প্রকৃত বন্ধু ল্যাম্পপোস্ট

হালিম নজরুল ২১ ডিসেম্বর ২০২১, মঙ্গলবার, ১২:১৪:৫০অপরাহ্ন ছোটগল্প ৮ মন্তব্য

প্রিয়তির বন্ধুরা সবাই অবাক। ল্যাম্পপোস্ট আবার কারো বন্ধু হয় নাকি ! অথচ প্রিয়তি কিনা বলছে ঐ ল্যাম্পপোস্টটাই তার প্রকৃত বন্ধু। দুদিন ধরে ওইটাকে ঘিরেই সময় কাটিয়ে দিচ্ছে সে। ওটার সাথেই একা একা কথা বলছে সে, অভিযোগ জানাচ্ছে, কাঁদছে। আর কারো সাথে কোন কথাও বলছে না। সবাই ভাবছে কি করে সম্ভব এটা। যে প্রিয়তি সারাক্ষণ বন্ধুবান্ধব নিয়ে মেতে থাকে, সেই কি না কোন বন্ধুর সাথে মিশছে না। গতকালও সকালের নাস্তা খেয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিল। কিন্তু সে স্কুলে যায়নি। আজও তার মা তাকে অনেক আদর করে বুঝিয়ে শুনিয়ে স্কুলে পাঠিয়েছে। স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে সেই সকালে বেরিয়েছে। কিন্তু স্কুলে যায়নি। প্রিয়বান্ধবী রুনুও তাকে স্কুলে যাবার পথে অনেকবার তার সাথে যেতে বলেছে। কিন্তু কোন কথায়ই কাজ হয়নি। তার একই কথা আমার বন্ধুকে রেখে আমি কোথাও যাব না। আমার ভূতবন্ধু বলেছে এই ল্যাম্পপোস্টটাই আমার সত্যিকারের বন্ধু। সে কখনো মিথ্যে বলে না এবং সেই আমার জীবনে অনেক বড় উপকার করবে।

 

নন্দীভূতের সাথে প্রিয়তির বন্ধুত্ব বেশ ভাল। প্রায় বছর খানেক হল তাদের পরিচয়। তার পর থেকে প্রায়ই কথা হয় তাদের। মাঝেমধ্যেই প্রিয়তিকে দেখতে আসে। উপহার দেয়। বিপদ আপদে সহযোগিতা করে। কিন্তু বাবা নিখোঁজ হবার পর বেশ কয়েকদিন হয়ে গেলেও আসতে পারেনি সে। বেশ কদিন বিরতির পর পরশু রাতে এসেছিল সে। প্রিয়তিকে অনেক শান্তনা দিয়ে গেছে। সেইই প্রিয়তিকে বলে গিয়েছে ওই ল্যম্পপোস্টটাই প্রিয়তির প্রকৃত বন্ধু। ওটাই বলে দেবে প্রিয়তির বাবার সন্ধান। সবাই মিথ্যা বললেও ল্যাম্পপোস্টটা কখনো মিথ্যা বলবে না।

 

প্রিয়তির বাবা ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। তার একমাত্র স্বপ্ন প্রিয়তিকে মানুষের মতো মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা। আলিশান বাড়ি, বিদেশী গাড়ি বা কোটি কোটি টাকার স্বপ্ন দেখেননি কোন দিন। তিনি খুব নিরীহ ও সৎ প্রকৃতির লোক। কোনরকম দুর্নীতি বা অসৎ কর্মকান্ড পছন্দ করেন না। অথচ একটি চক্র বেশ কিছুদিন যাবৎ একটি অনৈতিক কাজ বাগিয়ে নেওয়ার জন্য তাকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে আসছে। কিন্তু প্রিয়তির বাবা খুব নীতিবান লোক। তার এক কথা, জীবন দেবে তবুও অনৈতিক ফাইলে সই করবেন না। ইদানিং কারা যেন টেলিফোনে নানারকম হুমকি দিয়ে আসছিল। কখনো বলে প্রিয়তিকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে, কখনো বলে স্ত্রীকে হত্যা করবে, কখনো বা বলে বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দিবে।

 

নানারকম হুমকি ধামকিতে প্রিয়তির মায়ের মনটা খুব খারাপ। তার মনে নানারকম প্রশ্ন খেলা করছে। মানুষগুলো এত খারাপ হয় কি করে ! ইচ্ছে করলেই তো সবাই সৎ ও সুখী জীবনযাপন করতে পারে। কাউকে ঠকিয়ে বা কারো ক্ষতি করে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করার দরকারটা কি ! অতীতে যারা এমন সব অপকর্ম করেছে তারা কি কেউ চিরজীবী হয়েছে ?

 

মায়ের মন খারাপ দেখে প্রিয়তিরও ইদানিং লেখাপড়ায় মন বসছে না। বেশিরভাগ সময়ই বাবার ল্যাপটপ কিংবা মায়ের মোবাইল নিয়ে সময় কাটিয়ে দিচ্ছে। কখনো কখ‌নো ফেসবুক, ইউটিউব দেখে। কখনো বা গেম খেলে। যে বয়সে তার মা-বাবা মোমাইল বা ল্যাপটপ চিনতোই না, সেই বয়সে প্রিয়তি ডিজিটাল যুগের মানুষ। সে অনেককিছু জানে। এইসব ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে অনেককিছু শিখেছে সে।

 

আর মাত্র দুমাস পরেই প্রিয়তির পি এস সি পরীক্ষা। এবার সে ক্লাস সিক্সে উঠবে। তাই প্রিয়তির মা খুব টেনশনে আছে। এমন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সামনে রেখে মোটেই সময় অপচয় করা ঠিক নয়। তাই সে বারবার প্রিয়তিকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। তার ধারণা এই ডিজিটাল ডিভাইসগুলোই প্রিয়তির মাথা খেয়েছে। তাই ওগুলো দূরে রেখে পড়াশোনার তাগিদ দিচ্ছে বারবার। কিন্তু প্রিয়তির বাবার মত ভিন্ন। তার মতে লেখাপড়ার পাশাপাশি এগুলোর দরকার আছে। আধুনিক জগতের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে অধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা জরুরি। বাবার এমন উতসাহে প্রিয়তি খুব খুশি হয়। সে উল্টো মাকে বলে “তুমি তো আমাকে এগুলো নিয়ে খেলতে দাও না, খালি বল বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে খেলতে। কিন্তু ওরা আমাকে ভাল কিছু শেখাতে পারে না, মিথ্যা কথা বলে। কিন্তু এইগুলো কখ‌নো মিথ্যা বলে না, আমাকে কত কিছু শেখায়”। বাবা বলেন বন্ধু বান্ধব মোবাইল – ল্যাপটপ সবই দরকার আছে মা। তবে এই মুহূর্তে তোমার সবচেয়ে দরকার ভালভাবে লেখাপড়া করা।

 

পরীক্ষা শেষ হলে মা-বাবার সাথে দাদাবাড়ি ঘুরতে যাবে প্রিয়তি। অনেকদিন শহর থেকে গ্রামে যাওয়া হয়নি। কিন্তু গ্রাম তার খুব ভাল লাগে। গ্রামের খোলা মাঠ, নদী নালা, ফুল-ফলের বাগান, সবুজ প্রকৃতি, পাখ-পাখালি আর মানুষের সরল ভালোবাসা খুব ভাল লাগে প্রিয়তির। তাই বাবা অফিস থেকে ফেরার আগেই তার সব গোছগাছ সম্পন্ন।

 

বিকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এসেছে, কিন্তু বাবার ফিরে আসার নাম নেই। সারারাত অপেক্ষার পরও বাবা ফিরে না আসায় আতংক বাড়ছে প্রিয়তি আর তার মায়ের। পরিচিত-অপরিচিত আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ সম্ভব সব জায়গায় খোঁজ নিয়েও কোন সন্ধান মেলেনি। অবশেষে থানায় শরনাপন্ন হয়েছে তারা। কিন্তু তারাও কোন কুল কিনারা করতে পারেনি। সবাই শুধু শান্তনা দিয়ে যাচ্ছে।

 

প্রায় দু’মাস পেরিয়ে গেছে প্রিয়তির বাবা নিখোঁজ হয়েছে। কোন সন্ধান মেলেনি। সপ্তাহখানেক আগে ফ্লাইওভারের উপর বস্তাবন্দী একটি মস্তকবিহীন লাশ পাওয়া গেছে। এর আগেও কয়েকবার ওইখানে খুনের ঘটনা ঘটেছে। যেহেতু ওই পথ দিয়েই প্রিয়তির বাবা অফিসে যাতায়াত করে, তাই পুলিশের ধারণা এটি প্রিয়তির বাবার লাশ হতে পারে। সেই মোতাবেক তাকে দাফন করাও হয়েছে।

 

লাশটি দাফন করার পর থেকেই প্রিয়তি নানারকম স্বপ্ন দেখছে। পরশ থেকে প্রতি রাতে ভূতবন্ধু নন্দীভূতও তার সাথে দেখা করতে আসে। নন্দীভূতই নাকি বলেছে ফ্লাইওভারের উপরের ওই ল্যাম্পপোস্টটিই তার বাবা নিখোঁজের প্রকৃত সন্ধান দিতে পারবে। সেইই প্রকৃত বন্ধু এবং সে কখনো মিথ্যে বলবে না। তাই গত দুদিন ধরে প্রিয়তি ওইখানে এসে বসে থাকে, কাঁদে আর কিসব যেন বলতে থাকে।

 

আজ সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে যাচ্ছে, তবুও বাসায় যেতে চাইছে না প্রিয়তি। মা, মামা বন্ধু বান্ধব কেউ তাকে বোঝাতে পারছে না। তার এক কথা আগে আমার বাবাকে এনে দাও। কোন উপায় না পেয়ে প্রিয়তির মা পুলিশের শরনাপন্ন হলেন। তিনি পুলিশ অফিসারকে অনুরোধ করলেন তারা যেন প্রিয়তিকে আশ্বস্ত করেন যে তার বাবাকে এনে দেবে। এই কথা শুনলে হয়তো প্রিয়তি বাসায় যেতে পারে।

 

প্রিয়তির মায়ের পিড়াপিড়িতে পুলিশ অফিসার তার অনুরোধ রাখলেন। তিনি একগাড়ি পুলিশ নিয়ে হাজির হলেন ফ্লাইওভারের উপর। তারা প্রিয়তিকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুতেই কোন কাজ হচ্ছে না। হঠাৎ পুলিশ অফিসারের চোখ পড়ল ল্যাম্পপোস্টের উপরের দিকে। তিনি অন্য অফিসার ও সিপাহিদের ডাকলেন। তারপর সবাইকে কি যেন বললেন। তিনি প্রিয়তিকে বললেন, থানায় চলো প্রিয়তি, কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমার বাবার রহস্য জানা যাবে। বলেই সবাই থানার পথে রওনা হল।

 

সবাই গভীর উৎকণ্ঠায় পুলিশ অফিসারের কক্ষে অপেক্ষা করছেন। এমন সময় একজন জুনিয়র অফিসার এসে বললেন, স্যার প্রিয়তির বাবাকে পাওয়া গেছে। একদল অপহরণকারী উনাকে অপহরণ করে একটি ঘরে আটকে রেখেছিল। আর ফ্লাইওভারের উপরে যে লাশটি পাওয়া গিয়েছিল, সেটি অন্য কারো লাশ। আসলে প্রিয়তির কথাই সত্য। ওই ল্যাম্পপোস্টটিই ওর প্রকৃত বন্ধু। ওই ল্যাম্পপোস্টের সিসিটিভি ক্যামেরা এবং আলোর কারনেই আমরা প্রিয়তির বাবা ও তার অপহরণকারীদের খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছি। অফিসার মৃদু হেসে বললেন, এজন্য সবার আগে আমাদের উচিৎ প্রিয়তিকে ধন্যবাদ জানানো। ধন্যবাদ প্রিয়তি।

২১৪জন ১৩৬জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ