মামাকে দেখতে যাওয়া- পর্ব (৬)

শামীম চৌধুরী ২৪ মে ২০২০, রবিবার, ০৩:০১:৫০পূর্বাহ্ন ভ্রমণ ১৫ মন্তব্য
দেহ ও মনে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে । আমরা সবাই পিনঃপতন চুপ। ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুর শব্দ নেই। ৬ জনের ১২টি স্বপ্নীল চোখের দ্যুতি বাড়িয়ে কি যেন খুঁজছে। ৬জনের দৃষ্টি শক্তি এই মহুর্তে বনের ৬দিকে। সবার ভিতরে প্রথম বনে বাঘ দেখার আনন্দ ও অনুভুতিটা কেমন তা পাঠকরা বুঝতেই পারছেন। কার আগে কে মামার দর্শন করবো তার একটা অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলছে।
 
আমরা চিতলে বাঘের স্পটে গাড়িতে দাঁড়িয়ে আছি। গাইড রতন কৈরালা নীচু স্বরে আঙ্গুল উঁচিয়ে আমাদের দেখালো গত সপ্তাহেও সে ওখানে বাঘ দেখেছে। তার সাথে পর্যটকরাও বাঘ দেখার আনন্দটা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। রতনের মুখে গল্পটা শুনার পর ভাবছি ভাগ্য কি আমাদের সুপ্রসন্ন হবে না? তারপরও মনের ভিতর বিশ্বাস ও আশার হাল না ছেড়ে বাঘ দেখার জন্য অপেক্ষা করছি। কে,কোন সেটিংসে বাঘ তুলবে তার একটা হিসাব আমার কাছ থেকে জেনে নিলো। যেহেতু বাঘের দৈর্ঘ্য বেশ বড় তাই সবাইকে এ্যাপারচার বাড়িয়ে অর্থাৎ ডেপথ অব ফিল্ড বাড়িয়ে রাখার জন্য এবং এফ: ১১-১৫ এর মধ্যে রাখতে বললাম। সাথে শাটার স্পীড ২৫০-৩৫০। এরই মধ্যে সবাই যার যার মতন করে তাদের ক্যামেরার সেটিংসটি সাজিয়ে নিলো।
 
যতই সময় পার হচ্ছে ততই উত্তেজনা বাড়ছে। সৃষ্টিকর্তার কাছে কায়ামনোবাক্যে প্রার্থনা করছি হে মালিক, তুমি আমাদের নিরাশা করো না। জীবনে অনেক পাখি ও বণ্যপ্রানীর ছবি তুলেছি। কিন্তু বাঘের ছবি তোলার জন্য এমন উত্তেজনা বা অস্থিরতা কখনই হয়নি। যা লিখে পাঠকদের বুঝানো যাবে না।
 
আমি গাড়ির চালককে ইশারায় আরেকটু সামনে যাবার জন্য বললাম । গাড়িটাও সামনে ধীরে ধীরে আগাচ্ছে। এরই মধ্য সাংবাদিক কিসমত খোন্দকার ভাই নীচু গলায় বললেন শামীম ভাই ঝোপের ভিতর কি যেন নড়ছে। ভাইয়ের কাছ থেকে শোনার পর গাড়ি থামাতে বললাম। সতীর্থদের বললাম সবাই নাকে গন্ধ নেবার চেষ্টা করেন। ঝোপের ভিতর বাঘ থাকতেও পারে। সকলের একটি প্রশ্ন। যদি ঝোপের ভিতর বাঘ থাকে তবে আমরা বুঝবো কি ভাবে? তখন আমার সাথে গাইড রতনও বলে উঠলো বাঘ থাকলে বিশ্রী একটা গন্ধ বাতাসে ভেসে আসবে। তাহলেই বুঝা যাবে আশে পাশে বাঘ আছে।
 
আমি রতনকে বললাম.চিতলে হরিনের সংখ্যা কেমন? সে জানালো প্রায় দশ লক্ষের অধিক সারিস্কা বনে আছে। যা পুরো বনে বিচরন করছে। রতনের কথা শুনার পর বুঝলাম তবে হরিনের ভালই একটা সংখ্যা চিতলে থাকার কথা। কারন বাঘ যেখানে খাবার পায় সেখানেই বসবাস করে। এটাই বাঘের চরিত্র। তাই চিতলকে বাঘ তাদের Territory বা এলাকা হিসেবে বেছে নিয়েছে। বাঘ যত না দেখেছি তার চেয়ে বাঘের স্বভাব,খাদ্যাভ্যাস,প্রজনন,বিশ্রাম, শিকারের ধরন, বাঘের বয়স সম্পর্কে জেনেছি ও পড়েছি। সেদিক থেকে বাঘ খোঁজার ব্যাপারে মোটামোটি পারদর্শী বলতেই পারেন।
 
কিন্তু, তখন চিতলে আমরা কোন হরিন দেখতে না পেয়ে ভাবলাম বাঘ ঠিকই ঝোপের ভিতর আছে। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখলাম ঝোপের ভিতর লেজ দেখা যাচ্ছে। সঙ্গীদের বললাম সবাই প্রস্তুত হোন। মনে হয় বাঘ ঝোপের ভিতরই আছে। সবাই যুদ্ধ ক্ষেত্রের মতন যার যার পজিশন নিয়ে দাঁড়ালো। রতন ফিস ফিস করে আমার কানে বলতে শুরু করলো “সাবজি ঝোপকা আন্দার টাইগার হায় নি। আমি বললাম তুমি কি করে জানলে। সে উল্টো আমাকেই প্রশ্ন করলো ”কই খুশবু মেলা আপকো?” তখন আমিও ভাবলাম ঠিকই তো কোন গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে না। এখানে বাঘ থাকলে গন্ধের তীব্রতায় দাঁড়ানোই সম্ভব হবে না। এমন সময় ঝোপের ভিতর থেকে বের হয়ে আসলো পন্ডিত মশাই।Golden Jackal বা সোনালী শিয়াল।
আরো কিছুক্ষন সময় মামার আশায় চিতলে রইলাম। বেলা ৪টা বেজে গেছে। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে  ও মনে একটা অবসাদ নিয়ে চিতল থেকে বের হলাম। কারো মুখে কোন হাসি নেই। সবার চেহারায় একটা না পাওয়ার বেদনার ছাপ ফুঁটে উঠেছে। আমার পুত্র সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম তারও বাঘ না দেখার অপ্রাপ্তিটা কষ্টাকারে ভালই বাসা বেঁধেছে। আমি ছেলেকে বললাম “Baba Enjoying the tour. Don’t worry.take challenge.It is your adventure journey. Go ahead,”
রতকে বললাম যেহেতু আমাদের হাতে দুই ঘন্টা সময় আছে, তাই কোথাও না দাঁড়িয়ে বনটা ঘুরে দেখানোর জন্য। আর এর ফাঁকে ফাঁকে যা দেখা যায়। সবাই আমার সাথে সম্মত হলো। কিছু পথ যাবার পর দেখা মিললো Samba Deer বা সাম্বা হরিনের। তার সামনে ছিলো Grey-caped Langur বা ধূসর মাথা বানর। আমরা সবাই বন্যপ্রানীর ছবি তুললাম।
যতই সামনে যাচ্ছি ততই বন্যপ্রানী দেখছি। নিজ চোখে  না দেখলে পাঠকরা এর অনুভুতি বুঝবেন না। ছোট বেলায় পড়েছি-
”বন্যরা বনে সুন্দর
শিশুরা মাতৃকোড়ে”
যার এক হরফও মিথ্যে নয়। বন হলো পশু-পাখিদের অভয়ারন্য। ওদের বাসস্থান। যেখানে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা ছাড়া মানুষের কোন উপদ্রব নেই। যার জন্য বনেই এরা আপন মনে ঘুরে ফিরে খাচ্ছে। কেউ জলাধারের সামনে পানি পান করছে। কেউ গোসল করছে। কেউ নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে। সব মিলিয়ে এ যেন প্রকৃতির এক অলংকার খঁচিত মেলা।
বনে ঘুরার সময় বেশ কয়েক প্রজাতির পাখিও নজরে পড়লো। যার মধ্যে বেশ কিছু পাখি আমার সংগ্রহে ছিলো না। অন্যান্য প্রানী ও পাখির ভীড়ে আমরা সবাই বাঘ না দেখার কষ্টটা ধীরে ধীরে ভুলতে বসলাম। এরই মধ্যে বেশ কয়েক প্রজাতি পশু ও পাখির সংগ্রহ আমাদের হয়ে গেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো
Wild Bore
Spotted Deer
Yellow spraow
Great Babler
Indian Robin
Jungle Wabler
Grey Falcolin
White checked Bulbul
Laughing Dove সহ বেশ কয়েক প্রজাতি। সবার চেহারায় লক্ষ্য করলাম বেশ একটা প্রশান্তির আমেজ।
মুয়ুর
সাম্বা হরিণ
ইন্ডিয়ার রবিন।
Grey-caped Langur
মাঙ্গুজ বা কাঁকড়া খেকো বেজি।
Great Babler
ঘড়ির কাঁটায় যখন ৫:৩০টা বেজে উঠলো তখন রতন গাড়ীর চালককে ফেরত যাবার জন্য আদেশ করলো। আমি গাইডকে বললাম যে পথ ধরে এসেছি সেই পথেই কি ফেরত যাবো? উত্তরে বললো না। আমরা অন্য পথ ধরে যাবো। ভাবলাম তাহলে আরে বেশ কিছু প্রানীর দেখা পাওয়া যাবে। ফেরার পথে সন্ধ্যা হওয়ার জন্য তেমন কিছু চোখে পড়েনি। ৫/৬টা প্রজাতির ছবি তুলেছিলাম।
আমরা  ৬:২০টায় সারিস্কায় পর্যটকদের বিশ্রামাগারে পৌছালাম। আমাদের ট্যুর অপারেটর সুজিত বেরা আমাদের জন্য নুডুলস ও কফির ব্যাবস্থা করে রেখেছিলো। সারাদিনের অনাহারে সেই সময় খাবারগুলি বেশ তৃপ্তি সহকারে আহার করলাম।
পরে চা পান শেষে জয়পুর শহরের উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠে বসলাম। রাত ৯:৩০ মিনিটে আমাদের জন্য নির্ধারিত হোটেলে হ্যারিটেজ হাবেলীর সামনে এসে গাড়ি থামলো। গাড়ি থেকে নেমে যার যার মতন রুমে চলে গেলাম। শাওয়ার শেষ করে সবাই এক সাথে রাতের খাবার সেরে ঘুমিয়ে পড়লাম।
(চলবে)
৯১জন ২জন
18 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য