নগরে দেবদূত

রেহানা বীথি ৭ জুন ২০১৯, শুক্রবার, ০৯:৩৪:৪৪অপরাহ্ন গল্প ২০ মন্তব্য

নগরে দেবদূত
———————–
নিস্তব্ধ নির্জন রাত। আমার পতনের শব্দটা প্রতিধ্বনি তুলে মিলিয়ে গেলো রাতের বুকে। বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে উঁচু বেদিতে চালকসহ একটা ঘোড়ার গাড়ি। নিশ্চল। বুঝলাম, ওটা আসল নয়, চালকসহ ঘোড়ার গাড়ির কাঠামো। পথবাতির আলো পড়ে চকচক করছে। কে বানিয়েছে এটা? একেবারে নিখুঁত তো! তিনদিক থেকে তিনটে প্রশস্ত পথ এসে মিলেছে এখানটায়। প্রতিটি পথের মাঝেই বিভাজন রেখায় হাঁটুসমান ঘন সবুজ গাছ। নিয়ন বাতির আলোয় যেগুলো কালচে দেখাচ্ছ। কালচে দেখাচ্ছে গাছের বিপুল কৃষ্ণচূড়াগুলোকেও। এখন কি কৃষ্ণচূড়া ফোটার সময়? বিশাল পৃথিবীর মাঝারি এই নগরে এখন কোন ঋতু? কিছু দূরে কাঠগোলাপও ফুটে আছে দেখছি! একটা মিষ্টি মৃদু ঘ্রাণ প্রবেশ করলো আমার নাকে। সেখান থেকে ছড়িয়ে গেলো মস্তিষ্কের কোষে কোষে। আমি আবেশিত হলাম। ইচ্ছে করছে গান গাইতে। না না, তারচাইতেও বেশি ইচ্ছে করছে ঘুমিয়ে যেতে। আমার বাঁ হাতের ওপর ময়ূরকণ্ঠী নীল প্রজাপতিটিও বোধহয় ঘুমিয়ে গেছে। ওটার উড়ু উড়ু করে বসে থাকার ভাবটি নেই এখন। আমিও ক্লান্ত ভীষণ। এই তো….. ঘুমে জড়িয়ে আসছে দু’চোখ।

ভোরের আলো আসি আসি করেও আসছে না। গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি ঝরছে আকাশ থেকে। সেকারণেই যেন কুয়াশাময় চারপাশ।তবুও একটু একটু করে জেগে উঠতে চাইছে শহর। এই সামান্য বৃষ্টিতে থেমে যাবে না কিছুই। সবই চলবে আপন গতিতে। আব্দুল ওয়াহাব, একজন স্কুল শিক্ষক, সে-ও থেমে নেই। ফজরের আজানের আগেই বিছানা ছেড়েছে সে।ছোট্ট মুরগির পাতলা ঝোল আর একেবারে নরম করে একটু খিঁচুড়ি রান্না করেছে। আর করেছে পাঁচটা সেদ্ধ আটার রুটি, একটা ডিমও ভেজেছে। তারপর গোসল করে, পরিপাটি হয়ে বেরিয়ে এসেছে বাড়ি থেকে ছাতা মাথায়। তিনরাস্তার মোড়ের ওই বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাছে যখন সে পৌঁছালো, তখনও হালকা অন্ধকার, কুয়াশার মতো বৃষ্টি তো আছেই। তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে হবে তাকে, না জানি মা ছেলে কী করছে! হয়তো ছেলের খিদে পেয়েছে। বলছে, মা, জলদি আমাকে কিছু খেতে দাও, অনেকদিন পর আমার খুব খুব খিদে পেয়েছে! ছেলেকে একটু নরম খিঁচুড়ি আর মুরগির ঝোল খাইয়ে ওরা মিয়াবিবিতে রুটি আর ডিমভাজি খাবে খুশিমনে। যাই তাড়াতাড়ি, আর একটু পা চালাই। একথা ভেবেই তার চোখ গেলো ঘোড়ার গাড়ির ওই বেদিটার দিকে। দেখলো, গাড়োয়ানের ঠিক পেছনেই, গাড়ির মধ্যভাগে কে যেন একজন হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। আশ্চর্য হলো আব্দুল ওয়াহাব। ওখানে তো কাউকে কখনও ঘুমাতে দেখেনি সে! আর দেখবেই বা কেন, ওটা কি ঘুমানোর জায়গা? তারওপর আকাশ থেকে গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি ঝরছে! যাক গে! ভেবেও আবার কি মনে করে এগিয়ে গেলো একটু। নজরে এলো, একটি লোক, গায়ে পাতলা ফিনফিনে নীল রঙের একটা জামা আর নিম্নাংশ আবৃত একখণ্ড সাদা কাপড়ে। লুঙির মতো। তার দু’পা ঝুলে আছে গাড়ির বাইরে। ডানহাতটাও। বাঁহাত বুকের ওপর ভাঁজ করা। এবং……এবং সেই হাতে ওপর অদ্ভুত সুন্দর একটা প্রজাপতি। ময়ূরকণ্ঠী নীল তার রঙ। সেটিকে ঘিরে রেখেছে এক আশ্চর্য নীলাভ আলো। আব্দুল ওয়াহাব নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলো না। সে একেবারে হতবাক হয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো লোকটির দিকে। কে সে? নাকি স্বপ্ন দেখছে আব্দুল ওয়াহাব? স্বপ্নই হবে…. স্বপ্নই হবে! হাতের টিফিনবাটিটা নামিয়ে রেখে দু’হাতে রগড়ে নিলো চোখ। নাহ্, একই অবস্থা। সেই একইভাবে ঘুমিয়ে আছে ঘোড়ার গাড়ির ওপর লোকটা। ডাকবে নাকি? কিন্তু…….! নড়ে উঠলো যেন একটু! মনে হচ্ছে জেগে উঠছে সে। হ্যাঁ, আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলতে যাচ্ছে বটে!

এহ্ হে, বেশ ভিজে গেছি দেখছি! ওহ্, বৃষ্টি? আর আমি কি না টেরই পাইনি! বেশ ঘুমিয়ে নিলাম একচোট! কিন্তু আমার পায়ের কাছে ওটা কে দাঁড়িয়ে ছাতা মাথায়? এই কুয়াশাময় হালকা অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে তার চোখে এক অদ্ভুত বিস্ময়। সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরিহিত বছর চল্লিশ- এর এক লোক, কেমন যেন জুবুথুবু। একটু যেন ভয়ে ভয়েও আছে সে। সে থাক, চারপাশের প্রকৃতিকে একটু দেখি তো আগে দু’চোখ ভরে। তারপর না হয় তার সাথে কথা বলা যাবে। বাহ্, ঝকঝকে শহর তো! রাতে বোঝা যায়নি ঠিকমতো। উঁচু উঁচু ভবন, গাছপালাও আছে কিছু। গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি যেন কেমন রহস্যময় করে তুলেছে সবকিছু। এই যাহ্, লোকটা দেখছি চলে যেতে উদ্যত!

— এই যে শুনছেন? চললেন কোথায়? একটু দাঁড়ান, কথা বলি আপনার সাথে!

— আমার সাথে? কেন?
— ইচ্ছে করছে যে! বলবেন না কথা আমার সাথে?
— আমার একটা জরুরি কাজ আছে, দেরি হয়ে যাবে। পরে বলবো কোনো এক সময়।
আব্দুল ওয়াহাব হাঁটা দিলো জোরে জোরে। অন্যকিছুর ভয় নেই তার তেমন, কিন্তু পাগলকে তার খুব ভয়। এ লোকটা যে পাগল নয়, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?
— কিন্তু আর যদি আপনার সাথে দেখা না হয়? কী এমন জরুরি কাজ আপনার?
গলা উঁচিয়ে বললো লোকটা।
— হাসপাতালে যেতে হবে।
কী ভেবে জবাব দিয়েই ফেললো আব্দুল ওয়াহাব।
— হাসপাতালে, কেন? কেউ অসুস্থ বুঝি?
— হ্যাঁ, আমার ছেলে।
— আপনার ছেলে! কী হয়েছে তার? আহা রে!
— কঠিন অসুখ। একদম শুকিয়ে গেছে। খেতে চায় না কিছুই।
— বয়স কত তার?
— দশ বছর।
— ইশ্, এ বয়সী একটা ছেলে হাসপাতালে? কতদিন ধরে আছে?
— একমাস।
— একমাস? বলেন কী! কিছু যদি মনে না করেন, আমি কি যেতে পারি আপনার সাথে?

আচ্ছা মুশকিল তো! মনে মনে ভেবেও রাজি হয়ে গেলো আব্দুল ওয়াহাব।

বৃষ্টি ঝরছে এখনো। আব্দুল ওয়াহাব হাঁটছে, তার পাশে পাশে চলেছে অদ্ভুত লোকটা। ওর হাতের প্রজাপতিটি চঞ্চল। ভেজা ভেজা পথঘাট জেগে উঠছে একটু একটু করে। পথের ধারের দোকানপাট খুলে যাচ্ছে একে একে। ফাঁকা রিক্সাগুলো হুড তুলে চলেছে টুংটাং। হাসপাতালে পৌঁছে গেলো ওরা। এ জায়গা কখনোই পুরোপুরি ঘুমিয়ে যায় না। নিশুতি রাতেও এখানে ব্যস্ততা দিনের মতো। নতুন রোগী আসে, পুরোনোদের হতাশ চলাফেরা, হঠাৎ হৃদয়বিদারক কান্নায় ভাবি হয় বাতাস, কারও মুখ আবার নতুন প্রাণের আগমনে উদ্ভাসিত, সবমিলে কর্মচঞ্চল সবসময়।
আব্দুল ওয়াহাব লোকটাকে নিয়ে প্রবেশ করলো সেই কর্মচঞ্চলতায়। লোকটা কেমন যেন অবাক হয়ে দেখছে সব। লম্বা করিডোরের শেষ মাথায় উপরে ওঠার সিঁড়ি। পাশে কিছু ফুল গাছে নানা রঙের ফুল। ওরা সিঁড়িভেঙে চলে গেলো সোজা তিনতলায়, ছেলের ওয়ার্ডে। ছেলেকে বিছানায় হাসিমুখে বসে থাকতে দেখে মনটা ভরে গেলো আব্দুল ওয়াহাবের। সাথের লোকটিও মিটি মিটি হাসছে দেখছি! ছেলে বউও তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে লোকটার দিকে। লোকটির বাঁহাতের ওপর খেলতে থাকা প্রজাপতিটি অবাক হয়ে দেখছে ওরা।

— তোমার পছন্দ এটা?
— খুউব! কিন্তু ওটা তোমার হাতের ওপর কেন?
— হা হা… কারণ ওটা যে আমার প্রজাপতি! সবসময় ওটা আমার সাথে থাকে।
— সত্যি? কিন্তু তা কী করে হয়? প্রজাপতি আবার কখনও কারও নিজের হয় নাকি? আমার তো নিজের কোনো প্রজাপতি নেই! আমাদের কারোরই নেই, আমার বন্ধুদেরও না।
— এটা তুমি ঠিক বললে না। তুমি হয়তো জানো না, তোমারও একটা প্রজাপতি আছে। তোমারা যারা ছোট, তাদের সবারই একটা করে প্রজাপতি থাকে।
— তাহলে দেখতে পাই না কেন? ওগুলোর রঙও কি এটার মতোই? এত সুন্দর!
— ঠিক এটার মতো নয়, তবে ওগুলোও খুব সুন্দর।
— তাই! আমি দেখবো!
— অবশ্যই দেখবে। তার আগে লক্ষী ছেলের মতো খেয়ে নাও তো! তোমার বাবা কত কষ্ট করে তোমার জন্য খিঁচুড়ি আর মুরগির ঝোল রান্না করে এনেছে, দেখো!
— হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি খাবো! মা, তাড়াতাড়ি আমাকে খেতে দাও, খুব খিদে পেয়েছে…. খুব!

খুশিতে ঝলমল করে উঠলো আব্দুল ওয়াহাব আর তার বউয়ের মুখ। কতদিন পর নিজে থেকে খেতে চাইছে ছেলে! টিফিন বাটি খুলে ছেলেকে খাবার দিচ্ছে বউ। কিন্তু আব্দুল ওয়াহাবের মনটা হঠাৎ খচ খচ করে উঠলো, সে কি কি রান্না করে এনেছে, লোকটা জানলো কেমন করে? কে লোকটা? অন্তর্যামী! বউটাও জানি কেমন, অচেনা এক লোককে সাথে করে এনেছে সে, একবারও কোনো প্রশ্ন করলো না? মা ছেলের ভাব দেখে তো মনে হচ্ছে, কতকালের চেনা! লোকটাও এমন ভাব জমিয়ে ফেলেছে এই অল্প সময়ের মধ্যে! তবুও লোকটার কারণেই এতদিন পর খেতে চেয়েছে ছেলে, সেটা তো অস্বীকার করা যায় না!
একমাত্র সেজন্যেই লোকটার ওপর পুরোপুরি রেগে যেতে পারছে না সে। কেমন যেন খুব সূক্ষ্ম একটা প্রশ্রয়বোধ কাজ করছে। কিন্তু তা বোধহয় আর বেশিক্ষণ থাকবে না। এবার বোধহয় রেগেই যাবে আব্দুল ওয়াহাব। লোকটা তার ছেলেকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যেতে চাইছে, কী আশ্চর্য! ছেলে তো হাসপাতাল থেকে ছাড়াই পায়নি! যত্তসব পাগল ছাগল!

পৃথিবীতে পতনের পর পরই এমন একটা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবো ভাবিনি আমি। একটা এত ছোট্ট, এত মিষ্টি ছেলে এতদিন ধরে হাসপাতালে! অথচ মনে হচ্ছে, ছেলেটির কোনো অসুখই নেই। যেটা আছে সেটা হলো অসুবিধা। কিন্তু কি সেই অসুবিধা? জানতে হবে……গভীরভাবে জানতে হবে! যে করেই হোক আজই হাসপাতাল থেকে ছুটি পেতে হবে ছেলেটিকে। তারপর ওকে নিয়ে নগরীর কোনো সুন্দর জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে জেনে নিতে হবে ওর সমস্যা। এত সুন্দর একটা ছেলের জীবনে কোনো আনন্দ থাকবে না, তা কী করে হয়? আমার হাতের প্রজাপতিটি দেখে ওর চোখে যে খুশির ঝিলিক ফুটে উঠেছে, তা হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না কোনোমতেই। ওর মনের মধ্যে যে একটা অপূর্ব রঙের প্রজাপতি আছে সেটার সন্ধান ওকে জানাতেই হবে।

— আজ কেমন আছো বাবু? দেখি জিভটা। হুমম….!
— জানো ডাক্তার, আমি না ভালো হয়ে গেছি! আমাকে ছেড়ে দাও, বাড়ি যাবো। আর এই যে লোকটাকে দেখছো, যার কাছে একটা প্রজাপতি আছে, ও আমার বন্ধু। ও বলেছে, আমারও একটা প্রজাপতি আছে। ওকে সাথে নিয়ে খুঁজে বের করবো সেটাকে। দেবে না ছুটি আজ?

ডাক্তার বেচারা আশেপাশে তাকিয়ে কোনো প্রজাপতিওয়ালাকে দেখতে পেলো না। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আব্দুল ওয়াহাব আর তার বউয়ের দিকে তাকাতেই ওরা বললো, সত্যিই ও ভালো হয়ে গেছে ডাক্তার সাহেব! অ-নে-ক দিন পর ও আজ নিজে থেকে খাবার খেয়েছে। ভালোমতোই খেয়েছে। ছুটি দিয়ে দিন, বাড়ি যেতে চাইছে, হয়তো বাড়ি গেলে আরও তাড়াতাড়ি সুস্থ হবে।

চিন্তার রেখা ডাক্তারের কপালে। হাসপাতালে থেকেও তো বিশেষ লাভ নেই, ভাবলো ডাক্তার। কিন্তু প্রজাপতিওয়ালার কথাটা তো ঠিক বোধগম্য হলো না! ছেলেটির বাবা মা-ও তো কোনো দ্বিমত করছে না ছেলের কথায়! হয়তো ছেলের হঠাৎ কিছুটা সুস্থতায় তাদের এই প্রশ্রয়। যাইহোক, ছুটি দিলে মন্দ হয় না। দেখা যাক! আগামী সপ্তাহে একবার দেখা করে যেতে বললেই হলো।

ঘাসে ছাওয়া নদীর ধার। একটা ছোট্ট ডিঙি বাঁধা আছে ঘাটে। অব্যবহৃত বোধহয় বহুদিন। আব্দুল ওয়াহাব তার বউকে নিয়ে বসে আছে ঘাসের ওপর। ওদের চোখেমুখে উপচে পড়ছে খুশি। ছেলে তাদের ছাড়া পেয়েছে হাসপাতাল থেকে। আমার বাঁহাতের প্রজাপতিটিও অকারণে ফুরফুর করছে। ছেলেটি ছুঁয়ে দেখছে সেটিকে একটু পর পর। বলছে, এত সুন্দর….. এত সুন্দর! আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে বার বার। আশ্চর্য, আমার চোখে জল!

— তোমার স্কুলটা কোথায়? নিয়ে যাবে আমাকে?
— তুমি যাবে ওখানে? কিন্তু আমার স্কুল তোমার ভালো লাগবে না যে!
— কেন?
— ভীষণ উঁচু একটা ভবন। লিফ্ট এ ওঠানামা, আমার ভালো লাগে না।
— কেন? স্কুলের মাঠে খেলো না বন্ধুদের সাথে?
— নাহ্, মাঠই তো নেই! আর যা লেখাপড়ার চাপ! খেলার সময় কোথায়? খেললে পিছিয়ে যাবো না? যে খেলবে সেই পিছিয়ে যাবে। আমরা তো খালি পড়ি। জানো, আমার কয়টা বই?
— কয়টা?
— অ-নে-ক! আর প্রতিটা বইয়ের জন্য আলাদা আলাদা খাতা। প্রাইভেট, স্কুল, কোচিং সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা খাতা। সেসবে ব্যাগ এত ভারি হয়, কী বলবো তোমায়! আমার সব বন্ধুদের পিঠে ব্যথা, চোখেও চশমা অনেকের। লেখাপড়া এমন কেন? এত পড়তে হয় কেন? আচ্ছা, তুমিও কি এমন করেই লেখাপড়া করেছো? আমার বাবা করেনি জানো? বাবা যখন ছোট ছিলো, তখন নাকি তাদের স্কুলে বিশাল একটা মাঠ ছিলো। ক্লাসের ফাঁকে তারা বন্ধুরা ওই মাঠে খেলা করতো। গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা আরও কত কী! আমরাও তো ছোট, আমাদের মাঠ নেই কেন? দেখো, পুরো শহরজুড়ে শুধু উঁচু বিল্ডিং। আমার ভালো লাগে না একদম। আমার বন্ধুরা মোবাইলে, কম্পিউটারে গেম খেলে। আমার ভালো লাগে না ওসব।

— তোমার কী ভালো লাগে বলো?
— বললে তুমি দিতে পারবে তা?
— হ্যাঁ পারবো।
— সত্যিই?
— একদম সত্যি। বলেই দেখো না!
— আমি চাই খোলা মাঠ। অনেক গাছ, অনেক প্রজাপতি উড়ে বেড়াবে ফুলে ফুলে। আমি বন্ধুদের সাথে ঘুরবো, খেলবো, মাঝে মাঝে লেখাপড়াও করবো। স্কুলের ব্যাগটা হবে অনেক বেশি হালকা। পারবে করতে এসব? আর আমার প্রজাপতি? ওটা কোথায়? তুমি যে দেবে বলেছিলে আমাকে!

— দেবো দেবো। সব দেবো তোমাকে। এখন বাড়ি চলো, সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে। ওই দেখো, তোমার বাবা মা ডাকছেন আমাদের।

— কিন্তু কখন দেবে? আমার যে আর দেরি সহ্য হচ্ছে না! ওগুলো পেলেই আমি একদম সুস্থ হয়ে যাবো। আর কোনোদিনও হাসপাতালে যেতে হবে না আমাকে।

— দেবো, অতি শীঘ্রই! চলো, এবার বাড়ি যাই, অন্ধকার হয়ে গেলো।
— চলো।
— ও হ্যাঁ, তোমার নামটাই তো বলোনি আমাকে!
— উচ্ছাস।
— বাহ্, উচ্ছাস!
— আর তোমার নাম?
— পরে বলবো।

একটা ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরের আড়ালে অসুস্থ শিশু? অসুস্থ ভবিষ্যত! হাজার হাজার শিশুর মনে হাজার হাজার প্রজাপতি বন্দী হয়ে আছে এভাবে? ওরা ওড়ার জায়গা পাচ্ছে না। এই সুন্দর শহর এই অসুস্থ সন্তানদের দিয়ে কী ভবিষ্যত গড়বে? ভেবেই পাচ্ছি না আমি। সুন্দর পৃথিবীটা দু’চোখ ভরে দেখবো বলে এসেছিলাম। কিন্তু কোথায় সৌন্দর্য? শুধু প্রশস্ত পথঘাট আর ঝকঝকে উঁচু বিল্ডিংই কী সৌন্দর্য? ছোট, নিষ্পাপ বাচ্চাদের শৈশব হরণ করে এ কেমন সৌন্দর্য? বেদনার পাহাড় যেন বুকে চেপে বসেছে আমার। আমি যেখান থেকে নেমে এসেছি, সেখানে বসে এসব বাচ্চাদের কষ্ট অনুভব করা সম্ভবই নয়। ওদের কষ্ট অনুভব করতে হবে ওদের পাশে থেকে। হঠাৎ পৃথিবীতে আসার সিদ্ধান্তটা ভুল নয় তাহলে! আর এসেই যখন পড়েছি, এইসব কচিমুখগুলোর কষ্ট কিছুটা লাঘব করি। আমার অনন্ত জীবন, আমার অপার্থিব ক্ষমতা যদি কিছুটা কাজে লাগে ওদের, ধন্য হবো আমি।

ওরা ঘুমিয়ে পড়েছে। মাঝখানে ছেলে, দু’পাশে বাবা-মা । ছেলের বুকের ওপর দু’জনের হাত রাখা। আহা, কী নিশ্চিন্তি! কী পরম নির্ভরতা! ওই যে স্বর্গ, যেখানে আমার বাস, আব্দুল ওয়াহাবের ঘরটায় আজ রাতে সেই স্বর্গই নেমে এসেছে যেন। ভোর হওয়ার আগেই সেরে ফেলতে হবে আমার কাজ। মাঝারি এই নগরে প্রতিটা বাড়ির সামনে এক চিলতে উঠোন, উঠোনে ফুল গাছ, ফুলগাছে হাজার হাজার প্রজাপতি ওড়াতে হবে রাতের মধ্যেই! স্কুলের সামনে থাকবে বিশাল খোলা মাঠ। ভোরে সব শিশু কলকল করে উঠবে। অসংখ্য প্রজাপতির ভিড়ে খুঁজে নেবে নিজের প্রজাপতি। ওরা বেড়ে উঠবে সুস্থ সুন্দর মন নিয়ে। গড়ে তুলবে এক স্বপ্নের আগামী। আমি চলে যাবো নিঃশব্দে।
আচ্ছা, উচ্ছাস কে কি বলে যাবো, আমার পরিচয়?
না থাক, ওরা তো ভুলে যাবে বেদনাময় অতীত। শুধু থাকবে বর্তমান, আর সুন্দর ভবিষ্যত!
সুখে থাকুক ওরা। উচ্ছাস থাকুক আমার মনে, আর আমি নাহয় থাকি উচ্ছাসের মায়াবী ঘোর হয়ে।

২৬৫জন ৯৩জন
11 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য