আমরা অনেক বিষয়ে লিখি, ব্লগিং করি। কিন্তু যখন সমসাময়িক বিষয়ে লিখি তখন আসলে কি চিন্তা করি- আমাদের লেখাটি প্রাসঙ্গিক কিনা বা বস্তুনিষ্ঠ বিষয়ে সঠিক তথ্য আমরা আসলে জানি কিনা যা পাঠকদের জানানো প্রয়োজন? কারন সমসাময়িক বিষয়ের লেখা একটি ব্লগকে যেমন সচল রাখে তেমনি পাঠকের মনে সেই লেখার লেখক সম্পর্কে একপ্রকার স্বচ্ছ ভাবনারও জন্ম দেয়। সঠিক তথ্যসমৃদ্ধ লেখা পাঠকে যেমন উপকৃত করে তেমনি ভুলতথ্যের লেখা সেই ব্লগ এবং লেখককে পাঠকসমাজে ও জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সমসাময়িক করোনাভাইরাসই এখন বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মনে সার্বক্ষণিক একটি আতঙ্কের বিষয়। সকল দেশের কর্তাব্যক্তিরা যখন লাশের মিছিল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তখন আমাদের দেশেও এর বাহিরে নয়। এদেশের আপামর জনসাধারণের জন্য আমাদের সরকারসহ সকল সংগঠন নানাবিধ নির্দেশনা দিচ্ছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে সেসব প্রকাশিত হচ্ছে বলেই পাঠক উপকৃত হচ্ছেন।

গতকাল অনলাইনেই একটি ব্লগের পাতায় একটি শিরোনাম দেখলাম- করোনাভাইরাস নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আদেশ শিরোনামে একটি খবর ভাইরাল হয়েছে যা মোটেই বস্তুনিষ্ঠ এবং সত্য নয় বরং বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে জনমনে। উদাহরণ হিসেবে- ভাড়াটিয়ার বাড়িভাড়া মওকুফের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে, সেসব অনেকটাই গুজব বরং প্রধানমন্ত্রী ৩১ দফা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন যা কার্যকর করা হচ্ছে।

আশ্চর্য হতে হয়, এসব বিভ্রান্তিকর লেখা আসলে কারা বা কোন ধরনের লেখক লেখেন? আর একটি ব্লগের পাতায় তা প্রকাশিত হয় কিভাবে? যদিও সেই ব্লগের লেখাটিও সংশোধন করা হয়েছে তবে গতকাল যে গুজব ছড়িয়েছিল জনমনে তা কিন্তু হুট করে অসত্য তথ্য পরিবেশন করার জন্যই হয়েছিল।

সমসাময়িক এ বিষটি নিয়ে কিছুটা চিন্তার উদ্রেক থেকেই আমার আজকের এই লেখা। আমার কাছে মনে হয়েছে একজন লেখককে সমসাময়িক বিষয়ে লিখতে গেলে অবশ্যই কিছু বিষয়ের কেমিস্ট্রি বা রসায়ন তার মধ্যে বিদ্যমান থাকতে হবে।

তাই সবার প্রথমে জানতে হবে ভাল লেখা কি বা কাকে বলে?

লেখক সমাবেশে আমাদের প্রায়শই জিজ্ঞাসা করা হয় “ভাল লেখা কী করে?” বা ” ভাল লেখা কীভাবে কাউকে একজন ভাল লেখক করে তোলে?” প্রশ্ন আসতে পারে যে কাউকে সত্যিই লিখতে শেখানো যেতে পারে কি এবং কেন লেখকগন বস্তুনিষ্ঠ সত্য লিখতে জানে না। লেখা এবং লেখকদের “ভাল” কী করে তোলে তা বুঝতে শুরু করার জন্য আমাদের আরও বড় প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার আর সেটি হলো “লেখালেখি কী?”

লেখার সংজ্ঞায় অনেকের সাথে একমত হওয়া সহজ তবে যদি আমরা এটিকে “কাগজে কলম লাগানো” বা “কম্পিউটারে নিজের ধারণাগুলিকে শুধুমাত্র টাইপ করার মতো” সীমাবদ্ধ করি। তবে আমরা যদি লেখার কাজের উপাদানগুলিকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে লক্ষ্য করি তবে সংজ্ঞাটি সহজেই অনুমেয়।

এখন প্রশ্ন আসে আমরা কেন লিখি?

মনে রাখবেন লেখা আপনার একটি প্রতিক্রিয়া। আমরা কারও বা অন্য কিছুতে প্রতিক্রিয়া করছি বলেই আমরা লিখি। হুট করে কিছু মনে হলো বা লিখলাম লেখার এই বিচ্ছিন্নতা একটি স্বতন্ত্র কাজ তখনই যখন- আপনার কাছে লেখালিখিকে কেবল কম্পিউটার বা কাগজের একটি পাতায় ছাপানোকেই একমাত্র উদ্দেশ্য মনে করবেন।

আমার কাছে লেখালিখি করা এটি সত্যই একটি সামাজিক কাজ। লেখা এমন একটি উপায় যার মাধ্যমে আমরা আমাদের চারপাশের মানুষ এবং বিশ্বের প্রতি প্রতিক্রিয়া জানাই। লেখার বিষয় হয় নির্দিষ্ট যা প্রায়শই নির্ধারিত প্রসঙ্গে হয়। আমরা কেবল লিখছি না – আমরা সর্বদা কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পাঠকদের কাছে লিখছি। আমরা লিখি, কারণ আমরা চাই আমাদের নিজেদের ধারণাগুলির গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিক্রিয়া জানাতে কোনও নির্দিষ্ট স্থান তৈরি করার প্রয়োজন হয় বলেই আমরা লিখি। আর ব্লগারদের জন্য ব্লগই হচ্ছে লেখার অন্যতম স্বচ্ছ মাধ্যম।

লেখার লাইনআপ বা রৈখিকতা সম্পর্ককে কি জানেন?

যে কোন লেখার রৈখিকতা হচ্ছে বিষয়বস্তুকে কার্যকরভাবে পাঠকের সাথে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম। আমাদের কথা এবং ধারণাগুলিকে এমনভাবে লিখতে হবে যা পাঠকের কাছে অর্থবোধ করে যা অতীব প্রয়োজন। আমরা এই প্রয়োজনটির নাম বিভিন্নভাবে রাখি: “ব্যাকরণ,” “যুক্তি,” বা “প্রবাহ”। মনে রাখবেন প্রয়োজনীয় ধারণাগুলি তৈরির এই প্রক্রিয়াটি সহজ নয় এবং সর্বদা “লেখা” হিসাবে স্বীকৃত নয়।

আমরা যদি ধরে নেই বা কেউ যদি ধারণা করে থাকি যে বস্তুনিষ্ঠ লেখার এই প্রকৃয়া একটি সহজ বিষয় তা মোটেই কিন্তু নয়। কারন বাস্তবে এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত আরও জটিল হয়। যেমন- উদাহরণস্বরুপ বলা যায় আমরা সবাই দেখেছি, আমাদের অনেকেরই লেখা পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়না অর্থাৎ আমাদের লেখার বিষয়বস্তু ও ধারণাগুলি একটি রৈখিক আকারে উত্থিত হয় না বলেই এমনটা হয়। উপরে উল্লেখিত একটি ব্লগে গতকালের প্রকাশিত লেখাটিই এর উদাহরণ।

আমাদের ধারণাগুলিকে শব্দের মধ্যে ধরে রাখার এবং পাঠকের জন্য তা লিখে সাজানোর প্রক্রিয়া পাঠকের মনে লেখক হিসেবে নিজের স্থান তৈরি করতে এবং আমাদেরকে অন্বেষণে পাঠককে সহায়তা করে। তাই কেবল শুধুমাত্র একজন লেখকেরই কেবল তার লেখার বিষয়বস্তুর বস্তুনিষ্ঠ ধারণাগুলি মনে “ধারণ” করা প্রয়োজন। তবে সেই ধারণাগুলি অর্থবহ হওয়ার জন্য লেখককে তাদের লেখাকে রৈখিক আকারে রাখতে হবে এবং পাঠকের জন্যই তাদের “লিখতে” হবে এই ধারনাকে মনে লালন করতে হবে। ফলস্বরূপ যখনই আমরা কিছু লিখছি, আমাদের মনে রাখতে হবে পাঠকের পছন্দ ও গ্রহণযোগ্যতার সাথে লেখার রৈখিকতার কাঠামোর মাপসই যেন অবশ্যই থাকে।

মনে রাখবেন লেখা একটি প্রক্রিয়া। সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রৈখিকতা, সামাজিক প্রেক্ষাপট, বিষয়বস্তুর উপস্থাপনা ও উদ্দেশ্য আপনার লেখাকে একটি পরিপূর্ণ গঠনরুপ দেয় এবং এই প্রক্রিয়াটি যা সময়ের সাথে সাথে এবং ভাষার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। পাঠকদের জন্য লেখার একটি অংশ তৈরি করার সময়, অভিজ্ঞ লেখকরা তাদের বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করেন। প্রত্যেক লেখকের মধ্যে লেখার চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনা, খসড়া তৈরি এবং সংশোধন করার একটি রসায়ন থাকতে হবে। কোনও লেখকের এই রসায়নের ঘাটতি থাকলে কখনোই সমসাময়িক বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ লেখা উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। কারন সেটি আপনার দৃষ্টিতে লেখা হলেও পাঠকের কাছে অর্থহীন কিছু বাক্য ছাড়া আর কিছুই নয়।

লেখাটি পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। সকলেই ভালো থাকবেন।

আরো পড়তে পারেন- আমিও ভালো লেখক হতে চাই।

২৯৮জন ৫৯জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য