিফট থেকে বেরুলেই অনিলাকে সামনে পেলো, ও বসে আছে হাতে ব্রাশ নিয়ে। 

কি খবর অনিলা, স্যার কেমন আছেন? 

তুমি এতো ভোরে চলে এলে, ব্রাশ টুথপেষ্ট ব্যাগে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলো।

নাও এতে ব্রেকফাস্ট আছে।

তুমি এই কষ্ট করতে গেলে কেন? 

আরেহ সকালে ব্রেকফাস্ট না করে কতক্ষণ থাকবে, নাও শুরু করো।

ভালোই করেছো, আসলে সকালে ঘুম ভাঙ্গলেই আমার খিদা লাগে।

তা স্যার কেমন আছেন?

আব্বু না একদম সুস্থ হয়ে গেছেন, ডাক্তার বললেন চাইলে নিয়ে যেতে পারবো আজকে, অবশ্য পনেরো দিন পর চেকআপ করতে হবে যদি কোনো সমস্যা থাকে হার্টে তাহলে ব্যবস্থা নিতে হবে। 

আচ্ছা, স্যার কি ঘুমাচ্ছেন? 

হাঁ ঘুমাচ্ছেন।

তা আজ কি রিলিজ করছো? 

হাঁ করে নেবো, সিনিয়র ডাক্তার আসবেন বারোটার পর, এরপর রিলিজ করবো, আমার কাজিন এসেছে, আমিও বাসায় যাবো, গোসল করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ফিরে আসবো বাবাকে রিলিজ করতে।

 

খুব ভালো হয়েছে, তাহলে চলো তোমাকে তোমাদের বাসায় পোঁছে দিয়ে আমি কাজে যাবো, তার আগে চলো  স্যারকে দেখে আসি। 

এখন না, আব্বু ঘুমাচ্ছে, তারচেয়ে চলো বাসায় নামিয়ে দিও। 

তাহলে চলো। 

তুমি যাও আমি কাজিনকে বলে আসছি।

রুদ্রর সেলফোন বেজে উঠলে রুদ্র বললো তুমি নিয়ে এসো বলেই রুদ্র রিসিভ করে হ্যালো বললো। 

রুদ্র তোর ঘুম ভেঙ্গেছে বাবা।

হাঁ মম তাও অনেক আগেই, আমি এখন হাসপাতালে।

তাই, তা সুলতান ভাই কেমন আছেন? 

এখন উনি মোটামুটি সুস্থ, আজ রিলিজ দিয়ে দেবে, পরে চেকআপের জন্য আবার আসবেন। 

খুব ভালো হয়েছেরে, আচ্ছা শুন বাবা। 

বলো মম। 

আমার রুমটা আমি ছেড়ে দেবো, তোর আন্টি খুব জোর করছেন এখানে থেকে যেতে, তুই আমার রুমটা ছেড়ে দে। 

ঠিক আছে মম, তোমার কাপড় জিনিসপত্র তো বাইরে রাখা, ওগুলো কি করবো?

তুই হোটেলে বলে দে আমি রুম ছেড়ে দেবো, এগারোটার দিকে আসবো আমি রুম ছাড়ার জন্য। 

ওকে মম আমি বলে দেবো, তুমি চিন্তা করোনা। 

আচ্ছা বাবা, আমি রাখছি।

ওকে মম বাই।

 

বিকেল চারটা পর্যন্ত ব্যস্ত রইলো রুদ্র, এর মধ্যে একবার সীতাকুণ্ড ইয়ার্ডেও গেলো, সব ডিল সেট করে ফিরে এলো হোটেলে, দুপুরের লাঞ্চ করেছে বাইরেই, খন্দকার শীপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে আজ প্রথম মেজবানির স্বাদ নিলো রুদ্র। 

হোটেলে ফেরার পথেই অনিলা ফোন দিয়ে বলেছে বিকাল পাঁচটার দিকে ওদের বাসায় যাওয়ার অনুরোধ করেছে ওর বাবা, সাথে যেন রুদ্রর মাও যান, তাই রুদ্র মাকে বলেছে রেডি হয়ে নিতে। 

হোটেলে ফিরেই প্রথমে শাওয়ার নিলো, কারণ ইয়ার্ডে অরচুর ধুলা আর ময়লার মাঝেই ছিলো এতক্ষণ। 

রুদ্র হোটেল থেকে বেরিয়ে প্রথমে গেলো মেহেদিবাগ, ওখান থেকে ওর মা আর কুমু আন্টিকে তুলে নিয়ে রওনা হয়ে গেলো। 

অনিলাদের কুলশির বাড়িটি পাহাড়ের উপর, আসলে কুলশি এলাকাটা পাহাড়ি বলেই সব বাড়ি গুলো পাহাড়ের উপরেই বানানো।

অনিলাদের বাড়ির গেইট দিয়ে প্রবেশ করে এক সাইডে গাড়ি রেখে রুদ্ররা নেমে এলো।

বাড়িটি পুরানো হলেও এর আভিজাত্য এখনো টিকে আছে, দোতলা বাড়ির ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেই কাজের লোক এসে পরিচয় জানতে চেয়ে বসতে দিয়ে ভিতরে খবর দিতে গেলো। 

 

কিছুক্ষণের মধ্যেই অনিলা ওর বাবাকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে চলে আসলে, রুদ্ররা সবাই দাঁড়িয়ে গেলো, রুদ্র বললো, স্যার আপনি রেস্ট করতেন। 

অনিলা সবাইকে সালাম জানিয়ে বসতে বলে অনিলাই বললো, আব্বুকে বলেছিলাম কিন্তু উনি শুনলেন না। 

সুলতান সাহেব বললেন, কতক্ষণ আর বসে থাকা যায়, তাই চলে এলাম। 

ভাই সাহেব এখন কেমন লাগছে আপনার, রুদ্রর মা জিজ্ঞেস করলেন।

জ্বি ভাবী এখন ভালো আছি, আসলে ভালো আছি শারীরিক ভাবে, মানষিক ভাবে ভালো নেই। 

ভাই সাহেব আমি সব শুনেছি গতকাল অনিলার কাছ থেকে, সত্যি দুঃখজনক। 

কাজের লোক নাস্তা দিয়ে গেলে অনিলা সবাইকে তুলে তুলে দিতে লাগলো। 

সুলতান সাহেব বলে যাচ্ছেন উনার কথা, খুব শখ করে মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছিলাম, আমি নিজেই ছেলেকে দেখে পছন্দ করেছি কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে বিয়ে করেছে তাতো বুঝতেই পারিনি, বলেই থামলেন। 

ভাই আপনি এইসব এখন না বললে হয়না, আপনার রেস্টের প্রয়োজন। 

না ভাবী এইসব বলছি কারণ ওরা ইচ্ছাকৃত ভাবে আমাদের সাথে চিট করেছে, গত সপ্তাহে ওরা হটাৎ করে বললো ছেলে একটা পেট্রোল পাম্প কিনার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে কিন্তু টাকার অভাবে কিনতে না পেরে খুব কষ্ট পাচ্ছে। 

 

কি বলেন ভাই? 

হাঁ ভাবী, ওরা বললো সম্ভব হলে দুই কোটি টাকা দিলে ও কিনতে পারতো। 

আমিও ভাবলাম এই বাড়ি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে টাকা লোন নিয়ে দেবো, আসলে মেয়ের খুশিটাই তো আমার চাই। 

রুদ্র অবাক হয়ে শুনছে সব। 

হটাৎ গতকাল দুপুরের পরে আমার এক ভাতিজা ফোন করে জানালো ছেলেটি এক আমেরিকান মেয়েকে বিয়ে করেছে প্রায় দুই বছর, সাথে একটা বাচ্চাও আছে, ভাতিজা আমার কিছু ছবিও পাঠালো আমাকে, যা দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো, সুলতান সাহেব কফিতে চুমুক দিলেন। 

এরপর আবার বলতে লাগলেন, আমি ফোন করলাম ছেলের বাবাকে, প্রথমে তো স্বীকারই করেনা, যখন বললাম প্রমাণ আছে, তখন বলে কিনা ওদেশে থাকতে হলে ও ধরণের বিয়ে করতে হয়, ওতে অসুবিধা নেই, ঐ মেয়েকে নাকি ডিভোর্স দিয়ে দেবে এই বিয়ের পর। 

এমন ছেলেকে বিয়ে দেওয়াই তো বিপদ, ওরা তো আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করে চলছিলো টাকার জন্য, কুমু আন্টি বললেন। 

এ জন্যই বিয়েটা ভেঙ্গে দিয়েছি, আমি জেনে শুনে তো মেয়ের ক্ষতি কর‍তে পারবোনা। 

একদম ঠিক করেছেন ভাই সাহেব, রুদ্রর মা বলললেন।

 

ভাবী কেকটা নিন, আপা আপনিও নিন প্লিজ, কি রুদ্র তুমি তো কিছুই নিচ্ছোনা, অনিলার বাবা বললেন।।

না স্যার, আমি নিয়েছি, ধন্যবাদ।

এখন ভাবী আরেকটা সমস্যায় পড়েছি। 

কি সমস্যা ভাই? 

মেয়ের বিয়ে ভেঙ্গে গেছে, এ নিয়ে চট্টগ্রামের মানুষ না না কথা বলবে, বলবে কি, বলছেও।

এ কেমন কথা, মানুষ এসব নিয়ে কথা বলবে কেন? 

সমস্যা হলো চট্টগ্রামের সমাজ ব্যবস্থাটাই সবচেয়ে বাজে, এরা এসব নিয়ে বাজে গসিপ করতে ছাড়েনা, এছাড়া ছেলে পক্ষ না না কথা রটিয়ে বেড়াচ্ছে।

ওরা তো বাজে মানুষ দেখছি?

ওরা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে যেন আমি বাধ্য হয়ে যায় ওদের ছেলেকে বিয়ে দিই আমার মেয়েকে, ওরা কয়েকবার ফোন দিয়ে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টাও করেছে। 

সরি স্যার, কেমন চাপ সৃষ্টি করছে, রুদ্র জানতে চাইলো? 

আসলে ছেলের চাচা বর্তমানে সরকার দলীয় এমপি, সরকারের উপর মহলে বেশ ঘনিষ্ট, উনি বলছে হয় মেয়েকে বিয়ে দিতে হবে, নাহয় ওর বাধ্য করবে যেন বিয়ে দিই। 

কি বলেন এতো দেখছি বিপদ, কুমু আন্টি বললেন। 

মা অনিলা দেখতো রাতের খাবারের কি ব্যবস্থা? 

অনিলা ভিতরে চলে গেলে সুলতান সাহেব বললেন, আসলে ভাবী আপনার কাছে একটা আনডিউ আবদার করতে চাইছি, যদি অনুমতি দেন তাহলে বলতে পারি।

 

…… চলবে। 

ছবিঃ গুগল।

২৬৪জন ৭৮জন
0 Shares

৩৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ