কৃষ্ণচূড়া রঙ...
রঙ…

🙂 আজ বুঝি পহেলা ফাল্গুন, রাই-কিশোরীর আবেগ উছলানো দিন? বেশ লাগে ভাবতেই, বাসন্তী রঙের শাড়ী পড়ে, খোঁপায় গাজরা আর গাঁদা ফুল একসাথে জড়িয়ে, কপালে ছোট্ট একটা টিপ, চোখ টেনে কাজল। কতোদিন যে এভাবে সাজা হয়না! রিক্সার হুড সরিয়ে হুল্লোড় করে গান। কে, কি বললো, না বললো, কি এসে যায় তাতে! কিন্তু লজ্জ্বা যে চোখের পাঁপড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকোনো থাকে, সেও তো জেনেছি সেই সময়ে। তখনই বুঝেছি লজ্জ্বার জন্ম মানেই প্রেম। উফ এতো ভালোবাসা আজও বেসে যাচ্ছি, কিভাবে সম্ভব বলো তো! কিচ্ছু জানিনা। কি যে এলোমেলো হয়ে আছি না! তোমার দুষ্টু-মিষ্টি-পঁচা-খারাপ টুনটুনিটাকে একটু তো সুর দিতে এসো। আরে বয়স হয়েছে, তাতে কি? বুড়িয়ে গেলেও প্রেম তো সেই একই উছলেই পড়ছে, তাই না?
—চোখ খোলো। দেখো।
🙂 এই শোনো, একজন বলেছিলো আমায় এমনই এক বসন্ত দিনে পথভোলা পথিক হয়ে আসবে আমার সামনে। পড়িয়ে দেবে নূপুর।
—চুপ! একটা কথা নয়।
🙂 যদিও আজ অব্দি সেই ফাল্গুণ পাইনি। কিন্তু আশা ছাড়িনি। খুউব ইচ্ছে আমার…
—আবারও? চুপ! এতো কথা বলো কেন? বলছি না চেয়ে দেখো, তোমার পায়ে কি!
🙂 উফ শোনো না, ওই যে শাহবাগের রাস্তা ধরে হেঁটে গিয়ে, সেখানে পথের পাশে একটা চায়ের দোকান আছে না? ওখানে গিয়ে বসবো। জানো কোনোদিন বসা হয়নি? তারপর যাবো বকুলতলায়। তরুণ-তরুণীর ভীড়ে আমরা কি খুব বেমানান হবো, বলোনা! ওরা দেখবে আর বলবে, “এই দেখ দেখ কি বয়স, আর এসেছে প্রেম করতে! এখনও কত্তো শখ!” আবার অন্য কেউবা বলবে, “দেখেছিস ভদ্রলোক কিন্তু হেভি হ্যান্ডসাম। স্টিল ইয়াং।” পাশ থেকে আরোও কেউ বলবে, “আচ্ছা দেখতো এমন লাগছে না, মহিলার বয়স ওই ভদ্রলোকের চেয়ে বড়ো?” আমি ওসব শুনবো, একটু মন খারাপ করবো। তারপর তুমি তো জানোই বেশীক্ষণ পারিনা ঝিম মেরে থাকতে। ওই ছেলে-মেয়েদের ডেকে বলবো, এই শোনো এতো জানার ইচ্ছে যখন, সামনে এসো। ওরা মুহূর্তে লজ্জ্বা পেয়ে যাবে। হুম বয়স অনেক হলো, কিন্তু কি করবো বলো আমার এই পথিকের সময় কোথায়? সে আসে, আবার নিরুদ্দেশ। তবে এবার সে আর যাবেনা। এই দেখো পায়ে নূপুর পড়িয়ে দিয়েছে। বেঁধেই ছিলাম, এখন এই নূপুরে সে বাধা পড়েছে। আমার এসব পাগলামো কথা শুনে ওই ছেলে-মেয়েগুলোর কি অবস্থা হবে, তাই ভাবছি।
—আচ্ছা এবার কি তোমার কথা শেষ হলো? আসলেই বুড়িয়ে গেছো, আগের থেকে অনেক বেশী কথা বলো। অবশ্য চেহারায় ক্যালেন্ডারের পাতা তো দেখা যায়না। কিন্তু আমি তো দেখি, আমার বুড়ীটার দিকে কতো কতো চোখ এখনও।
🙂 আহা! হিংসে হয় বুঝি? আর এই যে বোকা বুড়ো শোনো, পায়ে নূপুর পড়িয়ে দিলে, আমি ঠিকই টের পেয়েছি। আমার পা প্যারালাইসড হয়নি।
—কিন্তু আমার হার্ট যে একই জায়গায় থেমে আছে, সে কিন্তু নয়!
🙂 আচ্ছা খুব ভালো। যতোদিকে ছোটানোর ছোটাতে থাকো ওই হার্ট। এখন শোনো তারপর যাবো বইমেলায়। আমি কিছুতেই তোমার হাত ছাড়বো না। কি ভীড়! যদি হারিয়ে যাই? তুমি পাশে থাকলে ওসব সেলফোন আমি সঙ্গে নিইনা, সেটা তো জানোই।
—এক জোড়া চোখ চাই শুধু আমাকে দেখবার। একটা অনুগত মন চাই শুধু আমাকে ভাববার। একটা অবাধ্য আবেগ চাই শুধু আমাকে ভালোবাসবার। তোমাকে চাই, আমি আমাকে ফিরে পাবার।
🙂 বহুদিন পর বললে। তখন কি বুঝেছিলাম কাকে উদ্দেশ্য করে? পৃথিবীটায় আমরাই তো দুজন, যাদের ব্যালকনিতে আলো-ছায়ার পাশাপাশি, উষ্ণ কফির কাপ টি-টেবিলে অপেক্ষায় থাকেনা। ওখানেই যে আমাদের হাজারো গল্প তোমার দুষ্টু দুষ্টু হাসির সাথে। আচ্ছা আমি এখনও লজ্জ্বা পাই তোমার ওই চাহনিতে। কি যে করি! এতো সুন্দর একটা জীবন আমার জন্যে বসে ছিলো, সেদিনও ভাবিনি। যেদিন প্রচন্ড ঝড়ে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিলো। এমন জীবন আমি পাবো, বিশ্বাস ছিলো। যে বয়সে মহিলারা চুলার গনগনে আগুণে তেল-লবণের পরিমাপ করতে থাকে, আর হিসেবের খেরো খাতায় জমা দিতে হয় খরচের পরিমাণ, সেই জীবন কোনোদিনও আমার নয়। জানি আমি। তাই কি এলে?
—উফ এসব ন্যাকা কথা ছাড়ো। রেডি হও। আজ ফুচকা খাবো তোমার ফুটপাতে। সারাদিন ঘুরে বেড়াবো। আমার শ্বাসে হাজারবার ধাক্কা খেলেও কিছুতেই বইমেলা মিস করবো না।
🙂 নাহ, আজ কোত্থাও যাবো না। এখানেই সাজবো। দেখি তো চিনে নিতে পারো কিনা! আমাদের এই যে কথাগুলো বাতাসে ওড়াওড়ি করছে, তারপর আয়নমন্ডলের পঞ্চম স্তরে গিয়ে থেমে যাবে। ভাবলেই কেমন লাগে, তাই না?
—আজকাল বুঝি রিসার্চ শুরু করেছো? যাও রেডি হও।

/(^:^)\সে জীর্ণ-দৈন্যদশা নিয়ে ফিরে গেছে
আগুণমুখো শিমুলের বনে।
ওখানেই পাতা ঝরা বৃষ্টির গান নূপুরের তালে তালে
তাকে চিনতে পারিনি, কখন জানি হাওয়ার আঁচলে ছোঁয়া লাগিয়ে গেছে
ঘ্রাণে ম’ ম’ করে উঠেছে আমার সবগুলো যুবক বসন্ত
ফিরে এসো, এ কথাটি বলতে অনেক দেরী হয়ে গেলো।
তবুও জানি ফাগুণের বেলায় তার নূপুরের গান মৌণ-মুখরতায় ডেকে নেবে।
তার প্রতিটি সন্ধ্যে শৈশবের খোলস ছেড়ে উঠে এসে আমার পূর্ণতার পৌরুষে পড়বেই ঝাঁপিয়ে
ওই ঠোঁট অস্বীকার যদি করে না-চেনার,
চিনিয়ে দেবো এই ঠোঁটের আদরে।

🙂 কি ব্যাপার হঠাৎ আবৃত্তি! বেশ লাগলো কিন্তু। আজ তাই হোক। এই বারান্দাতেই শব্দদের আসর বসুক। আর শোনো ওভাবে বেলী ফুলের মালার সাথে হলুদ শাড়ী রাখতে নেই। বয়স হয়েছে, রোমান্টিকতা বেড়ে গেলে তুমি-ই সমস্যায় পড়বে কিন্তু।
—সেই কবিতাটা পড়ো তো! “এসো স্পর্শন”, তারপর রোমান্টিকতা নিয়ে নয় কথা হবে!

/(^:^)\কতোকাল তুমি আমায় ছোঁওনি,
আমিও তোমাকে না।
বাঁধ-ভাঙ্গা আদরে ডুবে গিয়ে স্পর্শ করিনি অতল আবেগ—
কতোদিন হয়ে গেলো বে-হিসেবী ভালোবাসায় উন্মাতাল হয়ে
ঠোঁটের উষ্ণতা নিইনি আমরা আমাদের।
কুন্ডলী প্যাঁচানো হাইবারনেশনের ভেতর নিষ্ক্রিয়তার অগাধ সময়ে ভেঁজা নি:শ্বাসে স্নান করিনি।
আচ্ছা শেষ কবে আমরা দুজন দুজনকে পরিতৃপ্ত যন্ত্রণায় কাতর করেছিলাম?
মনে আছে?
আমার ব্যালকনিতে এসে উঁকি দাওনি, ঘরের দরোজায় টোকা মারোনি,
জানালা খুলে দিয়ে হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নাওনি।
যে তুমি কপট প্রত্যাখ্যানে তীব্র বাতাসের মতো জড়িয়ে নিয়ে তোমার পাঁজরে বন্দী করতে আমার লজ্জ্বা,
কতো কতো কাল কেটে গেলো, তুমি ছোঁওনি সেই লজ্জমানতা।
তোমার বন্যতার সাথে আমার ঊষ্ণতার দেখা হয়নি কতোকাল—
এসো আজ স্পর্শ করি একে অন্যকে।

🙂 হলো?
—উহু। এখনও অসম্পূর্ণ
🙂 পারোও বটে। ঠিক আছে দেখি পারি কিনা পূর্ণ করতে। তারপর আবার হেসো না যেনো। ক্ষ্যাপালে খুব কষ্ট পাবো।
https://www.youtube.com/watch?v=VvkarC8P-FA

**প্রিয় বন্ধুরা ফাগুণ ফাগুণ শুভেচ্ছা। বহুদিন পর এতোটা সময় নিয়ে লিখেছি। সেই সকাল থেকে থেমে থেমে লেখা, আর গানটা শুয়ে শুয়ে চেষ্টা করেছি। আমার নিজের মন ছোঁয়নি, তবুও দিলাম। ফিরে আসার পথে অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা পার হতে হচ্ছে এখনও। বারবার অসুস্থতার কথা বলে সবার মনকে বিরক্ত করে দিতে চাইনা। এর মধ্যে একটা সুখবর, অনেকটাই জোড়া লেগে গেছে পেলভিস বোনস দুটো। আশা করছি ২/১ মাসের মধ্যে পারবো শুধু নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে। ভালো আছি। ভালো থাকুন সবাই। আর এই কথোপকথনটি দুটি সত্যি জীবনের উপর দাঁড়িয়ে। আর এই দুটি জীবন আমার প্রিয়’রও প্রিয়। কিন্তু পরিচয়টুকু আবেগের গভীরতায় থাকুক, এটাই ওদের চাওয়া।

হ্যামিল্টন, কানাডা
১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ইং।

৭০৪জন ৭০৪জন
2 Shares

৩৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ