সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

সূখের অসূখ

মনির হোসেন মমি ২৮ আগস্ট ২০২১, শনিবার, ০৯:০৩:৩০অপরাহ্ন গল্প ১৩ মন্তব্য

খুব কষ্ট হচ্ছে ওর।আজ সারাটা দিন একটুও ঘরের বাহির হয়নি।শুধু ঘরের দখিনা জানালায় দাড়িয়ে ক্ষণিক পর পর দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন আনমনা হয়ে ভাবছিলো।আজকাল প্রায় সে এ ভাবে আনমনা হয়ে থাকেন।নতুন বউয়ের এমন দৃশ্য প্রায় দেখেন তার  শ্বাশুরী।এক সময় সে ভেবেই বসেন এই মেয়ে! না জানি কখন কোন অঘট ঘটিয়ে ফেলে।

অনন্যা গল্পের মুল চরিত্র।এক প্রবাসী ছেলের সাথে সবে মাত্র বিয়ে হয়েছিলো তার ।বিয়ের কয়েক মাস অনন্যার বিবাহীত জীবন বেশ ভালো উপভোগ্য ছিলো।বর প্রবাসে চলে যাবার পর শুরু হয় সাংসরিক জীবনের তিক্ততা।অনার্সে পড়ুয়া অনন্যার বিয়ে দেয়াটা হয়েছিলো অনেকটা তার মতের ইচ্ছের বিরুদ্ধে।তার ইচ্ছে ছিলো জীবনকে আগে স্বাভলম্ভী ভাবে গড়ে তুলা।তারপর না হয় সংসারি হওয়ার চিন্তা ভাবনা মাথায় আনবেন।কিন্তু পরিবারের চাপে শেষ পর্যন্ত তার ইচ্ছেগুলো মাটি দিতে হলো।

একটা সময় এ দেশে মেয়ে বেটি কিংবা ছেলে পুলে বিয়ে করাতে শিক্ষাগত যোগ্যতা,ডাল ভাত উপার্জন সক্ষমতা,ভিটে বাড়ী আছে কিনা  ইত্যাদি খোজ খবর নিয়ে কনফার্ম হয়ে তারপর শুভ বিবাহের কাজ শুরু করতেন।অনেক সময় যদি ছেলে মেয়ের পারিবার গরীব হয় সেক্ষেত্রে ছেলে বা মেয়ের স্বভাব-চরিত্রে ত্রুটি আছে কীনা তার দিকেই বেশী গুরুত্ব দিতেন।আরো একটি বিষয়ে মুরুব্বীরা সবার উপরে বেশী গুরুত্ব দিতেন তা হলো তাদের বংশ পরিচয়।যার পরিপেক্ষিতে একটি প্রবাদও সৃষ্টি হয়েছে-“নদীর পানি ঘোলা ভালো-জাতের মেয়ে কালো ভালো”।বিয়ে সাদির বিষয়ে আমাদের পূর্বপুরুষদের এমন ভাবনাগুলো বর্তমান যুগে যদিও অচল কিন্তু কখনো কখনো এ সব যাচাই বাছাইয়ের প্রয়োজন পড়ে যায়।

এ বিষয়ে মুরুব্বিদের আরো কিছু চিন্তা ভাবনা ছিলো তা হলো- নিকটাত্মীয়ের সাথে বিয়ে সংক্রান্ত আত্মীয়তা না করা আর বাড়ীর পাশে বা পাশা পাশি বাড়ীতে বিয়ে সাদি না কারানো।এ ক্ষেত্রে সামান্য টুকিটাকি বিষয় নিয়ে দুপক্ষের মাঝে প্রায় ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকে।

আর নিকটাত্মীয় মধ্যে বিয়ে সাদি হলে-যদি ভাল হয় তবেতো ভালোই আর যদি ভেজাল লাগে তাহলে উভয় পক্ষ আপণ আত্মীয়তার কারনে  কেউ কাউকে না পারে কিছু কইতে না পারে কিছু করতে না পারে সইতে-মাঝ খানে বিবাহ পূর্ব রক্তের আত্মীয়তায় ফাটল ধরে।

অনন্যার পরিবারও অনন্যাকে বিয়ে দেবার পূর্বে একবারো ভাবেনি ছেলের বংশ পরিচয় কিংবা মানেনি দূরত্বের বিষয়টি।ছেলে প্রবাসী।মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা কামায়।দেশে বাড়ী ঘরের অবস্থা বেশ ভালো  দেখে পরিবার মেয়েটিকে সেখানে বিয়ে দিলেন।সদ্য বিবাহিত একটি মেয়ে কেনোই বা দিনের পর দিন প্রায় সময় খোলা জানালায় দাড়িয়ে উদাসী চোখে আকাশপানে চেয়ে থাকবে!এতো অর্থ প্রচুয্য থাকার পরও কেন সে সূখী নয়? সুতরাং শুধু অর্থ বিত্ত হলেই সূখ ধরা দেয় না,তাহলে?তার অভাব একটাই তার স্বামী তার কাছে নেই।সুখ দুঃখের কথা বলার সেই মানুষটি নেই।যেই মানুষটি তাকে আদরে-শাসনে সব সময় কাছে রাখবেন,কাছে থাকবেন।সেই মানুষটির অনুপস্থিতির অভাবে অনন্যার মন সব সময় কেবল উদাসীনতায় আচ্ছন্ন থাকে।এই সুযোগে শ্বাশুরী ননদরা তার নামে বদনাম রটাতে থাকে এবং প্রবাসী স্বামীকে নানান কু-কথা বলে কানভারী করতে থাকে।

একজন নারীর শেষ আশ্রয় ভরসার স্থল হলো তার স্বামীর ঘর।মা তাকে জন্ম দেন,কায়িক পরিশ্রমে বাবা তাকে কুলে পিঠে করে বড় করেন,মানুষ করেন-রক্তের ভাই বোনদের খুনসুটিতে সে বড় হয়।

এক জীবনে সে নাড়ীর মায়ায় পরে জীবনকে উপভোগ করেন পিতৃলয়ে আরেক জীবনে সেই সব নাড়ীর টানকেও ছিন্ন করে পরকে আপণ করতে সামাজিক দায়বদ্ধতায় স্রস্টার নিয়মে কবুল বলে স্বামীকুলে ।এই অধ্যায়টাকে বলতে পারি নারীর জীবনে ভালমন্দে টিকে থাকার আরেক জীবনে সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।যদি ভাগ্য ভালো হয় কিংবা নারীর সদ্য আপণ হওয়া পর বাড়ীর সবাইকে শত দুঃখ কষ্টেও জয় করার সক্ষমতা থাকে তাহলে সে চিরসূখী নতুবা আজীবন শুধু চোখের জলেই তাকে বুক ভাসাতে হয়।

এ ক্ষেত্রে পুরুষ বা স্বামী কিংবা তার পরিবার যদি না ভাবেন-যে নতুন বউটি তাদের ঘরে এলো সে জনম জনমের বন্ধন রক্তের নাড় ছিড়ে  শুধু মাত্র বিশ্বাসকে পুজি করে।শ্বশুর শ্বাশুরীকে বুঝতে হবে এই যে সদ্য বিবাহীত মেয়েটি তাদের ঘরে লক্ষী হয়ে এলেন যদি সে তাদের নিজের মেয়ে হতো,তাহলে তার সাথে কী রকম আচরণ করতেন,স্বামীর ঘরে এসে একজন মেয়ে বা নারী ঠিক তেমন আচরণটাই আশা করেন যা তাদের নিজ সন্তানদের করেন।পক্ষান্তরে বউকেও শশুড় শাশুড়ীকে নিজের মা বাবার মতই দেখতে হবে।

স্বামী বিদেশ চলে যাওয়ার পর অনন্যার শাশুড়ীর তার প্রতি মানুষিক নানান দিক দিয়ে অত্যাচার করতে থাকেন।কথায় কথায় দোষ ধরা।বাপের বাড়ী হতে কিছুই পেলেন না।স্বামীর সাথে ঘন ঘন কথা বলা যাবে না ইত্যাদি।

অসংখ্য অত্যাচির বর্ননার মধ্যে হতে একটি ঘটনা অনন্যাকে বেশ ভাবিয়ে তুলে।

এমনিতেই তাদের কার্যকলাপে অনন্যার মনটা তেমন একটা ভাল থাকে না তার পরও যদি রাতে ঠিকমত তাকে ঘুমাতে না দেয় তবে তার মন মানুষিকতার অবস্থাটা কী হতে পারে তা অনুমেয়।স্বামী বিদেশ চলে যাওয়ার পর অনন্যার ঘরে রাতে তার শাশুড়ী থাকেন।তাতে অনন্যা সাহস পেতো।তার মনে একা একা ঘরে থাকার মেয়ে মানুষি ডর ভয় কিছুটা হলে কম হতো।কিন্তু আজকাল শাশুড়ী তার ভাল মানুষির রূপ পাল্টিয়ে ক্রমশত হয়ে উঠছেন এক দানব সমতুল্য-ডাইনী।

প্রতি দিনের মতো সেদিন রাতেও অনন্যা প্রবাসী স্বামীর ফোনের অপেক্ষায় ছিলো।দানব শ্বাশুরী হঠাৎ এসে তার মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে বললেন।
-কোন নাগরের জন্য ফোনে অপেক্ষা করছ?
-কার জন্য আবার!আপনার ছেলে ফোন দিবে।
-অ,,,তাই!!দরকার নাই,এখন ঘুমা।
-মাত্রতো রাত দশটা বাজে!ফোনটা দেন মা।।

-না ফোন দেয়া যাবে না।এখন তুই ঘুমাবি।সকালে উঠে সবার লাগি নাস্তা বানাবি।
শ্বাশুরী এ কথা বলেই খাটে শুয়ে পড়লেন।তার আগে রুমে ঢুকে শ্বাশুরী চলন্ত এসিটা বন্ধ করে দেন।চৈত্র মাসের গরমে অতিষ্ট জীবন।তারপর এসি থাকতেও যদি এসিটা বন্ধ করে ফ্যানটা চালু করেন তাহলে কার মেজাজ ভাল থাকে!তবুও অনন্যা টু শব্দটিও করলনা।উপায়ন্তর না পেয়ে শ্বাশুরীর পাশে শুয়ে পড়ল।শ্বাশুরী বেড সুইচটা টিপ দিয়ে লাইটটি অফ করে দিয়ে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই নাক ডাকা শুরু করলেন।

শ্বাশুরী ঘুমাচ্ছে,অনন্যার চোখে ঘুম নেই।গভীর অন্ধকার রুমে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।স্বামীহীন নারীর বেচে থাকার কি যে যন্ত্রণা তা অনন্যা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।ভাবনার জগতে কখন যে ঘুম পরীরা এসে চোখ নিদ্রায় নিয়ে যায় টের পেল না।

ঘনকালো অন্ধকারে কে যেন তার হাত টেনে ঘুম থেকে উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন।অন্ধকারে আবছা সদৃশ্য মুখটি চেনার কোন উপায় ছিলো না।তার হাত ধরে টানছে আর বলছে-আয় আয় আয়…শান্তির তলে আয়…।

-কৈ যাবো? কে আপনি?
-আমি তোর আপণজন- আমি তোর ভাল চাই- তুই এখানে থাকলে মারা যাবি, আমার সাথে চল।

তার কথাগুলো অস্পস্ট ছিলো-অনেকটা সেই ঠাকুর মার ঝুড়ির রূপকথার ভূত পেত্মীর কণ্ঠস্বরের মতন।
ভয়ে অনন্যার মুখের শব্দে বার বার তোতলামী আসছে।
-কৈ যা-বো?
-স্বর্গে…

-দুনিয়ায় আ-আ-আপনি স্বর্গ পা পা পাবেন কৈ ?
-আমরা সব পারি।ইচ্ছে করলে দুনিয়াতে যখন তখন স্বর্গ নরক নামাতে পারি।তুই টেনসন করিছনা আমার লগে ল আমি তোরে স্বর্গে সুখে রাখমু….চল,, চল,,, চল।
-না না না আমারে ছাইরা দেন…………
হঠাৎ অনন্যার ঘুম ভেঙ্গে যায়।চেয়ে দেখলো তার বুকের উপর তার শ্বাশুরী বসে আছেন।তার দুই হাত চেপে ধরেছিলেন বেডের সাথে।ধাক্কা দিয়ে শাশুড়ীকে নামিয়ে দিয়ে বললেন।
-একি করছেন আম্মা!??

শ্বাশুরীর সেই ভুতূরে কণ্ঠের ন্যায় জবাব।
-কথা কইছনা-আমার লগে জ্বীন আছে।

সেদিনের ঘটনার পর হতে অনন্যা আরো বেশী ইমোশনাল হয়ে পড়ে।এ বাড়ীতে আর এক মুহূর্ত থাকা যায় না।

১৮৫জন ১৮জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য