হাসপাতালে থেকেই সবাইকে ফোন সারছি একে একে। আমার ছোটবেলায় যে মানূষটি আমার দেখাশোনা করতো সাধু বুড়ো, তার সাথে কথা বললাম। বুড়ো একই আছে। এখনও হাঁটছে-চলছে-ফিরছে-ঘুরছে। ইচ্ছে হচ্ছিলো ছুটে গিয়ে দেখে আসি। বুড়োর সাথে দেখা হলেই আমি জড়িয়ে নেই। ওই বুকেই যে অনেক অনেক ঘুমিয়েছি কোলে কোলে। যাক এরই মধ্যে বান্ধবী হেনাও এলো। হেনার মা ল্যাব এইডে ভর্তি ছিলেন। কতোটা টান থাকলে এক ছুটে এসে আমায় দেখে যায়। ওরা বাপি-মামনিকে খুব ভালোবাসে। কি ছিলো দুজন মানুষ হেনা বলছিলো, “খুব মিস করি রে সেই দিনগুলো শমশেরনগরে তোদের বাসায় কাটানো সেই রাত-দিন, আড্ডা। আন্টির অনেক মজার গল্প।” একই কথা অষ্ট্রেলিয়ায় থাকা বন্ধু মৃদুলও বলে। হেনা বেশীক্ষণ থাকতে পারলো না। বুকের ভেতর কেমন একটা হাহাকার, এইতো সেদিন আড্ডা-বাদাম-গান, সিলেট এম.সি কলেজের সবুজ মাঠ। পরক্ষণেই আবার ফিরে এলাম বাস্তবতায়। অপারেশনের তারিখ দিয়েছে, এখন কোনোভাবে ব্লাড সুগার ঠিক থাকলেই হলো। কেউ কারো জন্যে আটকে থাকেনা। কিন্তু তাও আমি চাই আমার থাকা অবস্থাতেই যেনো সব হয়ে যায়। একেকটা মুহূর্ত সেকেন্ডের কাটাকেও হার মানাচ্ছিলো। সকাল গড়িয়ে বিকেল, সন্ধ্যে-রাত্রি। পরেরদিন ফোন এলো, “নীল তোদের কেবিন নাম্বার কতো?” আমি চমকে গেলাম। ফেসবুকে পরিচয় রুমানা সি আহসান যাকে আমি ঊর্মীদি বলে ডাকি উনি হাসপাতালে এসেছেন বাপিকে দেখতে। এই দিদি সিলেট এম.সি.কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল মতিন স্যার যিনি বাপির টিচার ছিলেন উনার মেয়ে। পরিচয় করিয়ে দিতেই বাপির চোখের জল, হয়তো সেই সময়কার দিনগুলো মনে পড়ে গিয়েছিলো। উচ্ছ্বল-প্রাণবন্ত এক তরুণের স্মৃতিকাতর সময়। দিদিকে দেখে আমিও আবেগাপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম। ফটোসেশন হলো, দিদি চলেও গেলো। বিকেলে প্রায়ই আমার আত্মীয়-স্বজনেরা আসতো। মোটামুটি প্রতিদিনই রানা আসতো। যে সময় নিয়ে গিয়েছিলাম তা আসলেই অপ্রতুল ছিলোনা সকলের সাথে দেখা করার জন্য। আমার শাশুড়ি, এক অসাধারণ মহিলা। একটিবারের জন্যও অভিযোগ করেননি কেন আমি থাকিনি শ্বশুরবাড়ী। বরং প্রতিটি মুহূর্তে সহযোগিতা করেছেন। তাও দেবরের বাসায় গিয়ে এক রাত থেকেছিলাম তীর্থকে নিয়ে। তীর্থকে বলেওছি গিয়ে থাকতে, কিন্তু ও থাকতে চায়না আমায় ছাড়া। আসলে আমি নই, মৌয়ের বাসায় থাকলে ইন্টারনেট পাওয়া যায়, তাছাড়া রাইয়ের কাছেও যাওয়া যায়। আর আমার দেবর রবিদের বাসায় টিভি আছে, তাতে ওর মন ভরে না। শাশুড়ির জন্যে খারাপ লাগছিলো। নিজেকে যদি উনার জায়গায় রাখি তাহলে আমি এতো উদার হতে পারবোনা। রবির বৌ মনি খুবই ভালো মেয়ে আর অসম্ভব সংসারী। ঠিক আমার উল্টো। অনেক কিছু রান্না করলো। যা যা আমার প্রিয় শাশুড়ি মা মনিকে বলেছিলো। মনি আমায় বললো, “দিদি তোমার সব পছন্দ মা জানেন।” রবির বিয়ের সময় দেশে ছিলাম না। যাক রাতে শাশুড়ি আর আমি ঘুমালাম। অনেক গল্প। যেনো ফুরোতে চায়না। সকালে বললেন, “একটা কাঁথা সেলাই করেছি তীর্থর জন্য।” বললাম ইস আমার ওটা। কারুর না। হেসে বললেন, “মা রে ঠিক আছে নিও তুমি।” আসার সময় মজা হলো বাসে করে এসেছি তীর্থকে নিয়ে। বুঝিনি লোকাল বাসে উঠে গেছি, খুব ইচ্ছে করছিলো ঢাকার বাস চড়তে সেই কলেজ জীবনের মতো। উঠে বুঝেছি যেটার কথা বলেছিলো রবি সেটায় উঠিনি। ওহ আমার সাথে মামাত ভাই প্রীতমও ছিলো। ওটাকে বললাম তুই বুঝিসনি? বললো, “দিদি আমার এদিকে আসা হয়না। আমি থাকি চিটাগং, ঢাকার সব বাস কি করে চিনবো?” সেও কথা। এরই মধ্যে ফার্মগেট চলে এলাম। প্রীতম বললো যেনো রেডি থাকি। কিভাবে নামবো এতো ভীড়? তীর্থ বেচারার বিশাল অভিজ্ঞতা হলো। বললাম তোর মা এভাবে অনেক কষ্ট করেছে, তুই দেখবি না?

ওদিকে মামনি বললো বাপি নাকি বেশ জ্বালাচ্ছে। আমি কোথায়? কেন গেছি ওকে ফেলে? একেবারে বাচ্চাদের মতো। যাক তারপর সরাসরি হাসপাতাল। প্রীতমকে বললাম তুই তীর্থকে নিয়ে যা। এসে দেখি বাচ্চাদের মতো বাপি হাসছে। বললাম আমি থাকলে তো তোমাকে বকি। মামী আর মামনি তো ছিলো, অস্থির কেন? যেটুকু বুঝলাম মামনি আর মামী সব নাকি বোঝেনা। হায়রে আমার বাবা কে যে কার চরিত্র পেয়েছে, কে জানে! ওহ পরেরদিন অপারেশন। যদিও আমি নিশ্চিন্ত বাপি সুস্থ হয়ে উঠবেই। তাও সকলেরই চিন্তা। বিকেলে বাপিকে নিয়ে যাওয়া হলো অপারেশন থিয়েটারে। অগাধ বিশ্বাস আমার কথার উপর। বললাম এখানেই আছি, তিরিশ মিনিট পরই তোমাকে দেখতে দেবে। আসলে তো দু’ ঘন্টারও বেশী সময় লেগেছিলো। অপারেশন থিয়েটারের সামনে প্রচন্ড ভীড়। এসব দেখে আসলে অভ্যস্ত নই। আর হৈ-হুল্লোড়। ফোনে চিৎকার করে কথা বলা। একজন-দুজন না, প্রায় সকলেই। সময়ের কিছু আগেই আবার গেলাম, গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম ডাঃ কৈরীর পেশেন্ট করুণাময় চন্দ, উনার অপারেশন কি শেষ? খবর নিয়ে জানালেন অপারেশন থিয়েটার থেকে বাপিকে আই.সি.ইউ তে নেয়া হয়েছে। আমি জানিনা আই.সি.ইউ কেন বলা হয়? সাধারণত অপারেশন শেষ হলে Post Anesthesia Care Unit (PACU) তে নেয়া হয়। একে রিকোভারী রুমও বলা হয়। কিন্তু দেশে কেন যে আই.সি.ইউ বলে। যাক ভেতরে গিয়ে যা দেখলাম, আমার চক্ষু চড়কগাছ। একেকজন রোগীকে যেভাবে এনে রাখছে, তাতে মনে হচ্ছিলো কাটা শেষ, এইবারে বস্তায় ভরে ফেলো। লোকজন গিজগিজ করছে। জায়গা নেই পাশ কেটে যাবার। সরকারী হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডের দৃশ্য। কাউকে বললাম না। মামনি চিন্তা করবে। এরই মধ্যে নার্স বললো, “পেশেন্টের খাবার এনেছেন?” আমি অবাক কি খাবার আনবো তাও একজন সার্জারীর রোগীর জন্য? বললাম সে তো আপনারা জানেন। আমি কি খাবার আনবো তাও এই আই.সি.ইউ-এর ভেতর? বললো, “না আনলে উনাকে কিন্তু সারারাত না খেয়ে থাকতে হবে। আর শুনুন স্যুপ আনবেন।” ওই সময় রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। স্যুপ আমি কোথা থেকে আনবো? তাও ক্যাফেটেরিয়াতে গেলাম, কেউ নেই। দিনে বসার চেয়ার থাকেনা, এখন সারি সারি চেয়ার চুপচাপ ঝিমুচ্ছে। অপুকে ফোন দিলাম বেচারা অতো রাতে কোত্থেকে স্যুপের প্যাকেট কিনে আনলো, সাথে বাসায় গিয়ে ফ্লাস্কে করে গরম জল। নিয়ে গেলাম বানিয়ে, গিয়ে দেখি বাপি চেয়েছে। হাসি দিলাম, এনেস্থেশিয়ার ঘোর কাটছে। ব্যথা বাড়ছে। তবুও বললাম গালে গাল ঠেকিয়ে, কপালে চুমু দিয়ে স্যুপটা খেও। আমি বাইরে আছি। বাপি অবশেষে খেলো। সেই রাত আমি আর কেবিনে ফিরিনি। একটা শূণ্যতা। যাওয়া-আসার মধ্যে কেটে গেলো রাতটা। পরেরদিন সকালে বাপিকে বেড-এ রাখা হলো। অপারেশন সাকসেসফুল। আমার জন্য ওটাই যে সব পাওয়া।

একেকটি রাত জানে আমার সাথে নিঃশ্বাসের কথোপকথন
কি ঘটছে অগোছালো মস্তিষ্কের ভেতর!
যারা বলছে ভালো লাগছেনা,
আর আমার আমি অনুভূতিহীন, সব ভালো-মন্দ ছাড়িয়ে–
প্রতিদিনকার হিসেবের খাতায় কেবলই বিয়োগ।
সময় যাচ্ছে,
আবার আকাশ খেলা দেখাবে,
দিন-রাতের সন্ধিক্ষণের মহাসাগরের মধ্যিখানে
সূর্য আর চাঁদের সহাবস্থান।

**এই ধারাবাহিকের শেষের দিকের প্রতিটি পংক্তি গ্রীনলাইফ হাসপাতালে বসে লেখা, একেকটি রাতের সাথে কথা বলা নিজের সাথে নিজের।**

ক্রমশ

হ্যামিল্টন, কানাডা
১২ অক্টোবর, ২০১৫ ইং।

বান্ধবী হেনা...
বান্ধবী হেনা…
রুমানা সি আহসান ঊর্মীদি...
রুমানা সি আহসান ঊর্মীদি…
শাশুড়ি মা আর তীর্থ...
শাশুড়ি মা আর তীর্থ…
দেবর রবি আর ওর স্ত্রী মনি...
দেবর রবি আর ওর স্ত্রী মনি…
৩৯২জন ৩৯২জন
0 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ