ঘুরে এলাম সুন্দরবন।

শামীম চৌধুরী ২৬ জুলাই ২০১৯, শুক্রবার, ০২:৫৪:২০অপরাহ্ন ভ্রমণ ২১ মন্তব্য

সুন্দরবনকে প্রকৃতির রানী বললে ভুল হবে না। কেওড়া আর গোলপাতায় ঘেরা সুন্দরবন। ‘আমাদের সুন্দরবন’ বইয়ের লেখক ফরিদী নুমান সুন্দরবনের বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন যে, বিশাল, বৃহৎ, বিস্তীর্ণ, নীরব, নিথর, নিস্তব্ধ, শ্বাপদ-সংকুল ভয়াল, রোমঞ্চকর, চির রহস্যাবৃত এক বন। পৃথিবীর বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বন সুন্দরবন। সাধারণের কাছে বাদাবনখ্যাত এই বন সত্যিই অনুদঘাটিত এক রহস্যের নাম, অপার বিস্ময়! অসম্ভব-অস্বাভাবিক রূপের আঁধার এই বনকে যিনিই দেখেছেন, তিনিই তার প্রেমে মজেছেন। একবার ভাবুন তো এমন বর্ণনাময় সুন্দরবনে কার না যেতে ইচ্ছে করে? আমারও শখ বা সাধ জেগে উঠেছিলো সুন্দরবনের সৌন্দর্য নিজ চোখে দেখার জন্য। তারপর থেকেই সুন্দর বন ভ্রমনের নেশা জাগে। তারপর থেকে সুন্দরবনে ভ্রমন শুরু করি। প্রকৃতির সাথে মিশে থাকতে ভালো লাগলো। ভালো লাগে প্রকৃতির বন্যপ্রাণীদের নানান ধরনের কসরৎ ও পাখির নানান সুরের কলতান শুনতে। জোয়ার-ভাটা নদী ও সাগরের যৌবন নিয়ে খেলা করে। নৌকা চলে জোয়ার-ভাটার সাথে মিতালী করে। আর সেই নৌকায় বসে দোল খেয়ে নিমিষেই হারিয়ে যাই ম্যানগ্রোভ বনে।

তাই গত ১৮,১৯,২০ জুলাই আমরা ১০জন এক সাথে সুন্দরবন যাওয়ার পরিকল্পনা করি। ১৭ তারিখ খুলনার উদ্দেশ্যে রাত ১০:৪৫ মিনিটে সায়েদাবাদ জনপথের মোড় থেকে মধুমতি ফাল্গুন বাসে  যাত্রা শুরু করি । সময়মত বাসে উঠে যার যার নির্ধারিত আসনে বসে যাই। মাওয়া ফেরীঘাটে যখন পৌছি তখন রাত ১:৩০মিনিট। চাঁদনীরাত। জোস্নার আলো পদ্মার নদীর উপর আছড়ে পড়ছে। চাঁদনীর আলোতে পদ্মা রূপালী রঙে সেজেছে। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। ফেরী হুইসেল বাজিয়ে ছুটে চলছে তার গন্তব্যে। আমরা সবাই ফেরীতে দাঁড়িয়ে পদ্মার উত্তাল ঢেউ আর জোস্নাকে হৃদয়ের সঙ্গী করে আড্ডায় মশগুল। ফাঁকে ফাঁকে ধুমপায়ীরা সুখটান দিচ্ছেন। কেউ কেউ চা পানে ব্যাস্ত। এরি মাঝে ঘাটে  ভিড়লো ফেরী। তখন  রাত ৪:০০মিনিট। বাস ছুঁটে চলছে খুলনার উদ্দেশ্যে। নিজ আসনে বসে কেউ কেউ ঘুমের চেষ্টা করছেন। সকাল ৬:১৫ মিনিটে কাটাখালী মোড়ে বাস থামলো। অভিযাত্রিক দল নিজ নিজ মালামাল সঙ্গে নিয়ে নেমে পড়লাম। কাটাখালিতে নাসিরের দোকানে রং চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার সাথে সাথেই অনিদ্রার ক্লান্তি দূর হলো। আমাদের ট্যুর অপারেটর রুবেল ততক্ষনে মাইক্রোবাস নিয়ে হাজির হলো। সবাই মাইক্রোবাসে বসলাম। আমরা যাবো মংলা পোর্টে। অতিথিদের বরন করে নেবার জন্য আমাদের ভাড়া করা জাহাজ অপেক্ষা করছে । ভোর ৬:৫০ মিনিটে মংলা ঘাটে নামলাম। সেখান থেকে নৌকায় নদী পার হয়ে জাহাজে উঠলাম। জাহাজের কর্মচারীরা আমাদের মালামাল ও লাগেজ নিয়ে জাহাজে উঠলো। আমরাও জাহাজে উঠলাম। উঠার সাথে সাথে Tang এর শরবত, পাউরুটি, মধু, জেলী, ডিম ভাজি ও চা/কফি দিয়ে আপ্যায়ন করালেন রুবেল সাহেব। জাহাজের ৫টি কেবিনে ( একেক কেবিনে ২জন)  আমরা ১০জন যার যার মালপত্র গুছিয়ে রাখলাম। ওয়াশরুমে যেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে পোষাক পরিবর্তন করে জাহাজের উপরে ডাইনিং টেবিলে বসলাম। কেউ কেউ জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য  সুন্দরবনের কেওড়া , সুন্দরী, হেতাল ও গড়ান গাছে ঘেরা বন দেখছেন। এমন সময় ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো। নিরাপদে ক্যামেরা রেখে বৃষ্টির ফোঁটা মুখে ও শরীরে ভিজিয়ে শান্তির পরশ খুঁজে পেলাম। জাহাজ চলছে হাড়বাড়িয়া ইকো টুরিজমের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে চাকদাই ফরেষ্ট রেঞ্জ অফিস থেকে ট্যুর অপারেটর রুবেল সাহেব আমাদের নিরাপত্তার জন্য একজন বন নিরাপত্তা কর্মী (গানম্যান) ও একটি দেশীয় নৌকা মাঝি সহ সাথে নেন। গানম্যান পর্য টকদের সাথে থাকা বাধ্যতামূলক। সকাল ১১:১০মিনিটে হাড়বাড়িয়ায় পৌছালাম। এখানে রুবেল সাহেবের একটু পরিচয় ও তার কর্তব্যের বর্ণনা না দিলে নিজেকে অপরাধী মনে হয়।

তানজির হোসেন রুবেল একজন ট্যুর অপারেটর। আমরা ১০ জন রুবেলের সাথী হয়ে এ মাসের ১৮,১৯,২০ তারিখ সুন্দরবনের হাড়বাড়িয়া, কটকা ও করমজলে যাই। রুবেল ,আমাদের জন্য সুন্দর একটি ভ্রমনের আয়োজন করেন। সকালের নাস্তায় ছিলো বিভিন্ন নমুনার খাবার। দুপুরে মাছ ,মাংস, কাঁচ-কলা ভর্তা, চিংড়ি মাছ দিয়ে সব্জি ও ডাল এবং রাতে মাছ ,মাংস,ভর্তা, সব্জি ও ডাল দিয়ে আমাদের আহারের ব্যাবস্থা করেন। প্রতি বেলায় খাবারের পর ফল,মিষ্টি ও দই ছিলো। প্রতিদিন বিকেল যে নাস্তা দিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করেছেন তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। কলা, চা বা কফি ছিলো অপরিমিত। ফেরার দিন রাতে BarBQ পার্টিতো ছিলই। এর বাহিরেও আমাদের কাছে ভালো লেগেছে যতবার জাহাজ থেকে নেমে বনে বা খালে ছবি তুলতে গিয়েছি তাতবার জাহাজে ফেরার পর লেবুর শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করা। শ্রাবনের এই প্রচন্ড দাবানলে ঘাম ঝরা ক্লান্ত শরীরে হাতের কাছে এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত পেয়ে আমরা সবাই প্রাণবন্ত হয়ে উঠি। নিমিষের মধ্যেই শরীরের সব ক্লান্তি দূর করে দেয়। আমরা কৃতজ্ঞ রুবেলের এমন কর্তব্যপরায়ন ও বিশ্বস্ত আতিথিয়েতার জন্য। রুবেল চুক্তির বাহিরে অনেক সেবা আমাদের জন্য করেছেন। যদিও ট্যুরের আয়োজন ও পর্যটকদের নিয়ে সুন্দরবনে ঘুরানো রুবেলে আয়ের একটি অংশ বা ব্যবসা। তারপরও রুবেল চুক্তির বাহিরে অনেক কিছু আমাদের জন্য করেছেন। তার সততা,অধ্যবসা,কর্তব্যপরায়নতা ও কমিটমেন্ট আমাদেরকে মুগ্ধ করেছে। যার জন্য রুবলেকে আমরা সবাই অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে জানাই ধন্যবাদ। আপনারা কেউ যদি পরিবার নিয়ে বা একাকী সুন্দরবন ভ্রমনে ইচ্ছুক হোন তবে রুবেলের সাথে যোগাযোগ করে যেতে পারেন। আমরা ওর কাছ থেকে যেমন ভদ্রোচিত আচরন ও সম্মান পেয়েছি তেমন একজন সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি তার যোগ্যতার প্রমানও রেখেছেন। 

হাড়বাড়িয়ায় ইকো ট্যুরিজমে পৌছার পর আবারও গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। ক্যামেরা ও  লেন্সকে বৃষ্টিরোধক করে আমরা দলবদ্ধ হয়ে কাঠের ট্রেইলের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করি। প্রথেমেই হাড়বাড়িয়ায় নিয়োজিত বন কর্মচারীদের কাছে আমাদের পূর্বে নেয়া অনুমতি পত্র ও পরিচয় পেশ করতে হয়।  বনরক্ষীদের অমায়িক ব্যবহার ও আচরন আমাদের মুগ্ধ করে। নিরাপত্তা রক্ষী বা গানম্যান শেখ মজিবুল্লাহ মামাকে সাথে নিয়ে বনের ভিতর প্রবেশ করি। বনের রাস্তার দুইধারে কেওড়া ও গোলপাতা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নীচে শাঁসমূলের মাথা উঁচু করা যেন বনের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বলে রাখা ভালো যে, এই হাড়বাড়িয়াতে বাঘের অবাধ বিচরন। বেশ কয়েক বছর আগে হাড়বাড়িয়াতে মানুষ খেঁকো বাঘ ছিলো। বাঘিনী এখানে বাচ্চারও জন্ম দেয়। তাই হাড়বাড়িয়া মোটেও নিরাপদ নয়। একা একা বেড়ানো খুবই বিপদজ্জনক। দলবদ্ধ থাকলে যে কোন হিংস্র প্রাণী আক্রমন করতেও ভয় পায়। যারাই সুন্দরবনের হাড়বাড়িয়ায় যাবেন দলবদ্ধ হয়ে থাকবেন। ঘন্টা দুয়েক হাড়বাড়িয়ায় অবস্থান করে জাহাজে আসি। তখন দুপুর ১:৩০মিনিট। জাহাজে উঠার আগে বাচ্চা সহ একটি বানরের ছবি তুলি। বাচ্চাটি মা’র কোল থেকে পানিতে পড়ে যায়। পরে মা বানরটি বাচ্চাটিকে পানি থেকে তুলে নিজের বুকে আগলে রাখে। সেই মুহুর্তের কিছু ছবি নেই। ছবিগুলি দেখেলে মনে হবে মাতৃত্ব শুধু মানবেই নয়। মাতৃত্ব সব জাতিতে।

দুপুরের খাবারের জন্য  জাহাজের ডাইনিং টেবিলে যাই। (উল্লেখ্য দুপুর ও রাতের খাবারের বর্ননা রুবেল সাহেবে পরিচিতিতে তুলে ধরেছি।) একসাথে সবাই খেতে বসি। কেউ কারো প্লেটে ভাত তুলে দিচ্ছেন। কেউবা সব্জি, ডালে বা মাছের কারি দিচ্ছেন। দৃশ্যগুলি দেখলে আপনাদের মনে হবে এযেন একই পরিববারে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে  আবদ্ধ সবাই। কে কম খেলেন, বা বেশী তার কোন চিন্তা কারো মাথায় নেই। সত্যিকার অর্থে এমন মন-মানসিকতার লোক সাথে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমরা খাচ্ছি। জাহাজও  ছুঁটে চলছে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কটকার উদ্দেশ্যে। দুপুরের খাবার শেষ করে সবাই গল্প করছি। এই ফাঁকে জাহাজ থেকে ফল দেয়া হলো আনারস।  শ্রাবনের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। হরেক প্রজাতির পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। সুন্দরবনের উঁচু গাছে ঈগল প্রজাতির পাখি বসে আসে। গাছের ডালে বসে থাকা মাছরাঙা পাখিটি শিকারের জন্য পানিতে ডুব দিচ্ছে । এই দৃশ্যগুলি আমার কাছে নতুন নয়। তবুও যতবার দেখি ততবারই নতুন মনে হয়। বন্যপ্রাণীর কারো সাথে কারো  ঝগড়া বিবাদ নেই। নেই মারামারি। হানাহানি-কাটাকাটিও নেই। কারো আহার কেউ ছিনিয়ে নেয় না। অথচ আমরা নিজেদের মধ্যে হানাহানি করে নিজেরাই নিজেদের ‍মৃত্যুর কারন হয়ে দাঁড়াচ্ছি। ছেলেধরা বলে কারো মা’কে পিটিয়ে হত্যা করছি। কোন সন্তানকে মাতৃহারা করছি। আমরাও প্রকৃতিরই মানুষ। অথচ কত তফাৎ বন্যপ্রাণীদের সাথে মানুষের। এসব চিন্তা ও প্রকৃতির পাখিদের দৃশ্য দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে এলো। আবারো সবাইকে এক সাথে ডাকা হলো বিকেলের নাস্তার জন্য।  জনপ্রতি গরম গরম ৪টি ডালের পুরি ও টমেটো সস দিয়ে পরিবেশন করা হলো বিকেলের নাস্তা। সাথে চা ও কফি। নাস্তার পর আবারো আড্ডায় জমে গেলাম। কেউ কেউ তাদের অভিজ্ঞতা ও হাস্যকর ঘটনার বর্ননা দিচ্ছেন। কেউ কেউ ফটোগ্রাফীর উপর জানতে চাচ্ছেন। আলাপে আলাপে কখন যে সূর্য অস্ত যেয়ে সন্ধ্যা নেমে আসলো বলতেই পারবো না। রাত ৮:৩০মিনিটে কটকায় পৌছালাম। ৯:০০ টায় রাতের খাবার  দেয়া হলো। খাবার শেষে মংলার প্রসিদ্ধ মিষ্টি দেয়া হলো। কিছুক্ষন ডেকে বসে ঘুমানোর জন্য রাত ১০:০০টায় কেবিনে আসলাম । বিছানায় ক্লান্ত শরীর ঢেলে দেবার পর কখন যে ঘুমিয়ে গেছি বলতেই পারবো না।

(চলবে)

 

১৮৮জন ২৩জন
36 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য