যখন থেকে জীবন শুরু তখন থেকেই এর ব্যাবহার শুরু বলা চলে মানব জীবনের সাথে প্রত্যাক্ষ ভাবে তা জড়িয়ে আছে।আমাদের দেশে একটা সময় ছিল যখন হুজুর কবিরাজের ঝাড় ফুকের বিশ্বাসের উপর অনেক রোগ নির্মুল হতো তা এখন ডিজিটাল যুগে অকেজু হয়ে এ্যালোপ্যাথি-হোমিওপ্যাথিতে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।এর পাশাপাশি আয়ুবের্দি ঔষধের গুরুত্ব বাড়তে থাকে যা আজও জনপ্রিয়।
গণতণ্ত্রের মূল নীতি মানে প্রতিটি নাগরিকের যে মৌলিক অধিকারগুলো আছে তার মধ্যে সকল নাগরিকের জন্য রাষ্ট্রের সু-চিকিৎসা নিশ্চিত করা অন্যতম।সে অনুযায়ী আমরা কি পাচ্ছি?রাষ্ট্রের কাছ থেকে চিকিৎসার সকল সুযোগ সুবিদাতো দূরে থাক নিজ অর্থ শ্রম দিয়েও সুচিকিৎসা পাওয়া সাধারণ জনগণের জন্য বিরল।দেশে যদিও সরকারি হাসপাতালের অভাব নেই সে অনুযায়ী ঐ সব হাসপাতালগুলোকে স্ব-চোক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে এ সব সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসার গুণগত মান কতটা নীচে,কতটা অবহেলিত দূর দুরান্ত থেকে আসা রোগীদের কতটা অমানবিক ভাবে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

ঢাকা কলেজ মেডিক্যালে কিছুটা অভিজ্ঞতার আমার রয়েছে।বন্ধুদের মনে আছে কি না জানি না এ সম্পর্কে প্রথম ঢাকা কলেজ মেডিক্যালে কি রূপ পরিস্থিতিতে 1456245292300পড়েছিলাম সে সম্পর্কের একটি পোষ্ট আছে।আমার দ্বিতীয় সন্তান মেয়ে এখন ডাক নাম তার জান্নাত।অনেকে বলেন ওমুকের সন্তানতো সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে,তো সে ক্ষেত্রে আমার সন্তানরা তেমন সোনার চামচতো দূরে থাক রূপো কাসার চামচও তাদের ভাগ্যে নেই,তাছাড়া মেয়ে আমার জন্মেছে জীবনের ভয়ংকর অজানা এক ত্রুটি নিয়ে যা যেখানে ভুমিষ্ট হয়েছিল সেই হাসপাতাল ডাক্তারাও আগে-বাগে বলতে পারেননি।যখনি মেয়েটির মুখে মায়ের শাল দুধ দেয়া হলো তার কিছুক্ষণ পরই সমস্যা দেখা দিল।সে স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে পারছিলো না।তখন রাত দশটা বাজে আমিও ভাল অবস্থা দেখে বাসায় চলে এসেছিলাম হঠাৎ ফোন পেয়ে দ্রুত মাওতাইল হাসপাতাল সেখানে অপারগতা স্বীকার করায় দ্রুত চলে গেলাম ঢাকা কলেজ মেডিক্যালে ভাগ্যক্রমে আইসিইউতে।হাসপাতালে আই সিইউতে ভর্তির শর্তের কাগজে যখন সাইন করলাম তখন মনে ভয় চলে এলো যে মেয়েটিকে বুঝি আর বাচাতে পারলাম না।ধৈর্য্য এবং প্রিয় সোনেলার বেশ কয়েকজনের পরামর্শে,হাসপাতালে সহযোগিতায় আশা জাগে।সে যাত্রায় প্রায় পনের বিশ দিন হাসপাতালে অমানবিক ভাবে অপেক্ষা করে মেয়েটি আল্লাহর রহমতে সুস্থ্য করে বাসায় আসি।সমস্যা বাধে তাকে কি ভাবে খাওয়াবো সরাসরি খাদ্য মুখে দিলে তা তালু কাটা বলে যে কোন সময় খাদ্য লাঞ্চে গিয়ে জীবন মারাত্বক ঝুকির মধ্যে পড়তে পারে তাই অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে ডাক্তারদের কথা মত সোনার চামচ খুজছি।মানে তাকে খাওয়াতে হলে ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী বিশেষ চামচ দিয়ে খাওয়াতে হবে নতুবা আই সি ইউ হতে ডাক্তাররা যে নাকের ভিতর দিয়ে পাইপ দিয়েছিলেন সেই পাইপ দিয়েই খাওয়াতে হবে।খোজতে শুরু করলাম সেই বিশেষ চামটি।নিউ মার্কেট,শাহবাগ,বসুন্ধরায় খোজতে গিয়ে চামচের সংখ্যাই শুধু বাড়ালাম কোন কাজেই লাগাতে পারলাম না।ওর অতি চঞ্চলতায় এক সময় নাকে দেয়া পাইপটিও সে নিজেই খুলে ফেলে।এখন উপায় যে চামচগুলো ক্রয় করেছি তা দিয়ে খাওয়াতে পারছিলাম না।ঘরেই ছিল সর্বত্র বাজারে বিক্রয় হয় দুধের ফিটারের নরমাল বান তাই দিয়ে শুরু করেন তার মা।এক দিন দুই দিন তিন দিন কাজ হয়ে গেল সে তার সুবিদা মত খাবার খাচ্ছে নিয়মিত।স্রষ্টার দয়ায় কোন আর কোন সমস্যা হলো না।যাক বাচা গেলো মেয়েটিও নাকের পাইপের যন্ত্রনা থেকে রক্ষা পেলেন।
যতটুকু জানি তালু কাটা CLEFT PLATE শিশুরা বিশ্বের সর্বত্রই ফ্রি অপারেশন হয়ে থাকে।এ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারও বিশ্ব slide_27স্বাস্থ্য সংস্থা হতে অনুদান পেয়ে থাকেন।আমি মুলত ফ্রি-অফ্রি চিকিৎসা ভাবছি না,ভাবছিলাম কোথায় এর ভালো সার্জারী হয়।অনেকের সাথেই কথা বলে বুঝতে পারলাম যে কোন রোগীর জন্যই ঘণ ঘণ ডাক্তার বা হাসপাতাল পাল্টানো রোগীর জন্য ক্ষতিকর যতক্ষণ না ডাক্তার অন্যত্র রেফার না করেন তা ছাড়া অন্যত্রে যদি সমস্যা দেখা দেয় তবে এই ঢাকা কলেজ মেডিক্যালেই পাঠাবেন কেননা ঢাকা কলেজ মেডিক্যাল হলো যে রোগীর জন্য এ দেশের শেষ ভরসা।সেই মোতাবেক আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকা কলেজ মেডিক্যালেই যাবো যেখান থেকে ওর দ্বিতীয় জন্ম হয়।
গেলাম প্লাষ্টিক সার্জারী ও পোড়া রোগীর বিভাগে সেখানে যে যার মতো চলছেন,কাউকে জিজ্ঞাসা করেও তেমন ভাল কোন উত্তর পেলাম না ভর্তি হওয়ার বিষয়ে অবশেষে বিষয়াদি জানিয়ে টিকিট নিয়ে একটি ডাক্তারের রুমে লাইন দিলাম।লাইনেই সেখানকার কর্তব্যরত এক লোক আমাকে সহি স্থানে নিয়ে গিয়ে বললেন —আমার পারিশ্রমিক দেন।
-মানে!
লোকটি মুখ ভর্তি পান চিবুচ্ছেন একটু মুচকি হাসি দিয়ে বললেন
-এই আর কি, কিছু বকসিস।
বুঝতে পেরে পকেট থেকে কিছু দিলাম বলবো না কত দিয়েছিলাম তবে যা দিয়েছি তাতে সে আত্ব তৃপ্তিতে বললেন।
-আবার কোন সমস্যা হলে ঐ যে ঐখানে আমাকে পাবেন।
আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় করলাম।আমাদের বিভাগ রেড ইউনিট প্লেট সার্জারী বিভাগ সেখানে বা সেই রুমে যেতে হলে রুমের বাহিরে করিডরে রাখা LLআছে বেশ কয়েকজন পোড়া রোগী।রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়াতে কেবিনের বাহিরে করিডরে রোগী রাখতে হয়।পোড়া ঘায়ের ঔষধের গন্ধে যেখানে বেশীক্ষণ দাড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়।দেখতে অনেক বিশ্রি পুড়ে যাওয়া অনেকের হাত পা স্ট্যান্ডের সাথে বাধা যা দেখলে শিশু বা দূর্বল হার্টের লোকদের জীবনের জন্য বেশ  ঝুকিপুর্ণ।তাদের পাশ কেটে একান্ত বাধ্য হয়েই সেই প্লেট প্লাষ্টিক সার্জারী অফিস বিভাগে গিয়ে কাগজ পত্র দেখিয়ে ভর্তির সিট নিলাম।রুমের যেতেই বন্দ একটি রুম খোলে দিল এক হাসপাতাল বয়।ভিতরে ঢুকে অবাক হলাম আমাদের ছাড়া আর কেউ নেই পরে জানতে পারলাম ঈদের ছুটিতে আছেন সবাই কয়েকদিন পর পুরো ভরে যাবে।
যাক কাঙ্খিত ডেট অনুযায়ী অপারেসনস হলো সফল ভাবেই কৃতজ্ঞ ডাক্তারদের নিকট তারা অনেক যত্ন নিয়ে সময় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে সুন্দর ভাবেই কাজটি করলেন।
(y)  এই লিংকটিতে বার্ণ রোগির জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা এবং পরিচালকের কিছু কথা জানতে পারবেন। করণীয়গুলো
কিছু অনাকাঙ্খিত অভিযোগ:
   (y) যদিও অপারেসনের সমস্থ ব্যায় ছিল ফ্রি কিন্তু আমাকে খরচ হয়েছিল শুধু মাত্র অপারেসনস ফি ছাড়া সকল ঔষাধি ও খুচরা যন্ত্রানাংশের মুল্য।ডাক্তারদের ধরিয়ে দেয়া ঔষধের লম্বা একটি লিষ্ট যা ডাক্তারদের নিদিষ্ট করা ঔষধের মার্কেট থেকেই কিনতে হবে।
(y) সব চেয়ে বড় যে সমস্যা তা হলো রোগীর ফাইল নিয়ে নিজে ডাক্তারদের নির্দেশ মতে ওমুক স্যারের কাছে যান….সাইন নিয়ে আসেন অথচ সেই রুমের জন্য ওয়ার্ড বয় নিয়োগ প্রাপ্ত আছেন।এক বার অন্য এক জন রোগীর অবিভাবক এ কাজে ব্যার্থ হলে অফিসের এক বড় কর্তা এ সব বিষয়ে তার অধীনেস্তদের ধমকাচ্ছিলেন….তাদের ওয়ার্ড বয়রা কি করে?
(y) ওয়ার্ড বয়,প্রায় প্রতিটি গেইটের সিকোরিটি,অপারেসন থিয়েটারে থাকা বয়কে দিতে হয় বকসিস যা একজন নিন্ম বিত্ত পরিবারের পক্ষে অসহনীয়।
(y) ডাক্তারদের ব্যাস্ততা এতই যে এক কথা দুইবার শুনা যেন পাপ…কেমন যেন চোখে মুখে বিরক্তিকর ছাপ লক্ষ্য করা যায়।
(y) সরে জমিনে জানা মতে ঢাকা কলেজ মেডিক্যালের শুধু মাত্র তালু কাটা বিভাগেই মাসে প্রায় আড়াই কোটি টাকা বৈদেশিক অনুদান আসে কিন্তু সে তুলনায় তাদের খরচ যৎ সামান্য।
(y) সব শেষে আমার এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা যা আমাকে বেশ অবাক করে….
সে দিন হঠাৎ বাচ্চার জন্য একটি ইমাজেন্সি ঔষধ বাহির হতে ক্রয় করে লিফট দিয়ে রেড ইউনিটে উঠে দেখি বিশেষ কিছু লোকের ঝটলা।করিডরে বার্ণ রোগীর সিট রাখার কারনে যাতায়াতের পথ সরু হয়ে পড়ে সেই সরু পথেই কিছু স্বনামধন্য ডাক্তার সাহেবরা বার্ণ রোগিদের পরিদর্শন করছেন।সন্তানের চিন্তায় আমার চিন্তা চেতনা সে দিকে নেই তাই ঔষধ নিয়ে সরু পথ দিয়েই যেতে চেয়েছিলাম নিদিষ্ট ক্লিফ প্লেট রুমে।পথ আটকায় এক মহিলা ডাক্তার সে রীতিমত হঠাৎ রেগে গিয়ে কি বলতে চেয়েছিলেন আমি নিজেও তেমন বুঝতে পারিনি যখন বুঝতে পারলাম তখন উত্তরটা একটু কড়া ভাবেই দিলাম।
-দেখছেনতো আপা আমার হাতে ঔষধ…এটা বাচ্চার জন্য খুব ইমাজেন্সী।
আপা বলাতে ডাক্তার সাহেবীনি আরো রেগে গেলেন।
-বেয়াদপ…
-কি বেয়াদপি করলাম আপা?
-আবার!আমাকে আপা বলছো কেনো?
-তাহলে তাহলে কি বলব?
-ম্যাডাম,
এক প্রকার রেগেই উত্তর দিলেন সে,এর মধ্যে সিকুরিটিকে ধমকাচ্ছেন হাসপাতালের বড় এক কর্তা।অবস্থা বেগতি দেখে এ ফাকে আমি পিছু ব্যাক করে পরিদর্শক থেকে একটু আড়ালে সরে আসি।বড় কর্তার ধমক হজম করে সিকুরিটি আমার কাছাকাছি এসে জিজ্ঞাসা করছেন…কে?কে ঐখান দিয়ে যেতে চেয়েছিলো?উপস্থিত সবাইকে কয়েকবার বলার পর আমি উত্তর দিলাম।
-ঐ খান দিয়ে যে ভিতরে যাওয়া নিষেধ,তা সাইন বোর্ড লাগালেন না কেনো?তবেতো কেউ ঐ খান দিয়ে যেতো না।
-নারে ভাই কথা সেটা নয় আমি নিজেও জানতাম না যে ওনারা আসবেন।তাছাড়া ওরা প্রতিনিয়ত এমনিই ব্যাবহার করেন।ওদের সাথে থাকতে থাকতে আমিও কেমন যেন যন্ত্রের মতো হয়ে যাচ্ছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মোবাইলে রিং আসে।ডাক্তার সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন ঔষধটি পেয়েছি কি না।আমি বললাম পেয়েছি সে বললো তবে দেরী করছেন কেনো আসছেন না কেনো?আমি বললাম কি করব আমার যাওয়ার পথে বড় বড় ডাক্তারা বার্ণ রোগিদের পরিদর্শন করছেন তারা আমাকে যেতে বাধা দিচ্ছে।ডাক্তার সাহেব রেগে গেলেন…..কি যে বলেন না “পরিদর্শন বড় না রোগী বড়”? আমি বললাম তা আপনার সহকর্মীদের জিজ্ঞাসা করলেই পারেন।কথাটি মনে হয় তার গায়েও লেগেছে তাই সে নিজেই বাহিরে এসে আমার কাছ থেকে ঔষধটি নিলেন।ফোনে কথা এবং সে বাহিরে এসে আমার কাছ থেকে রাগাম্বিত সূরে ঔষধ বুঝে নেয়া সবিই অবলোকন করছিলেন ঐ আপা মানে ম্যাডাম।অতপর আমিও তার সাথে ম্যাডামের পাশ দিয়ে ভিতরে চলে গেলাম।

চট্রগ্রামের শিশুটি মৃত্যুর আগেই মৃত্যুর সনদ পায় ।ভুমিষ্ট হওয়া শিশুটিকে চিকিৎসক মৃত ঘোষনা দিয়ে ফেরত দেন পরিবারের কাছে।পরিবার শিশুটির দাফনের সময় নড়ে চড়ে উঠতে দেখে তাকে ফের হাসপাতাল নিলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করেন।
13-300x498দিনাজপুরে আরেক নব জাতকে স্হানীয় একটি হাসপাতালের ডাক্তার মৃত ঘোষনা করে পরিবারের কাছে দিলে তাকে দাফনের সময় বক্স খুলতেই শিশুটি নড়ে চড়ে কেদে উঠে এখবর পেয়ে তাকে এক হৃদয়বান ব্যাক্তি হেলিকপ্টার পাঠিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসেন।পরবর্তীতে ৩২ ঘন্টার পর শিশুটি মারা যান।
প্রশ্ন হলো এ রকম মন্দ খবরের পাশা পাশি ভাল খবরও ডাক্তারদের আছে।প্রেমে প্রত্যাখান হওয়া বদরুল খাদিজাকে কোপায় যা দেশ বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তুলে সেই বোন খাদিজাকে মরনের দুয়ার থেকে এক প্রকার জোড় করেই ফেরত আনেন ডাক্তার সাহেবদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর মেধা।খাদিজা ৯৬ ঘন্টা পর চোখ মেলেছেন যা আমাদের প্রিয় ডাক্তারদের জন্য সাফল্য আর আমাদের জন্য বেচে থাকার প্রেরণা।

চলবে
মানুষ মেরামতের কারিগর ঢাকা কলেজ মেডিক্যাল

১৫৫জন ১৫৫জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য