আমি তোমার জন্য এসেছি-(পর্ব-৬৭)

রিহানের মুখামুখি হলো, ভাইয়া আমি বিয়ে করতে চাই।রিহান হাসতে হাসতে বললো ওরে বাবা রাইসা শোনছো আমাদের শ্রেয়া বিয়ে করবে।আচ্ছা আমি তোমার বিয়ের জন্য ভালো ছেলে দেখবো।নাহ্ ভাইয়া ছেলে আমি পছন্দ করে রেখেছি।তাই নাকি!সেই সৌভাগ্যবান পুরুষটা কে শুনি। তোমার বন্ধু আরিয়ার চৌধুরী আরাফ’কে আমি ভালোবাসি, বিয়ে করতে চাই তুমি তাঁর সাথে কথা বলো।রিহান কি বলবে বুঝতে পারছিলো না কারন সে আরাফের অতীত সম্পর্কে জানে দেশে ফিরলেই আরাফ প্রিয়াকে বিয়ে করবে।

শ্রেয়া তুমি যাও, আমি আরাফের সাথে কথা বলে পরে তোমাকে জানাব।রিহানের কথা শুনে শ্রেয়া খুশি হল আই লাভ ইউ ভাইয়া,ইউ আর গ্রেট বলেই রুম থেকে চলে গেল।আরাফের বিয়ে ঠিক সেটা তুমি শ্রেয়ার কাছে গোপন করলে কেন?রাইসার এমন প্রশ্নে রিহানের চোখে পানি।শ্রেয়া আরাফকে খুব ভালোবাসে তাই এই মুহূত্বে সত্যিটা বলে আর কষ্ট দিতে চাইনি।সময় আসুক পরে একদিন শ্রেয়াকে বুঝিয়ে বলবো বলেই রিহান অফিসে চলে যায়।কেটে গেল বছর শ্রেয়া মনদিয়ে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিল,কয়েকমাস পর রেজাল্ট হলো।

শ্রেয়া মেডিকেল পাশ করে ডাক্তার হয়ে বের হলো, চারদিক থেকে সম্ভান্ত পরিবারের ছেলেরা শ্রেয়ার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে শুরু করলো।শ্রেয়া এবার সিদ্ধান্ত নিল আরাফকে তার ভালোবাসার কথা জানাবে।সুযোগ বুঝে বলেই ফেলল আরাফ সাহেব আমি আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।জ্বী বলুন।অফিসের বাইরে আমরা দেখা দেখবো।আরাফ অনইচ্ছা সর্তেও শ্রেয়ার জেদের কাছে হার মানলো পরদিন সিটি পার্কে ওরা দুজনেই দেখা করলো।

শ্রেয়া একটু আগেই চলে গেল প্রায় ১ঘন্টা অপেক্ষার পর আরাফ আসল,ওরা পার্কে বসল।আরাফ বললো ম্যাডাম  বলুন কি আপনার জরুরী কথা,,শ্রেয়া আমতা আমতা করে বললো আরাফ সাহেব আমি আপনাকে ভালোবাসি,বিয়ে করতে চাই।স্যরি ম্যাডাম আমি একজনের জন্য অপেক্ষা করতেছি।শ্রেয়ার আগ্রহ বাড়ে!কে সে?আমার প্রথম ভালোবাসা আমার পিচ্চি প্রিয়া।

আরাফ প্রিয়ার সাথে ঘটে যাওয়া গত ৭ বছরের সব ঘটনা খুলে বললো।আমি প্রিয়ার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করবো,আমার বিশ্বাস প্রিয়া একদিন আমার ভালোবাসা বুঝবে।আরাফের কথা শুনে শ্রেয়ার হৃদয় ভেঙ্গে দু-খন্ড হয়ে গেল শ্রেয়ার দু-চোখ বেয়ে পানি ঝরতে লাগলো।প্রিয়ার প্রতি আরাফের ভালোবাসা, বিশ্বাস শ্রেয়াকে মুগ্ধ করলো।আরাফের প্রতি শ্রেয়ার ভালোবাসা বহুগুন বেড়ে গেল সাথে শ্রদ্ধাটাও।

শ্রেয়া চেয়ে দেখল আরাফের চোখে পানি, একজন মানুষকে মন থেকে কতটা চাইলে।তার জন্য ৭ বছর অপেক্ষা করা যায়,তাকে ভেবে কাঁদা যায়।সব মিলিয়ে শ্রেয়াও আবেগে আপ্লুত হলো, আরাফ আর কথা বাড়াল না।শ্রেয়াকে পার্কে রেখেই আরাফ গাড়িতে ওঠে বসল,কাঁচের বাইরে চোখ ফেরাল শ্রেয়া বসে আছে।শ্রেয়া বসে বসে ভাবতে লাগলো যেহেতু ৭বছরেও প্রিয়া আরাফের সাথে যোগাযোগ করে নাই।তার মানে সে আরাফকে ভুলে গেছে!

নতুন ভাবে জীবন শুরু করছে। অন্য কারো সাথে বাঙ্গালি মেয়েরা এত বছর অপেক্ষা করে না। আরাফের সাথে শ্রেয়ার দেখা হলেই সে আরাফকে বুঝানোর চেষ্টা করে প্রিয়া তাকে ভুলে গেছে।আরাফ যেন শ্রেয়াকে বিয়ে করে তার ভালোবাসা দিয়ে সে প্রিয়ার স্মৃতি মুছিয়ে দিব। কিন্তু আরাফ শ্রেয়াকে পাত্তা দেয় না,শ্রেয়াও জেদ করে পৃথিবীর যেকোন কিছুর বিনিময়ে হলেও সে আরাফকে বিয়ে করত চায়।শ্রেয়ার ভাই রিহান,ভাবী রাইসা সবাই আরাফ, প্রিয়ার ভালোবাসার কাছে হার মেনে নেয়। কিন্তু শ্রেয়া ছেড়ে যাবার প্রার্থী নয় সে আরাফকে বিয়ে করার প্রতিজ্ঞা করে।

একদিন ব্যবসায়ী কাছে রিহান যেতে পারে নাই, মিটিংএ শ্রেয়া আরাফের সাথে যায়।কানাডা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েকজন বায়ার আসে তাদের সাথে আরাফ মিটিং শেষ করতে দুপুর ৩ টা বেজে যায়।আরাফ পিয়নকে ডেকে পাঠায় বাইরে থেকে খাবার আনতে শ্রেয়া আরাফ আফিসে খাবে।শ্রেয়া আরাফকে জানায় তাকে বিয়ে না করলে সে সুইসাইড করবে,আরাফ শ্রেয়াকে বুঝানোর চেষ্টা করে প্রিয়া ছাড়া সে কাউকে ভালোবাসতে পারবে না।

শ্রেয়া কাঁদতে কাঁদতে তাঁর অফিস কক্ষে গিয়ে দরজা আটকিয়ে দেয়,পিয়ন এসে জানায় শ্রেয়া ম্যাডামকে কোথায়ও পাওয়া যাচ্ছে না।আরাফ পাগলের মতো শ্রেয়াকে খোঁজতে থাকে, হঠাৎ অফিস কক্ষের দরজা বন্ধ দেখতে পায়।আরাফের ডাক শ্রেয়ার কানে পৌঁছায় না,সবার ডাক প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।অবশেষে আরাফ সিদ্ধান্ত নেয় দরজা ভাঙ্গার পিয়নসহ সবাইকে নিয়ে দরজা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে। আরাফ যা দেখল সে এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলো না।শ্রেয়া অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছে, পাশেই রক্ত মাখা চুরি পড়ে আছে।হাত থেকে প্রচুর রক্ত বের হচ্ছে আরাফ শ্রেয়ার হাত ধরে চিৎকার করে ওঠল শেয়া এ তুমি কি করলে!পাশে ডাক্তার সুপর্ণা ফাল্গুনী চেম্বার, প্রিয়ন দৌঁড়ে গিয়ে ডাক্তার নিয়ে আসলো।

সুপর্ণা ফাল্গুনী কোন রিস্ক নিতে চাইলেন না, হাসপাতালে ফোন দিলেন ডাক্তার তৌহিদ..!আপনি রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসুন বললেন। আরাফ সাহেব আমরা মেম’কে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাই।এই মাত্র ডাক্তার তৌহিদের সাথে কথা বললাম শ্রেয়ার অবস্থা খুব খারাপ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রক্ত পড়া বন্ধ করতে হবে। তারপর চিকিৎসা শুরু না করলে হয়ত আমরা মেম’কে বাঁচাতে পারবো না,শ্রেয়ার প্রচুর রক্তকরন হয়েছে।

যা ভালো মনে হয় প্লীজ তাই করুন আমি রিহানকে ব্যাপারটা জানাচ্ছি,আমি আর চাপ নিতে পারছি না।আরাফ রিহানের নাম্বারে কল দিল হ্যালো রিহান শ্রেয়া….সব খুলে বললো!কখন,কিভাবে হলো বলেই রিহান চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো আরাফ শ্রেয়া আমার একমাত্র বোন।ওর কিছু হলে আমি বাঁচবোনা,তোরা শ্রেয়াকে নিয়ে হাসপাতালে যা আমি রাইসাকে নিয়ে আসতেছি।রাইসা,রাইসা বলে চিৎকারটা আরাফ শোনতে পেল তারপর রিহান ফোনে লাইনটা কেটে দিল।

হাসপাতালে কেউ হেসে বের হচ্ছে কেউ বা কান্নায় আরাফ জানে একটা জীবনের কত মূল্য। এইমাত্র একজন লোক মারা গেল লাশবাহী গাড়িটা নিয়ে যাচ্ছে, পাশের কেবিন থেকে হাসির আওয়াজ আসছে। কিছুক্ষন আগে প্রথম কন্না সন্তানের বাবা হলেন ছাইরাছ হেলাল সাহেব লোকটা আরাফের পূর্ব পরিচিত।ইঞ্জিনিয়ানিং পড়ার সময় অনেক আড্ডা দিতাম ওনি অফিস সহকারী ছিলেন,আজ শ্রেয়া অসুস্থ তাই ভিতরে বাচ্চাটাকে দেখতে যাননি৷ হেলাল সাহেব সেই খুশিতে সবাইকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে।আরাফ পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছুটছিলো সবার কান্ড দেখছিলো।শ্রেয়ার একটা কিছু হলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবোনা।

ওটি থেকে ডাক্তর সুপর্ণা ফাল্গুনী বের হলেন, শ্রেয়া এখন কেমন আছে?আরাফ সাহেব আপনি শান্ত হয়ে ওয়েটিং রুমে বসুন, শ্রেয়া মেম’কে ওটিতে নেওয়া হয়েছে।ডাক্তার তৌহিদ,ডাক্তার নিতাই বাবু পুরনো ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ডাক্তার।ওনারা দেখছেন কোন চিন্তা করবেন না সামান্য একটা অপারেশন সব ঠিক হয়ে যাবে।

আরাফ চেয়ারে বসল ডাক্তার নিতাই বাবু এসে সুপর্ণা ফাগ্লুনীর পাশে  দাঁড়ালেন,কিছু বলবেন?জ্বী রোগীর সাথে লোকজন কে আসছেন?আরাফ বললো স্যার আমি শ্রেয়ার বন্ধু আমাকে বলুন।ডাক্তার নিতাই বাবু প্রশ্ন করলেন পরিবারের কেউ আসে নাই?জ্বী ওরা রওনা হয়েছে কিছুক্ষনের মধ্যেই আসবে।ডাক্তার সুপর্ণা ফাল্গুনী  বললেন ওনি শ্রেয়া মেম এর আত্মীয়, ততক্ষনে নার্স খাদিজাতুল কুবরা এসে হাজির।

স্যার রোগীর অবস্থা বেশি ভালো না প্লীজ তাড়াতাড়ি আসুন।ডাক্তার নিতাই বাবু,ডাক্তার তৌহিদ, সুপর্ণা ফাল্গুনী দ্রুত স্থান ত্যাগ করে ওটি দিকে গেলেন।নার্স শ্রেয়া বাঁচবে তো! আমি কিভাবে বললো আমি তো নার্স ডাক্তারদের এসব প্রশ্ন করবেন। আমার সাথে আসুন বলেই হেঁটে ভিতরের যেতে লাগলো।রোগী আপনার কি হয়?আত্মীয় এত হাত কাটলো কেউ দেখেন নাই।জ্বী মানে, এত মানে মানে করছেন থাক বলতে হবে না।পিচন থেকে আলমগীর সরকার লিটন ডাকলেন, জ্বী লিটন দাদা বলুন।দিদি ৩২নং ওয়াডের দায়িত্বে কে আছেন? জ্বী সুরাইয়া পারভীন।ও আচ্ছা আমি ওনাকে খোঁজছি বলেই চলে গেলেন।সামনেই সুরাইয়া পারভীর ও প্রদীপ চক্রবতী বেশ গল্পে মশগুল।আরে প্রদীপ চক্রবতী দাদা যে কেমন আছেন? আলমগীর সরকার লিটন দাদা হাত মিলালেন।রাতে ডিউটতে আমি আছি তাই একটু তাড়াতাড়ি এসে পড়লাম বললেন প্রদীপ চক্রবতী।খুব ভালো করছেন দাদা রাতে কথা হবে, সুরাইয়া পারভীন দিদিকে খোঁজছি বললেন আলমগীর সরকার লিটন। চলুন দাদা বলেই সুরাইয়া পারভীন এগিয়ে আসলেন ৩২নং কেবিনের রোগীর কি সমস্যা কথোপকথন চলছে।

আরাফ আর খাদিজাতুল কুবরা ভিতরে ঢুকতেই ডাক্তার এস.জেড বাবু,অফিস সহকারী সঞ্জয় মালকার চেয়ারে বসে আছেন।স্যার ওনি আমাদের রোগী শ্রেয়ার আত্মীয় ও আচ্চা আপনি যান।আপনার নাম জ্বী আরাফ চৌধুরী…বাসার ঠিকানা একের পর প্রশ্ন করে চললেন ডাক্তার এস.জেড.বাবু।আপনি ওনার পরিচয় লিখে রাখুন, সঞ্জয় মালাকার আরাফের সব ঠিকানা এন্টি করে রাখলেন।

কিছুক্ষনের ভিতর এখান থেকে অন্য রুমে ডাকল সেখানে ডাক্তার ইঞ্জা অপেক্ষা করছেন।আরাফকে দেখা মাত্রই ভিতরে ডাকলেন আসুন,স্যার আমার রক্তের গ্রুপ (০-পজেটিভ) বলেই আরাফ চেয়ারে বসল।বাহ্ দারুন! প্রতিটা সচেতন মানুষকেই তার রক্তের গ্রুপ জানা জরুরী, ওকে আপনি এখানে সাইন করোন।সঞ্জয় মালাকার বললেন রোগী অবস্থা ভালো না, রোগীর জরুরী কিছু তথ্য এখানে লিখা আছে কিছু সাইন দেন প্লীজ। আরাফ একটা দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলল হে আল্লাহ্ তুমি আমাকে এ কোন পরীক্ষায় ফেললে।

……চলবে।

২২৯জন ৯৬জন
0 Shares

২৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য