আখাউড়া বর্ডার ভ্রমণ

শাহরিন ১৩ জুলাই ২০১৯, শনিবার, ০৪:৫০:৫৫পূর্বাহ্ন ভ্রমণ ২৭ মন্তব্য

আমার অল্প কিছু ভ্রমণের অভিজ্ঞতার মধ্যে সব গুলো জায়গাই ভালোলাগার। নতুন নতুন জায়গা দেখা আমার মনে হয় সবারই পছন্দের। আমিও এর ব্যাতিক্রম নই। আর এই পছন্দকে বাস্তবরূপ দিতে পেরেছি একান্তই আমার কন্যার বাবার জন্য। এটা স্বীকার করা আর ধন্যবাদ দেয়া একান্তই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ধন্যবাদ তাকে আমাকে পছন্দসই জায়গায় যাওয়ার স্বাধীনতা দেয়ার জন্য।

আমার হঠাৎ করেই বাংলাদেশের সীমানা গুলো দেখার প্রবল ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু ছোট মেয়েকে নিয়ে দূরের কোন বর্ডারে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আমার নানা বাড়ি ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া তাই হটাৎ মনে হলো আখাউড়া বর্ডার কাছাকাছি হবে ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার। বলতে লজ্জা নেই যে বাংলাদেশের মানচিত্র সমন্ধে আমার তেমন জ্ঞান নেই। গুগল মামার সাহায্যে সব খুটিনাটি দেখা শুরু করলাম। আমার নানা বাড়ি থেকে কত দূর হবে,  কোন রাস্তায় যেতে হবে ইত্যাদি।

আমার মায়ের গ্রামে কিছু কাজ থাকায় সেই সুবাদে পতি দেব এর সম্মতিতে মায়ের সাথে গ্রামে গেলাম। সাথে ভাবি, ভাতিজা ও ভাগ্নিও ছিল। তারা কেউই আমার আসল উদ্দেশ্য জানতো না। রাতে মায়ের আর সবার সাথে কথা বললাম। প্রথমে বাঁধা দিলেও পরে বুঝতে পেরেছে যে রাজি না হলে আমি একাই ড্রাইভার নিয়ে রওনা দিব। শেষ মেষ রাজি হলো আর জানালেন তারাও সংগী হবেন।

সকাল ৯ টার দিকে যাত্রা শুরু করলাম। গুগল বললো যে ১ঃ৩০  ঘন্টা লাগবে। ম্যাপ সেট করে গাড়ী ছুটে চললো। পথে তো নজর কারা সবুজের সাগর দেখলাম। সাথে ব্রাহ্মনবাড়িয়ার শহর, জেলা হাসপাতাল, শিশু পার্ক, কোর্ট, ভূমি অফিস, জেলখানা, কলেজ, শহীদ মিনার সহ আমার ভাতিজা যে হাসপাতালে জন্ম নিয়েছিল সে হাসপাতাল দেখলাম। আমি সামনের সিটে বসে কোন কথা না বলে সব নজরবন্দিতে ব্যস্ত। এক সময় লোকালয় পেরিয়ে একটি রাস্তায় গাড়ি প্রবেশ করলো। যতদূর চোখ গেল শুধুই ধু ধু ধানের ক্ষেত। আর রাস্তার দু পাশে সারি সারি গাছ। কিছু দূর যাওয়ার পর হঠাৎ মোবাইলে দেখলাম ভূল পথে যাচ্ছি। গাড়ি থামিয়ে একজনকে জিজ্ঞাসা করলে বললো আমরা অনেক পেছনে বর্ডার রেখে এসেছি। ড্রাইভার সাহেব একটু ভয় পেল কিন্তু আমি খুশিই হয়েছিলাম। ওকে বললাম ভূল না হলে তো এত সুন্দর পথ দেখতেই পেতাম না। গাড়ি ঘুরিয়ে আবার বর্ডার এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। একজনকে জিজ্ঞাসা করায় সে পথ দেখিয়ে দিল। কিছুদূর যাওয়ার পর বিজিবিদের ক্যাম্প দেখলাম। সিকিউরিটির একজন বললো এটা ক্যাম্প এখান থেকে পারমিশন ছাড়া ভেতরে যেতে দিবে না। কিন্তু বুঝতে বাকি রইলো না যে এবার ও ভূল হয়েছে। কারণ আমরা শুধু সীমানা নয় যেখান দিয়ে মানুষ ইন্ডিয়া যাতায়াত করে সে জায়গাটি দেখতে গিয়েছিলাম। পরে সে আবার রাস্তা দেখিয়ে দিল। অপরূপ দৃশ্য সে গ্রামের। মনে হচ্ছিল সবুজ রঙ দিয়ে একে রেখেছে কেউ।    কিছুদূর যাওয়ার পর কাঙ্খিত সে জায়গার দেখা পেলাম। ড্রাইভার তো পারেনা বর্ডার এর গেইট দিয়েই গাড়ি ঢুকিয়ে দেয়। তাকে অনেক বোঝানোর পরে সে বুঝলো যে পাসপোর্ট ছাড়া যাওয়া যাবে না।

বর্ডার নামার পরে দেখলাম  সেখানে ভ্রমণ কর দেয়ার জন্য সোনালী ব্যাংক এর শাখা আছে। সেখানে ভ্রমণ কর সহজেই দেয়া যায়। আর  ডিউটি ফ্রি একটি দোকানও আছে। যদিও সে দোকানটি সব সময় বন্ধই থাকে, স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পেরেছি । বাংলাদেশ অন্যান্য বর্ডার এর চেয়ে এই বর্ডার একটু কম জনপ্রিয় তাই   এখানে ভীর কম থাকে। সে কারণে  ইমিগ্রেশন এর জন্য অনেক লাইন ধরতে হয় না। ঢাকা থেকে এই জায়গাটির দূরত্ব ও কম। বাস বা ট্রেনে করে সহজেই আসা যায়।

বর্ডার এর ওপাশে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা শহর। এটি ইন্ডিয়ার একমাত্র শহর যা বর্ডার এর এতো  কাছে। ১৯৭৪ সালে ১৬ ই মে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারত বাংলাদেশের সীমানা চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও তা সঠিকভাবে কার্যকর হয় ২০১৫ সালের ৭ই মে। বর্তমানে এদেশের বিপুল পরিমাণ পর্যটক ভারত ভ্রমণ করেন। আর পর্যটন সেবা ও দুদেশের বানিজ্যিক খাত উন্নয়ন করার জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্দ্যোগ নিচ্ছেন। দুদেশের বানিজ্যিক উন্নয়ন এর লক্ষ্যে সপ্তাহে সাতদিন সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত এই বর্ডার খোলা থাকে। ইমিগ্রেশন শেষ করে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যেই আগরতলা শহরে প্রবেশ করা যায়। এই বর্ডারটি জনপ্রিয় করার জন্য রেল মন্ত্রণালয় থেকেও অনেক প্রচারণা করছে। আর আগরতলা থেকে মুম্বাই,  দিল্লি,  চেন্নাই সহ অনেক জায়গারই সরাসরি ট্রেনে যাওয়ার সুবিধা আছে। সাথে বিমানবন্দর ও আছে।

আমরা বর্ডার দেখার পরে সেখানের গার্ড রা জানালেন যে বিকাল ৫ টা বাজে অনুষ্ঠানে যেতে পারবো চাইলে। সে অনুষ্ঠান এ দুদেশের মানুষই যেতে পারবে। কিন্তু অপরিচিত জায়গা এই ভেবে সেখানে অনুষ্ঠান পর্যন্ত থাকিনি। বর্ডারে প্রতি বৃহস্পতিবার বর্ডার হাট বসে। বাংলাদেশ আর ভারত দুই দেশের মানুষের জন্যই হাট উন্মুক্ত থাকে। বর্ডারের পাশে দেখে এখানকার লোকজন ইন্ডিয়ান জিনিসপত্রের ব্যবসায় বেশী করে। নারী পুরুষ উভয়ই বিভিন্ন ব্যবসায় করে। যেমন শাড়ী, থ্রি পিস,  মেডিক্যাল এর সামগ্রী,  প্রশাধনী । আমার এক দূরের আত্নীয়ের মাধ্যমে এটা জানতে পারি। এবং বেশিরভাগ জিনিসই আসে চোরাই পথে। কিভাবে আনে আল্লাহই জানেন। আমরা সেখানে আরো কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি।

আরো কিছুক্ষণ থাকলে হয়তো আরো অনেক কিছু জানা যেত। কিন্তু সময় এর কাছে মানুষ অসহায়। তবে অনেক ভালো লাগা নিয়ে ফিরেছি। আমি অনেক এক্সাইটেড ছিলাম, যতদূর চোখ যায় বর্ডারের ওপাশে দেখার চেষ্টা করছিলাম। আমার মা বাচ্চাদের মত শত প্রশ্ন করছিলেন বিপরীত পাশ নিয়ে। তাকে বোঝাতে পারছিলাম না তুমি যা দেখছো আমিও তাই দেখছি। আমার সহযাত্রীরা প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও পরে অনেক উপভোগ করেছে। আমার মেয়েটি আমাকে খুবই ভালো সময় দিয়েছে। দীর্ঘ পথ হলেও ছোট মানুষ হিসেবে  কোন প্রকার বিরক্ত করেনি।

আরেকটি বিষয় হলো কেউ খাবার ব্যাপারে একটু বেশী সচেতন হলে সাথে করে খাবার নিয়ে যাবেন। কারণ সেখানে খাবার এর দোকান নেই। যাওয়ার সময় বাজার আছে সেখান থেকে খাবার সংগ্রহ করতে পারবেন। তারপরেও অনেক ভালো কিছু পাবেন এটা আশা করা সঠিক হবে না। যেমন আমার মেয়ে আইসক্রিম খেতে চেয়েছিল কিন্তু কোথাও পাইনি। সব দোকানে ফ্রিজ আছে কিন্তু ফ্রিজে বিদুৎ সংযোগ ছিল না।

কোন নতুন জায়গায় গেলে সেখানের স্থানীয় মানুষদের সম্মান করুণ ও নিয়ম মেনে চলুন। তাহলে ভ্রমণ একটু নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যের হবে।

ধন্যবাদ।

২৪৭জন ৪৪জন
41 Shares

২৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য