নিছক গল্প-১

সাতকাহন ২ জুলাই ২০১৩, মঙ্গলবার, ০৪:০৮:৩০অপরাহ্ন গল্প ২৮ মন্তব্য

সুমনের ঘরে বাসর রাতে বাত্তি নেভানোর গান বাজছে। বাসর রাতে বাত্তি নিভে যাওয়া মানে মামলার শেষ স্বাক্ষীটারও পটল তোলা-একটি কি করি না করি টাইপের ইন্টু মিন্টু অবস্থা। বাঙলা গান একটা শরীরী ঠিকানার দিকে ছুটছে। এখন সে বাসর ঘরে হাজিরা দিচ্ছে, মধ্যরাতে ঘরের মধ্যে খুট্ খুট্ শব্দ হচ্ছে।

সুমনা নামের এক কোটিপতি কন্যার একটু মনযোগ পাবার আশায় প্রতি বৃহস্পতিবার সুমনের ঘরে গান বাজনার আয়োজন করা হয়। প্রায় দেড় বছর দুঃসাধ্য আরাধনা এবং প্রচুর গবেষণার পর জানা গেল রবীন্দ্র সংগীতের প্রতি সুমনার সামান্য ঝোক আছে। সুমনার সাথে সম্পর্কের সাঁকো তৈরীতে এভাবে কবিগুরুর সাহায্য পাওয়া যাবে সুমন ভাবতে পারেনি। সে রবীন্দ্র সংগীতের সিডি জোগাড় করে ঘর ভরে ফেলে।

সুমনার বান্ধবী ইতি। ভয়াবহ রূপ সচেতন মেয়ে। ত্বক উজ্জ্বল করার গোপন সূত্রটি আবিস্কারের জন্য সে নিজের ওপর বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে; দুধের সর, কমলার খোসা বাটা, ডিম, ময়দার পেষ্ট, ডিমের কুসুম কোন কিছু মাখা বাদ রাখেনি একশতভাগ আশ্বাস পেলে সে কচি বাছুরের গোবর মাখতেও দ্বিধা করবে না।

ইতি দুই চোখের পাতার ওপর শসার চাক দিয়ে শুয়ে আছে। এই মুহূর্তে তাকে মিশরের মমির মত দেখাচ্ছে। সুমনা ইতির নির্দেশমত বিভিন্ন গাছের পাতা বেটে বানানো ভর্তা গায়ে মেখে বসে আছে। সুযোগ বুঝে ইতি সুমনাকে জানায় এপাড় বাংলা-ওপাড় বাংলার শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রেমিকের বসবাস এই শহরেই। সুচিত্রা সেনের আদি ও আসল ক্যাসেট পেতে এই প্রেমিকের সাথে যোগাযোগ না করে উপায় নেই।

দেন দি কেস স্টার্টেড। প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে চিকেন রোল, বিফ বার্গার, খিচুরী সহযোগে রবীন্দ্র সংগীত-সুমনের চোখের তৃপ্তি সুমনার কানের। এখন একটি অমৃত বাক্যের জন্য অনন্ত অপেক্ষা। গুরুজীর গান প্রেমরসে ভরা ‘আমার পরানও যাহা চায়’-সাষ্টাঙ্গে পেন্নাম আপনাকে গুরু।

সুমনার দ্বিতীয় ভালোবাসা রাজা নামের একটা গৃহপালিত প্রাণী। রাজার লেজের পশমগুলো বেজীর মত ঝরঝরে। সম্ভবত লেজে চিরুণী চালানো হয়। রাজা প্রতি বৃহস্পতিবার তার মালেকীনের সাথে সঙ্গীত সভায় আসে।

রাজাকে ভবিষ্যত শালাবাবু জ্ঞান করে একটু বেশী খাতির করা হয়। রাজাও সম্ভবত ব্যাপারটি বুঝে গেছে। সে সুমনকে দেখামাত্র ঘু-উ-উ-উ… ঘু-উ-উ-উ… ‘জাতীয় কুকুরী ভাষায় আনন্দ প্রকাশ করে। তার হাতের উল্টাপিঠে টুক টাক চাটা মারে এবং পেছনের দু’পা স্থির রেখে কত দ্রুত লেজ নাড়ানো সম্ভব তা ভবিষ্যত দুলাভাইকে দেখিয়ে দেয়। আচার-আচরণে রাজা খুব ভালো। দু’একবার দেয়ালের কাছে গিয়ে পেছনের পা তুলে জলের পিচ্কারী ছোড়ার ভুলটুকু ছাড়া রাজার আচরণে কোন ভুল ধরা যাবে না। ব্যবহারে বংশের পরিচয়। সুমনার মত ধনী কন্যার কুকুর তালুই বাড়ীতে এসে অভদ্র আচরণ করতে পারে না। সঙ্গীতসভা অব্যাহত রাখতে প্রচুর মালপানি বের হয়ে যাচ্ছে। রাজার জন্য শুকনো টোস্ট, নিজেদের জন্য স্ন্যাকস্, ইতির হাত খরচা, সুমনার দুর সম্পর্কের খালাত ভাই রূপম যে সুমনাদের রামছাগল ম্যানেজারটাকে স্যারের বাসায় যাওয়ার কথা বলে এখানে নিয়ে আসে তার সম্মানজনক রেমুনারেশন, সুমনার পছন্দের সিডিগুলো সংগ্রহ করা-এই খরচগুলো যোগ করলে আঁতকে ওঠার মত একটা যোগফল হয়। এত খরচা পাতির পরও রাজার সাথে বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছুই হয়নি। তবে সুমন নিরাশ হবার ছেলে না, রবার্ট ব্রুস এবং মাকড়সার গল্পটি তার জানা-একবার না পারিলে…।

সুমনা যেদিন না আসে বন্ধুরা সেদিন মাতলামি শুরু করে দেয়। রবীন্দ্র সংগীত শোনার মধ্যে ধৈর্য্য ধারণের একটা ব্যাপার আছে। সুমনা থাকলে চুপচাপ রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে হয়। সুমনের মুখের দিকে তাকিয়ে কোন কথা বলা যায় না। থুতনীর নীচে একটা কালো ভ্রমর সমান দাড়ি রাখা রঞ্জনের পছন্দ পশ্চিমা গান। সে থ্রাশ মেটাল, স্পিড মেটাল, হার্ড রক মনযোগ দিয়ে শোনে। এই জাতীয় গান শোনার জন্য একটা পৈশাচিক আবহ দরকার। রঞ্জন মাথার খুলি, হাড়ের ক্রস, ভ্যাম্পায়ারের ছবিওয়ালা গেঞ্জি পরে আড্ডায় আসে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির কারণে পিশাচেরা কাছে ঘেষতে পারে না-তারা কালো গাউন পরে দূরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। গুরুজী পিশাচদের নিয়ে কিছু গান লিখলে এই সমস্যার সৃষ্টি হত না।

আজ সুমনা না আসায় পিশাচদের উদ্বাহু নৃত্য শুরু হয়ে গেছে। সুমন চিমসা মুখে বসে আছে। শ্রীকৃষ্ণ কংস বধের জন্য রাধাকে ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে যে কষ্টটা পেয়েছিলেন সুমনের মনে সেই ধরনের একটা কষ্ট জমাট হয়ে আছে। বন্ধুরা এই কষ্টটাকে বুঝতে পারছে না। তারা অনাবশ্যক একটা বিষয়ে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছে। বলিউডের বিপাশা বসু এবং মল্লিকা শেরাওয়াত এই দুই হার্টথ্রবের মধ্যকার একটা বিষয়ে কে বেশী নম্বর পেতে পারে তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং বিতর্ক। বিতর্কটা প্রায় শার্টের হাতা গোটানো অবস্থায় পৌঁছে গেছে। এই ফাঁকে কে যেন পিশাচ গানের সিডি পাল্টে বাসর রাতের গান বাজাতে শুরু করেছে। ‘তুমি যেও নাকো বাসর…।’ বাত্তি নেভানো গানের মধ্যপর্ব। যুবক মেয়েটিকে ভরসা দিচ্ছে তাকে বিশেষ নিরাপত্তা দেয়া হবে। কোন ভয় নেই। তাকে বুকের মধ্যে রাখা হবে। ভারতের ব্লাক ক্যাট, র‌্যাব, কোবরা প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের সাধ্য নেই এই নিরাপত্তা দেয়। গানটি শেষ হয়ে যাবে এমন সময় মজিদ সাহেবের গাড়িটা গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়।

মজিদ সাহেবের গাড়িটা দেখা মাত্র  সবকিছু স্তদ্ধ হয়ে যায়। সুমনের বন্ধুরা নেংটি ইদুরের মত লেজ তুলে পেছন দরজা দিয়ে কেটে পড়তে থাকে। সুমনা না আসায় সুমন নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিলেও তার  সন্দেহ দুর হয় না। সুমনা দু’একদিন আড্ডার প্রায় শেষ মুহূর্তে আসে। এই মুহূর্তে সে এসে পড়লে কি ধরনের সমস্যা হবে তা ভেবে ঘামতে থাকে সুমন। টেলিফোন করে সুমনাকে এখানে আসতে নিষেধ করার মত অবস্থান সে এখনও তৈরী করতে পারেনি। শুধুমাত্র রাজার সাথে শালাবাবু সম্পর্কের ভিত্তিতে সুমনাকে এখানে আসতে নিষেধ করা যায় না।

(এটা আমার ধারাবাহিক গল্পের প্রথম কিস্তি-আরো আছে চলবে)

২৪১জন ২৪১জন
0 Shares

২৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য