এন্ড্রু কিশোর এর দেহাবসান

রুমন আশরাফ ৭ জুলাই ২০২০, মঙ্গলবার, ০১:৫৯:০৬পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১০ মন্তব্য

বয়স তখন আমার সবে তিন-চার। নব্বইয়ের দশক। পঁচাশি-ছিয়াশি সাল হবে। বাবা তখন একটি গান প্রায়ই গাইতেন। গানটি ছিল, “ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, রইবো না আর বেশিদিন তোদের মাজারে।“ বাবার কণ্ঠে গানটি শুনতে শুনতে একসময় মুখস্তই করে ফেললাম। প্রথম প্রথম ভাঙা ভাঙা বললেও পরে ঠিকভাবেই রপ্ত করেছিলাম। গানটি হয়তো ছিল আমার জীবনে শোনা প্রথম গান। প্রথম যেকোনো কিছুই একটা আলাদা গুরুত্ব বহন করে। গানটিও তাই।

সেসময় বাংলা সিনেমার খুব চাহিদা ছিল। বিনোদনের উপকরণ বলতে তখন টেপ রেকর্ডার আর কাঠের বাক্সে বন্দি সাদাকালো টেলিভিশন। টেপ রেকর্ডার এর রেডিওতে তখন সিনেমার বিজ্ঞাপন হত আর সাথে চলতো গান। বিভিন্ন শিল্পীর বিভিন্ন গান শোনানো হত। শুনতাম। সেইসময়ে এন্ড্রু কিশোর সিনেমাতে প্লে-ব্যাক করছেন হরদম। “নয়নের আলো” এবং “ভাই বন্ধু” ছায়াছবির গানগুলো তখন ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। “আমার সারাদেহ খেয়োগো মাটি”, “আমার বাবার মুখে”, “আমার বুকের মধ্যখানে”, “ভেঙ্গেছে পিঞ্জর” এমন আরও অনেক গান তখন মানুষের মুখে মুখে। বাদ যাইনি আমিও। “ভাই বন্ধু” যে বছর মুক্তি পায় সে বছর সর্বমোট ৬৭টি ছায়াছবি মুক্তি পেয়েছিল। আর এবছরই বেশ কয়েকটি ছায়াছবিতে এন্ড্র কিশোর এর গান ছিল। গান শুনতে শুনতে তাঁর গানের প্রতি আমার একটা আলাদা ভালোলাগা তৈরি হল।

এরপর আস্তে আস্তে যত বড় হতে থাকলাম, গান পছন্দ এবং নির্বাচনের রুপান্তর ঘটতে থাকলো। ব্যান্ড এর গানও তখন ধীরেধীরে সমান তালে চলতে থাকলো। বিটিভিতে মাঝেমাঝেই ব্যান্ড শো হত। দেখতাম। ধীরেধীরে রক-মেটাল গানের প্রতি আকৃষ্ট হলাম। কিন্তু দিন শেষে গুনগুন করে “হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস”।

জীবনে বহু গান শুনেছি। বহু গান মনে রেখেছি। কিন্তু এন্ড্রু কিশোর এর বেশ কিছু গান হৃদয়ে লালন করে রেখেছি। মনের অজান্তে এখনও গেয়ে উঠি “আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান, সেদিন থেকে গানই জীবন গানই আমার প্রাণ”। যদিও আমি কিংবা বাবা কেউই গায়ক নই, কিন্তু তাঁর বেশ কিছু গান এতোটাই শিহরণ জাগায় যে, তাঁর গাওয়া গানগুলো গুনগুন করে গাইতে আমাকে বাধ্য করে।

ব্যক্তি হিসেবে এন্ড্র কিশোর এর একটি মহৎ গুন আমি খেয়াল করেছি। গানের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে বিচারকের ভূমিকায় থাকাকালীন কোনও প্রতিযোগীর প্রতি আপত্তিজনক কোনও আচরণ করতে দেখিনি। খুব সাবলীল এবং বিচক্ষণতার সাথে বিচারকের ভূমিকা পালন করতেন।

গতকাল আকস্মিক তাঁর মহাপ্রয়াণের খবরটি শুনে কেমন যেন একটা শূন্যতা অনুভূত হল। মনে হল কি যেন হারালাম। হ্যাঁ আমরা আরও একজন কিংবদন্তি হারালাম।

ওপারে ভালো থাকুক গানের পাখি।

১৬৭জন ৪৯জন
5 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ