ভাদু চোরের সাধু ছেলে

হালিম নজরুল ২০ মে ২০২০, বুধবার, ০৯:০৬:৪৯অপরাহ্ন ছোটগল্প ২১ মন্তব্য

 

“হৈ হৈ কাণ্ড রৈ রৈ ব্যাপার, হৈ হৈ কাণ্ড রৈ রৈ ব্যাপার। জ্বী হ্যাঁ, প্রিয় এলাকাবাসী, আজই বিকাল ৫.০০ ঘটিকায় স্থানীয় সেবাবাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় জুনিয়র ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা। উক্ত খেলায় অংশগ্রহন করবে বাংলাদেশের সেরা দুই ফুটবল দল চুয়াডাঙ্গার হাটবোয়ালিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় আর গোপালগঞ্জ কাশিয়ানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। দেশসেরা জুনিয়র ফুটবল খেলোয়াড়দের ক্রীড়ানৈপুন্য দেখতে হলে আজই চলে আসুন ঠিক বিকাল পাঁচটায়। উক্ত খেলায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করবেন মাননীয় মন্ত্রী …………….।”

মাইকের আওয়াজ যতই ক্ষীণ হয়ে আসছে অনিকের দাবী ততই জোরালো হচ্ছে।

–বাবা, ও বাবা চলনা খেলা দেখতে যাই। বল বাবা, আমাকে নিয়ে যাবে না? ও বাবা,  চলনা।

–অনিক, পাগলামী করোনা বাবা। ফুটবল খেলার কি দেখে! এখন তো ক্রিকেটের যুগ। আজ থাক। বরং কোন ক্রিকেট খেলা হলে সেদিন তোমাকে নিয়ে যাবো, কেমন?

-তুমি যে কি বল বাবা! খেলার আবার যুগ থাকে নাকি! খেলা তো চিরকাল একরকমই থাকে।

-হ্যাঁ তা ঠিক। তবে সময়ের সাথে একেকটার চাহিদা একেক রকম হয়। আচ্ছা বল তো এসব খেলা করে বা দেখে কি লাভ?

-ও বাবা, তুমি জাননা বুঝি! অনেক লাভ বাবা। আমাদের বইতেও লেখা আছে খেলাধুলা করলে শরীর ও মন দুটোই ভাল থাকে। তাছাড়া খেলোয়াড়দের কত্ত নাম। পৃথিবীর সবাই উনাদের চেনে।

-ও তাই নাকি! আচ্ছা কয়েকজন বিখ্যাত ফুটবলারের নাম বল তো ?

-ম্যারাডোনা, পেলে, জিদান, মেসি, রোনালদো আরও কত বিখ্যাত খেলোয়াড় আছে। জানো বাবা, ওই যে আজ যে খেলা হবে, ওখানে আমার ক্লাসের এক বন্ধুও খেলবে। ও এতই ভাল খেলে যে ওকে সবাই মেসি বলে ডাকে।

-মেসি কেন?

-মেসি হল বর্তমানের সবচেয়ে সেরা খেলোয়াড়, ছয়বার বিশ্বসেরা পুরস্কার পেয়েছে, উনি দারুণ খেলেন বাবা।

-তোর বন্ধু বুঝি মেসির মত খেলে? কি নাম ওর?

-হ্যাঁ বাবা, ওর নাম সাধু। ও খুব ভাল খেলে। ওদের দলে যে এগারোজন খেলে তারা সবাই ভাল। তবে দুই দল মিলে যে বাইশজন খেলে তার মধ্যে ওই সেরা খেলোয়াড়। এজন্য সবাই মিলে ওকে দলনেতা বানিয়ে দিয়েছে।

-ফুটবলেও আবার দলনেতা লাগে নাকি রে!

-হ্যাঁ বাবা। দলের সৃংখলা রক্ষা আর মনোবল ধরে রাখার ক্ষেত্রে দলনেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অবশ্য মাঠে যে রেফারিরা থাকে তারাও বাঁশি বাজিয়ে খেলার সৃংখলা রক্ষা করে থাকে।

অনিকের বুদ্ধিমত্তা দেখে আমি ক্রমেই মুগ্ধ হতে থাকি। এক পর্যায়ে ওর দাবীর কাছে আমাকে হেরে যেতে হয়। অবশেষে ওকে নিয়ে খেলার মাঠে হাজির হই। মাঠে সে কি দর্শক! হাজার হাজার মানুষ এসেছে ওদের খেলা দেখতে।

রেফারি বাঁশি বাজিয়ে খেলা শুরু করতেই তুমুল করতালিতে আকাশ বাতাস মুখরিত। খেলায় সে কি উত্তেজনা! আর আমি নিজেকেই যেন হারিয়ে ফেলেছি সাধু নামের সেই ছেলেটির খেলা দেখে। আমি মুগ্ধ। আমি বিমোহিত। সত্যিই যেন ম্যারাডোনা, পেলে বা মেসির খেলা দেখছি আমি। ভেতরে ভেতরে আমার নানান কৌতুহল খেলা করে। কে ওই ছেলেটি? কোন শ্রেণীতে পড়ে? ইতিমধ্যে খেলার মধ্যবিরতির সময় হয়ে যায়। আমি অনিকের কাছে ওর পরিচয় জানতে চাইলে ও আমাকে মাঠের একটা কোণায় নিয়ে যায়। একটা মধ্যবয়সী লোকের কাছে এসে বলে “এই যে বাবা এই লোকটাই সাধুর বাবা।”

গায়ে ময়লা জামাকাপড়, মুখে খোচা খোচা দাড়ি। মনমরা হয়ে মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কাছে আসতেই একটু নড়েচড়ে উঠলেন।

-আপনিই সাধুর বাবা? কি নাম আপনার?

-হ্যাঁ ,সাধু আমার ছেলে। আমার নাম ভাদু।

-ও আচ্ছা, তো আপনার ছেলে তো বিখ্যাত খেলোয়াড়, সারাদেশের মানুষ ওকে চেনে।দেখছেন সবাই কেমন আপনার ছেলের নাম ধরে মিছিল করছে। আপনি একজন গর্বিত পিতা। তাছাড়া যতদূর শুনলাম আপনার ছেলে শুধু নামে নয় কাজেও সাধু। সত্যিই আপনি দারুণ ছেলে গড়েছেন। আজ ওর মাকে গিয়ে বললে তিনিও খুব খুশী হবেন নিশ্চয়?

আমার একের পর এক প্রশ্ন শুনে আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে লোকটি। ততক্ষণে তার চোখের কোণে ছলছল করে ওঠে নোনাজল। আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করি—

–আজকের এই আনন্দের দিনে আপনি কাঁদছেন কেন? ওর মা কি অসুস্থ?

আমার প্রশ্ন শেষ না হতেই অনিক বলে ওঠে “ওর মা তো বেঁচে নেই বাবা।”

আমি একটু মুষড়ে পড়ি। ভিতরে ভিতরে নিজেকে ধমক দিতে থাকি। আবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলি –

-না জেনে, না বুঝে আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেললাম। আমাকে ক্ষমা করবেন ভাদু সাহেব।

-না না স্যার, সে কি বলেন, আপনারা হলেন সম্মানী মানুষ। ওসব কথা বলতে নেই স্যার।

-আচ্ছা ওর মায়ের কি হয়েছিল, মারা গেল কেন?

-সে অনেক কথা স্যার, সেসব থাক।

-না না বলুন না, কি হয়েছিল উনার?

–স্যার আমরা গরীব মানুষ, দিন আনি দিন খাই। আমি একটা ইটভাটায় কাজ করতাম। আর সাধুর মা মোড়লদের বাড়ীতে কাজ করে অল্প কিছু আয় রোজগার করত। এতে আমাদের সংসার কোনমতে চলে যায়। তখন সাধুর বয়স তিন চার বছর হবে। হঠাৎ একদিন মোড়লের বড় ছেলে সাধুর মাকে খুব মার মারলো। তার নাকি অপরাধ সে মোড়লের ছেলের হুকুমের অবাধ্য হয়েছে।তাই বলে মানুষ মানুষকে এরকমভাবে মারে স্যার? সাধুর মা তো ফিরে আসারও শক্তি হারিয়ে ফেলে। কেউ একজন দয়া করে ওকে আমাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায়। কিন্তু যন্ত্রনায় সে ছটফট করতে থাকে। গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। আমি গ্রামডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে আসি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়না। উপয়ান্তর না পেয়ে গাঁয়ের লোকের কথামতো গঞ্জের হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু তারা বলে অনেক দেরী হয়ে গেছে। ওর চিকিৎসা করাতে এখন অনেক টাকা লাগবে। কিন্তু আমার তো কোন টাকা নেই। গরীবের তো কোন আত্মীয় থাকেনা স্যার। তবুও আমি সম্ভব সব জায়গায় চেষ্টা করেছি, হাত পেতেছি। কিন্তু কেউ একটু মুখ তুলে চায়নি। একদিকে স্কুল পড়ুয়া মেয়ে, একদিকে দুধের বাচ্চা সাধু আর অন্যদিকে সাধুর মা। কি করব ভেবে পাই না। শেষমেষ ভাবি ইটভাটার মালিকের কাছে আরেকবার যাই। গিয়ে আমার বিপদের কথা বলি। কিন্তু কোন কিছুতেই কাজ হলনা। কিন্ত কি করি! অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম ভাটার সিন্দুক থেকে টাকা নিতে হবে। কিন্তু বিধিবাম। ধরা পড়ে গেলাম।

যথারীতি আমি চোর প্রমাণিত হলাম। আমাকে শারিরীক নির্যাতনসহ নানান শাস্তি দেওয়া হল। অথচ দেখুন গাঁয়ের এত এত মানুষ, কেউ যদি আমার দিকে একটু মুখ তুলে চাইতো তাহলে কি আমাকে চোর হতে হতো? যাহোক আমাকে গাঁয়ে একঘরে করা হল। শোকে তাপে সাধুর মা একদিন দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। বাচ্চাদুটো এতিম হল। কিন্তু গ্রামের একটা মানুষের করুণা হলনা। বরং আমি চোর বলে কেউ কাজেও নিতে চাইল না। আমার সোনার টুকরো সন্তানদেরকে সবাই ভাদু চোরের ছেলে-মেয়ে বলে ডাকতে লাগলো। মেয়ের নাম কেটে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হল। সাধু বাচ্চাদের দলে খেলতে গেলে বলতে লাগলো চোরের ছেলেকে দলে নেয়া হবেনা। যখন আর কোন উপায় পেলাম না, সিদ্ধান্ত নিলাম গঞ্জে চলে যাবো। তারপর যেদিন গঞ্জ চলে যাবো, তার চার-পাঁচ দিন আগে কজন গুণ্ডা এসে মেয়েটাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। আমার কোন কাকুতি মিনতিতেই কোন কাজ হলনা। সেই যে গেল আর এলোনা। শুনেছি সপ্তাহখানেক পরে নাকি তেরনলার বিলে ওর লাশ পাওয়া গিয়েছিল। বাবা হয়ে আমি কিছুই করতে পারিনি সাহেব। শুধু এই নষ্ট সমাজটাকে ধিক্কার দিতে পেরেছি।

গঞ্জে আসার পর একটা কাজ জুটিয়ে নিলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম সাধুকে এমনভাবে গড়ে তুলবো যাতে ওর ছেলেকে কেউ চোরের ছেলে বলতে না পারে। তারপর স্কুলে ভর্তি করেছি। খেয়ে না খেয়ে ওকে মানুষ করার চেষ্টা করেছি। স্কুলে প্রথম, দ্বিতীয় না হলেও পড়াশোনায় বেশ নাম আছে। আর খেলাধুলায় সবার সেরা। দোয়া করবেন স্যার, আমার ছেলেটা যেন আরও বড় হতে পারে।

-হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই , চলুন বাকি খেলাটুকু একসাথে বসে দেখি।

ততক্ষণে খেলা প্রায় শেষের পথে। কিন্তু ফলাফল দুদলের সমান সমান। এখন কি হবে? অনিক বলল –

-বাবা এখন টাইব্রেকার হবে। টাই ইংরেজি শব্দ। টাই মানে সমতা। তাই টাই ব্রেক করে একটা ফলাফল বের করে আনাকে টাইব্রেকার বলে। এখন দুই দল পাঁচটি করে পেনাল্টি মেরে যারা বেশী গোল করবে তারাই জয়ী হবে। যে কথা সেই কাজ।টাইব্রেকার হল। সাধুর দল জিতে গেল। অনিকের মুখেও হাসি ফুটে উঠলো। দর্শকদের সে কি উল্লাস!

এবার পুরস্কার বিতরনের পালা। মন্ত্রী সাহেব মঞ্চে উঠে পুরস্কার দেবার আগে ঘোষণা দিলেন “আমি পুরস্কার দেবার আগে আজকের সেরা খেলোয়াড় সাধুর বাবাকে মঞ্চে দেখতে চাই।” মন্ত্রীর কথামতো ভাদুকে মঞ্চে ডাকা হল। মন্ত্রী মশাই ভাদু সাহেবের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন আর সকলের উদ্দেশ্যে বললেন “ভাদুসাহেবের সাথে যে সকল অন্যায় আচরণ করা হয়েছে এমনটি যেন এদেশের মাটিতে আর কখনো না ঘটে।”

মন্ত্রী সাহেব ভাদুর সাথে মোনাকাত করে নিলেন। ভাদুর চোখ আনন্দে ছলছল করে উঠলো।অনিক মহা আনন্দে বলে উঠলো -“চল বাবা এবার আমরা বাড়ি ফিরে যাই।”

———————0 0————————

১৭৮জন ৩৫জন
0 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য