মায়ার টানে

রেহানা বীথি ৮ ডিসেম্বর ২০১৯, রবিবার, ০৮:৫৯:৫৬অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২৮ মন্তব্য

বিলের এপারে আমাদের বাড়ি আর ওপারে আমার বড় দাদু, ছোট দাদুদের বাড়ি। বিলের ঠিক বুক চিরে চলে গেছে মেঠোপথ। ছোট্ট একটা কালভার্ট দু’পাশের সংযোগসেতু। এই বড় দাদু আর ছোট দাদু কিন্তু আমার দাদুর আপন ভাই নন। তাঁরা ছিলেন একে অপরের চাচাতো ভাই। এ কথাটা অবশ্য জেনেছিলাম অনেক পরে। যাক সেকথা। আগে তো টকমিষ্টি স্বাদের দারুণ টুসটুসে বরইগলোর গল্প করে নিই!

মেঠোপথ আর কালভার্ট না ডিঙিয়েও শুধুমাত্র বিল সাঁতরেই পৌঁছে যাওয়া যেতো ছোটদাদুর বাড়ির কান্টায়। আর ঠিক ওই জায়গাতেই ছিল একটা বরই গাছ। যেটা কিনা অদ্ভূত ভঙ্গিতে কিছুটা বেঁকে গিয়ে ছুঁয়ে থাকতো বিলের জল। ছুঁয়ে থাকতো না বলে বিলের জলে গাছটার কিছু অংশ ডুবে থাকতো বলাটাই বোধহয় বেশি জুতসই। তো আমরা যারা কচিকাঁচার দল, তারা এপার থেকে সাঁতরে চলে যেতাম ওপারে। গিয়েই পটাপট বরই পেড়ে প্যান্টে গুঁজে পালিয়ে আসতাম। একরকম চুরিই বলতে পারেন। তবে এ চুরিতে কোনও দোষ নেই, সেসময় আমাদের তাই মনে হতো। তারচেয়ে বরং যার কারণে এই টুসটুসে বরই আমাদেরকে বাধ্য হয়ে চুরি করতে হচ্ছে, মনে হতো, সে-ই বিরাট দোষী। হবে না? এই কচিকাঁচাদের হক ওই টুসটুসে বরইগুলো কিনা আচার বানানোর বাহানায় গাছ থেকে পেড়ে রোদে শুকোনোর পাঁয়তারা করতো সখিনা দাদী!!

বড় রূপসী সখিনা দাদীর ঠোঁটজোড়া সবসময় পানের রসে রঙিন হয়ে থাকতো। তাঁর দুধে-আলতায় গায়ের রঙের সাথে সেই পানখাওয়া লাল ঠোঁট যে কী ভালো লাগতো বলে বোঝানো যাবে না। ছোটদাদু মারা গিয়েছিলেন কতদিন আগে জানি না। দাদীকে সবসময় ধবধবে সাদা শাড়িতেই দেখেছি। কী রূপ আর কী মায়া ওই চেহারায়! কিন্তু সবসময় তো আর মায়া খেলা করতো না! বিশেষ করে ওই বরই চুরির সময়। ভুলবশত দু’চারবার ধরা পড়ে দেখেছি, কী রাগ …. কী রাগ! আমরা তো ভয়ে কেঁদেই ফেলতাম। মাফটাফ চেয়ে কোনওরকমে পালিয়ে আসতাম আর কী! কিন্তু চোর কি কখনও ধর্মের কাহিনী শোনে বলে শুনেছেন আপনারা? আমরাও শুনিনি। দু’তিন দিন ঘাপটি মেরে থেকে আবারও নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়তাম বরই গাছে। কত আর রাগ দেখানো যায়, একসময় সখিনা দাদীর কড়াকড়িও শিথিলতা পেতো। কিন্তু ততদিনে বরই শেষ হবো হবো। আবার প্রতীক্ষা নতুন বছরের। এই করতে করতে একসময় বড় হয়ে গেলাম আমরা।

সত্যিই হয়তো বড় হয়ে গেলাম আমরা। কতকিছুই বদলে গেলো! আমার খেলার সাথীদের কারও কারও বিয়ে হয়ে গেলো। গ্রামে যাওয়া কমে যেতে লাগলো আমাদের। গেলেও বিলের ওপারের দাদীদের বাড়ি হয়তো যেতে পারতাম না সবসময়। কোনও সময় দেখা হতো, কিংবা হতো না। এই সময়ের ভেতরেই আমাদের রূপসী ছোটদাদী বেশ অনেকটা বুড়িয়ে গেছেন। মুখের দুধে-আলতা চামড়ায় শতেক ভাঁজ। তবু তাঁর পানখাওয়া ঠোঁটের সরল হাসিটি অক্ষত। দেখলেই জড়িয়ে ধরে গায়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কাঁদতেন। কাঁদতে কাঁদতে বলতেন, “তুই এসেছিস, দেখ, আমাকে কেউ জানায়নি!”

একদিন খবর পেলাম, রূপসী ছোট দাদী নেই, চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ছুটে গেলাম। নিথর তাঁর দেহ, অসম্ভব ফর্সা মুখে ঠোঁটজোড়া যেন টুকটুকে তখনও। আমি নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে মনে বললাম, দেখো দাদী, আমি এসেছি, তোমার বরই গাছটা যে অরক্ষিত এখন! সবই অরক্ষিত এখন। দাদীর বাড়ি, নানীর বাড়ি। কোথাও কেউ নেই।

পেরিয়ে গেছে আরও কিছু বছর। এখন বিলছোঁয়া বরই গাছটি নেই। একেকটা বাড়িতে হয়েছে একাধিক ভাগ, হয়েছে নতুন নতুন ঘর, এসেছে নতুন নতুন মুখ। তাদের কাছে আমি অতটা চেনা নই। আমাকে দেখলে তারা খুশি হয়, বসতে বলে, চা-নাস্তা দেয়। তেমন করে জড়িয়ে ধরে না কেউ! তাদের এ প্রশ্ন সে প্রশ্নের উত্তর দিই আর দেখি। চারিদিক দু’চোখ ভরে দেখি। দেখতে দেখতে ঝাপসা হয়ে আসে চোখ। আমি উঠে পড়ি। আমি ফেরার পথ ধরি। ফেরার পথ ধরে আবারও ফিরে তাকাই। মায়ার টানে।

৩৭১জন ১৮০জন
0 Shares

২৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য