আমার ছোটবেলায় আমাদের মহম্মদপুর ছিল ভীষণ অসাম্প্রদায়িক, মানবিক, সহানুভূতিশীল। সত্যিকথা বলতে, অসাম্প্রদায়িক শব্দটা তখন পর্যন্ত আমার জানা ছিল না। সবার বাড়িতেই সবার অবাধ যাতায়াত ছিল। ঈদ উপলক্ষে আমার বন্ধু জিয়ার ভাবি, বোন আমার মাথায় হাতে মেহেদি লাগিয়ে দিতো; ওরা কোনদিন আমারে মনে করেনি আমি বাইরের কেউ। ঈদের দিনগুলো আক্ষরিক অর্থেই কেটে যেত হৈহুল্লোড়, ব্যস্ততায় আর আনন্দে। সকালবেলা বাসনা সাবান দিয়ে গোছল করে সাধ্যমত ভালো জামাকাপড়, জুতো পরে প্রথমেই চলে যেতাম জিয়া, পিনুদের বাড়িতে। ওর মা’কে আমি ডাকতাম দাদি আর অনেক আদর করতেন আমাকে। দাদি আমাকে মনে হয় না জিয়া, পিনুদের থেকে আলাদা করে দেখতেন। ঈদের দিন প্রথম সেমাই দিতেন আমাকে। সেমাই খেয়ে আমি জিয়া, পিনু, পাপেলদের সাথে চলে যেতাম মহম্মদপুর গোরস্থান মাঠের ঈদগাহ ময়দানে। একবার আমি ঈদের জামাতেও দাঁড়িয়ে পড়ছিলাম। সবাই হাসাহাসি শুরু করলে জিয়া বলল, “তোর এখানে দাঁড়ানো লাগবে না”। তখন আমি ঈদ মাঠের পাশে অস্থায়ী জিলেপি, বাতোসা আর খেলনার দোকানে অপেক্ষা করতাম ওদের ঈদের নামাজ শেষ হওয়ার জন্য।

আমার ছোটবেলায় এক আপু ছিল, শিরিন আপু। আমাকে ঈদের সেমাই না খাওয়ালে তার ঈদ নাকি শুরুই হতো না। বাড়ি থেকে জামাকাপড় পরে সেজেগুজে বের হওয়ার পথে শিরিন আপু অপেক্ষা করতেন তার জানলার গ্রিল ধরে। আমাকে সালামি দিয়ে বলতেন, যা বন্ধুদের সাথে ঘুরে আয় আর সারাদিন কী কী করলি আমাকে সন্ধ্যায় বলবি।

ঈদের নামাজ শেষ হলে আমরা জড়ো হতে থাকতাম বাজারের একটা চায়ের দোকানে। সেখান থেকে ভ্যানে করে প্রত্যেক বন্ধুদের বাড়ি যেতাম। যেসব মেয়ে বন্ধুদের বাসায় রেগুলার যাওয়ার সুযোগ ছিল না ঈদের দিন তাদের বাসায় যাওয়ার জন্য যেন স্পেশাল ডিসকাউন্ট অফার। তখনকার সময়ে কেউ আমাকে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করেনি, আমার সাথে মিশলে কারো ধর্মচর্চা বাঁধাগ্রস্থ হয়নি। তখনকার বন্ধুদের বাবামা, সমাজ এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনকার মত ধর্মীয় বিভাজন রেখা টেনে দেননি। একবার ঈদে ঢাকা থেকে বাড়ি গেছি, তখন সদ্য সিগারেট খাওয়া শুরু। একবন্ধু সিগারেটের মধ্যে গাঁজা ভরে আমাকে দিছে, আমিও টানছি মনের সুখে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে মনে হলো আমি মনে হয় মরে যাচ্ছি। মুহুর্তে কোথা থেকে যেন খবর পেয়ে এক বন্ধুর মা আমাকে দ্রুত বাড়িতে নিয়ে এলেন। তার ঈদের সমস্ত সাংসারিক কাজ ফেলে আমার মাথায় পানি ঢেলে, তার কোলের উপর মাথা রেখে মাথায় তেল মালিশ করে, তেতুল গোলা পানি খাইয়ে সুস্থ করেছিলেন। আমার জন্য তার চোখের সেদিনের উৎকণ্ঠা এখনো মনে পড়ে।

ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় কোন এক ঈদে এক বন্ধুর বাসায় ঈদের সময় বেড়াতে গেছি, তখন আমার গোমাংসের টেস্ট পাওয়া হয়ে গেছে। আমি ভাবছি আজও আমার গোমাংস ভক্ষণ করার যোগ আছে। সেমাই, মুরগী, খাসি, সবই আছে শুধু গরু নাই, বন্ধুর মা খাবার টেবিলে গরু আনতেই দেন নাই”। সেই বন্ধু তার মাকে বলল, “মা, ও এসব মানে না, ও সবই খায়। তখন সেই মা বললেন, “বিকাশ হয়ত এসব মানে না কিন্তু আমার বাসায় বিকাশকে আমি এটা খেতে দিতে পারবো না।”

বর্তমান সমাজ কি এখনো তেমন আছে?

——————————————————

লেখক বিকাশ মজুমদার আমার স্বামী। লেখাটি অত্যন্ত ভালো লাগায় সোনেলায় শেয়ার দিলাম। বাংলাদেশে এমনই একটি  অসাম্প্রদায়িক সমাজের প্রতাশা ছিল আমাদের।

 

২৫২জন ১৭২জন
13 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ