ফাগুন,

ভালো আছো?  যেমনই থাকো, এই  চিঠি পড়ে ভালো থাকবে জানি। ভাবছো হঠাৎ আমার কি হলো ! যে আমি তোমাকে প্রতি বসন্তে চিঠি লিখতে ভুলে যাই, সেই আমি গ্রীষ্মকালে চিঠি লিখেছি কেন ! হাহা শোনো, সোনেলা ব্লগে ঈদের জন্যে ম্যাগাজিন তৈরী হচ্ছে। একটা উৎসব উৎসব ভাব। এমনিতে তো তোমাকে চিঠি লেখার সুযোগ পাইনা, কই থাকো , কোথায় আছো তাও বুঝিনা। তাই ভাবলাম এই সুযোগটা কাজে লাগাই। জানি সোনেলা আমার চিঠিটা ঠিক ঠিক তোমার কাছে পৌছে দিবে।

জান, তোমার আমার প্রেম কিন্তু কোনো জনমেই শুধু আমাদের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো না। আমি তুমি মিলে আমাদের ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়েছিলাম পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। আমরা ভ্রমন করেছি পৃথিবীর স্থল, জল, আকাশ এমনকি বনেও। তোমার মনে আছে ? একবার আমরা এক ফিস অ্যাকুরিয়ামের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। অ্যাকুয়ারিয়ামটায় অনেক প্রজাতির মাছ ছিলো। একটা মাছ হঠাৎ করে সাতরে আমাদের কাছে চলে এসেছিলো। আমাদের দুজনকে দেখে সেকি হাসি ; মাছের হাসি ! শুনতে কি অদ্ভুদ লাগে তাই না ? অথচ আমরা দুজনেই দেখেছি। মাছটি নড়ছিলো না, অন্য কোথাও যাচ্ছিলো না, ঠায় ভেসে ছিলো। আর হাসিমুখে আমাদেরই দেখছিলো। মাছেদের কথা বুঝিনা, তবে তখন মনে হয়েছিলো ও হয়তো বলছে – ”তোমরা এসেছো ? এই জনমে আবার এক হয়েছো বুঝি ! তোমাদের কথা আমি শুনেছি আমার পূর্ব-মাছদের মুখে। তোমাদের ভালোবাসার কথা আমরা জানি। তোমাদের একসাথে দেখে আমার চোখ ধন্য হয়ে গেলো !”

আচ্ছা ফাগুন, বলতো আমরা যখন ঐ বুনো পথ ধরে ফিরছিলাম, তখন ঐ হরিনের দল আমাদের দেখে অমন অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলো কেন ? তুমি ওদের জিজ্ঞেস করেছিলে – ”এই তোমরা আমাদের দিকে এভাবে তাকিয়ে আছো কেন ? যাও ভাগো, নিজেদের কাজে যাও। ” তোমার কথা শুনে ওরা একদম ভয় পায়নি। আরো মন দিয়ে আমাদের দেখেছে। হয়তো, ওরাও ভাবছিলো – ” আরে ! এরাই তো তারা, যাদের প্রেমের গল্প শুনে আমরা বেড়ে উঠেছি। এই জনমে আবার ফিরে এসেছে একত্র হতে ! ”

প্রিয়, আজ আমাদের প্রথম দেখার দিনটির কথা মনে পড়ছে। আমরা তখন শুধু একজন আরেকজনের নাম জানতাম। কেউ কাউকে দেখিনি। যেদিন সাক্ষাতের সময় এলো, তখনো বুঝতে পারিনি। কেমন লাগবে বা আমি-তুমি কি আসলেই তুমি-আমি ? যখন তুমি তোমার হাতটা বাড়িয়ে দিলে আমার দিকে, আমার হাতটি বাড়াতে পারছিলাম না। ভীরু মনে, দুরুদুরু বুকে কাঁপা হাতে যখন তোমার বাড়িয়ে দেয়া হাতটা স্পর্শ করেছি, আমার সারা দেহে যেন বিদ্যুৎ বয়ে গেলো ! হৃদয়ের স্পন্দন শিরায় শিরায় এলার্ম দিয়ে জানিয়ে দিলো এ হাত আমার জনম জনমের পরিচিত। আমারই দেহের বাকি অংশ, যার অর্ধেকটা আমার ছিলো আর অন্যটি এই মাত্র খুঁজে পেলাম। মনে হয়েছিলো, আমি একটি দুর্ভেদ্য আইডি আর তোমার হাত ঐ আইডির পাসওয়ার্ড !

ফাগুন, এক দুপুরে আমরা আমাদের সংসার গড়েছিলাম হিমছড়ি পাহাড়ের উপর অজানা এক গাছের নীচে। ধুলো-মাটির আস্তরণ সরিয়ে আমরা দুজন দুজনের গায়ে হেলান দিয়ে বসে বিনিময় করেছি আমাদের দেখা না হওয়া জনম গুলোর ইতিহাস। চতুর্দিকে সবুজ পাহাড়-দূরে সাগর আর মাথার উপর ছিলো ঝক্‌ঝকে নীল আকাশ। তোমায় ছাড়া ঐ জনম গুলো অসম্পূর্ন রংহীন ছিলো জাদু। তুমি যখন আমার অধরে তোমার প্রেম ছোঁয়ালে, তখনই চারপাশ ভরে উঠেছিলো রঙের আল্পনায়। ভালোবাসার রঙে রঙ্গীন হয়েছিলাম আমি।

জাদুজান, সেদিনের সান্ধ্য আকাশটা ভরে গিয়েছিলো অজস্র তারায়। বিধাতা সেই সন্ধ্যাটা আলোকিত করেছিলো আমাদের মিলন উৎসবে। আকাশের চাঁদ মাটিতে এসেছিলো তার নদীকে নিজের বুকে আকড়ে ধরার জন্য। নদীর ঢেউ বয়ে ছিলো চাঁদের নিঃশ্বাসের তালে তাল মিলিয়ে, চাঁদ-নদী লেপ্টে ছিলো একাকার হয়ে।

জান, ঐ রাতে আমি ছিলাম তোমার হাতে এক জীবন্ত গিটার। প্রতি তারের স্পর্শে বেজে উঠেছি ভিন্ন ভিন্ন সুর-শব্দে। আঙ্গুলের ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত আমি একেক তারে একেক সুর তুলেছি। তুমি অপার মুগ্ধতায়, সুরের মূর্ছনায় আবিষ্ট হয়ে গ্রহন করেছিলে আমায় সর্বাত্মক রুপে- সম্পূর্ণতায়।

ফাগুন, আমাদের জনমের ব্যবধান কভু ফুরাবে না। আমরা বারবার ফিরে আসবো এই ধরনীতে, আমাদের অসমাপ্ত প্রেমের পূর্ণতা দিতে। নিয়তির ঢেউ যতবার ফাগুন নদীকে আলাদা করবে, ততবারই পু্নর্জনম নিয়ে আমরা আসবো।

জাদুজান, আমরা আরেকটি স্বপ্ন পৃথিবী গড়বো। তুমি হবে উত্তপ্ত সবুজ পর্বত। আমি হবো অঝোর বৃষ্টি। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত আর তুমুল বর্ষণে আমরা সৃষ্টি করবো এক নায়াগ্রা। রঙধনুর সাত রঙে রঞ্জিত হবে আমাদের ভালোবাসার মায়া-আকাশ।

এসো আরেকটি রাত গড়ি শুধু তোমার-আমার,
এসো খুব কাছাকাছি হয়ে আরেকটু ভালোবাসি
প্রেমেরই সুরভিতে প্রজাপতির ডানায় আমাদের ছবি আঁকি।
আমার ঈশ্বর তুমি আমি তোমারই সৃষ্টি ,
সুর তুমি প্রাণের বীণায়,
ছন্দ আমার অ-কবিতায়…

ভালো থেকো ফাগুন , মনে রেখো।

* তোমারই নদী *

 

৪৪৯জন ২১১জন
66 Shares

৪৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য