মূল লেখায় যান

সেদিনের সেই বেঁচে যাওয়া ছয় মাসের মেয়েটি এখন সোনেলার ব্লগার (স্মৃতিতে ১৯৭১)

জিসান শা ইকরামএকান্ত অনুভূতি৫২টি মন্তব্য

১৯৭১ এর মার্চের প্রথম দিকে মিসেস লিলি ইসলাম তার পিতার বাড়িতে গেলেন। পঁচিশ মার্চ এর পরে তার স্বামী, শ্বশুর বাড়ি যাবার ইচ্ছে প্রবল হয়। তার শ্বশুর, স্বামী সহ দেবর গণ সবাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের নেতা। শহরের তিনটি আওয়ামী লীগ পরিবার যারা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত, লিলি ইসলাম এর শ্বশুর এর পরিবার তার মধ্যে একটি। ঢাকায় পাকিদের এমন আক্রমনের খবর শুনতে পেয়ে আতংক গ্রস্থ হয়ে পরেন লিলি ইসলাম। চার দেবর ৬৯ এর ছাত্র আন্দোলন এর পরে দু একবার গ্রেফতার হতেন প্রায়ই। ৭১ এ বঙ্গবন্ধুর সমস্ত আদেশ নির্দেশ পালনে এই চার দেবর মুখ্য ভুমিকা রাখেন। স্বামী স্কুলের শিক্ষক এবং ইত্তেফাক সংবাদদাতা। এমনি অবস্থায় তিনি পিতার বাড়ি থেকে স্বামীর কাছে থাকাই শ্রেয় মনে করলেন।

৭১ এ সড়ক যোগাযোগ তেমন ভালো না থাকায়। বরিশালের শিকারপুর বন্দর থেকে ছোট একটি লঞ্চে ওঠেন তিনি, সাথে নেন বড় বোনের ছেলেকে। তার ছয় মাসের ফুটফুটে কন্যা সন্তান সারাক্ষণই কোলে কোলে থাকে। শিকারপুর এর নদীটা বিশাল। নদী পথেই শিকারপুর হতে ঝালকাঠীর যোগাযোগটা ভালো। মার্চের ২৭ এর ঘটনা এটি।

লঞ্চ ষ্টেশন থেকে লঞ্চ ছাড়ল দশ মিনিটের মত হয়েছে। হঠাৎ বিকট শব্দ। লিলি ইসলাম চোখের সামনে দেখলেন তার সামনে বসা বোনের ছেলে দুই ভাগ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরলো। আরো কয়েকজন কিছু বোঝার আগেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে মৃত্যুর ছোঁয়া পেলো। ডুবে যাচ্ছে লঞ্চ। মুহুর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ছয় মাস বয়েসি কন্যা সন্তান নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিলেন লিলি ইসলাম। পরনের কাপড়ে জড়িয়ে পরলেন তিনি। কাপড় সামলাতে গিয়ে হাত থেকে ফসকে গেলো কন্যা। পাগলিনীর মত পানির মধ্যে ডুব দিয়ে কন্যাকে খুঁজতে আরম্ভ করলেন। এক সময় আল্লাহার অসীম রহমতে কন্যার জামা হাতে লাগলো, যক্ষের ধনের চেয়েও মূল্যবান কন্যা সন্তানকে এক হাতে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আর এক হাত দিয়ে সাতার কেটে কেটে অবশেষে বিশাল নদীর তীরে পৌছালেন তিনি। নদীর পাড়ে জড়ো হওয়া মানুষদের সহায়তায় উদ্ধার হলেন তিনি কন্যা সন্তানকে সহ। বেঁচে আছে মেয়ে, বেঁচে আছে চিৎকার করে আল্লাহর দরবারে শোকরিয়া আদায় করলেন তিনি।

পাক হানাদার বাহিনী কোনো তথ্যের ভিত্তিতে ঐ লঞ্চে বিমান হামলা করেছিল। লঞ্চের খুব অল্প সংখ্যক মানুষ সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন, বাকীরা মৃত। লিলি ইসলাম সাতার জানতো বলে, সর্বোপরি ভাগ্য সহায়তা করেছিল বলেই কন্যা সহ বেঁচে গিয়েছিলেন। এই ঘটনার পরে কয়েকবছর যাবত লিলি ইসলাম তার বড় বোনের সামনে যা্ন নি। স্বাভাবিক ভাবেই তিনি অভিযুক্ত করেছিলেন লিলি ইসলামকে যে তার ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিল বলেই ছেলে মারা গিয়েছে। এই ঘটনার পরে ছোট্ট মেয়েটির নাম হয়ে যায় স্মৃতি, ৭১ এর স্মৃতি।

ঘটনার পরদিন লিলি ইসলাম এর স্বামী ঝালকাঠী থেকে একটি স্পিড বোড এ চলে যান শিকারপুর। স্ত্রী এবং কন্যা সহ ফিরে আসেন নিজ বাড়িতে। এরপরে ইতিহাস অন্য অনেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ইতিহাসের মত। ২৭ এপ্রিল ঝালকাঠীতে পাক সেনারা আসে। কিছু প্রতিরোধ যুদ্ধের পরে তারা দখল করে নেয় ঝালকাঠী শহর। লিলি ইসলাম এর চার দেবর মুক্তিযুদ্ধে চলে যায়। স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি এবং কয়েকজন ছোট দেবর ননদ সহ লিলি ইসলাম এর পলাতক জীবন চলে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ যাবত। ৬ ডিসেম্বর ঝালকাঠী থেকে পাক হানাদার বাহিনী চলে যায়। ৮ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ঝালকাঠী পুন দখল করে, শত্রু মুক্ত হয় ঝালকাঠী।

৭১ এর পাকিদের বিমান হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া, মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে আসা ছয় মাসের শিশুটি এখন আমাদের সোনেলার অতি পরিচিত এবং প্রিয় একজন ব্লগার।

শুভ কামনা মৃত্যুঞ্জয়ী বন্যা ইসলাম।  আল্লাহ্‌ তোমাকে সমস্ত বিপদ আপদ থেকে দূরে রেখে আরো অনেক বছর বাঁচিয়ে রাখুক,
আমীন…………

মোট পড়েছেনঃ ১৪৩৯জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

৫২টি মন্তব্য

    1. জীবনে অনেককিছুই ঘটে, যা আসলেই মাঝে মাঝে আমাদের অবাক করে রাখে।
      আপনার ভালবাসা কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহন করলাম। আপনার প্রতিও রইলো আমার ভালবাসা অজস্র❤❤

  1. বন্যা আপুকে মনের অন্তঃস্থল থেকে একরাশ শুভেচ্ছা। একাত্তর প্রজন্মের একজন আমাদের সবার প্রিয় ব্লগার ভাবতেই ভালো লাগছে। সকল বিপদাপদ মুক্ত থাকুন তিনি সবসময় এটাই কাম্য।

    লেখাটি পড়ে আসলে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারছিনা। এ এক অন্যরকম ভালোলাগা।

    আপনাকে ধন্যবাদ ভাই আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য।

  2. জয় বাংলা।বন্যা ইসলাম প্রিয় আপু।আপনার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আরো বেড়ে গেল।লেখার বর্ননায় পড়ছিলাম মনে হয়নি মনে হতে থাকল যুদ্ধে নদী পাড়াপাড়ে এক অসহায় মা তার সন্তানকে একহাতে রেখে হাত উচু করে পার হচ্ছিল যেন। স্যালুট মা ও বেটি এবং আপনাদের পুরো মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে।

  3. বড়ই কঠিন সত্য আজ তুলে ধরলেন ভাইজান, বড়ই করুণ ও কঠিন সময় কাটিয়েছেন বন্যা ইসলাম আপুর মা ও তার পরিবার, আমি সেদিনের শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই, স্যালুট জানাই বন্যা আপুর শ্রদ্ধেয়া মাকে, বুঝতে পারি উনি আজন্ম সেদিনের দুঃখজনক ঘটনার কষ্ট বুকে নিয়ে ঘুরছিলেন, আমি স্যালুট করি বন্যা ইসলাম আপুকে যার মা এমন সাহসী ছিলেন।
    ধন্যবাদ ভাইজান, এমন একটি ঘটনা আমাদের সামনে তুলে ধরার জন্য, এই জন্য আপনাকেও স্যালুট।

  4. যখন ফুটফুটে কন্যা শিশুটি নদীতে হারিয়ে গেলো,,, কেঁপে উঠলো সমস্ত হৃৎপিণ্ড। একজন মা হিসেবে এ সময়টাকে অনুভব করেই শিউরে উঠা। আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন। একবার মৃত্যুকে জয় করেছেন আমাদের বন্যা আপু। আপু আপনার জন্য রইলো অসংখ্য শুভ কামনা।💓💓

    1. জীবন থাকতে মরন নাই,কথাটা মর্মে মর্মে অনুধাবন যোগ্য আমার ক্ষেত্রে। সত্যি মহান আল্লাহর অসিম রহমতের কারনে আর মা’য়ের অকুতভয় সাহসের কারনে আজো বেঁচে আছি রাব্বুল আলআমিনের কৃপায়।
      অসংখ্য ধন্যবাদ শুভেচ্ছা সুরাইয়া আপু।

  5. বুকটা ধপাস করে উঠলো। অতোটুকু বয়সের শিশুর পানিতে পড়েও বেঁচে থাকা সত্যিই ঈশ্বরের কৃপা। বন্যা আপুর দীর্ঘায়ু কামনা করছি। বন্যা আপুর মায়ের সাহসী কতার প্রশংসা করতেই হবে।

    1. সেই সময়ের অনুভূতি কেবল আমার মা’ই অনুভব করতে পারেন! চেষ্টা করলেও হয়তো আমি নিজেও ভাবতে পারবোনা কেমন লেগেছিলো সেই পরিস্থীতে আমার মা’য়ের? মহান স্রষ্টার প্রতি লাখ কোটি শুকরিয়া জানাই আজো। এক মা তাঁর প্রথম সন্তানহারা হননি। ধন্যবাদ শুভেচ্ছা দিদি আপনাকে।

  6. সত্যিই অবাক ব্যাপার।
    বন্যা দিদির জন্য অনেক অনেক শুভকামনা রইলো।
    স্যালুট জানাই বন্যা দিদিকে যার মা এমন সাহসী ছিলেন।
    অন্যরকম এ এক ভালো লাগা।

  7. কথায় বলে রাখে আল্লাহ মারে কে? আল্লাহর অশেষ রহমতে বন্যা আপু। ঐ নদীর পানি হতেও রক্ষা পেয়েছেন মায়ের আশ্রয়ে। কিন্তু তার খালাত ভাই দু’ ভাগ হলে কারো করার কিছুই নাই। আল্লাহই নিয়েছেন আল্লাহ তাকে বেহেস্তদান করুন।
    বন্যা আপু দীর্ঘ জিবি হোন। আল্লাহ সব বিপদ্মুক্ত রাখুন।

    1. হয়ত এটাই ছিলো ভবিতব্য! খালাত ভাইকে নিয়ে আল্লাহ্ আমার জীবন দান করে দিয়েছেন। দোয়া রাখবেন আমার এবং আমার মা’য়ের প্রতি। ধন্যবাদসহ শুভেচ্ছা জানবেন দাদা।

  8. সেরা খেলোয়াররা নিশ্চিত আউটের হাত থেকে সৌভাগ্যক্রমে রক্ষা পেলে, সেদিন অকুতোভয়ের মত মারকুটে খেলা খেলে দলের জন্য বিজয় ছিনিয়ে আনে। তুমি ঠিক বাস্তব জীবনের একজন সেরা খেলোয়ার বুজি। দ্বিতীয় জীবন ফিরে পাওয়া একজন প্রতিভাবান মানুষ ।

    1. তোমার মন্তব্যে আমি আবেগি হয়ে পড়লাম শাফিন! দ্বিতীয় জীবন! সেটাই ভোগ করছি বর্তমানে। জীবন সংসারে খেলেই তো যাচ্ছি! চার ছক্কা হাঁকাতে আর পারছি কই?
      তোমার জন্য অসংখ্য ভালবাসা, শুভকামনা, জয়ী হও তুমি জীবনের সকল কর্মে। ভালো থেকো সবসময়।

  9. লেখাটার প্রথম কটা লাইন পড়েই কেন যেন বুঝে গিয়েছিলাম এটা বন্যা আপুই, যদিও উনার সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না। ভালবাসা আর শ্রদ্ধা রইলো।

  10. একেবারে অবিশ্বাস্য কাহিনী, বিমান হামলায় লঞ্চ ডুবি। তারপর ছয় মাসের শিশুর অকল্পনীয় ভাবে বেঁচে যাওয়া। তবে ঐ যে বলে “রাখে আল্লাহ মারে কে?” সাহসী মায়ের সাহসী মেয়ে আমাদের বন্যা আপু, ভাবতেই ভালোলাগে…….বন্যা আপুর মা বেঁচে আছেন কিনা জানিনা, ওনাকে হ্যাট খোলা স্যালুট।

  11. লেখাটি পড়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম।
    মমতাময়ী মায়ের সাহসিকতায় সত্যি শিহরিত হয়ে উঠলাম।
    মাকে সহস্র শ্রদ্ধা।
    আপু আপনার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা রইলো।

  12. জয়তু বন্যা ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে তিনি যেন দীর্ঘ জীবী হন!
    আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন হাজারো স্মৃতি আছে। যা আমাদেরকে সবসময় অনুপ্রেরণা দান করে।
    ধন্যবাদ জিসান ভাই!

  13. মহান ৭১ বাংলার প্রতিটি ঘর/ পরিবারের কত যে স্মৃতি জমা করে রেখেছে ভাবলে অবাক হই। একটি যুদ্ধ একটি দেশ ও জাতির গোটা ইতিহাস বদলে দেয়, শুধু বদলাতে পারে না আঁকড়ে রাখা স্মৃতিগুলো। দেরিতে লিখলেন, তবুও লিখে আমাদের জানিয়েছেন তাতেই ধন্যবাদ।

    মৃত্যুঞ্জয়ী বন্যাকে অনেক অনেক ভালোবাসা। তার অকুতোভয় মায়ের প্রতি সালাম রইলো। যারা সেদিনের বিমান হামলায় নিহত হয়েছিলেন তাদের সহ সকল শহীদের আত্মার জন্যে দোয়া করি।

    শুভ কামনা আপনাকে 🌹🌹