খেরোজীবনের শেষ অনুচ্ছেদ

তৌহিদুল ইসলাম ১৯ এপ্রিল ২০২১, সোমবার, ০৬:৫৭:৩৯অপরাহ্ন গল্প ২৩ মন্তব্য

শুনশান নীরবতা চারপাশে, উঠানে রাখা কাঠের চৌকিতে শোয়া অবস্থা থেকে আমি ধরমড়িয়ে উঠে বসতেই সামনে তাকিয়ে দেখি অনেক বাল্যবন্ধু আমার দিকে বেজার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি জানি, এখনো তারা মনেমনে বলছে- “যাহ্ শালা! তোর সাথে কোনো কথা নাই। কি করে পারলি তুই?”

আজ পুরো বাড়িতে শোকের মাতম। অনেকদিন পরে চাচা, ফুফুরা এসেছেন। বাসাভর্তি মানুষ সবাই কাঁদছে। ঘরের এককোণে বোনটা কেঁদে কেঁদে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। আমার ভাইটা সামনে যাকেই পাচ্ছে গলা জড়িয়ে ধরে বলছে- “ভাইয়া নাইরে, ভাইয়া আর নাই।”

আমি সহ্য করতে পারলাম না, বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো আমার। পৃথিবীতে ভাইবোনদের আদর, ভালোবাসা কখনো নিষ্প্রভ হয়না। বড় হলে হয়তো সাময়িক বিচ্ছিন্নতা আসে; তবে অসুখবিসুখ এবং মৃত্যু এ দুটো সময় মন থেকে তাদের অহর্নিশ মমতা আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভা হয়ে বেড়িয়ে আসে।

সেই ঘর থেকে বেড়িয়ে নিজের ঘরে এলাম। বিছানায় বসা আমার সরলমনা স্ত্রী হিচকি দিয়ে কান্না করছে আর দরজার দিকে বারবার করুন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে; একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে। ঘরে আমার আসার সময় হলে কিংবা আমার অনুপস্থিতিতেও সে এমন ব্যাকুল হয়ে বসে থাকে সবসময়। এই বিছানায় আমাদের বাসরের প্রথম রাত। আমি তার হাত ধরে বলেছিলাম- “এই হাত ভুলেও কখনো ছেড়ে যাবেনা তো?”

তার দু’চোখে তাকাতেই কত স্মৃতি তার মনটাকে তোলপাড় করছে অনুভবে সে বেদনা আমায় কুড়েকুড়ে খেতে লাগলো। বলতে চাইলাম- “তুমি ভালো না থাকলে অন্যদের সামলাবে কে সোনা?” কিন্তু কিছুই বলতে পারলামনা, আমি জানি বললেও সে কথা এখন সে শুনতে পারবেনা।

আম্মার ঘরে এসে দেখি কঠোর হৃদয়ের অধিকারী আমার জন্মদাত্রী মা আজ শোকে বুকে পাথর বেঁধে শুয়ে আছেন। পাশে খালা, যিনি আমার ছোটবেলার খেলার সাথী। মারামারি, দুষ্টামি কত কিছুইনা করেছি তার সাথে! মা’র মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন খালা।
“বুজান কান্দিসনা বুজান, শুধু দোয়া কর।” নিজে একথা বলছেন অথচ চোখের পানি টপটপ করে ঝরছে তার।

একমাত্র আম্মাই কেন যেন কাঁদছেননা। আজ তার চোখের পানি কি সব শুকিয়ে গিয়েছে?
খালাকে বলছেন- “এই শোন, ওকে কিন্তু আমাদের নানার পাশেই কবর দিতে বলবি কেমন?
“হু, ঠিক আছে বুজান”
“ওর মামাকে ডাক দে, কুসুম গরম পানির সাথে সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোসল দিতে বল। সুগন্ধি সাবান ছাড়া আমার ছেলেটা কখনওই গোসল করতে চাইতোনা।”
“আচ্ছা বুজান, সে ব্যবস্থা করেছি আমি।”
এরপরে আম্মা আবারো নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে থাকেন। একমনে তাকিয়ে আছেন ছাদের দিকে, চোখের পাপড়ি পর্যন্ত পড়ছেনা। আমি জানি তার চোখে এখন জমা হয়েছে জন্মান্তরের অসংখ্য সব স্মৃতি।

আমার মনে পড়ে গেলো, সেই দিনের কথা। ৮৮’র কালবৈশাখী ঝড়ের সেই গভীর রাতে আব্বা বাসায় ফিরছেন না দেখে আম্মা ভয় পেয়ে আমাকে কোলের ভিতরে শাড়ির আঁচলে পেঁচিয়ে পাশে চাচার বাসায় এক দৌড়ে চলে গিয়েছিলেন। শিলাবৃষ্টি থেকে আমাকে বাঁচাতে গিয়ে আম্মা সেদিন নিজের কোমরে যে আঘাত পেয়েছিলেন সে ব্যথা সারাজীবন তাকে কাবু করে রেখেছে।
মনেমনে বললাম- “আম্মা, আমার খুব ভয় লাগছে। আপনাকে ছাড়া নিজেকে আজ বড্ড অসহায় লাগছে!”

আম্মার ঘরের সামনেই আমার নিজ হাতে গড়া ফুলের বাগান। দু’টি গোলাপ মাথা নুইয়ে কি তাদের শেষ বিদায়ের ভালোবাসা প্রকাশ করছে? কেউ একটু পানিও দেয়নি টবটাতে। আহা! একটি গোলাপ আদরের বৌটাকে ভালোবেসে দিতে চেয়েও ভুলে গিয়েছি!

আমি বাড়ির উঠোনে বেড়িয়ে ত্রস্ত পায়ে মাটিতে শুইয়ে রাখা খাটিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। একটু পরেই শুরু হবে নামের বদলে লাশ শব্দ ধারণকারী আমার অন্তিমযাত্রা। কবর খোঁড়া হয়ে গিয়েছে। বাতাসে আগরবাতি, ধূপের গন্ধে গুমোট প্রকৃতি।

হঠাতই আমার কাঁধে যেনো আব্বার হাতের ছোঁয়া পেলাম।
” কিরে বাবা ভয় পাচ্ছিস? ”
“বললাম – হু ”
ধুর ব্যাটা, আমি আছিনা। চল বাবা আর যে সময় নেই!”

সন্তানের কাঁধে রাখা বাবার শক্ত হাত সবসময়েই মনে সাহস যোগায়। সন্তান হয়ে ওঠে অকুতোভয়। সে অনুভূতি আজ আবারো অনুভব করছি নিজের মনে। অন্যরা আমাকে কাঁধে বয়ে নিয়ে হেঁটে চলেছে, তাদের ঠিক পাশে আমার হাতের আঙ্গুল শক্তভাবে ধরে রেখে আব্বাও হাঁটছেন। একদম সেই ছোটবেলার মতো, যেভাবে আমি আব্বার আঙ্গুল ধরে হাঁটা শিখেছিলাম।

আত্মাশ্রয়ের কাছে ফিরে আসার প্রচন্ড আঁকুতি নিয়ে একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখি সবাই বাড়ীর সদর দরজায় আমাকে অন্তিম বিদায় জানাতে দাঁড়িয়ে আছে। আম্মার গগনবিদারী কান্নার আওয়াজে মেঘেরা আজ গর্জন করতে ভুলে গিয়েছে। “আমার আদরের নাড়ীছেড়া ধন! তুই চলে গেলিরে বাবা? আমায় একলা করে চলে গেলি বাপ?”

প্রিয়তমা স্ত্রী যেনো আমাকে বলছে- “তুমি কথা রাখলে না, আগেই আমার হাত ছেড়ে দিলে! এমনতো কথা ছিলো না!”

ভাই, বোন, বন্ধু সবাই মিলে শেষবারের মত হয়তো বলছে- যাসনা রে, ফিরে আয় ভাই, তোর দোহাই লাগে ফিরে আয়। এখনো কতকিছু করার বাকী আমাদের।

জানি কেউই শুনতে পাবে না, তবুও কবরে শুইয়ে দেয়ার পর তিনমুষ্ঠি মাটি কফিন স্পর্শ করার আগে আমি চিৎকার দিয়ে বলবো- “হে পৃথিবী, হে পৃথিবীর মানুষ! ভালো থেকো তোমরা। যারা, আমাকে মন উজার করে ভালোবাসা দিয়েছিলে, তোমাদের বিদায়! আমার অন্তিম যাত্রায়ও গভীর মানবপ্রেমের যে অশ্রুজলে আমাকে সিক্ত করেছো তার ঋণ আমি কৃতজ্ঞচিত্তে রেখে গেলাম। আবারো দেখা হবে অসীমের ছায়াপথে। গহীন অন্ধকারে জোনাকির আলোর দিশারী হয়ে আমি অপেক্ষায় থাকবো অনন্তকাল।”

চিরবিদায়ের কালে এটাই হয়তো আমার রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে থাকবে সবার মনে। কিছু ঋণ শোধ করা যায়না, করতেও নেই। ইশ্বর সে শক্তি মানুষকে দেননি। তবে মানুষ সকলে সুযোগ দিয়েছে বলেই একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছি। শেষ বিদায়েও এটাই আমার পরম প্রাপ্তি…..

প্রতিনিয়ত আমি ঢেউয়ের কারসাজি বুঝতে চেয়েছি, আমি ঢেউকে আমার মত করে অনুবাদ করতে চেয়েছি। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে মাঝ দরিয়ায় টুপ করে একটা ডুব দেই। সাথে সাথে দরিয়ার বুকের দেয়াল ভেদ করে ক্রমাগত গহীনের দিকে যাই।

ডুবুরীরা দেয়ালের এপাশে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে উঠে বলুক- “লোকটাকেতো আর পাওয়া গেলনা, ঢেউয়েই বুঝি তার মরণ লেখা ছিল।”

আমি ঐদিকে ডুবুরীদের কথা শুনে মুচকি হেসে মুখে পানি নিয়ে বুদবুদ বানিয়ে তাদের দিকে ছুড়ে মারব। সাথে সাথে দুনিয়ার সব বুদবুদ ঢেউ হয়ে যাবে, সব সওদাগরী নৌকা ডুবে যাবে।

আমি গুনগুন করে গাইব- “বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এইবার ঘুঘু তোমার বধিবে পরান!”

(অসমাপ্ত)

[কিছু গল্পের শেষটা লেখা যায়, শুরু করাটা খুব কঠিন। এটি হয়তো তেমনই একটি গল্প হয়েই সোনেলার খেরোখাতায় থেকে যাবে।]

ছবি – আমার নিজের। কেউ ছবিটি নিজের পোষ্টে ব্যাবহার করতে চাইলে অনুগ্রহ করে ছবি তোলক হিসেবে ‘শবনম’ নামটি লিখে দেবেন।

২৩৪জন ১৩৮জন
25 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য