জীবনের গল্প

রুমন আশরাফ ২৩ আগস্ট ২০২০, রবিবার, ০৮:৩৮:৫৬অপরাহ্ন গল্প ৭ মন্তব্য

ঈদের ছুটি কাটিয়ে দ্রুতই কর্মস্থলে যোগদান করেছি। ঈদের পর সাইট চালু হতে সাধারণত ১০/১২ দিন লেগে যায়। শ্রমিকেরা ছুটি কাটাতে বাড়ি যায়। অনেক দূরদূরান্তে কারও কারও বাড়ি। তাই ছুটি শেষে ফিরে আসতেও দেরী করে। কিন্তু আমাদের সময়মতই সাইট কাম অফিসে উপস্থিত থাকতে হয়। কর্ম থাকুক কিংবা না থাকুক তাতে কিছু যায় আসে না। যদিও সামান্য কিছু অনলাইন রিপোর্টিং আর মিটিং ছাড়া তেমন কোনও কাজই থাকে না। আর তাই সাইট চালুর হওয়ার আগ পর্যন্ত এই এক সপ্তাহ বড্ড আলস্যে দিন কাটে।

 

সেদিন সকাল সকাল সাইটে গেলাম। সাইটের প্রবেশদ্বারেই সিকিউরিটি পয়েন্ট। আমাকে আসতে দেখে দূর থেকেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সিকিউরিটি মজিদ মিয়া। কাছাকাছি আসতেই প্রতিরক্ষা বাহিনীদের মতো স্যালুট দিল। আমিও তার জবাব দিলাম। মজিদ মিয়ার এই স্যালুট দেবার ভঙ্গিটি আমার বেশ লাগে। আগে আর্মিতে ছিল। সিপাহী পদবীতে। এখানে তার জয়েন করার দিনই বলেছিল। কিন্তু কি কারণে যেন তার অবসর নিতে হয় তা ঠিক মনে নেই।

-“কি মজিদ মিয়া, কেমন আছেন”?

-‘আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছি স্যার। আপনার শরীর কেমন স্যার?”

-“আল্লাহ্ ভালো রেখেছে।”

 

আমাদের বাক্যালাপের এক পর্যায়ে খেয়াল করলাম সিকিউরিটি পয়েন্ট এর ভেতরে একটি বাচ্চা ছেলে বসে আছে। বয়স আনুমানিক আড়াই-তিন হবে। পিটপিট করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। হাতে কি একটা চিপ্সের প্যাকেট। প্যাকেটের মুখটি খোলা। এতক্ষণ হয়তো প্যাকেটের ভেতর ছোট ছোট হাত ঢুকিয়ে চিপ্স বের করে খাচ্ছিল। আমাকে দেখে ভড়কে গিয়ে হয়তো খাওয়া বন্ধ করেছে।

 

আমাদের সাইটে আঠারো বছরের নিচে কোনও শ্রমিক কিংবা শিশু প্রবেশ নিষিদ্ধ। যদিও বাচ্চাটি এখন মূল সাইটের বাইরেই আছে। আর সাইটেও কাজ শুরু হয়নি এখনও। তাই আমি নিশ্চুপ থেকে ব্যাপারটি মেনে নিলাম। মজিদ মিয়ার দিকে তাকালাম। মজিদ মিয়াকে দেখে মনে হল সে খুব অনুতপ্ত ব্যাপারটি নিয়ে।

 

-“স্যার এইটা আমার ছেলে। একমাত্র সন্তান। বাড়িতে থাকতে চায় না। কান্দে। তাই সাথে নিয়া আসলাম।“

-“আচ্ছা ঠিক আছে। সমস্যা নেই। আমি অফিসে যাচ্ছি। পিয়ন তো এখনও আসেনি। কিছু লাগলে আপনাকে ডাকবো।

-“ঠিক আছে স্যার”।

-“আর বাচ্চাকে চাইলে আমার রুমে দিয়ে যেতে পারেন।”

-“সমস্যা নাই স্যার। আমারে ছাড়া ও থাকবে না। কান্না করবে“।

-“আচ্ছা ঠিক আছে। সমস্যা হলে জানাবেন।”

 

সিকিউরিটি পয়েন্ট হতে আমার অফিস এর দূরত্ব ২০ গজের মতো। সাইটের ভেতরেই অফিস। অফিসে ঢুকে ফ্রেস হয়ে দাপ্তরিক নির্দিষ্ট কাজগুলো সারলাম। হাতে আর কাজ নেই এখন। কিন্তু অফিসে আরও কিছুক্ষণ থাকা উচিত। দায়িত্ববোধ বলে কথা। কিছু একটা নিয়ে সময় কাটানো দরকার। বেশ কিছু নাটক ল্যাপটপে সংরক্ষিত আছে। ভিডিও ফোল্ডার ওপেন করতেই নাটকের পাশাপাশি কয়েকটা কার্টুন এর ভিডিও চোখে পড়লো। ছুটিতে বাড়ি থাকাকালীন আমার কন্যা এসব কার্টুন দেখত। মজিদ মিয়ার ছেলেকে কার্টুনগুলো দেখানো যেতে পারে। এদিকে চা এর খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। খেতে হলে নিজেকেই বানিয়ে খেতে হবে। টি ব্যাগ আছে কিনা কে জানে। লম্বা ছুটির পর সাধারণত এসব এর অভাব থাকে অফিসে। প্রায় প্রতিটি অফিসেই এমনটি ঘটে। এটা আমার ধারণা।

 

রুমের দরজা খুলতেই দেখি মজিদ মিয়া চা হাতে দাঁড়িয়ে। পাশে বাচ্চা ছেলেটি। পরনে লাল গেঞ্জি আর নীল হাফ প্যান্ট। সিকিউরিটি পয়েন্টে যখন বসা ছিল তখন পোশাকের ব্যাপারটি খেয়াল করা হয়নি। চায়ের কাপটি হাতে নিয়ে মজিদ মিয়া আর তার ছেলেকে ভেতরে আসতে বললাম। চায়ে চুমুক দিতে দিতে কার্টুন ছেড়ে দিলাম। বাচ্চাটি ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বাচ্চাটিকে কোলে তুলে ভিজিটর চেয়ারে বসিয়ে দিলাম। মজিদ মিয়া নিঃশব্দে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। বাচ্চাটি কার্টুন দেখছে। দেখে বেশ মজা পাচ্ছে। বাবার অনুপস্থিতি মনে হয় টের পায়নি। একে একে সব কার্টুন দেখালাম। বাচ্চার আনন্দিত মুখটি দেখে বেশ ভালো লাগলো। বাচ্চাটি এখন আগের অনেক ইজি হয়েছে। চেহারা ভরা মায়া।

 

কিছুক্ষণ পর মজিদ মিয়া রুমে ঢুকল।

“-স্যার ছেলে কোনও দুষ্টামি করে নাই তো”।

-“না না খুব শান্ত ছেলে আপনার। বসে বসে কার্টুন দেখলো। কিন্তু ছেলে বাড়িতে কান্না করে কেন? বললেন বাড়িতে থাকতে চায় না।“ আমার কথাগুলো শুনে মজিদ মিয়ার চোখ ছলছল করে উঠলো। মনে হল প্রায় কেঁদেই দিবে।

-“কি ব্যাপার! কাঁদছেন নাকি?“

-“স্যার, আমার ছেলে মা হারা। এখানে জয়েন করার সপ্তাহ খানেক আগে ওর মা মারা যায়। ক্যান্সার ছিল তার। মা মরার পর বাড়িতে ওর দাদা দাদীর কাছে থাকতো। কিন্তু মাকে না পেয়ে খালি কান্না করে। আজকে ডিউটিতে আসার সময় অনেক কান্না করতেছিল। আমাকে আসতেই দিবে না। উপায় না পেয়ে তাই সাথে নিয়া আসলাম।“

 

মজিদ মিয়া এবার সত্যি সত্যি কেঁদে ফেললো। আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। বাচ্চাটি তাকিয়ে তাকিয়ে বাবাকে দেখছে। নিষ্পাপ বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার আমার খুব মায়া হল। চোখ ভিজে গেলো। এতো ছোট বাচ্চা এখনই মা হারা হয়েছে। এই কষ্টটা ওকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। বড় হলে মায়ের সাথে ওর সুখের স্মৃতিগুলো ওর হয়তো খুব একটা মনেও থাকবে না। কিন্তু মা হারানোর বেদনা ওকে আজীবন দগ্ধ করবে। মজিদ মিয়া রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে একটু পরপর। নিজে কান্না করে নিজেকে হালকা করা যায়। কিন্তু অন্যের কান্না দেখলে কেন যেন কষ্ট লাগে। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক করা দরকার। মজিদ মিয়া কান্না থামিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিল। ছেলেটি এখনও বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি এতীম ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। হাত বুলাতে বুলাতে ভীষণ কান্না পেল আমার। সাইটে আসার আগে এক প্যাকেট বিস্কুট কিনেছিলাম। ব্যাগ থেকে বের করে বাচ্চাটির হাতে দিলাম। নির্মল হাসি মুখে বিস্কুটটি গ্রহণ করলো। এই হাসি বড়ই মায়াময়।

 

ওরা চলে যাবার পর চোখের পানিকে আর আটকাতে পারলাম না। এই মুহূর্তে আমার একমাত্র কন্যা সন্তানের কথা মনে পড়লো। পরিবার ছেড়ে দূরে থাকি। এক দুমাস পর পর পরিবারের সান্নিধ্যে যাই। কন্যাকে কাছে না পাওয়ার কষ্ট বুকে ধারণ করে পেট বাঁচানোর তাগিদে বাধ্য হয়ে দূরে থাকি। কন্যা আমাকে কাছে না পেয়ে খুব মন খারাপ করে মাঝেমাঝে। কিন্তু শান্তনা এই যে, অনেকদিন পর পর হলেও আমাদের একে অন্যের দেখা হয়। কিন্তু ঐ এতীম শিশুটি আজীবনের জন্য বঞ্ছিত হল মায়ের দেখা পাওয়া থেকে, আদর সোহাগ থেকে। চাইলেও মাকে আর কোনদিন কাছে পাবে না। ‘মা’ বলে ডাকলেও মা এর জবাব সে কোনদিনও পাবে না। কোনদিন না।

১৭৫জন ৬৬জন
0 Shares

৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য