ভিক্টোরিয়ার ভিক্টোরি

হালিম নজরুল ২৪ মে ২০২০, রবিবার, ০৫:৪৪:১৬অপরাহ্ন ভ্রমণ ২০ মন্তব্য

দু’দিন কলকাতায় অনেক ঘোরাঘুরি হল। হাতে সময় খুবই কম। আর একদিন মাত্র সময় পাবো কলকাতার বাকি কয়েকটা দর্শনীয় স্থান দেখবার। তাই প্রিয়বন্ধু ভাগ্যধর বৈদ্যকে রাতেই বলে রাখলাম পরদিন কয়েকটা জায়গা দেখে শেষ করতে হবে। ভাগ্যদা ঠিকঠাক সময়ে রুমে এসে হাজির। তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। মিছরির গলি থেকে নাস্তা সেরে হাঁটতে হাঁটতে সদর স্ট্রীটে পৌঁছে গেলাম। সদর স্ট্রীটের মাথায়ই ঐতিহ্যবাহী মিউজিয়াম। লোভ হল সেখানে ঢুকবার। কলকাতা যেহেতু প্রায় দুইশত বছর ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল, সেহেতু সুদৃশ্য শহরটির মতই মিউজিয়ামটিও শত-সহস্র ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। কিন্তু প্রথমেই একটা ধাক্কা খেলাম। বিশাল এক বৈষম্য আমাকে বিমুঢ় করে দিল। আমি ও ভাগ্যধরের মনের মধ্যে কোনপ্রকার দূরত্ব না থাকলেও একটা তারকাটার বেড়া আমাদের মধ্যে কত দূরত্ব তৈরী করে দিয়েছে! সাইনবোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী ওখানে ঢুকতে ভাগ্যধরের লাগবে মাত্র বিশ রুপি, আর আমার পাঁচশত রুপি! খুব অভিমান হল। একসময় তো এই বৈষম্য তাড়াতেই আমার আর ভাগ্যধরের দাদুরা একসাথে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল!

মিউজিয়াম থেকে একটু এগুলেই পার্কস্ট্রীট স্টেশন। মেট্ররেলের প্রতি আমার ভালবাসা ও কৌতুহল সবসময়ই একটু বেশি। সুতরাং মিউজিয়াম থেকে ওদিকেই হাঁটলাম দু’জন। একটা অসাধারণ ভাললাগা অনুভব করলাম। রবীন্দ্র সদনের দিকে গেলে বরাবরই আমার অন্যরকম আবেগ কাজ করে। কেন যেন একটা অফুরান তৃপ্তি অনুভব করি। নন্দনকাননের স্মৃতিগুলো আমাকে আবেগাপ্লুত করে।

এইখানেই আগে “বাংলাদেশ বইমেলা” আয়োজন করা হত। এইখানেই পরিচিত হয়েছি অনেক অনেক বিখ্যাত লেখক, শিল্পী, কবি/সাহিত্যিক, অভিনেতা, সাংবাদিক, আলোকচিত্রীর সঙ্গে। এখানে বসেই হয়তো লিখে ফেলেছি দু’-চারখানা ছড়া, কবিতা বা গল্প। ওখানকার বাংলা আকাদেমী, শিশুকিশোরের আকাদেমী, নন্দন সিনেমা হল আর  বন্ধুদের ক্যামেরাগুলো এখনো সেসবের  সাক্ষী।

রাস্তার ওপারেই মোহরকুঞ্জ। চমৎকার একটি সাজানো বাগান। মুহূর্তেই সকলকে মুগ্ধ করে তার অপরূপ সৌন্দর্য। কোন ক্লান্ত পথিক এক মুহূর্তেই নিয়ে নিতে পারে অনাবিল প্রশান্তি। আমরাও ব্যতিক্রম নই। তাই এখানে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিলাম।

আরেকটু সামনে এগুলেই প্লানেটোরিয়াম। ভিক্টোরিয়ার দিকে যেতে একটু ডানহাতে পড়ে সেটি। বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের জন্য সত্যিই এক অসাধারণ জায়গা এটি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বা মহাকাশ নিয়ে যাদের কৌতুহল, তাদের জন্য এ এক অন্যরকম জগৎ।

কলকাতার গড়ের মাঠের কথা আমরা অনেকেই গল্পে গল্পে শুনেছি, যার আরেকটি নাম রেসের মাঠ। প্লানেটোরিয়াম থেকে আরেকটু এগুলেই ঐতিহাসিক সেই মাঠ। শুধু আকারেই বড় নয়, এর সাথেও ইংরেজ আমলেরও অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। শুনেছি এখানে ঘোড়ার ট্রেনিং হত। অবশ্য এখনো সেখানে গেলে কিছুকিছু ঘোড়া প্রায়শই দেখতে পাওয়া যায়।

এবার আসি ভিক্টোরিয়ার পার্কের কথায়। মহারাণী ভিক্টোরিয়ার নাম দেখে যে কেউ সহজেই বুঝতে পারেন এটি তৎকালীন সময়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে নির্মিত। ইংরেজ আমলের বহু ইতিহাস ও নিদর্শন সম্পর্কে জানা ও দেখার সুযোগ সবার কপালে জোটে না। আমি ছিলাম হয়তো সেদিনের এক সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। তবে ভিক্টোরিয়ার একটি ঘটনা এখনো প্রায়ই আমাকে হাসায়।

মিউজিয়ামের মত ভিক্টোরিয়া গেটে গিয়েও আমার চোখ কপালে উঠে গেল। যথারীতি গেটের বাইরে নোটিশবোর্ডে প্রবেশমূল্য সাটানো। ভাগ্যধরের বিশ রুপী, আর আমার পাঁচশত রূপী। ঢোকার আগে মাথায় এক দুষ্টামি এলো। ভাগ্যদাকে বললাম যেহেতু আমি বাঙালি এবং হালকা হালকা হিন্দি বলতে পারি, আমি বিশ টাকার দেশীয় টিকিট কাটব। ভাগ্যদা অধিক সহজ সরল ভদ্র মানুষ। তাই সে কিছুটা আমতা আমতা করল। আমি বললাম দাদা সাহস রাখো, আমি ঠিক সামলে নেব। ভাগ্যদা বলল ওরা তোমার কথা শুনলে নাকি বুঝে ফেলবে। আমি বললাম আচ্ছা দেখছি, আগে তুমি দুটো টিকিট তো নাও। ভাগ্যদা দুটো টিকিট নিল। আমি একটা টিকিট ধরিয়ে দিয়ে বললাম, তুমি এগিয়ে যাও, আমি পিছন পিছন আসছি।

আমার হাতে বিশ টাকা মূল্যের টিকিট। পাঁচশ’র জায়গায় বিশ! বুক তো একটু কাঁপার কথা। বুকে ফু লাগিয়ে সামনে পা বাড়ালাম। প্রধান ফটকের জওয়ানরা টিকিট চাইলে হাত বাড়িয়ে দিলাম। একজন বাঙালি জওয়ান কিছু জিজ্ঞেস করতেই কলকাতার ভঙ্গিতে এমনভাবে বাংলায় কথা বলতে শুরু করলাম যে, দ্বিতীয় আর কোন প্রশ্ন এলো না। কিছুটা সামনে গিয়ে দু’জন একত্রিত হয়ে হো হো করে হাসতে লাগলাম।

এবার ভিক্টোরিয়া বিল্ডিংয়ে ঢোকার পালা। ভাগ্যদা বলল, এবার জওয়ানরা টিকিট দেখতে চাইলে কি করবে দাদা? আমি বললাম, আমি এবার বোবা হব। ঘটলও তাই। জওয়ানরা হিন্দিতে জিজ্ঞেস করল, কোত্থেকে এসেছি, পরিচয় কি। আমি হাত-চোখের ইশারার সাথে সাথে পুরোপুরি বোবার ভূমিকায় অভিনয় করে বললাম, আবাবা আব আব, আব উবুব আব উব, বুব বাব। জওয়ানরা হা করে তাকিয়ে থাকল। ভাগ্যদা নম্র- ভদ্রভাবে জানাল আমরা দক্ষিন কলকাতা থেকে এসছি। অতপর ভিতরে ঢুকে আবারও হো হো করে হেসে উঠলাম।

ভিক্টোরিয়ায় ঢুকে দুইশত বছরের ইংরেজ শাসনের বহু নমুনা-নিদর্শন দেখলাম। জানলাম অনেক অনেক ইতিহাস, ঐতিহ্য। জানলাম মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ইতিবৃত্তসহ অনেককিছু। সাথে থাকা মোবাইল ক্যামেরায় তুলে রাখলাম বেশকিছু ছবি।

সব দেখা শেষে নীচে নামলাম। পুকুরপাড়ের গাছগুলোর নীচে বসে অনেকেই হাওয়া খাচ্ছে। কপোত-কপোতীরা প্রেমময় মধুর সময় কাটাচ্ছে। আমাদের সাথে প্রেমিকা নেই। কিন্তু প্রেমের কোন কমতি নেই। ভাগ্যধর বলল, চল আমরাও কিছুটা হাওয়া খেয়ে নিই। আমিও খুশিতে বলে উঠলাম “আবাব আব আব”। অতপর গাছের নীচে বসে হো হো করে হাসতে লাগলাম।

১৫৮জন ৩৪জন
13 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য