বেদনায় বলা কথা

রেহানা বীথি ১৬ জুলাই ২০১৯, মঙ্গলবার, ১০:০৮:৫৮অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২৩ মন্তব্য

বেদনায় বলা কথা
*********************
কিছুদিন আগে শেষ হওয়া অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষার খাতা দেখানো চলছে। ক্লাস ফোর- এ পড়া একজন বাচ্চা তার খাতায় প্রাপ্ত নাম্বার দেখে চরম হতাশ। হঠাৎ করে সে সবার অলক্ষ্যে চলে গেলো ছাদে। উদ্দেশ্য, ঝাঁপিয়ে পড়ে দিয়ে দেবে নিজের জীবন। সৌভাগ্যক্রমে একজন শিক্ষক দেখে ফেলেন এবং বাচ্চাটিকে ছাদ থেকে নিয়ে আসেন।

আজ দুপুরে স্কুল ফেরত মেয়ের মুখ থেকে কথাটা শুনে ভীষণভাবে অবাক হয়েছি। হয়েছি মর্মাহত। একটি কথাই তখন থেকে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, কী অসহনীয় জীবন পার করছে আমাদের সন্তানরা! এই নির্মল শৈশবে যখন তাদের প্রজাপতির মতো নিশ্চিন্তে উড়ে বেড়ানোর কথা, তখন কিনা তারা আত্মহত্যার মতো কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছে? কারণ কী?

বেশ কিছুদিন আগে একবার কোচিং সেন্টারে গিয়েছিলাম। আমি যেদিন গেছি সেদিন আবার ওখানে পরীক্ষার খাতা দেখানো চলছে। বাচ্চাদের মায়েরা উদগ্রীব হয়ে নিজের নিজের বাচ্চার খাতা দেখছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। কারো বাচ্চা হয়তো অকারণেই ভুল করে দুই এক নাম্বার কম পেয়ে গেছে সহপাঠীর চেয়ে। কেন কম পেলি? কেন এতবার করে শেখানোর পরও এই সামান্য জিনিস ভুল হয়? মায়ের আস্ফালন। অতঃপর দুম দুম পিঠের ওপর দু’চার ঘাঁ। তারপর হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে, ” বাড়ি চল, দেখাচ্ছি মজা।” জলে টইটুম্বুর চোখ তুলে তাকানোর সাহস নেই বাচ্চার। সত্যিই তো, ভুল তো সে করেছে! ছিঃ!

আজ যখন স্কুলের ছাদে গিয়ে বাচ্চাটির আত্মহত্যা প্রচেষ্টার কথা শুনি, চোখে ভেসে ওঠে সেদিনের কোচিং সেন্টারের সেই দৃশ্য। নিশ্চয়ই এ বাচ্চাটির মা-ও জানতে চাইবে, অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষায় তার সন্তানের নাম্বার। আর নাম্বার যেহেতু আশানুরূপ হয়নি, মায়ের কিংবা বাবার মুখোমুখি হওয়ার সাহস সে পাচ্ছে না। আর পাচ্ছে না বলেই এই কঠিনতম সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার কচিমন।
কী ভয়াবহ অবস্থা!
আরও আরও ভালো নাম্বার, আমার বাচ্চাই সেরা, আমার বাচ্চাই প্রথম হবে….. আমাদের এই দাবি মেটাতে গিয়ে শেষ করে দিচ্ছি যে আমাদের সন্তানদের মধুর শৈশব, সেকথাটা কেন একবারও ভাবছি না আমরা? কেন ভাবছি না, আমাদের সন্তানদের জীবন সংশয় উপস্থিত আমাদেরই কারণে? আজ সৌভাগ্যক্রমে বাচ্চাটি বেঁচে গেলো, কিন্তু যদি যথাসময়ে শিক্ষক সেখানে উপস্থিত না হতেন? হারিয়ে যেতো শিশুটি পৃথিবী থেকে। পরীক্ষার খাতায় হয়তো আগামীতে ফিরে আসবে ভালো নাম্বার, কিন্তু শিশুটিকে ফেরানো যেতো না কোনোভাবেই। কোমল শিশুমনে কঠিন এক বেদনা নিয়ে হারিয়ে যেতো সে চিরতরে।

স্বীকার করি, আমাদের শিক্ষাপদ্ধতির জটিলতার কারণেই তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। সেটুকু আমাদের সন্তানরা সামলে নিচ্ছে কষ্ট করে। কিন্তু আমরা অভিভাবকরা কেন এত অসহনীয় হয়ে উঠছি? কেন সেই চাপের ওপর আরও চাপ প্রয়োগ করছি? সবাইকে সব পরীক্ষায় প্রথমই হতে হবে কেন?ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারই কেন হতে হবে সবাইকে? প্রকৃতিপ্রেমী হোক, হোক শুদ্ধ মানুষ, দেশকে, দেশের মানুষকে ভালোবাসুক। পরীক্ষায় একটু নাহয় কম নাম্বারই পাক! দু’লাইন কবিতা লিখে চমকে দিক সবাইকে। লিখে ফেলুক সুখেন মরমু নামক কোনো সাঁওতালের সুখ দুঃখের কাহিনী। বাঁচুক ওরা প্রাণখুলে সৃষ্টিসুখের উল্লাসে। একদিন ঠিক ওরা দাঁড়িয়ে যাবেই নিজের পায়ে। দাঁড়াবেই!

২৮০জন ৭০জন
42 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য